রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।


ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবের হ্রাস ও হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুত্থানের সূচনা।

১৮৭০ হইতে ১৮৭৯ পর্য্যন্ত।

 ১৮৭০ সালের শেষে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ইংলণ্ড হইতে ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া নানা প্রকার সদনুষ্ঠানের আয়োজন করিলেন। 'ভারতসংস্কার সভা' নামে একটা সভা স্থাপন করিয়া তাহার অধীনে পাঁচ প্রকার কার্য্যের আয়োজন করিলেন (১ম) সুলভ সাহিত্য, (২য়) সুরাপান নিবারণ, (৩য়) শ্রমজীবি-বিদ্যালয়, (৪র্থ) স্ত্রীশিক্ষা, (৫ম) দাতব্য-বিতরণ। সুলভ-সাহিত্য বিভাগে 'সুলভ সমাচার' নামক এক পয়সা মূল্যের সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বাহির হইল; সুরাপান নিবারণ বিভাগে “মদ না গরল” নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হইল; শ্রমজীবি বিদ্যালয় বিভাগে শ্রমজীবিদিগের জন্য নৈশ বিদ্যালয় স্থাপিত এবং তাহার কাৰ্য্যভার তাহার অনুগত কাৰ্য্যদক্ষ এক প্রচারকের প্রতি অর্পিত হইল; স্ত্রীশিক্ষা বিভাগে বয়স্থা মহিলাদিগের জন্য এক বিদ্যালয় খোলা হইল; তাহাতে আমাদের অনেকের স্ত্রী ভগিনী প্রভৃতি বয়স্থা মহিলাগণ পাঠ করিতে লাগিলেন; এবং আমরা কয়েকজন তাহার শিক্ষক হইলাম; দাতব্য বিভাগে এক মহাকার্য্যের অনুষ্ঠান হইল। তখন বেহালা প্রভৃতি কলিকাতার উপনগরবর্ত্তী স্থানে ম্যালেরিয়া জ্বরের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়া ছিল। কেশবচন্দ্রের দ্বারা প্রেরিত হইয়া তাঁহার একজন অনুগত প্রচারক সপ্তাহের মধ্যে কয়দিন গিয়া ম্যালেরিয়া-পীড়িত দরিদ্র লোকদিগের চিকিৎসা ও তাহাদের মধ্যে ঔষধ বিতরণ করিতে লাগিলেন। এই প্রচারক খ্যাতনামা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। গোস্বামী মহাশয় শান্তিপুরের প্রসিদ্ধ অদ্বৈত বংশের সস্তান। যৌবনের প্রারম্ভে ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হন; এবং ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার-কাৰ্য্যে আপনাকে অর্পণ করেন। তিনি কলিকাতা মেডিকেল কলেজে পড়িয়াছিলেন। তিনি প্রত্যুষে উঠিয়াই স্নান ও ঈশ্বরোপাসনা সারিয়া কিঞ্চিৎ জলযোগ পূর্ব্বক, ঔষধ ও পথ্যাদি লইয়া, বেহালাতে গমন করিতেন; এবং সেখানে ১০/১১ টা পৰ্য্যন্ত রোগী দেখিয়া এবং ঔষধ বিতরণ করিয়া ১২টার সময় সহরে ফিরিতেন; ফিরিয়া আহার করিয়াই বয়স্থাবিদ্যালয়ে গিয়া পাঠন কার্য্যে নিযুক্ত হইতেন। সে সময়ে তাঁহার যে পরিশ্রম দেখিয়াছি গবর্ণমেণ্টের কোনও উচ্চ বেতনভোগী কৰ্ম্মচারীকে তত পরিশ্রম করিতে কখন দেখি নাই। সেই শ্রমে তার শরীর জন্মের মত ভগ্ন হইয়া গেল। তিনি পরে এক প্রকার ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করিয়াছিলেন বলিলে হয়; কিন্তু আমাদের সঙ্গে বাসকালে যে নিঃস্বার্থ পরসেবা, যে সদনুষ্ঠানে একাগ্রমতি, যে ধৰ্ম্মোৎসাহ দেখাইয়া গিয়াছেন তাহা চিরদিন আমাদের আদর্শস্বরূপ স্মৃতিতে মুদ্রিত রহিয়াছে।

 পূৰ্ব্বোক্ত পঞ্চবিধ সদনুষ্ঠানের মধ্যে 'সুলভ সমাচার' বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সূলভ সমাচার, এদেশে সুলভ সংবাদপত্রের পথপ্রদর্শন করিল। এক পয়সা মূল্যের সংবাদপত্র যে বাহির হইতে পারে, এবং বাহির হইলে যে তিষ্ঠিতে পারে, তাহা কেহ অগ্ৰে জানিত না। “সুলভ” যখন বাহির হইল তখন চারিদিকে আলোচনা পড়িয়া গেল। ‘সুলভ' একদিকে যেমন দেশের প্রচলিত সংবাদ দিতে লাগিল, অপরদিকে নীতিপুর্ণ প্রবন্ধের দ্বারা লোকচিত্তের সদ্ভাব উদ্দীপন ও হাস্যরসোদ্দীপক গল্পাদি দ্বারা আমোদম্পৃহা চরিতার্থ করিতে লাগিল। দুঃখের বিষয় ‘সুলভ' কয়েক বৎসর পরে অন্তর্হিত হইয়া গেল।  এই পাঁচ প্রকার সদনুষ্ঠান ব্যতীত ভারতসংস্কার সভার অধীনে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় আরও কয়েক প্রকার কার্য্যে হস্তার্পণ করিয়াছিলেন। হরনাথ বসু নামক ব্রাহ্মসমাজের একজন উৎসাহী সভ্যের প্রতিষ্ঠিত একটা স্কুল নিজহাতে লইয়া তাহার এলবার্ট স্কুল নাম দিয়া চালাইতে লাগিলেন। তৎপরে কলেজ স্কোয়ারের উত্তরপার্শ্ববৰ্ত্তী পুরাতন প্রেসিডেন্সি কলেজের ব্যবহৃত একটা বাড়ী ক্রয় করিয়া, তাহাতে এলবার্ট স্কুল স্থাপন করিলেন; এবং তাহার উপরের তালার বড় হলটী ট্রষ্টিগণের হস্তে দিয়া, এলবার্ট হল নাম দিয়া, সৰ্ব্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য রাখিলেন।

 এতদ্ব্যতীত এই সময়ে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের অনুষ্ঠিত আর একটী প্রধান কাৰ্য্য ভারত আশ্রমের প্রতিষ্ঠা। ১৮৭২ খ্ৰীষ্টাব্দে ঐ কার্য্যের সূত্রপাত হয়। কেশবচন্দ্র ইংলণ্ড বাসকালে ইংরাজজাতির গার্হস্থ্যনীতি দেখিয়া অত্যন্ত মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তিনি সৰ্ব্বদা বলিতেন ইংরাজের home বা গৃহ-পরিবারের ন্যায় জিনিসটা আর পৃথিবীতে নাই। বাস্তবিক ইংরাজ মধ্যবিত্ত ভদ্রগৃহস্থের গৃহের ধৰ্ম্মভাব, সুশৃঙ্খলা, সুনিয়ম, মিতাচার, পরিচ্ছন্নতা, কার্যবিভাগ, নরনারীর স্বাধীন সন্মিলন, শিশু পালন প্রভৃতি সমুদয় অতীব প্রশংসনীয় এবং অনুকরণের যোগ্য। তিনি মনে করিলেন একটা আশ্রম স্থাপন করিয়া কতকগুলি ব্রাহ্মপরিবারকে তাঁহাতে থাকিবার জন্য আমন্ত্রণ করিবেন; এবং তাহাদিগকে কিছুকাল সুনিয়মে ও ধৰ্ম্মসাধনে নিযুক্ত রাখিয়া পারিবারিক ধৰ্ম্ম-জীবনে শিক্ষিত করিবেন। তৎপরে তাহারা সেই শিক্ষায় ভাব লইয়া নানা স্থানে যাইবে; ক্রমে ব্রাহ্মপরিবার সকল ধৰ্ম্মসাধন, শৃঙ্খলা ও সুনিয়ম বিষয়ে আদর্শ পবিবার হইব। তাহার অভিপ্রায় অতি মহৎ ছিল। তাঁহার আহ্বানে আমরা অনেকে সপরিবারে ভারত-আশ্রমে গিয়া বাস করিয়াছিলাম। সেখানে একত্র উপাসনা, একত্র আহার, সময়ে পাঠ, সময়ে কাৰ্য্য প্রভৃতির ব্যবস্থা হইয়াছিল। তদ্দ্বারা আমরা আপনাদিগকে বিশেষ উপকৃত বোধ করি। দুঃখের বিষয় আশ্রমটী বহুদিন স্থায়ী হয় নাই; কয়েক বৎসর পরেই উঠিয়া যায়।

{gap}আর এক কারণে এই আশ্রমপ্রতিষ্ঠার কালটী বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজে ও তদ্বারা বঙ্গসমাজে স্ত্রী-স্বাধীনতার আন্দোলন ও চর্চ্চা উপস্থিত হয়। ব্রাহ্মসমাজের ভিতরে ভিতরে অনেকদিন হইতে ঐ চর্চ্চা চলিতেছিল। ইহার কিছু পূৰ্ব্বে পূৰ্ব্ববঙ্গের বিক্রমপুর প্রদেশ হইতে একজন দৃঢ়চেতা, নির্ভীক, একাগ্রচিত্ত ও নারীহিতৈষী পুরুষ কলিকাতাতে আগমন করেন। তাঁহার নাম দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি আসিবার সময় তাঁহার প্রকাশিত “অবলাবান্ধব” নামক সাপ্তাহিক পত্র সঙ্গে করিয়া আসেন। “অবলাবান্ধব" ইহার কয়েক বৎসর পূৰ্ব্বে ঢাকা হইতে প্রকাশিত হয়; এবং নারীগণের শিক্ষা ও উন্নতি সম্বন্ধে অত্যগ্রসর দলের কাগজ বলিয়া পরিগণিত হয়। কলিকাতাতে আসিয়া নুতন নূতন লেখকদিগের সাহায্যে অবলাবান্ধবের শক্তি ব্ৰাহ্মসমাজ মধ্যে প্রবল হইয়া উঠে। ব্রাহ্ম যুবকযুবতীদিগের মধ্যে অনেকে ঐ ভাবাপন্ন হইয়া উঠেন। এই ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ভূতপূৰ্ব্ব সুপ্রসিদ্ধ উকীল দুর্গামোহন দাস মহাশয় ১৮৭০ সালে হাইকোর্টে ওকালতী করিবার জন্য বরিশাল হইতে কলিকাতায় আসিলেন। তিনি আসিয়া গাঙ্গুলী মহাশয়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হইলেন। ব্রাহ্মদিগের উপাসনাস্থান যে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মমন্দির তাহাতে কেন মহিলাদিগের জন্য পর্দ্দার বাহিরে বসিবার স্থান থাকিবে না, অগ্রসর যুবকদলের মধ্যে এই আলোচনা কিছুদিন চলিল। অবশেষে তাহারা কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়কে আপনাদের অভিপ্রায় জানাইলেন। বলিলেন যে তাহারা স্বীয় স্বীয় পরিবারের মহিলাদিগকে লইয়া পর্দ্দার বাহিরে প্রকাশ্যভাবে বসিতে ইচ্ছুক, এ বিষয়ে তাঁহাকে সম্মতি দিতে হইবে, আচাৰ্য্য কেশবচন্দ্র মহা সমস্যার মধ্যে পড়িয়া গেলেন। তাহার উপাসকমণ্ডলীর কতকগুলি লোক যেমন এই প্রার্থনা জানাইলেন, অপরদিকে প্রাচীন ভাবাপন্ন অনেক সভ্য তদ্বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে লাগিলেন। এই চর্চ্চা যখন চলিতেছে এমন সময়ে একদিন অগ্রসর দলের কতিপয় ব্যক্তি স্বীয় স্বীয় পত্নী ও কন্যাগণকে লইয়া আসিয়া পর্দ্দার বাহিরে সাধারণ উপাসকগণের মধ্যে বসিলেন। প্রাচীন ও নবীন উপাসকগণের মধ্যে মহাবিরোধ ও আন্দোলন উপস্থিত হইল। স্বয়ং কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ও এতদুর যাইতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি অগ্রসর দলকে এরূপ করিতে নিষেধ করিলেন। কিন্তু তাঁহার সেরূপ নিষেধ ন্যায়সঙ্গত বিবেচনা করিলেন না। বলিলেন—তাঁহারাও উপাসকমণ্ডলীর সভ্য, মন্দির নিৰ্ম্মাণ বিষয়ে তাঁহারাও সাহায্য করিয়াছেন, মন্দিরের মধ্যে যেখানে ইচ্ছা তাঁহাদের বলিবার অধিকার আছে। কিন্তু সে আপত্তি শোনা হইল না। বারান্তরে তাঁহারা মহিলাগণের সহিত উপস্থিত হইলে তাঁহাদিগকে বসিতে নিষেধ করা হইল। তখন তাঁহারা বিরক্ত হইয়া ভারত বর্ষীয় ব্ৰহ্মমন্দিরে আসা পরিত্যাগ করিলেন; এবং প্রসিদ্ধ ডাক্তার অন্নদাচরণ ধাস্তগির মহাশয়ের ভবনে এবং তৎপরে অন্ত স্থানে একটী স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করিলেন। এই সমাজের কার্য্য স্বতন্ত্রভাবে কিছুদিন চলিয়াছিল; তৎপরে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ব্রহ্মমন্দিরে পর্দার বাহিরে মহিলাদিগের জন্য বসিবার আসন করিয়া দিলে, প্রতিবাদকারিগণ নিজেদের সমাজ তুলিয়া দিয়া আবার ব্ৰহ্মমন্দিরে ফিরিয়া আসিলেন।

 স্বতন্ত্র সমাজটা উঠিয়া গেল বটে, কিন্তু স্ত্রীশিক্ষা ও স্ত্রীজাতির উন্নতি-বিষয়ে প্রাচীন ও নবীন দুই দলের মধ্যে যে পার্থক্য ঘটিয়াছিল তাহা সম্পূর্ণ তিরোহিত হইল না। কেশবচন্দ্র ভারতাশ্রম ভবনে বয়স্থ বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া নারীকুলের শিক্ষার যে আদর্শ অনুসরণ করিতে লাগিলেন তাহা অগ্রসর দলের মনঃপূত হইল না। তাঁহারা নিজ নিজ পরিবারের কন্যাদিগকে সে বিদ্যালয়ে দিলেন না। প্রধানতঃ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি মহাশয়ের উদ্যোগে ১৮৭৩ সালে “হিন্দুমহিলা-বিদ্যালয়” নামে একটা স্বতন্ত্র বিদ্যালয় স্থাপিত হইল। সেখানে গাঙ্গুলি মহাশয় শিক্ষকতা করিতে আরম্ভ করিলেন।

 এই বিবাদ ক্ষেত্রে অনুমান ১৮৭২ সালের শেষে একজন শিক্ষিতা ইংরাজ রমণী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি কুমারী এক্রয়েড। ইনি পরে বরিশালের মজিষ্ট্রেট বেভেরিজ সাহেবের সহিত পরিণীতা হইয়াছিলেন। কুমারী এক্রয়েড ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ গার্টন কলেজে শিক্ষা প্রাপ্ত হইয়া তদানীন্তন ইংলণ্ডীয় নারীকুলের মধ্যে সুশিক্ষিত রমণী ছিলেন : ভারতের নায়ীগণের শিক্ষার দূরবস্থার কথা শুনিয়া, এদেশে আসিয়া, নারীকুলের শিক্ষাবিধান বিষয়ে সাহায্য করিবার বাসনা তাহার মনে উদিত হয়। তিনি আসিয়া পূৰ্ব্ব আলাপসুত্রে সুপ্রসিদ্ধ বারিষ্টার মনোমোহন ঘোষ মহাশয়ের ভবনে প্রতিষ্ঠিতা হইলেন; এবং নবপ্রতিষ্ঠিত হিন্দুমহিলা বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়িক হইলেন। ওদিকে আনন্দমোহন বস্থ মহাশয় বারিষ্টারিতে উত্তীর্ণ হইয়া স্বদেশে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি আসিয়া স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি ও দুর্গামোহন দাস প্রভৃতি বন্ধুগণের পক্ষ অবলম্বন করিলেন। কয়েক বৎসর পরে কুমারী এক্রয়েড পরিণীত হইয়া সহর পরিত্যাগ করাতে হিন্দুমহিলা বিদ্যালয় রূপান্তরিত হইয়া “বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়” নাম ধারণ করিল; এবং প্রধানতঃ আনন্দমোহন বসু ও দুর্গামোহন দাসের অর্থ সাহায্যে চলিতে লাগিল। ইহাই বঙ্গনারীর উচ্চশিক্ষার প্রথম আয়োজন। করেক বৎসর পরে এই বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় বেথুন কলেজের সহিত সম্মিলিত হয়; এবং আনন্দমোহন বসু, দুর্গামোহন দাস, মনোমোহন ঘোষ প্রভৃতি বেথুন স্কুল কমিটীতে স্থান প্রাপ্ত হন; এবং নারীগণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত শিক্ষা দিবার জন্য বেথুন স্কুলে কালেজ বিভাগ খোলা হয়।

 এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে আর এক প্রকার স্বান্দোলন উপস্থিত হয়। অনেক যুবক সভ্য ব্রাহ্মসমাজের কার্য্যকলাপের মধ্যে নিয়মতন্ত্র প্রণালী স্থাপন করিবার জন্য প্রয়াসী হইলেন। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় নিয়মতন্ত্র-প্রণালীর বড় পক্ষ ছিলেন না। তিনি ইহাকে ভয়ের চক্ষে দেখিতেন; সুতরাং একটা মতবিরোধ ও আন্দোলন উপস্থিত হইল। সভাসমিতিতে ও প্রকাশ্য পত্রাদিতে আন্দোলন চলিল। অবশেষে নিয়মতন্ত্রপক্ষীয়গণ “সমদর্শী" নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করিলেন। তদবধি র্তাহাদের নাম ‘সমদৰ্শী' দল হইল। স্ত্রীস্বাধীনতা পক্ষের অনেকে এ দলেও প্রবেশ করিলেন। এই আন্দোলনের চরম ফলে অবশেষে ব্রাহ্মসমাজে দ্বিতীয় গৃহবিচ্ছেদ ঘটে।

 কিন্তু যেজন্য এই কাল বিশেষভাবে স্মরণীয় তাহা অন্য প্রকার। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় বিলাত হইতে আসিয়া আর একটা কার্যে হস্তার্পণ করেন; যেজন্য ব্রাহ্মসমাজ মধ্যে এবং তৎসঙ্গে হিন্দুসমাজ মধ্যেও ঘোর আন্দোলন উপস্থিত হয়; এবং যে আন্দোলনের ফলে বাহিরের লোকের মনে ব্রাহ্মসমাজের শক্তি হ্রাস হইয়া হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুত্থানের তরঙ্গ উখিত হয়। তাহা এই –

 ইহা পূৰ্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে ১৮৬১ সাল হইতে ব্রাহ্মদিগের মধ্যে সংস্কৃত পদ্ধতি অনুসারে বিবাহাদি অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়। এতদৰ্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এক নব বিবাহ-পদ্ধতি প্রণয়ন করেন। তাহাতে হিন্দু-বিবাহ-প্রণালীর সাকারোপাসনা, ও হোম প্রভৃতি অনুষ্ঠান পরিত্যক্ত হইয়াছিল; তদ্ভিন্ন আর সকল বিষয়েই উহা প্রাচীন পদ্ধতির অনুরূপ ছিল।

 যতদিন এক জাতীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে বিবাহ-ক্রিয়া সম্পন্ন হইতেছিল, ততদিন ঐ সংস্কৃত পদ্ধতির বৈধতা সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠে নাই। কিন্তু ১৮৬৪ সাল হইতে বিভিন্ন জাতীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে বিবাহ-সম্বন্ধ স্থাপিত হইতে লাগিল; এবং ১৮৬৬ সাল হইতে উন্নতিশীল ব্রাহ্মদল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রণীত পদ্ধতি পরিবর্তিত করিয়া আপনাদের বিশ্বাস ও রুচির অনুরূপ এক নুতন পদ্ধতি প্রণয়ন করিলেন। তখন হইতে এই বিচার উপস্থিত হইল ব্রাহ্মসমাজের নবপ্রণীত পদ্ধতি আইন অনুসারে বৈধ কি না ? কয়েক বৎসর এই বিচার চলার পর কেশবচন্দ্র আইনজ্ঞ ব্যক্তিগণের মত নিৰ্দ্ধারণের জন্য, আদিসমাজের পদ্ধতি ও নিজেদের অবলম্বিত পদ্ধতি, উভয় পদ্ধতি তদানীন্তন এডভোকেট জেনারেলের হস্তে অর্পণ করিলেন। তিনি উভয় পদ্ধতিকেই আইনের চক্ষে অবৈধ বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। তখন আদি ব্রাহ্মসমাজের সহিত উন্নতিশীল দলের ঘোর বাক্-যুদ্ধ উপস্থিত হইল। আদি ব্রাহ্মসমাজ নবদ্বীপ, কাশী প্রভৃতি স্থানের পণ্ডিতগণের মত সংগ্রহ পূৰ্ব্বক দেখাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন যে তাঁহাদের অবলম্বিত পদ্ধতি হিন্দুশাস্ত্রানুসারে বৈধ। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ও কতিপয় লব্ধপ্রতিষ্ঠ সংস্কৃত-শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের মত সংগ্ৰহ করিয়া দেখাইলেন যে উভয় সমাজের পদ্ধতিই শাস্ত্রানুসারে অবৈধ।

 ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেই এই মতভেদ ও বিবাদ দেখিয়া গবর্ণমেণ্ট ব্রাহ্মম্যারেজ বিল নামে যে নুতন আইন প্রণয়ন করিবার সংকল্প করিয়াছিলেন তাহা পরিত্যাগ করিলেন। ঐ নাম পরিত্যাগ করিয়া “নেটিব ম্যারেজ বিল” নামে এক নূতন আইন বিধিবদ্ধ করিবার সংকল্প করিলেন। কিন্তু হিন্দুসমজের মুখপাত্র হিন্দুপেট্রিয়ট প্রভৃতির ও দেশের অপরাপর প্রদেশের পত্রিকাদির প্রতিবন্ধকতায় সে সংকল্পও পরিত্যাগ করিতে হইল।

 ওদিকে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ১৮৭১ সালে আইনটীকে নামহীন রাখিয়া পরিবর্তিত আকারে যখন বিধিবদ্ধ করিয়া লইবার জন্য ব্যগ্র হইলেন, তখন দুইটী গুরুতর প্রশ্ন উঠিল। প্রথম, এই নূতন আইনে কন্যার বিবাহোপযুক্ত বরস কত রাখা হইবে? দ্বিতীয়, এই আইন কাহাদের জন্য বিধিবদ্ধ করা হইতেছে? প্রথম প্রশ্নের মীমাংসার জন্য কেশবচন্দ্র ভারতসংস্কার সভার সভাপতিরূপে দেশের নানা প্রদেশের সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসকগণের মত জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহাদের অধিকাংশের মতে এদেশীয় বালিকাদের বিবাহোপযুক্ত বয়স ষোড়শ বর্ষের উপরে নির্দিষ্ট হইল। কেবল কলিকাতা মেডিকেল কলেজের অন্যতম প্রোফেসার ডাক্তার চার্লস গভৃতি কেহ কেহ লিখিলেন যে চতুর্দ্দশ বর্ষকে সৰ্ব্বনিম্নতম বয়স মনে করা যাইতে পারে। তদনুসারে, ১৮৭২ সালের তিন আইন নামে যে আইন বিধিবদ্ধ হইল, তাহাতে চতুর্দশ বর্ষ বালিকাদিগের সর্বনিন্ম বিবাহোপযুক্ত বয়স বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। -

 দ্বিতীয় প্রশ্নটীর মীমাংসা গবর্ণমেণ্ট এইরূপ করিলেন যে, এই নূতন আইন তাহাদেরই জন্য বিধিবদ্ধ ব্যবহৃত হইয়াছে যাহারা প্রচলিত হিন্দু, মুসলমান, খ্ৰীষ্টান, য়িহদী প্রভৃতি, কোনও ধৰ্ম্মে বিশ্বাস করে না, এবং ঐ সকল ধৰ্ম্মের নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসারে বিবাহ করিতে অনিচ্ছুক। বাহিরের লোকের মনে এই কথা দাড়াইল যে ব্রাহ্মেরা বলিতেছে—“আমরা হিন্দু নই।” আদিসমাজ এই কথার ঘোর প্রতিবাদ করিতে লাগিলেন। উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলও আপনাদের পক্ষসমর্থন করিয়া দেখাইতে লাগিলেন যে, তাহারা সামাজিক ভাবে হিন্দু হইলেও তাঁহাদের ধৰ্ম্ম উদার, আধ্যাত্মিক ও সাৰ্ব্বজনীন একেশ্বর-বাদ; সুতরাং তাহাকে ঠিক হিন্দুধৰ্ম্ম বলা যায় না।

 এই আন্দোলন চারিদিকে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িতে লাগিল। নবগোপাল মিত্র মহাশয়ের জাতীয় সভা এবং শোভাবাজারের রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর ও কালীকৃষ্ণ বাহাদুরের প্রতিষ্ঠিত সনাতন ধৰ্ম্মরক্ষিণী সভা প্রধানরূপে বিবাদ ক্ষেত্রে অবতরণ করিলেন। জাতীয় সভার উদ্যোগে “হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা” বিষয়ে এক বক্তৃতা দেওয়া হইল। আদিসমাজের সভাপতি ভক্তিভাজন রাজনারারণ বসু মহাশর সেই বক্তৃতা দিলেন এবং মহৰ্ষি দেবেন্দ্রনাথ বক্তৃতাতে সভাপতির কার্য্য করিলেন । অচির কালের মধ্যে ঐ বক্তৃতার ভূয়সী প্রশংসা এদেশের সর্বত্র ও অপরদেশেও ব্যাপ্ত হইয়া গেল । সনাতন ধৰ্ম্মরক্ষিণী সভার সভ্যগণ এবং তাহদের সভাপতি রাজা কালীকৃষ্ণ দেব বাহাদুর এই বক্তৃতার দ্বারা উৎসাহিত হইয়া, হিন্দুধৰ্ম্মের ও হিন্দু আচারাদির শ্রেষ্ঠতা প্ৰতিপাদন পূৰ্ব্বক সুপ্রসিদ্ধ মনোমোহন বসু প্রভৃতির দ্বারা বক্তৃতা দেওয়াইতে লাগিলেন।

 কলিকাতার প্রসিদ্ধ ধনী খেলৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের ভবনে সনাতন ধৰ্ম্মরক্ষিণী সভার অধিবেশন হইত। এই সভা কয়েক বৎসর পূৰ্ব্বে প্রতিষ্ঠিত হইয়া প্রাচীনশাস্ত্রের ব্যাখ্যা, শাস্ত্রীয় সাত্ত্বিক আচারের প্রতিষ্ঠা, হিন্দু ভাবের পুনরুত্থান, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের অভ্যর্থনা, প্রভৃতি কাৰ্য্য লইয়া ব্যস্ত রহিয়াছিল। কিন্তু এই সময়েই ইহা একটি প্রবল শক্তিরূপে দাঁড়াইল। ছি! ছি! ব্রাহ্মগণ আপনাদিগকে হিন্দু বলিতে চায় না, এই রব যেমন দেশে উঠিয়া গেল, তেমনি এই সভার উদ্যোগে হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থানের প্রয়াস বাড়িতে লাগিল।

 চিন্তা করিয়া যতদূর অনুভব করিতে পারি এই সময় হইতেই দেশের লোকের মনের উপরে ব্রাহ্মসমাজের শক্তি অল্পে অল্পে হ্রাস পাইতে লাগিল। আমরা অনুভব করিতে লাগিলাম কেশবচন্দ্র সেন আর পুর্ব্বের ন্যায় নব্যবঙ্গের অবিসম্বাদিত নেতা রছিলেন না; এবং যুবক দলের তাঁহার দিকে আয় সে প্রবল আকর্ষণ থাকিল না। ওদিকে ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেই তাঁহার বিরোধী দল দেখা দিল; তাহার বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় যুবক দলের নেতৃত্ব এক প্রকার পরিত্যাগ করিয়া যোগ, ভক্তি, বৈরাগ্য প্রভৃতির সাধনাৰ্থ কলিকাতার সন্নিকটে এক উদ্যান ক্রয় করিয়া, কতিপয় অনুগত শিষ্যসহ একান্তবাসী হইলেন; স্বপাকে আহার করিতে লাগিলেন; গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করিতে লাগিলেন; এবং বৈরাগ্য প্রচারে রত হইলেন। ‘সমদৰ্শী' দল এই সকলের প্রতিবাদ করিয়া দুঃখ করিতে লাগিলেন, যে যুবক দলের উপর হইতে ব্রাহ্মসমাজের শক্তি চলিয়া গেল।

 কিন্তু যুবক দল সম্পূর্ণ নেতৃহীন রহিল না। দুই জন প্রতিভাশালী নেতা আসিয়া এই সময়ে বঙ্গের রঙ্গ-ভূমিতে অবতীর্ণ হইলেন। ১৮৭৪ সালে এক দিকে আনন্দমোহন বসু বিলাত হইতে ফিরিলেন; অপর দিকে সেই সময়েই বা কিঞ্চিৎ পরেই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কৰ্ম্ম হইতে অবসৃত হইয়া কলিকাতাতে আসিয়া বসিলেন। ইঁহারা উভয়েই ছাত্রদলের মধ্যে কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। হাজার হাজার যুবক ইহাদের কথা শুনিবার জন্য ছুটিতে লাগিল; এবং হাজার হাজার হৃদয়ে উন্নতির আকাঙ্খা ও স্বদেশানুরাগ প্রবল হইয়া উঠিল। যুবকদল যেন ব্রাহ্মসমাজের দিকে পিঠ ফিরিল, এবং রাজনীতি ও জাতীয় উন্নতির দিকে মুখ ফিরিল। মধ্যে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের ছাত্রসমাজ স্থাপিত হইয়া সেই গতিকে কিয়ৎপরিমাণে নিয়মিত করিয়াছিল; কিন্তু আমার মনে হয়, যুবক দলের সে ভাব এখনও সম্পূর্ণ ঘুচে নাই।

 যখন ছাত্র দল এই সকল আন্দোলনে আন্দোলিত, তখন এক মহৎ কাৰ্য্যের সুত্রপাত হইল; তাহা ভারতসভার স্থাপন। তাহার ইতিবৃত্ত এই – বারিষ্টার মনোমোহন ঘোষ মহাশয়ের ভবন আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতির সম্মিলনের স্থান ছিল। সেখানে রাজনীতি বিবয়ে ইঁহাদের সৰ্ব্বদা কথা বাৰ্ত্তা হইত। সকলেই অনুভব করিতে লাগিলেন যে বঙ্গদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদিগের জন্য রাজনীতির শিক্ষা ও আন্দালনের উপযোগী কোনও সভা নাই। কথা বাৰ্ত্তা হইতে হইতে অবশেষে একটী রাজনৈতিক সভা স্থাপনের সংকল্প সকলের হৃদয়ে জাগিল। সেই সংকল্পের ফলস্বরূপ ১৮৭৬ সালে ভারতসভা স্থাপিত হইল। বঙ্গদেশের সামাজিক ইতিবৃত্তে সে একটা স্মরণীয় দিন। যত দূর স্মরণ হয়, সেদিন সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় মহাশয়ের একটী পুত্রের মৃত্যু হয়। তাহা সত্বেও তিনি সভাস্থলে আসিয়া ভারত সভা স্থাপনে সহায়তা করিলেন। আমাদের অনেকের সহিত দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি মহাশয়। ভারত সভাতে যোগ দিলেন; এবং পরে ইহার সহকারী সম্পাদকরূপে প্ৰসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন।

আনন্দ মোহন বন্ধু ও সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীনে ভারত সভা একটী মহৎকাজ। করিতে লাগিলেন। কয়েকজন ভ্রমণকারী বক্তা নিযুক্ত করিয়া স্থানে স্থানে সভা করিয়া বন্ধুতা কয়াইতে লাগিলেন। এই ভ্রমণকারী বক্ত গণ সর্বত্র ভারত সভার দিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিতে লাগিলেন; ইহার অনুষ্ঠিত নানা প্রকার কার্যোর জন্য অর্থসংগ্রহ করিতে লাগিলেন; এবং রাজনীতির চর্চার অভ্যাস যাহাদের ছিল না, সেই চল্টাতে তাহাদিগকে নিযুক্ত করিতে লাগিলেন। দ্বারকা নাথ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়। এই সকল কাৰ্য্যে বিশেষ উৎসাহী ও যত্নপর ছিলেন।

১৮৭৮ সালে কুচবিহারের নাবালক রাজার সহিত কেশবচন্দ্র সেন মহাদয়ের অপ্রাপ্তবয়স্ক ক্যার বিবাহ উপলক্ষে ব্রাহ্মদিগের মধ্যে মতভেদ ঘটিয়া, উন্নতি শীল ব্রাহ্মগণ দুই ভাগে বিভক্ত হন। প্রতিবাদকারী দল ১৮৭৮ সালের মে মাসে সাধরণ ব্রাহ্মসমাজ নামে একটি। স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করেন। এই সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অগ্রণী সভ্যগণের উৎসাহে ও উদ্যোগে দিটা স্কুল নামে একটী নূতন ব্গ স্থাপিত হর। উহার অনুষ্ঠান-পত্ৰ আনন্দমোহন বস্থ, সুরেন্দ্র নাথ। বন্দ্যোপাধ্যায় ও আমার নামে বাহির হয়।, আনন্দমোহন বাবু তাহার পরামর্শ দাতা, সুরেন্দ্র বাবু একজন শিক্ষক ও আমি প্রথম সেক্রেটারি থাকি। এই সিটস্কুলের স্থাপন সে সমস্তৃকার একটী বিশেষ ঘটনা বলিয়া এসকল বিষয়। উল্লেখ করিতেছি। সে সময়ে ইহ৷ সকলের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিম্নাছিল। তথন আনন্দমোহন বস্তু ও সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রদলের ও তাহাদের। অভিভাবকদিগের এত প্রিয় পাত্র ছিলেন, যে স্কুল খুলিবা মাত্র প্রথম মাসেই ছাত্র। সংখ্যা এত কইল যে ব্যয় বাদে অর্থ উহু,ত্ত হইল।

ঐ ১৮৭৯ সালেই সাধারণ। ব্ৰহ্মসমাজের সভ্যগণ ছাত্রদিগের জন্য ছাত্র সমাজ নামে একটী বমাজ স্থাপন কমিলেন। নবপ্রতিষ্ঠিত সিটাস্কুলের ভবনে প্রতি রবিবার প্রাতে তাহার অধিবেশন হইত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবলম্বিত শিক্ষা। প্ৰণালী ধর্ম • শিক্ষা বিহীন এই অভাবকে কিরৎ পরিমাণে দূর করা ঐ ছাত্র সমাজের উদ্দেষ্ট্য ছিল। বহুসংখ্যক ছাত্র এই সমাজে যোগ দিল॥ আনন্দমোহন বস্তু মহাশয়ও আমি প্রধানত: এই সমাজে উপদেশ দিতাম। ধৰ্মসংস্কার, সমাজ সংক্ষার, সাধারণ জ্ঞানো মতি প্রভৃতি বিষয়ে উপদেশ হইত। মধ্যে মধ্যে আমরা ২০০। ৩০০ ছাত্র লাইমা শিবপুরের কোম্পানির বাগান প্রভৃতি স্থানে যাইতাম, এবং নানা প্রকার সদালোচনাতে সমস্ত দিন যাপন করিয়া' আসিতাম॥ এই প্রকারে ছাত্র দলের মধ্যে কিছু দিনের জন্ট নবোৎসাহের সঞ্চার হইয়াছিল। ছাত্রসমাজ অত্যাপি। বৰ্ত্তমান আছে।

এক্ষণে এই কালের মধ্যে পূর্ববঙ্গে কি প্রকার আন্দোলনের তরঙ্গ উঠিরা। ছিল তাঙ্গ কিঞ্চিৎ নিৰ্দেশ করিতে প্রবৃত্ত হইতেছি। দশম পরিচ্ছেদে বলিয়াছি যে কেশব চন্দ্র সেন মহাশয় তাহার বিলাত গমনের পূর্বে ১৮৬৯ সালের শেষ ভাগে চাকার ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য ঢাকাতে গমন করেন। তৎপূর্ব চৈত্র মাসে তিনি দ্বিতীয় বার ঐ সহরে গিয়াছিলেন; এবং একমাস কাল তথায় বাস করিয়া ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন। কিন্তু ১৮৬৯ সালের শেষ ভাগে। যে আবার গমন করেন তাহার ফল কিরূপ দাড়াইয়াছিল তাহা নির্দেশ করা হয়। নাই। তাহার কিঞ্চিৎ বিবরণ সুপ্রসিদ্ধ কালী প্রসন্ন ঘোষ মহাশয় এক স্থানে। এই ভাবে দিয়াছেন।

“স্বনাম-ধন্য কেশবচন্দ্র তাহার কতিপয় শিষ্যসহ ঢাকায় আগমন করিলেন; কেশব ইংরাজীতে ও তৎপরে বাঙ্গলায় বক্ততা করিলেন; তাহার বক্ত, ত৷ শ্ৰবণ করিয়া ঢাকায় সকল সম্প্রদায়ের লোক মোহিত ও বিস্মিত হইল। ব্রাহ্মধর্মের জয় পতাকা ঢাকার নগর সঙ্কীৰ্ত্তনে প্রথম উত্তোলিত হইল। যাহারা কোন অংশেও ব্রাহ্ম নহে, তাহারা ও নগর সঙ্কীৰ্ত্তনে বহির্গত, ঋষিবেশে। সুশোভিতরির্পদ, কেশবচন্দ্রকে ধ্য পুরুষ মনে করিয়া নমস্কার করিল; এবং ব্রাহ্মধর্মকে একটা" আশ্চর্য ও অতি পবিত্র বস্থ জ্ঞানে সম্মান করিতে শিথিল।”

কিন্তু এই সময় হইতে।ঢাকাস্থ ব্রাহ্মসমাজের মূৰ্ত্তি পরিবর্তিত হইল। উহ৷ এখন আর ব্রহ্মোপাসনার মন্দির মাত্র, এই ভাবে লোকের চক্ষে প্রতিভাত হইল না। ব্রাহ্মগণ সমাজ-বদ্ধ হইয়া যথারীতি দীক্ষিত হইতে আরম্ভ করি লেন। এই উপলক্ষে পিতাপুত্রে বিচ্ছেদ, জাতিপাত, সমাজ ত্যাগ, দলাদলি আরম্ভ হইল, দেশে একটাহৈ চৈ পড়িয়া' গেল। বহু ব্ৰাহ্মণ যুবা উপবীত ত্যাগ করিয়া ব্ৰাহ্ম হইলেন। তাহাদিগের মধ্যে নবকান্ত, নিশিকান্ত ও তনুজ শীতলাকান্তের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। টাহারা ভিন ভাতাই ধনসম্পত্তিশালী সন্ত্রাস্ত পিতার পুত্র। তাঁহারা যখন পৈতৃক বিষয় সম্পত্তি। হইতে বঞ্চিত হইবার আশঙ্কাও অগ্রাহ্য করিয়া ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিলেন, তখন আরও বহু যুবা৷ তাঁহাদিগের পথ লইল, তথন ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ হিন্দুসমাজ হইতে স্বতন্ত্র হইয়া পড়িল।

উক্ত মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় সুপসিদ্ধ কে, জি, গুপ্তের পিতা কালীনারায়ণ গুপ্ত সপুত্রে ও অপরাপর যুবক প্রভৃতি প্রায় ৪• সল্লিশজন লোক ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। এক দিকে এই দীক্ষার ফলস্বরূপ প্রাচীন সমাজের সহিত ব্রাহ্মসমাজের বিচ্ছেদ ঘটনা হইল বটে, কিন্তু অপরদিকে ব্রাক্ষ সমাজে নুব প্রবিষ্ট যুবকগণ মহোৎসাহে নানা বিভাগে কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন।

কেবল তাহা নহে। ১৮৭০ সালে কালীপ্রসন্ন ঘোষ মহাশয় ‘শুভসাধিনী” নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করিলেন। তাহ৷ লোকের চিত্ত বিনোদন ও শিক্ষা উভয়ের প্রধান উপায় স্বরূপ হইল। তৎপরে ঘোষজ মহাশয় সমাজ সংস্কারে উৎসাহদান৷র্থ “সমাজ-শোধিনী” নামে একথানি গ্রন্থ প্রচার করেন। এরূপ শুনিতে পাওয়া যায়, এ গ্রন্থ পূর্ববঙ্গে সামাজিক আন্দোলনের বিশেষ সহায়তা করিয়াছিল।

তৎপরে কলিকাতাতে বঙ্কিমচন্দ্রের সুবিধাত “বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হইলে, তাহার এক বংসর পরে কালী প্ৰসন্ন বাবু তাহার সু প্রসিদ্ধ “বান্ধব” নামক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘বান্ধব’ বঙ্গ সাহিতো পূর্ববঙ্গের খ্যাতি প্রতিপত্তি সুদৃঢ় ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত করিল।

ব্রাহ্মসমাজে নব প্রবিষ্ট যুব কগণের যে কাৰ্য্যতৎপরতার 'উল্লেখ অগ্ৰে করিয়াছি, তাহা এই কালের মধ্যে ঢাকাতে মহ৷ হান্দোলন উপস্থিত করে। এই সকল কাৰ্য্যে পূর্বোল্লিখিত নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি কতিপয় যুবক প্রধান সারথিরূপে দণ্ডারমান হইলেন। প্রথম এই সময়ে কিছুদিন “শুভসাধিনী” নামে ব্রাহ্মদিগের একটী সভা ছিল। বোধ হয় তাহার সংশ্রবেই কালীপ্রসন্ন ঘোষ মহাশয় গ্ৰাহার “শুভসাধিনী পত্রিকা বাহির করিয়া থাকিবেন। ১৮৭০ সাল হইতে নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় ও অভয় কুমার দাসের পুত্র প্রাণকুমার দাস তাহার সম্পাদকতা ভার গ্রহণ করিয়া তাহাকে পুনরুজ্জীবিত করিয়া তুলিলেন। এই সভার: উদ্যোগে “ম ন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষ। সভা” নামে একটী সভা স্থাপিত হইল। নবকাপ্ত বাবুই তাহার সম্পাদক হইলেন। ইহারা অর্থনংগ্ৰহ . করিয়া অস্তঃপুরবাসিনী। মহিলাদিগের পাঠের ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা ও পারি তোষিক প্রদানের ব্যবস্থা করিলেন। শুনিতে পাওয়া যায় এই বিষরে। ইহাদেয় কৃতকাৰ্য্যতা দেখিয়া। গবৰ্ণমেন্ট ও নাকি ১৫০ টাকা সাহায্য দিয়াছিলেন।

১৮৭৩ সালের ফাৰ্বন মাসে নবকাস্ত চট্টোপাধ্যায় ও তাহার ভ্রাতা নিশিকান্ত। চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে “অ্যাল্য বিবাহ নিবারিণী সভা” নামে এক সভা স্থাপিত। হইল। ঢাকা কালেজের অধ্যাপক সোমনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয় ঐ সভার সভাপতি হইলেন। ইহাতেই প্রমাণ যে ওই সভ৷ সকল শ্রেণীর উদার-ভাবাপন্ন ব্যক্তিদিগকে লইয়াই স্থাপিত হইয়াছিল। কিছু দিন পরে এই সভাত সভ্যগণ “মহাপাপ বাল্যবিবাহ” নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। নবকান্ত বাবু ঐ পত্রের সম্পাদকতা ভার গ্রহণ করেন। এরপ তাজ। তাজা মনের ভাব। প্রকাশক, হৃদয় মনের তন্ময়তা-সূচক পত্রিক। আমরা অল্পই পড়িয়াছি। তাহার ফল কোথার যাইবে! দেথিতে দেথিতে ঢাকার যুবকদলের, বিশেষতঃ ব্ৰাহ্মদলের, মধ্যে মহোৎসাহের লক্ষণ সকল প্রকাশ পাইতে লাগিল। একদিকে ব্রাহ্মযুবকগণ জাতিভেদ বর্জন করিয়া, মুসলমানের সহিত। আহারাদি করিয়া, সমাজ হইতে বর্জিত হইলেন; এবং ঘোর নির্যাতন সহ্য করিতে লাগিলেন; অপর দিকে আশ্রয়গ্ৰহণার্থিনী কুলীন কন্যাদিগকে ও হিন্দু বিধবাদিগকে আশ্রয় দিয়া৷ ব্রাহ্মসমাজে আনিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। তাহার এক একটী ঘটনা। যেন কোনও অস্তৃত উপঠাসের এক এক পরিচ্ছেদের চায়। এক একটী বিধবা বা কুলীন কুমারীকে উদ্ধার করিতে গিয়া যুবকদিগের অনেকে প্ৰাণ পৰ্য্যন্ত পণ করিতে লাগিলেন। একটী কুলীন কুমারীকে আসন্ন বছবিরাহের বিপদ হইতে উদ্ধার করিয়া কলিকাতায় প্রেরণ করাতে, একজন যুবক, ঐ কন্যার অভিভাবকগণের প্রেরিত ওস্তার লগুড়াঘাতে মাথ: ফাটিয়া, মৃত্যু শয্যায় শারিত হইলেন॥ তথাপ্লি তাহাদের উৎসাহের বিরাম হইল না।

আর একটী। পলারিতা ও আশ্ৰয়াথিনী কুলটার ক্যাকে আশ্রয় দে ওয়াতে নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে আদালতে উপস্থিত হইতে হইল। সৌভাগ্যক্রমে। ইংরাজ বিচারপতির বিচারে ঐ ক্যার আভিভাবকতা আর তাহার মাতার হস্ত হইতে লইয়া নবকান্ত বাবুর প্রতি অর্পিত হইল।

নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় স্বদেশ-প্রেমিক মানুষ ছিলেন। নিজে ধনী ব্রহ্মণ। গৃহস্থের সস্তান হইয়াও যখন দারিদ্র্যে পড়িলেন, তখন দরিদ্র ভদ্রসভানদিগকে পথ দেখাইবার জন্য নিজে জুতার দোকান করিয়া জুতা বিক্রয় করিতে লাগি লেন। তাহাতে প্রাচীন সমাজের অনেকে স্তাহার প্রতি অগ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি তাহা গ্ৰাহ করিলেন না। তিনি জ্ঞানে বা। পদ-সন্ত্রমে পূর্ববঙ্গে অগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন ন৷ ; কিন্তু এই কালের মধ্যে টাকাতে যত প্ৰকার সদনুষ্ঠানের আয়োজন হইয়াছিল, তিনি তাহার অধিকাংশের উদ্ভাবনকওঁ । তিনি সকল সদামুষ্ঠানের সহিত সংপৃষ্টছিলেন বলিয়া তাহার সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এখানে দিতেছি। বাঙ্গালা ১২৫২ ইংয়াজী ১৮৪৬ সালের ১৪ই আশ্বিন বিক্রমপুরের অন্তর্গত পশ্চিমপাড়া গ্রামে তাহার জন্ম হয়। তিনি ঐ গ্রামের সুপ্রসিদ্ধ টাকা জজ আদালতের উকীগ কাণীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র। কাণীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয় স্বধৰ্ম্মা স্তুরাগী ও ব্রাহ্মসমাজ বিদ্বেষী মানুষ। ছিলেন। ১৮৬৫ সালের শেষে কেশবচন্দ্র সেন যখন ঢাকাতে গমন করেন, তখন তাহার প্রভাব হইতে যুবকদলকে বাঁচাই বায় জগ যে হিন্দুধর্মরক্ষিণী সভা ও হিন্দু হিতৈষিণী পত্রিকা স্থাপিত হয় তিনি তাহার । মূলে ছিলেন। তিনিই স্বধৰ্মানু রাগী মানুষদিগকে একত্র করিয়া ঐ নবধর্মকে বাধা দিবার জন্য বন্ধপরিকর। হইয়াছিলেন। কিন্তু কি বিচিত্ৰ ঘটনা ! তাহার পুত্রগণই ব্রাহ্মসমাজেয় আশ্রয় গ্রহণ করিল! জ্যেষ্ঠ ভামাকাপ্ত ব্যতীত আর তিন পুত্র নবাস্ত, নিশিকান্ড ও শীতলাকান্ত ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইলেন । ইহাদের মধ্যে নবকান্তকেই নির্যাতন ও দারিদ্র্যের তাড়ন! বিশেষভাবে সহ্য করিতে হইত্নাছিল ।

ব্রাহ্মধর্মের প্রতি তাহার অনুরাগের সঞ্চার দেখিয়া পিতা কাশীকান্ত উগ্র মূৰ্ত্তি ধায়ণ করিলেন । এমন কি প্ৰহায় পর্যন্ত করিতে বিরত হন নাই। কিন্তু কিছুতেই নবকান্তকে নিরস্ত করিতে পারিলেন না।

তাহার পিতৃবিয়োগের পরে তাহার কঠোর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। পিতা উইল করিয়া গেলেন যে ছেলে স্বধৰ্ম্মে না থাকিলে সে তাহার পরিত্যক্ত সম্পত্তি পাইবে না। তদনুসারে নবকান্ত সর্বপ্রকার পৈতৃক সম্পত্তি হইতে বঙ্কিত হইয়া অসম্পূর্ণ শিক্ষা লইয়া পরিবার প্রতিপালনের জন্য ঘোর সংগ্রামের মধ্যে পড়িলেন। তিনি প্রথমে, ধামরাই নামক স্থানের স্কুলে শিক্ষকতা কার্যে নিযুক্ত হন। পরে শ্রীনগর মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাজ করেন'তাহার পরিবারস্থ ব্যক্তিগণ বলেন, যে “স্কুলের সম্পাদক তাহাকে স্কুলের বিল সম্বন্ধে একটা অসঙ্গত প্রস্তাবে সম্মত হইতে অনুরোধ করায়, তিনি তৎক্ষণাৎ কার্য পরিত্যাগ করিয়া ঢাকায় চলিয়া গেলেন। ঢাকাতে আসিয়া তিনি প্রথমে পোগোস স্কুলে, তৎপরে জগন্নাথ কালেজে শিক্ষক রূপে প্রতিষ্ঠিত থাকেন। ১৮৬৯ সালের শেষে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়। চাকা ব্ৰহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠান উপলক্ষে ঢাকাতে গিয়া ৪০ জনকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত করেন। তাহার মধ্যে নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় একজন ছিলেন। সে সময়ে ঢাকাতে কিরূপ আন্দোলন• উঠিয়াছিল, তাহ৷ অগ্রেই প্রদর্শন করিয়াছি।

ইহার পরে নবকাপ্ত বাবু নানা সৎকাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইতে লাগিলেন। তাহার ও উল্লেৰ করিয়াছি । তাহার ভবন আশ্ৰয়াথিনী হিন্দু বিধবা ও কুলীন ক্যা গণের আশ্রয়স্থান হইয়া উঠিল। তিনি কৌলীন্য প্রথা ভঞ্জন, বহু বিবাহ নিবারণ, মুরাপান ও দুর্নীতি নিবারণ প্রভৃতি সকল প্রকার দেশহিতকর কার্যে অবিরাম পরিশ্রম করিতে লাগিলেন । এইরূপ নানা সদনুষ্ঠানে রত থাকিতে থাকিতে বাঙ্গালী ১৩১১ সালের ১৫ই আশ্বিন তাহার জন্মদিনে ইহলোক পরিত্যাগ করিলেন।

ব্রাহ্মসমাজ ও নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কার্য্য ব্যতীত এই কালের মধ্যে রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কৌলীন্য-প্রথা নিবারণের চেষ্টীতে মানুষের মনকে উত্তেজিত রাথিয়াছিল, তাই৷ দশম পরিচ্ছেদে তাহার জীবন চরিতের মধ্যে উল্লেখ করিয়াছি। বিদ্যাসাগর মহাশয় যে রাজবিধির দ্বারা বহুবিবাহ নিবারণে। প্রয়াসী হইয়াছিলেন, তাহার পশ্চাতে যে রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াস বহু পরিমাণে ছিল তাহাতে সনেহ নাই। বিগাসাগর মহাশয় তাহার সেই উগামে শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের সেরাপ সহায়তা পান নাই। রাসবিহারী অশিক্ষিত হইয়াও তাহার উৎসাহদাতা হইয়াছিলেন বলিয়া তিনি শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের প্রতি হাড়ে চটিয়া গিয়াছিলেন। যাহা হউক পূর্ববঙ্গ হইতে বছদিন সর্ববিধ । সামাজিক উন্নতির অমুকুল বাক্য শোনা যাইতেছে।

স্বগীয় রাজনারায়ণ বসু