রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের জন্ম, শৈশব, বাল্যদশা ও
কৃষ্ণনগরের তদানীন্তন সামাজিক অবস্থা।

Page46-1024px-রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ cropped.jpg

 ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দের চৈত্রমাসে বারূইহুদা গ্রামে মাতুলালয়ে লাহিড়ী মহাশয়ের জন্ম হয়। সর্ব্বজ্যেষ্ঠ কেশবচন্দ্র শিবনিবাসে জন্মিয়াছিলেন; এবং সর্ব্বকনিষ্ঠ কালীচরণ কৃষ্ণনগরের বাটীতে ভূমিষ্ঠ হন; তদ্ব্যতীত আর সকলেই বারূইহুদাতে ভূমিষ্ঠ হন। পিতা রামকৃষ্ণ বারুইহুদাগ্রামবাসী, রাজবাটীর দেওয়ান, রাধাকান্ত রায় মহাশয়ের কন্যা জগদ্ধাত্রী দেবীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন।

 জগদ্ধাত্রী যে রায়বংশের কন্যা তাঁহারা কৃষ্ণনগরে দেওয়ান চক্রবর্ত্তীর বংশ বলিয়া বিখ্যাত। ইঁহাদের পূর্বপুরুষ ষষ্ঠীদাস চক্রবর্ত্তীর বিষয় পূর্ব্বেই উল্লেখ করিয়াছি। তিনি খাঁ, ভাদুড়ি, সান্যাল, লাহিড়ী, মৈত্রেয় প্রভৃতি ছয় ঘর প্রসিদ্ধ কুলীনকে স্থাপন করিয়াছিলেন বলিয়া ছয় ঘরের প্রতিষ্ঠা-কর্ত্তা বলিয়া বিখ্যাত। তদবধি এই দেওয়ান বংশের অনেকেই রাজবাটীর দেওয়ানের কাজ করিয়া আসিতেছেন। ইহারা যদি ধর্ম্মভীরু লোক না হইতেন, তাহা হইলে মহারাষ্ট্রের পেশোয়াদিগের ন্যায় রাজাদিগকে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া নিজেরাই কার্য্যতঃ রাজ্যসম্পদের অধিকারী হইতে পারিতেন। কিন্তু ইঁহারা তাহা না করিয়া বরং আপনাদিগকে দিয়া রাজাদের বিষয় রক্ষা করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। এখনও রাজবাটীর অনেক বিষয় ইঁহাদের নামে বেনামী রহিয়াছে। সে সকল বিষয় ইঁহারা নিলামে ডাকিয়া রক্ষা করিয়াছেন। প্রভুদিগকে মারিয়া আত্মপোষণ করা দূরে থাকুক, দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় মহাশয়ের আত্মজীবন-চরিতে দেখিতেছি, মধ্যে মধ্যে ইহাদের বিলক্ষণ সাংসারিক অসচ্ছল স্বর্গীয় কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় উপস্থিত হইয়াছে। এই বংশের পূর্ব্বকথা যতদূর জানা যায়, তাহাতে দেখা যায় যে বংশ পরম্পরা ক্রমে ইঁহারা যাহা কিছু উপার্জ্জন করিয়াছেন, তাহা প্রায় খাতপূর্ত্তাদি খনন, দেবালয়াদি নির্ম্মাণ, ব্রাহ্মণ দরিদ্রে দান প্রভৃতি ধর্ম্ম কর্ম্মেই নিয়োগ করিয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে এক একজন এমন মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন যাঁহাদের গুণাবলীর কথা শুনিলে শরীর কণ্টকিত হয়। তন্মধ্যে একজনের বিষয় বিশেষ ভাবে উল্লেখ করিতেছি। যাহা শুনিলে অনেকে উপন্যাসের বর্ণিত বিষয় বলিয়া অনুভব করিবেন; কিন্তু তাহা সত্য ঘটনা। দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় মহাশয় তাহার আত্মজীবন-চরিতে তাহার জ্যেষ্ঠতাত তারাকান্ত রায় মহাশয়ের বিষয়ে এইরূপ লিখিয়াছেন:—

 “আমার জ্যেষ্ঠতাত মহাশয়ের এই সকল মহৎ গুণ এত অধিক ছিল যে তাঁহার সমতুল্য ব্যক্তি আমরা কখনও দেখি নাই। তিনি এমন মিষ্টভাষী ছিলেন যে কখনও কাহাকেও তুই বলেন নাই; এমন দানশীল ছিলেন যে সাধ্যাতীত না হইলে কখনও কোনও যাচককে নিরাশ করেন নাই; পর-স্ত্রী অভিলাষ বোধ হয় তাঁহার হৃদয়কে কখনও স্পর্শ করিতে পারে নাই; শত্রু মিত্রে সমান জ্ঞান এই দুল্লভ ধর্ম্ম কেবল তাঁহাতেই দেখিয়াছি। যে সকল হিংস্রক জ্ঞাতিরা তাঁহার বিলক্ষণ ক্ষতি করিয়াছিলেন, ও তাঁহাকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়াছিলেন, তাঁহাদিগকেও কখন একটী কষ্টদায়ক বাক্য বলেন নাই; এবং তাঁহাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশে কখনও ত্রুটী করেন নাই। তাঁহাদের দুঃসময়ে যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছেন; তাঁহাদের পীড়ার সময় সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়াছেন; মৃত্যুকালে তাঁহাদের গঙ্গাযাত্রার উদ্যোগ করিয়া দিয়াছেন; এবং পরিশেষে তাঁহাদের শ্রাদ্ধের কালে সহায় হইয়াছেন।”

 “তাহার উদার স্বভাবের দুইটী দৃষ্টান্ত আমার সন্তানদের জন্য লিখিতেছি। তিনি প্রতিবেশী কায়স্থ জাতীয় অতি দুর্দ্দশাপন্ন একটা যুবাকে আমাদের রাজবাটীর কোনও কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া দেন। কিয়ৎকাল পরে সে রাজার প্রিয় খানসামা হইয়া যথেষ্ট ধন সঞ্চয় করে। একদা আমাদের কয়েক বিঘা ভূমি আত্মসাৎ করিবার চেষ্টা করাতে আমার অগ্রজ মহাশয় প্রভৃতি কয়েকজন যুবক তাহার সমুচিত দণ্ডবিধানে উদ্যত হন। খানসামা জ্যেষ্ঠতাত মহাশয়ের শরণাপন্ন হইলে, তিনি তাহাকে ক্লেশ দিতে নিষেধ করিয়া দেন। কিছুদিন পরেই ঐ কৃত যুবক কোনও সুযোগ পাইয়া আমাদের আরও কয়েক বিঘা ভূমি অধিকার করিবার জন্য মিথ্যা মোকদ্দমা উত্থাপন করে। ইতিমধ্যে তাহার বাটীতে হঠাৎ ডাকাইতি হয়। ডাকাইতির সময় আমাদের কয়েকজন চৌকিদারকে ডাকাইতের দলে দেখিয়াছে এবং জ্যেষ্ঠতাত ও তাঁহার ভ্রাতৃদ্বয় এই ডাকাইতির মূলে আছেন, এইরূপ বিচারালয়ে প্রকাশ করিল। কর্ত্তারা অত্যন্ত ভীত হইয়া রাজবাটীতে আশ্রয় লইলেন। গ্রামস্থ লোক তাহার এই অন্যায়াচরণে যারপরনাই বিরক্ত হইয়া দারোগার নিকট কহিলেন, যে তাঁহারা ডাকাইতির বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাই। সুতরাং দারোগা এ ডাকাইতি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলিয়া রিপোর্ট করিলেন। মাজিষ্ট্রেটের পেষকার কর্ত্তাদিগকে কহিয়া পাঠাইলেন যে “যৎকিঞ্চিৎ উদ্যোগ ও ব্যয় করিলেই তাহারা ছয়মাসের নিমিত্ত কারাবদ্ধ হইতে পারে।” তাহারা সমুচিত দণ্ড পায় ইহা সকলেরই ইচ্ছা হইল; কিন্তু জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় কাহারও অনুরোধ রক্ষা না করিয়া কহিলেন;—“আমরা বিপদমুক্ত হওয়াতেই আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হইয়াছে; এ নির্ব্বোধদিগকে বিপদ্‌গ্রস্ত করিলে আর কি ফল লাভ হইবে?” এতাদৃশ ক্ষমাগুণের দৃষ্টান্ত আমি প্রায় দেখি নাই।

 “এক শীতকালের রাত্রিতে তিনি রাজার নিকট হইতে বাসস্থানে আসিয়া দেখিলেন, তাহার পরিচারক ব্রাহ্মণ তদীয় শয্যায় শয়ন করিয়া ঘোর নিদ্রা যাইতেছে। প্রতি রাত্রিতেই তিনি আসিলে তাঁহার জলপানের আয়োজন করিয়া দিত এবং তাঁহার আহার সমাপনান্তে নিদ্রা যাইত। জ্যেষ্ঠতাত ভাবিলেন, যখন এ ব্যক্তি আমার আসিবার পূর্ব্বেই আমার শয্যায় নিদ্রিত হইয়াছে, তখন বোধ হয় ইহার কোনও অসুখ জন্মিয়াছে। কিঞ্চিৎকাল এইরূপ চিন্তা করিয়া দুইখানি কুশাসনের উপরে শয়ন করিলেন। গাত্রে যে বস্ত্র ছিল তাহাই তাঁহার শীত নিবারণের উপায় মাত্র হইল। নূতন সংবাদে রাজার বড় আহ্লাদ হইত বলিয়া, একজন প্রভাতকালে এবিষয় তাহার গোচর করিল। রাজা এই আশ্চর্য্যাবস্থার দর্শনোৎসুক হইয়া তৎক্ষণাৎ জ্যেষ্ঠতাতের সন্নিহিত হইলেন। জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় তখনও সচ্ছন্দে নিদ্রা যাইতেছেন। রাজার আগমনে কিঞ্চিৎ গোলযোগ হওয়াতে জাগরিত হইয়া শশব্যস্তে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। রাজা ঈষৎ হাস্যবদনে জিজ্ঞাসা করিলেন যে “তোমার শয্যায় পরিচারক সুখে শয়ন করিয়াছিল; আর তুমি এই কুশাসনে পড়িয়া কষ্ট পাইতেছিলে, ইহার কারণ কি?” তিনি উত্তর করিলেন “আমার কষ্ট হয় নাই, তবে উহার যদি অসুখ হইয়া থাকে তবে উহার কষ্ট হইত।” তাহার এই সহৃদয় ব্যবহারে রাজা বিস্ময়াপন্ন হইয়া সকলকে কহিলেন যে “যদি সংসারে কেহ ধার্ম্মিক থাকেন তবে তিনি এই ব্যক্তি।”

 “তাঁহার গুণ বর্ণনায় শেষ হয় না। তাঁহার সাত আটটী পুৎত্র অকালে কালকবলিত হয়; তথাপি তাঁহার বদনে ক্ষণকালের নিমিত্ত কেহ কখনও শোকচিহ্ন দেখেন নাই। প্রত্যেক পুত্র বিয়োগ সময় তিনি স্থিরভাবে থাকিতেন এবং তাহার পর অধৈর্য্য পরিবারগণের শোকশান্তির নিমিত্ত বিশেষ চেষ্টা পাইতেন। যাঁহার কোমল হৃদয় চিরশত্রুর দুঃখে কাতর হইত, তাহার চিত্তকে যে জীবনাধিক পুত্র শোকেও বিচলিত করিতে পারিত না, এ সামান্য আশ্চর্য্যের বিষয় নয়।”

 কি অপূর্ব্ব সাধুতা! এ বিবরণ শুনিলেও চিত্ত সমুন্নত হয়। এ স্থানে ইহাও উল্লেখ-যোগ্য যে দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায়, যাঁহার আত্মজীবনচরিত হইতে এই সকল বিবরণ উদ্ধৃত করিতেছি, তিনিও সাধুতাতে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার ন্যায় ধর্ম্মভীরু, কর্ত্তব্যপরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ ও পরোপকারী লোক আমরা অল্পই দেখিয়াছি। তাঁহার জ্যেষ্ঠতাতের অনেক গুণ তাঁহাতে বিদ্যমান ছিল। আত্মীয়-স্বজনের পোষণ, গুণিজনের উৎসাহদান, সাধুতার সমাদর, বিপন্নের বিপদুদ্ধার, এ সকল যেন তাহার স্বভাবসিদ্ধ ছিল। এই সকল গুণেই তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, প্রভৃতি স্বদেশহিতৈষী স্বজাতিপ্রেমিক মহাজনগণের বিশেষ সন্মানিত হইয়াছিলেন। ইহার বিষয় বলিতে সুখ হয়, ভাবিলেও মন উন্নত হয়।

 জগদ্ধাত্রী দেবী এইরূপ বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এরূপ গৃহে জন্মিলে ও বাড়িলে মানুষ যাহা হয় তিনি সেইরূপ ছিলেন। তাঁহার বিষয়ে অধিক কথা জানিতে পারি নাই। যাহা কিছু জানিয়াছি তাহাতে তিনি যে মনস্বিতা ও সাধুতা বিষয়ে একজন অগ্রগণ্য স্ত্রীলোক ছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। জগদ্ধাত্রী পিতার একমাত্র কন্যা, তিন ভ্রাতার অগ্রজা, ও রূপলাবণ্যে এবং বিবিধ সদ্‌গুণে গৃহের শ্রী-স্বরূপা ছিলেন। শৈশবে রাজা শিবচন্দ্র তাঁহাকে কন্যার ন্যায় ভালবাসতেন। তাঁহাকে তাসের পোষাক পরাইয়া, নিজ হস্তীর উপরে হাওদাতে তুলিয়া, সঙ্গে লইয়া নগরভ্রমণ করিতেন। এই কন্যা পিতৃগৃহে কিরূপ অাদরে ছিলেন সকলেই তাহা অনুমান করিতে পারেন। ধন সম্পদে, মান সম্ভ্রমে, তাঁহার পিতার সমকক্ষ লোক তখন কৃষ্ণনগরে ছিল না বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি মনে করিলে সুখে সচ্ছন্দে চিরদিন পিতৃগৃহে বাস করিতে পারিতেন। সে সময়ে কুলীন জামাতৃগণ অনেক সময়ে শ্বশুরালয়েই বাস করিতেন। তদনুসারে রামকৃষ্ণ ও পরম সমাদরে চিরজীবন শ্বশুরালয়েই বাস করিতে পারিতেন। কিন্তু এরূপ শুনিতে পাওয়া যায়, জগদ্ধাত্রী তাহা পছন্দ করিতেন না। তিনি স্বীয় পতির আত্ম-সম্মানকে এত মূল্যবান জ্ঞান করিলেন, যে কিয়ৎকাল পরেই সন্তুষ্টচিত্তে পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া কদমতলাতে পতিগৃহে নিতান্ত সাংসারিক অসচ্ছলতার মধ্যে বাস করিতে লাগিলেন। তখন তিনি গুরুজনের আদেশের বশবর্ত্তিনী থাকিয়া ঘর নিকাইতেন, জল তুলিতেন, ধান ভানিতেন, সমুদয় গৃহকার্য্য নির্ব্বাহ করিতেন; এবং তদুপরি এতগুলি পুত্র কন্যার পালনের দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। অথচ একটী দিনের জন্য কেহ তাহাকে বিষণ্ণ দেখিত না। তিনি ধনীর কন্যা হইয়া কিরূপ দারিদ্র্যে বাস করিতেছেন তাহা দেখিয়া কেহ তাহার প্রতি দয়া প্রকাশ করিলে সে দয়া তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। একদা তিনি ধান ভানিতেছেন এমন সময়ে তাঁহার পিতৃগৃহের একজন প্রাচীন পরিচারিকা আসিয়া তাহাকে তদবস্থাতে দেখিয়া হায় হায় করিতে লাগিল। জগদ্ধাত্রী হাসিয়া বলিলেন,—“আমি এই খানে বড় সুখে আছি। তুমি মাকে বলিও আমার কোনও দুঃখ নাই। আমি কাজ করিতে বড় ভালবাসি।” তিনি রূপে গুণে লোকের চিত্তকে এমনি আকৃষ্ট করিয়াছিলেন যে যখন তিনি চলিয়া যাইতেন লোকে পশ্চাৎ হইতে বলিত—“যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।”

 এই লাহিড়ী ও রায়পরিবারদিগের একটী বিশেষ সদ্‌গুণ এখানেই উল্লেখযোগ্য। ইঁহাদের পরস্পরের মধ্যে প্রীতিবন্ধন অতীর স্পৃহণীয়। জগদ্ধাত্রী যখন সন্তুষ্টচিত্তে দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করিতেন, নিজ দুঃখের কথা কাহাকেও জানাইতেন না, তখন তাঁহার ভ্রাতারা তাহাকে ভুলিয়া থাকিতেন না। প্রায় প্রতিদিন নীলকুঠী হইতে ফিরিয়া গৃহে যাইবার সময় ভগিনীর গৃহে পদার্পণ করিতেন, এবং গোপনে যথাসাধ্য সাহায্য করিবার প্রয়াস পাইতেন। এইরূপ মাতামহকুলে রামতনু জন্মগ্রহণ করিলেন।

 লাহিড়ী মহাশয়ের জন্মকালে তাঁহার পিতা রামকৃষ্ণ সামান্য পৈতৃক বিষয়ের আয়ের দ্বারা ও নিজে তৎকাল-প্রসিদ্ধ, লাল বাবুদিগের ম্যানেজারি করিয়া যাহা কিছু পাইতেন তদ্দ্বারা কষ্টে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেন। নবদ্বীপাধিপতি রাজা শিবচন্দ্রের দৌহিত্রদ্বয়, হরিপ্রসন্ন রায় ও নন্দপ্রসন্ন রায়, সে সময়ে বড় লালা ও নূতন লালা নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রামকৃষ্ণ ইঁহাদের সামান্য বিষয় সম্পত্তির ম্যানেজারি করিতেন। এই ভ্রাতৃদ্বয়ের সদাশয়তা, সত্যনিষ্ঠা ও সাধুচরিত্রের বিষয়ে অনেক আখ্যায়িকা কৃষ্ণনগরে প্রচলিত আছে। কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় মহাশয় আত্মজীবনচরিতে এক স্থানে বলিয়াছেন;—“এই ভ্রাতৃদ্বয়ের কোনও দোষ কখনও কেহ দেখেন নাই বা শুনেন নাই; পরন্তু সকলেই তাঁহাদের গুণের কথা কীর্ত্তন করিতেন।”

 রামকৃষ্ণ নিজে যেরপ ধর্ম্মপরায়ণ লোক ছিলেন, সেইরূপ ধর্ম্মপরায়ণ প্রভুও পাইয়াছিলেন। কিন্তু লালা বাবুদের ম্যানেজারির বেতন স্বল্পই ছিল। ধর্ম্মভীরু রামকৃষ্ণ উপরি আয়ের দিকে চাহিতেন না; সুতরাং কেশবচন্দ্র উপার্জ্জনক্ষম না হওয়া পর্য্যন্ত ক্লেশেই তাঁহার সংসার চলিত।

 রামকৃষ্ণ সন্তানদিগকে সর্ব্বদা কুসঙ্গ হইতে দূরে রাখিবার চেষ্টা করিতেন। প্রতিদিন সায়ংকালে বিষয় কর্ম্ম হইতে অবসৃত হইয়া কিয়ৎকাল ধর্ম্মালোচনাতে যাপন করিতেন। সে সময়ে পাড়াতে দেবীপ্রসাদ চৌধুরী নামে একজন ভদ্র গৃহস্থ ছিলেন। ইনি স্থানীয় আদালতে মহাফেজের কাজ করিতেন। দোল দুর্গোৎসব প্রভৃতি বার মাসে তের পার্ব্বণ, ব্রাহ্মণ ভিক্ষুককে দান, স্বীয় ভবনে শাস্ত্রপাঠ, কথকতা প্রভৃতির ব্যবস্থাবিধান প্রভৃতি নিষ্ঠাবান হিন্দু-গৃহস্থোচিত সমুদয় কার্য্যের জন্য তিনি কৃষ্ণনগরে প্রসিদ্ধ হইয়াছিলেন। ধর্ম্মানুরাগী ব্যক্তিগণ সর্ব্বদা তাঁহার নিকটে আসিতেন। তদ্ভিন্ন বিষয়-কর্ম্ম-সূত্রেও বহুসংখ্যক লোক তাঁহার অনুগত ছিল। তাঁহার বাড়ী এখনও কৃষ্ণনগরে চৌধুরীবাড়ী বলিয়া প্রসিদ্ধ। রামকৃষ্ণ প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে তাঁহার ভবনে গিয়া বসিতেন। সেখানে নসীরাম দত্ত প্রভৃতি আরও কয়েকজন আসিয়া যুটিতেন। সেই সাধুসঙ্গে ও সৎপ্রসঙ্গে রামকৃষ্ণের সায়ংকালটা সুখেই কাটিত। তিনি যাইবার সময়ে কেশবচন্দ্রকে, পরে রামতনুকে, সঙ্গে লইয়া যাইতেন। দেবী চৌধুরী মহাশয়ের ভবনে একব্যক্তি ইংরাজী জানিতেন। শিশুদিগকে তাঁহার নিকটে ইংরাজী শিখিতে প্রবৃত্ত করিয়া দিয়া বৃদ্ধেরা ধর্ম্মলোচনাতে নিমগ্ন থাকিতেন। নসীরাম দত্তের উল্লেখ করিয়া রামতনু বাবু তাঁহার দৈনিক লিপিতে এক স্থানে লিখিয়াছেন,—“হায়! তাঁহাকে আর এ জীবনে দেখিব না।” এই নসীরাম দত্তের বিষয়েই কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় লিখিয়াছেন;—“কৃষ্ণনগরের মাঝের পাড়াবাসী নসীরাম দত্তের পুত্র যে এক পূজার কোঠা প্রস্তুত করেন, তাঁহার অব্যবহিত সম্মুখের ভূমির অধিকারী অন্য একজন ছিলেন। সেই ভূমিখণ্ড না পাইলে তাঁহাদের পূজার কোঠা অকর্ম্মণ্য হয় বলিয়া ঐ পুত্র তাহা বলপূর্ব্বক অধিকার করেন। ঐ অন্যায় অধিকার রহিত করিবার জন্য এক মোকদ্দমা উপস্থিত হয়। বিচারক ইহার তদন্ত জন্য ঐ স্থানে উপস্থিত হইল, অর্থী কহিলেন যে, “যদি প্রত্যর্থী আপনার সাক্ষাতে শুদ্ধ কহেন যে, এ ভূমি তাঁহার, তাহা হইলে আর আমি ঐ ভূমির দাবী রাখি না।” নসীরামের পুৎত্র পিতার স্বভাব জ্ঞাত থাকাতে তাহাকে বাটীর মধ্যে রাখিয়া ছিলেন। বিচারপতির আদেশে তাঁহাকে তদন্ত স্থানে আসিতে হইল। বিচারকর্ত্তা তাঁহাকে এ বিষয় জিজ্ঞাসা করিবামাত্র তিনি অতি ক্রোধভরে উত্তর করিলেন; “উহাকে (পুত্রকে) আমি ঐ ভুমি অধিকার করিতে বিশেষরূপে নিষেধ করিয়াছিলাম, তথাপি লক্ষ্মীছাড়া আমার কথা শুনে নাই, ঐ ভূমিতে আমার কোন স্বত্ব নাই।”

 রামকৃষ্ণ নিজে যেমন সাধু ছিলেন, তেমনি সাধু সদাশয় ব্যক্তিদের সঙ্গেই মিশিতেন। জনকজননীর দৃষ্টান্ত ও সদুপদেশ বৃথা যায় নাই। তাঁহাদের সন্তানগণ বয়োবৃদ্ধিসহকারে তাঁহাদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিতে লাগিলেন। জ্যেষ্ঠপুত্র কেশবচন্দ্র লাহিড়ী শৈশব হইতে গুরুজনের প্রতি ভক্তি ও বাধ্যতা প্রভৃতি সদ্‌গুণের পরিচয় দিতে লাগিলেন। যৌবনের প্রারম্ভে একবার তিনি গুরুজনের আদেশে গোয়াড়ি হইতে নিজস্কন্ধে এক মণ চাউলের বস্তা বহিয়া দিয়াছিলেন। আর একবার একদিন সন্ধ্যার সময়ে কেশবচন্দ্র দেখিতে পাইলেন যে পিতামহী ঠাকুরাণীর গৃহে উঠিবার পৈঠাটী ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তখন কাহাকেও কিছু বলিলেন না; পরে পিতামহী শয়ন করিলে, পাড়ার দুই একটী অনুগত সমবয়স্ক বালককে সঙ্গে লইয়া, রাতারাতি, ইষ্টক প্রভৃতি সংগ্রহ পূর্ব্বক, পৈঠাটী মেরামত করিয়া ফেলিলেন। প্রাতে পিতামহী ঠাকুরাণী দেখিয়া বিস্মিত ও প্রীত হইয়া কহিলেন—“এ কেশবের কাজ অার কারু নয়।” কেশবকে তিনি এমনি চিনিয়াছিলেন।

 কেশবচন্দ্র লাহিড়ীর জীবনের ঘটনা সকল সবিশেষ জানিবার উপায় নাই। কিন্তু জ্যেষ্ঠর প্রতি ভক্তিভাজন রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের যে প্রকার ভক্তি দেখিতাম তাহাতে বোধ হয় যে তাঁহার জ্যেষ্ঠের চরিত্র তাঁহার চরিত্র গঠন বিষয়ে বিশেষরক্ষপে কাজ করিয়াছিল। কেশবচন্দ্রের সাধুতার পরোক্ষ প্রমাণ কিছু কিছু আছে। তিনি যখন কলিকাতার সন্নিকটবর্ত্তী আলিপুরে জজ আদালতে কেরাণীগিরি কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলেন, তখন ঐ কর্ম্ম ব্যতীত তিনি অনেক দেশীয় ও বিদেশীয় লোকের মোকদ্দমাদির সহায়তা করিয়া এক প্রকা মোক্তারের কাজ করিতেন; তাহাতেও কিছু কিছু উপরি আয় হইত। সে সময়ে আদালতের চতুঃসীমার মধ্যে যাহারা বাস করিত, তাহারা উৎকোচ, মিথ্যাসাক্ষ্য, প্রবঞ্চনাদির দ্বারা অল্পকালের মধ্যেই ধনী হইয়া উঠিত। কিন্তু কেশবচন্দ্রের অতিরিক্ত আয় এত অল্পই ছিল যে তিনি নিজের ব্যয় নির্ব্বাহ ও কৃষ্ণনগরের বাটীর সাহায্য করিয়া কলিকাতায় ভ্রাতাদিগের শিক্ষার জন্য অধিক ব্যয় করিতে পারিতেন না। এজন্য তাঁহাকে পরের অনুগ্রহাপেক্ষী হইতে হইয়াছিল।

 এইরূপ পিতা মাতা ও এরূপ জ্যেষ্ঠের ক্রোড়ে শিশু রামতনু জন্মগ্রহণ করিলেন। হিন্দু গৃহস্থের গৃহে ছয়টী সন্তানের পর, বিশেষতঃ কয়েকী গত হওয়ার পর, পুত্র সন্তান জন্মিলে সেটী কিরূপ আদরের সামগ্রী হয়, সকলে তাহাকে কিরূপ অভ্যর্থনা করে, তাহা সকলেই বিদিত আছেন। তাহাতে অাবার মাতামহ রাধাকান্ত রায় মহাশয় রাজবাটীর দেওয়ান ও গ্রামের মধ্যে সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন। সুতরাং ইহাতে কিছু সন্দেহ নাই যে শিশু রামতনু ভূমিষ্ঠ হইলে স্বল্পকালের মধ্যেই বারূইহুদা ও কৃষ্ণনগরের লোক জানিতে পারিল দেওয়ানজীর দৌহিত্র জন্মিয়াছে। সুতিকাগৃহের দ্বারে সমাগত পল্লীবাসিনীগণের মাঙ্গল্য শঙ্খধ্বনিতে ক্ষুদ্র গ্রামখানি কাঁপিয়া উঠিল। পুরস্কারের প্রত্যাশায় দলে দলে বাদকগণ আসিয়া নিরন্তর বাদ্যধ্বনি করিতে লাগিল বারূইহুদায় বাটী হইতে সুসংবাদ লইয়া কৃষ্ণনগরের বাটীতে লোক ছুটিল; পথে, ঘাটে, সরোবরে স্নানের কালে, গৃহিণীগণ বলিতে লাগিলেন—“লাহিড়ীদের ছেলে হয়েছে; অাহা বেঁচে থাকলে হয়।”

 এবম্প্রকার অভ্যর্থনার মধ্যে রামতনু সুর্য্যের আলোক দেখিলেন। তৎপরে প্রাচীন হিন্দু গৃহস্থের গৃহে যে সকল কৃত্য ও কুলাচার হইয়া থাকে সকলি হইল। অর্থাৎ অষ্টাহে আটকৌড়া, সূতিকা-নিষ্ক্রমণ সময়ে ষষ্ঠীপূজা প্রভৃতি সমুদয় কার্য্য যথাবিহিত প্রণালীতে নিষ্পাদিত হইল।

 অতঃপর শিশু রামতনু সূতিকা কারাগার হইতে বাহিরে আসিয়া সকলের চক্ষের অগোচরে, জননীর স্নেহময় বক্ষে, শুক্লপক্ষের শশিকলার ন্যায় দিন দিন বাড়িতে লাগিলেন। জ্যেষ্ঠ কেশবচন্দ্র নবজাত সহোদরের রূপগুণের বর্ণনা করিয়া জননীকে কতই উৎসাহিত ও আনন্দিত করিতে লাগিলেন।

 পঞ্চম বর্ষ অতিক্রম করিলেই হাতে খড়ি দিয়া বিদ্যারম্ভ করান হইল। সে সময়ে পাঠশালাতে শিশুগণের পাঠারম্ভ হইত। দেবী চৌধুরী মহাশয়ের ভবনে একটী পাঠশালা ছিল। সম্ভবতঃ সেইখানেই শিশু রামতনুর পাঠারম্ভ হয়। সে সময়কার পাঠশালের কিঞ্চিৎ বিবরণ দেওয়া আবখ্যক। সচরাচর বর্দ্ধমান জেলা হইতে কায়স্থ জাতীয় গুরুগণ আসিতেন। তাঁহারা আসিয়া কোনও ভদ্র গৃহস্থের গৃহে বাহিরের চণ্ডীমণ্ডপে পাঠশালা খুলিতেন। প্রাতে ও অপরাহ্নে পাঠশালা বসিত। একমাত্র শিক্ষক গুরুমহাশয় বেত্রহস্তে মধ্যস্থলে একটী খুঁটী ঠেসান দিয়া বসিয়া থাকিতেন। সর্দ্দার পড়ুয়ারা অর্থাৎ উচ্চশ্রেণীর বালকেরা সময়ে সময়ে শিক্ষকতা কার্য্যে তাঁহার সহায়তা করিত। বালকেরা স্বীয় স্বীয় মাদুর পাতিয়া বসিয়া লিখিত। লিখিত এইজন্য বলিতেছি, তৎকালে পাঠ্যগ্রন্থ বা পড়িবার রীতি ছিল না। কিছুদিন পাঠশালে লিখিয়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সস্তানগণ টোলে গিয়া ব্যাকরণ পড়িতে আরম্ভ করিত, এবং যাঁহারা সন্তানদিগকে রাজকার্য্যের জন্য শিক্ষিত করিতে চাহিতেন, তাঁহারা তাহাদিগকে পারসী পড়িতে দিতেন। যাহারা জমিদারী সরকারে কর্ম্ম করিতে বা বিষয় বাণিজ্যে নিযুক্ত হইতে চাহিত, তাহারাই শেষ পর্য্যন্ত গুরুমহাশয়ের পাঠশালে থাকিত।

 পাঠশালে পাঠনার রীতি এই ছিল, যে বালকেরা প্রথমে মাটীতে খড়ি দিয়া ফর্ণ পরিচয় করিত, তৎপরে তালপত্রে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, যুক্তবর্ণ, শটিকা, কড়ানিরা, বুড়কিয়া প্রভৃতি লিখিত; তৎপর তালপত্র হইতে কদলীপত্রে উন্নীত হইত; তখন তেরিজ, জমাখরচ, শুভঙ্করী, কাঠাকালী, বিঘাকালী প্রভৃতি শিখিত; সর্ব্বশেষে কাগজে উন্নীত হইয়া চিঠিপত্র লিখিতে শিখিত। সে সময়ে শিক্ষা-প্রণালীর উৎকর্ষের মধ্যে এই টুকু স্মরণ আছে, যে পাঠশালে শিক্ষিত বালকগণ মানসাঙ্ক বিষয়ে আশ্চর্য্য পারদর্শিতা দেখাইত; মুখে মুখে কঠিন কঠিন অঙ্ক কষিয়া দিতে পারিত। চক্ষের নিমিষে বড় বড় হিসাব পরিষ্কার করিয়া ফেলিত। এক্ষণে যেমন ভূত্যের দশ দিনের বেতন দিতে হইলেও ইংরাজী-শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের কাগজ ও পেন্সিল চাই, ত্রৈরাশিকের অঙ্কপাত করিয়া কাগজ ভরিয়া ফেলিতে হয়, তখন সেরূপ ছিল না।

 গুরুমহাশয়গণ বর্ত্তমান স্কুল সমূহের শিক্ষকগণের ন্যায় কোনও কমিটী বা কোনও ব্যক্তির নিকট নির্দিষ্ট বেতন পাইতেন না। প্রত্যেক গৃহস্থ আপন আপন বালককে বা বালকদিগকে পাঠশালে দিবার সময় গুরুমহাশয়ের সহিত স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিতেন। এইরূপে মাসে সামান্য ১০৷১২ টাকা আয় হইত। তৎপরে যাত্রা, মহোৎসব, পার্ব্বণ, বা পারিবারিক অনুষ্ঠানাদিতে উপরি কিছু কিছু যুটিত। তাহাতেই গুরুমহাশয়দিগের সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ হইত। শুনিতে পাওয়া যায় যে ছেলে লুকাইয়া গুরুমহাশয়কে যত দিতে পারিত, সে তত তাঁহার প্রিয় হইত। সে অনুপস্থিত থাকিলে বা পাঠে অমনোযোগী হইলেও সমুচিত সাজা পাইত না। যে সকল বালক কিছু দিতে পারিত না, তাহাদিগকে সর্ব্বদা সশঙ্ক থাকিতে হইত। উঠিতে বসিতে, নড়িতে চড়িতে, গুরুমহাশয়ের বেত্র তাহাদের পৃষ্ঠে পড়িত। হাত ছড়ি, লাড়ুগোপাল, ত্রিভঙ্গ প্রভৃতি সাজার বিবিধ প্রকার ও প্রণালী ছিল। পাঠশালে আসিতে বিলম্ব হইলে হাত ছড়ি খাইতে হইত; অর্থাৎ আসনে বসিবার পূর্ব্বে গুরুমহাশয়ের সমক্ষে দক্ষিণ হস্তের পাতা পাতিয়া দাঁড়াইতে হইত, অমনি সপাসপ্‌, পাঁচ বা দশ ঘা বেত তদুপরি পড়িত। এই গেল হাত ছড়ি। লাড়ুগোপাল অার এক প্রকার। অপরাধী বালককে গোপালের ন্যায়, অর্থাৎ চতুস্পদশালী শিশুর ন্যার দুই পদ ও এক হস্তের উপরে রাখিয়া তাহার দক্ষিণ হস্তে একখানি এগার ইঞ্চ ইট বা অপর কোন ভারি দ্রব্য চাপাইয়া দেওয়া হইত; হাত ভারিয়া গেলে, বা কোনও প্রকারে ভারি দ্রব্যটী স্বস্থানভ্রষ্ট হইলে তাহার পশ্চাদ্দেশের বস্ত্র উত্তোলন পূর্ব্বক গুরুতর বেত্র প্রহার করা হইত। ত্রিভঙ্গ আর এক প্রকার। শ্যামের বঙ্কিম মূর্ত্তির ন্যায় বালককে এক পায়ে দণ্ডায়মান করিয়া হস্তে একটী গুরু দ্রব্য দেওয়া হইত; একটু হেলিলে বা বারেক মাত্র পা খানি মাটীতে ফেলিলে অমনি পশ্চাদ্দেশের বস্ত্র তুলিয়া কঠিন বেত্রাঘাত করা হইত। কোন কোনও গুরু ইহার অপেক্ষাও গুরুতর শাস্তি দিতেন; তাহাকে চ্যাংদোলা বলিত। কোনও বালক প্রহারের ভয়ে পাঠশাল হইতে পলাইলে বা পাঠশালে না আসিলে এই চ্যাংদোলা সাজা পাইত। তাহা এই, তাহাকে বন্দী করিবার জন্য চারি পাঁচ জন অপেক্ষাকৃত অধিক-বয়স্ক ও বলবান ছাত্র প্রেরিত হইত। তাহারা তাহাকে ঘরে, বাহিরে, পথে, ঘাট, বা বৃক্ষশাখায়, যেখানে পাইত সেখান হইতে বন্দী করিয়া আনিত। আনিবার সময় তাহাকে হাঁটিয়া আসিতে দিত না, হাতে পায়ে ধরিয়া ঝুলাইয়া শানিত। তাহার নাম চ্যাংদোলা। এই চ্যাংদোলা অবস্থাতে বালক পাঠশাল উপস্থিত হইবামাত্র গুরুমহাশয় বেতহস্তে সেই অসহায় বালককে আক্রমণ করিতেন। এই প্রহার এক এক সময়ে ঐত গুরুতর হইত যে হতভাগ্য বালক ভয়ে বা প্ৰহারের যাতনায় মলমূত্ৰ ক্লিয় হইয়া যাইত।

১৮৩৪ সালে লৰ্ড উইলিয়াম বেটিঙ্ক, মিষ্টর উইলিয়াম এডামকে দেশীয় শিক্ষার অবস্থা পরিদৰ্শনাৰ্থ নিয়োগ করিয়াছিলেন। তিনি পাঠশালা সকলের অবস্থা পরিদৰ্শন করিয়া গবৰ্ণমেণ্টের নিকট একটী রিপোৰ্ট প্রেরণ করেন। তাহাতে প্ৰায় চতুৰ্দশ প্রকার সাজা দিবার প্রণালীর উল্লেখ দেখা বার। তাহার অনেকগুলির বিবরণ শুনিলে হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। বালক মাটীতে বসিয়া নিজের এক থানা পা নিজের স্কন্ধে চাপাইয়া থাকিবে; বািনজের উরুর তল দিয়া নিজের হাত চালাইয়া নিজের কাণ ধরিয়া থাকিবে; বা তাহার হাত পা বাধিয়া পশ্চাদ্দেশের বস্ত্ৰ তুলিয়া জলবিছুটী দেওয়া হইবে, সে চুলকাইতে পারিবে না; বা একটা থলের মধ্যে একটা বিড়ালের সঙ্গে বালককে পুরিয়া মাটীতে গড়ান হইবে এবং বালক বিড়ালের নখর ও দংষ্ট্ৰাঘাতে ক্ষত বিক্ষত হইবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। লাহিড়ী মহাশয়ের বাল্যকালেও যে এই সকল সাজা প্ৰকার ও প্ৰণালী ছিল তাহাতে সন্দেহ নাই।

ইহা কিছুই অাশচৰ্য্যের বিষয় নয় ধে শাস্তির ভয়ে বালকেরা অনেক সময়ে পাঠশালা হইতে পলাইয়া অত্যন্ত ক্লেশ সহ কারিত। দেওয়ান কাৰ্ত্তিকেয় চন্দ্ৰ স্নায় ইহার কয়েক বৎসরের পরের কথা এইরুপ বৰ্ণন করিয়াছেন: “আমার সমবয়স্ক স্বসম্বন্ধীয় কয়েকজন বালক কৃষ্ণনগরে চৌধুরীদিগের বাটীর পাঠশালায় শিক্ষা করিতেন। এই পাঠশালায় আমার এক পিসতুতো ভ্ৰাতা ভালরাপ শিক্ষা না করাতে সৰ্ব্বদাই দণ্ডিত হইতেন। প্ৰথমে মধ্যে মধ্যে পলাইয়া আমার বাটীতে আসিতেন; কিন্তু গুরু মহাশয়ের দূতেরা গুপ্তভাবে আসিয়া তাহাকে ধৃত করিয়া লইয়া যাইত। কাহারও বাটীতে রক্ষা পাইবার অনুপায় দেখিয়া একদা এক বার ওয়ারি ঘরের মাচার উপরে অনাহারে এক দিবা ও এক রাত্ৰি থাকেন। একদা শীতকালে মাঠে অড়হরের ক্ষেত্ৰ মধ্যে যাপন করেন। ঐ গুরু-মহাশয় চৌধুরীবাটীর এক বালকের গণ্ডদেশে এরুপ বেত্ৰাঘাত করেন যে তাহার চিহ তাহার যেীবনাবস্থা পৰ্য্যন্ত ছিল।

লাহিড়ী মহাশয় তাহার দৈনিক লিপিতে এক স্থানে লিথিয়াছেন যে তিনিও এক এক সময়ে প্ৰহারের ভয়ে পাঠশালা হইতে পলাইতেন; সেজন্য তাহার' পিতা গভীর মনোবেদনা পাইতেন। কেবল তাহা নহে, তাহার সহাধ্যায়ীদিগের মধ্যে একটি বালক ছিল, সে অল্প বয়সেই চুরি বিদ্যাতে পরিপক্ক হইয়া উঠিয়ছিল। সেই বালকটা তাঁহাকে চুরি করিবার জন্য সৰ্ব্বদ প্ররোচনা করিত। লাহিড়ী মহাশয় বলেন, যে তাহার প্ররোচনাতে তিনি চুরি করিতে শিথিয়াছিলেন । একদিন তাহার জ্যেষ্ঠ কেশবচন্দ্র সন্দেহ করিয়া র্তাহাকে ধরিয়া বসেন ও অনেক তিরস্কার করেন। লাহিড়ী মহাশয় এই ঘটনার অন্ততঃ ষাটি বৎসর পরে তাহার দৈনিক লিপিতে লুিখিয়াছেন—“হায় ! আমি তখন আমার জ্যেষ্ঠের নিকট অপরাধ স্বীকার করিতে সাহসী হই নাই, কেবল কাদিয়াছিলাম।” যিনি ষাট বৎসর পরে স্বকৃত একটী বাল্যস্থলভ” পাপ স্মরণ করিয়া হায় হায় করিতে পারেন, তিনি যে কি ধাতুতে গঠিত ছিলেন, তাহা সকলেই অনুমান করিতে পারেন ।

 বালক রামতনুর ঘোড়া চড়িবার বাতিকটা অতিশয় প্রবল ছিল । • এরূপ অনুমান করা যায়, তখন চতুষ্পাশ্ববৰ্ত্তী গ্রাম ও জনপদ সকল হইতে কখন কখনও লোকে বেতো ঘোড়া চড়িয়া কৃষ্ণনগরে মামলা মোকদ্দমা বা বিষয়কৰ্ম্ম করিতে আসিত। তদ্ভিন্ন কলিকাতার অনুকরণে নুতন ধরণের কতকগুলি ভাড়াটিয়া গাড়ি চলাও আরম্ভ হইয়াছিল। ঐ সকল শকটের ঘোড়া যথেচ্ছভাবে রাজপথের পাশ্বে, বা মাঠে চরিয়া বেড়াইত। বালক রামতনু সমবয়স্ক বন্ধুদলে পরিবেষ্টিত হইয়া ঐ সকল ঘোড়৷ ধরিয়া চড়িতেন। যাহাদের ঘোড়া তাহারা জানিতে পারিলে তাড়া করিত, তখন বালকদল চক্ষের নিমিষে খানাখন্দ পার হইয়া পলায়ন করিত। এই ঘোড়া চড়িবার সখটা এতই প্রবল ছিল, যে র্তাহার সঙ্গীদিগের মধ্যে একটা অধিক বয়স্ক বালক ঘোড়া কিনিবার জন্য এক জনের অনেকগুলি টাকা চুরি করিয়াছিল । তিনি তখন তাহার উৎসাহদাতাদিগের মধ্যে একজন ছিলেন।

 বালক রামতনু যে কেবল ঘোড়া চড়িয়া সঙ্গীদিগের সুহিত আমোদ প্রমোদ করিতেন তাহা নহে। তখন কৃষ্ণনগরের চতুর্দিকে বালকদলের বিহারোপযোগী অনেক উদ্যান ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্নাবলী ছিল। রাজপরিবার ও তৎসংস্থঃ পরিবারগণ এই সকল উদ্যানের সত্ত্বাধিকারী ছিলেন । ইহার মধ্যে শ্ৰীবন সৰ্ব্বোপরি উল্লেখ-যোগ্য । এই উদ্যানটী কৃষ্ণনগরের এক ক্রেীশ পূৰ্ব্বদক্ষিণে অঞ্জন নামক নদীর তীরে অবস্থিত। রাজা ঈশ্বরচন্দ্র এই উদ্যান স্থাপন করিয়া এখানে একটা সুরম্য হৰ্ম্ম্য নিৰ্ম্মাণ করেন। তদবধি ইহা কৃষ্ণনগরের একটী আকর্ষণের বস্তু ছিল । দুঃখের বিষয় প্রবনের সে পূৰ্ব্ব শ্ৰী আর, নাই। যে, মুরম্য প্রাসাদ ইহার প্রধান সৌন্দৰ্য্য ছিল তাহার ভগ্নাবশেষও এখন নাই। ক্ষিতীশবংশাবলীচরিতকার উক্ত স্থানের নিম্নলিখিতরূপ বর্ণনা করিয়াছেন :–

 “এই স্থান অতি রমণীয়। অঞ্জনা যদিও এখন স্থির-সলিলা হইয়! গতিবিহীন হইয়াছে, তথাপি তদীয় পূৰ্ব্বকালীন মনোহারিণী শোভা এককালে তিরোহিত হয় নাই। প্রায় অৰ্দ্ধ ক্রোশ পর্যন্ত ইহার উভয় কুলে গ্রাম্য বৃক্ষ-সমূহ শ্রেণীবদ্ধ থাকাতে, এরূপ অপরূপ শোভা হইয়া রহিয়াছে, যেন কোন প্রকৃতি-প্রিয় মহাপুরুষ, স্বভাবের সৌন্দৰ্য্য প্রদর্শন করিবার বাসনায়, নিবিড় কানন মধ্যে এই জলাশয় প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন । প্রাহ্নে, অপরাহ্নে, অথবা রজনীকালে, এই নদীতে নৌকারোহণ করিয়া ইতস্ততঃ নয়ন সঞ্চারণ করিবামাত্র অসুস্থ হৃদয়ে সুস্থতা লাভ হয়। কতিপয় বর্ষ পূৰ্ব্বে আমাদিগের স্বপ্রসিদ্ধ কবিবর মাইকেল মধুসূদন এই নদীর অপূৰ্ব্ব শোভা সন্দর্শনে কহিয়াছিলেন,—“হে অঞ্জনে ! তোমাকে দর্শন করিয়া আমি অতিশয় প্রীত হইলাম, তোমাকে কখনই ভুলিব না, এবং তোমার বর্ণনা করিতেও ক্রট করিব না।” এই রাজার ( ঈশ্বরচন্দ্রের ) পূৰ্ব্বে পূৰ্ব্বপুরুষেরা এই নদীতটস্থ প্রাসাদের দক্ষিণ দিকে, যে কানন আছে, তাহাতে বিবিধ মুম্বাছ ফলের বৃক্ষ রোপণ করি। তাহার নাম মধুপোল এবং ঐ কাননের পূর্বাংশে যে উপবন আছে তাহার নাম আনন্দ-কানন রাখেন। মধুপোল অশোক, চম্পক, বক, কাঞ্চন, নাগকেশর, মুচুকন, কিংগুক, শান্মলী ইত্যাদি পুষ্পবৃক্ষ-শ্রেণীতে শোভিত ছিল ; এক্ষণে কেবল কিংশুক ও শান্মলী বৃক্ষমাত্র আছে। তথাপি বসন্তকালে এই তরুরাজি বিকশিত রক্তবর্ণ কুসুমাবলিতে অলঙ্কত হইয়া অপূৰ্ব্ব শোভা ধারণ করে। প্রায় পঞ্চবিশ বৎসর অতীত হইল একদ। আমাদের সুবিখ্যার্ত কবি মদনমোহন কাব্য-রত্নাকর এই শোভা সন্দর্শনে লিথিয়াছিলেন—“জগদীশ্বর সর্বভূতকে অদ্ভূত প্রদর্শনার্থ যেন রাশীভূত সিন্দুর রক্ষা করিয়াছেন।”

এই কবিজনের মনোহরণকারী সুরম্য কানন যে বালক রামতনু ও র্তাহার বয়স্তগণকে বার বার আকৃষ্ট করিত তাহা বলা নিম্প্রয়োজন। আমরা সকলেই এক কালে বালক ছিলাম ; অনেকেই পল্লীগ্রামে প্রকৃতির নিস্তব্ধ রমণীয়তার মধ্যে বদ্ধিত হইয়াছি ; সুতরাং বালক কালের সে সুখের কথা সকলেই স্মরণ করিতে পারি। গ্রামের পার্শ্বে যে কিছু রমণীয় দ্রষ্টব্য বিষয় ছিল, যে কিছু প্রাকৃতিক সৌন্দর্ঘ্য ছিল, যে কিছু সুম্ভোগ্য পদার্থছিল, আমরা কিছুই দেখিতে বা সম্ভোগ করিতে ছাড়ি নাই। বালক রামতনু ও তাহার বয়স্তগণও ছাড়েন নাই । সে সকল সম্ভোগের বস্তু এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে কিন্তু হায় সে সম্ভোগের শক্তি হারাইয়াছি। জীবনের ক্ষুদ্র সুখে সে অভিনিবেশ চলিয়া গিয়াছে ! বোধ হয় হৃদয়ের প্রসন্নতা ও নিৰ্ম্মলতা হারাইয়াছি বলিয়াই তাহা চলিয়া গিয়াছে। জগদীশ্বরের এই সৌন্দৰ্য্যময় জগতে মুখের আয়োজন যথেষ্ট আছে ; কিন্তু সে মুখ বোধ হয় কেবল পবিত্র-চিত্ত ব্যক্তির জন্যই আছে, অপরের জন্য. নহে। ক্ষিতীশবংশাবলী-চরিতকার তাহারই স্বপ্রণীত আত্ম-জীবনচরিতে ক্ষোভ করিয়া বলিয়াছেন ;–“ বোধ হয় যেন যৌবনের সঙ্গে সঙ্গে সকল সুখই তিরোহিত হইয়াছে। পূৰ্ব্বকালে যে সকল সুখ ভোগ করিয়াছি, সে সব মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করি বা মাত্ৰ যেন পলাইয়া যায়। ধরিবার সহস্ৰ চেষ্টা করিলেও আর ধরা যায় না । সেই শ্ৰীবন, সেই লালবাগ অদ্যাপি বর্তমান আছে ; কিন্তু তৎসমুদয় ত আর আমাদের কাহারও দেখিতে স্পৃহা হয় না। স্পৃহা দূরে থাকুক তাহার নাম ও উল্লেখ করা যায় না।”

 যাহা হউক বিবিধ প্রাকৃতিক শোভার মধ্যে নিৰ্ম্মল বাল্য সুখে রামতনুর বাল্যকাল গত হইয়াছিল। দক্ষিণ বঙ্গের অধিকাংশ ভূভাগ গঙ্গার তরঙ্গধৌত বালুক-রাশির দ্বারা নিৰ্ম্মিত এবং অপেক্ষাকৃত অল্প কাল হইল মানবের আবাস ভূমিরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। চীনদেশীয় পরিব্রাজক ফাহিয়ান যখন ৩৯৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ভারত-ভ্রমণের জন্ত আগমন করেন, তখন তাম্রলিপ্তক বা তমলুক নগরকে সমুদ্রতটে দেখিয়াছিলেন। এই নগর উৎকলের সৰ্ব্ব প্রধান বন্দর ও বৌদ্ধগণের একটা প্রধান স্থান ছিল। তিনি এখানে সহস্ৰাধিক বৌদ্ধ যতিকে, দর্শন করিয়াছিলেন। সেই তমলুক এখন সমুদ্রতর হইতে কতদূরে পড়িয়া রহিয়াছে! গঙ্গার তরঙ্গ-ধৌত বালুকারাশি দ্বারা গঙ্গার মুখভাগ ক্রমশঃ সমুন্নত হইয়া বঙ্গদেশের পরিসর কতই বৰ্দ্ধিত হইতেছে! সাগরগামিনী’ নদী সকলের তরঙ্গানীত বালুকারাশির ও সাগরতরঙ্গানীত বালুকারাশির ঘাত প্রতিঘাতে বালুশৈল সকল উত্থিত হইয়া নদী সকলের মুখে কি পরিবর্তনই ঘটাইতেছে। অনুমান করি, সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গ এই প্রকার সাগর-গর্ভ হইতে সমুখিত হইয়া মানবের বাসাপযোগ হইয়া থাকিৰে। সে অধিক দিনের কথা নহে। ইতিহাসের গণনার বহু পূৰ্ব্বে হইলেও মানব-সমাজের যুগ গণনাতে বহু দূৰ নহে। . সুতরাং বঙ্গভূমির দক্ষিণ বিভাগের ভূমির উৎপাদিকাশক্তি এখনও নবীন রহিয়াছে। এই জন্য এই ভূমি-ভাগ শুামল উদ্ভিদ-পরিপূর্ণ ফল-শস্ত-ভূষিত ও নয়ন মনের প্রতিকর। এই কারণে বিদেশীয় পৰ্য্যটকগণ বঙ্গভূমিকে ভারতের উদ্যান-ভূমি বলিয়া বর্ণন করিয়াছেন। সেই উদ্যান-ভূমির মধ্যে মধ্যমণিস্বরূপ নবদ্বীপ বিভাগ বিচিত্র রমণীয়তাতে পূর্ণ ছিল। এইরূপ সৌন্দর্ঘ্যের মধ্যে বালককাল অতীত হইলে তাহৰে মুখেই অতীত হয় তাহা বলা নৃিপ্রয়োজন। বালক রামতন্থ পূর্ণমাত্রায় সে মুখের অধিকারী হইয়াছিলেন।

 বালক রামতনু এইরূপে বয়স্তদিগের সহিত আনন্দে বিহার করিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু বোধ হয় পিতা মাতা তাহার ভবিষ্যৎ ভাবিয়া ভীত ও উৎকষ্ঠিত হইতে লাগিলেন। ভীত ও উৎকণ্ঠিত হইবার যথেষ্ট কারণ ছিল। সে সময়ে দেশের, বিশেষতঃ কৃষ্ণনগর সমাজের, নীতি-সম্বন্ধীয় জল-বায়ু দূষিত ছিল। সাধু রামকৃষ্ণের ন্যায় নিষ্ঠাবান প্রাচীন হিন্দুগণ স্বীর স্বীয় গৃহে ও পরিবারে যে সকল সদগুণ দেখিতে চাহিতেন দেশীয় সমাজে সে সকল সদগুণের বড়ই অভাব হইয়াছিল। বলিতে ক্লেশ হয়, ক্ষোভে অশ্রুবারি সম্বরণ করা যায় না, মুসলমান অধিকারের পূৰ্ব্বে, হিন্দু রাজত্বের অভু্যদয়ে ও প্রভাব কালে প্রাচীন গ্রীকপর্য্যটক ও চীনদেশীয় পরিব্রাজকগণ যে হিন্দু জাতিকে, সহসী, সত্য-নিষ্ঠ, সরল-প্রকৃতি, আতিথেয়, স্বদার-নিরত দেখিয়া গিয়াছিলেন, কয়েক শতাব্দীর পরাধীনতাতে সেই জাতিকে যেন সেই সমস্ত সদগুণে বঞ্চিত করিয়া ফেলিয়াছিল। স্থানে স্থানে মুসলমান রাজাদিগের রাজধানী স্থাপিত হইয়া, তাহাদের রাজ-সভার দূষিত সংস্রবে অগ্ৰে হিন্দু ধনীদের সৰ্ব্বনাশ হয়, তৎপরে ধনীদের দৃষ্টান্তে সমগ্র দেশের নীতি কলুষিত হইতে থাকে। মুসলমান রাজাদিগের দৃষ্টাস্তে দেশমধ্যে যে সকল কুরীতি প্রচলিত হইয়াছিল, তন্মধ্যে কয়েকটার উল্লেখ করা যাইতে পারে। প্রথমে ধনীদের মধ্যে স্ত্রীজাতির অবরোধ ও বহুবিবাহ প্রথা। যদিও বহুবিবাহ হিন্দুশাস্ত্রের বিরুদ্ধ নয়, এবং কৌলীন্ধ প্রথা নিবন্ধন বহুবিবাহ আর এক আকারে দেশে প্রচলিত হইয়াছিল, তথাপি ধনী হইলেই একাধিক স্ত্রী বিবাহ করিতে ও পুরবাসিনীদিগকে কঠিন অবরোধে অবরুদ্ধ রাখিতে হয়, এবং সেটা সেন এক-প্রকার সন্ত্রমের চিহ্ন, এই একটা ভাব মুসলমান নবাবদিগের সংস্রবে হিন্দুধনীদিগের মনে জাসিয়াছিল। দ্বিতীয়তঃ পুরুষদিগের মধ্যে ছুশ্চরিত্রতা। ইহা যেন প্রশংসার বিষয় হইয়া দাড়াইয়াছিল। এ বিষয়ে ৰে যত সাহসী ও কৃতকাৰ্য্য হইত সেই বেন বাহাদুর বলিয়া গণ্য হইত, এইটা মুসলমান অধিকারের সর্বপ্রধান কলঙ্ক। ইহাতে জাতীয় নীতিকে একেবারে দুষিত করিয়া ফেলিয়াছিল। এই কারণে দেখিতে পাই মুসলমান অধিকার কালে যে সকল সংস্কৃত কাব্য রচিত হইয়াছে তাহার রুচি বিকৃত । অধিক কি, এই অধিকার কালে যে সকল তন্দ্র শাস্ত্র রচিত হইয়াছে, তাহাতে ও ইন্দ্রিয়াসক্তি ধৰ্ম্মের নাম ধারণ করিয়া দেখা দিয়াছে। এই কালমধ্যে অভূদিত অধিকাংশ ধৰ্ম্ম সম্প্রদায় ইন্দ্রিয়াসক্তির পূতিগন্ধে আপ্লুত।

 মুসলসান অধিকারের তৃতীয় অনিষ্ট ফল তোষামোদজীবিতা, আত্মগোপন ও প্রবঞ্চনাপরতা । দেশীয় ধনিগণ তোষামোদ, আত্মগোপন ও প্রবঞ্চনা দ্বারা নবাবদিগের অত্যাচার হইতে বাচিবার চেষ্টা করিতেন। র্তাহাদের দষ্টান্তের অনুসরণ করিয়া, তাহাদের অত্যাচার হইতে রক্ষা পাইবার আশয়ে অপর সকলেও তোষামোদ ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় লইত। এইরূপে পরাধীনতাবশতঃ হিন্দুদিগের প্রাচীন সত্যনিষ্ঠা একেবারে চলিয়া গিয়াছিল বলিলে অত্যুক্তি হয় না। পথে ঘাটে, হাটে বাজারে, লোকে মিথ্যা কহিতে ও প্রবঞ্চনা করিতে লজ্জা পাইত না । তৎপরে যাহা কিছু অবশিষ্ট ছিল ইংরাজদিগের রাজস্ব আদায়ের প্রণালী, আইন ও আদালত স্থাপিত হইয়া তাহা ও অন্তৰ্হিত হইল। লোকে দেখিল সত্য নিদ্ধারণ ইংরাজের আইন বা ’ আদালতের লক্ষ্য নহে, সত্য প্রমাণিত হইল কি না তাহা দেখাই উদ্দেশু । সুতরাং লোকে জানিল যে, যে যত মিথ্য সাক্ষ্য সংগ্ৰহ করিতে পারিবে তাহারই জয়াশা তত অধিক । এইরূপে ইংরাজ-প্রতিষ্ঠিত আদালতগুলি মিথ্যা সাক্ষ্য প্রবঞ্চনাদির প্রধান স্থান হইয়া দাড়াইল লোকে জাল জুয়াচুরি দ্বারা কৃতকাৰ্য হইয়া স্পৰ্দ্ধা, করিতে আরম্ভ করিল। উৎকোচাদি দ্বারা ধনলাভ করিয়া সমাজ মধ্যে গৌরব লাভ করিতে লাগিল। দেশের এরূপ ছৰ্দশা না ঘটলে মেকলে বাঙ্গালিজাতির প্রতি স্বেরূপ কটুক্তি বর্ষণ করিয়াছেন, তাহা করিবার স্বৰোগ পাইতেন না। দেশের সাধারণ নীতির এই দুৰ্গতি হওয়াতে সৰ্ব্বত্রই লোকের প্রতিদিনের আলাপ আচরণ, তদনুরূপ হইয়া গিয়াছিল। কৃষ্ণনগরও সেই দূষিত বায়ুকে অতিক্ৰম করিতে সমর্থ হয় নাই।

 পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি খাজা ঈশ্বরচন্দ্র ১৮০২ খ্ৰীষ্টাব্দে লোকান্তরিত হন, এবং রাজা গিরীশ চন্দ্র রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হন। রামতনু লাহিড়ী মহাশয় গিরীশচন্দ্রের অধিকার কালেই জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সময়ে কৃষ্ণনগরের মধ্যবিত্ত ভদ্রসমাজ তিন প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম কেন্দ্রীভূত রাজ-পরিবার ও তাঁহাদের স্বসম্পৰ্কীয়, সংস্থষ্ট ও আশ্রিত ব্যক্তিগণ; ইহাদের ংখ্যাই বোধ হয় অধিক ছিল। দ্বিতীয় স্বাধীনবৃত্তি-সম্পন্ন পরিবারবর্গ,— ইহাদের অনেকে পারস্ত ভাষায় সুশিক্ষিত হইয়া বিষয় কৰ্ম্মোপলক্ষে নানাস্থানে বিক্ষিপ্ত হইয়া বাস করিতেছিলেন; অপরাংশ বাণিজ্যাদিতে নিযুক্ত হইয়া বঙ্গদেশেরই অন্যান্ত জেলাতে বাস করিতেছিলেন। তৃতীয় ইংরাজদিগের নব-প্রতিষ্ঠিত কাছারীর উকীল, মোক্তার আমলা প্রভৃতি; ইহাদের অধিকাংশ খড়িয়া তীরবত্তী গোয়াড়ি নামক স্থানে অবস্থিত ছিলেন।

 রাজা গিরীশচন্দ্রের স্বভাব চরিত্রের কথা অগ্ৰেই বর্ণিত হইয়াছে। তিনি অতি অসার, অল্পবুদ্ধি ও নীচ-প্রকৃতি লোকের বগুতাপন্ন ছিলেন। তাঁহার সময়ে স্বার্থপর ও হীনচরিত্র লোকসকল রাজবাটীকে ঘিরিয়াছিল। সুতরাং রাজবাটীর দৃষ্টান্ত ও হাওয়া কিরূপ ছিল সকলেই অনুমান করিতে পারেন। এই সময়ে রাজবাটীর সহিত লাহিড়ী পরিবারস্থ ব্যক্তিগণের কিঞ্চিৎ সংস্রব হয়। সাধু রামকৃষ্ণের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ঠাকুর দাস লাহিড়ী মহাশয় কিছুদিন গিরীশচন্দ্রের কার্য্যকারক ছিলেন তাহা অগ্ৰেই বলিয়াছি।

 রাজবাটীতে সচরাচর, কিরূপ পাপ প্রশ্রয় পাইত তাহার কিঞ্চিৎ বিবরণ পরবর্তী রাজা শ্ৰীশচন্দ্রের সময় হইতে দিতেছি। শ্ৰীশচন্দ্রের বিবিধ সদগুণ সত্ত্বেও তিনি ঐ সকল পাপে লিপ্ত ছিলেন, কারণ সে সকল পাপ তখন পাপ বলিয়া গণ্য হইত না। দেওয়ান কাত্তিকেয় চন্দ্র রায়ের স্বলিখিত জীবনচরিতে উহার কিছু কিছু বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহা হইতে দুইটা বিবরণ দিতেছি।

 একটা বিবরণ এই, শ্ৰীশচন্দ্র অতিশয় গীতবাদ্যের অনুরাগী ছিলেন; সৰ্ব্বদা সুগায়ুক মুগায়িকাদিগকে আনাইয়া গীতবাদ্য শুনিতেন। একবার এইরূপ এক গায়কদলে একটী অল্পবয়স্ক বালিকাকে দেখিয়া তাহাকে রাজা এক প্রকার কিনিয়া লইলেন। সেই বালিকা রাজবাড়ীতে নিয়মিত দাসীদলের মধ্যে পরিগণিত হইয়া রহিল। রাজার অবসর হইলেই তাহাকে আনিয়া গান শুনিতেন। ক্রমে তাহার বয়স ১৪, ১৬ বৎসর হইল। তখন দেওয়ান রাজাকে বলিলেন—“এ বালিকা এখন বয়ঃপ্রাপ্ত হইতে চলিল, আর ইহাকে সভামধ্যে আন কৰ্ত্তব্য নয়।” রাজা তাহার প্রতি কৰ্ণপাত করিলেন না। তৎপরে তাহাকে যখন তখন স্বরাপান করাইয়| বন্ধুগণ-সহ তাহার সহিত হান্ত পরিহাস আমোদ প্রমোদ করতে লাগিলেন। আর একটী বিবরণ এই —“এক রাত্রিতে রাজবাটীতে এক অপূৰ্ব্ব রূপসী ও অসাধারণ সুকণ্ঠাতয়ফাওয়ালীর নৃত্যগীতে সকলেই বিমোহিত হইলেন। কেহ প্রস্তাব করিলেন যে এই রমণী সুন্দর খ্যামটা নাচিতে পারে। তখন সুরাপানে সকলেরই হৃদয় প্রফুল্ল ছিল;, সুতরাং এ প্রস্তাবে দ্বিমত হইল না। ঐ সুন্দরী যখন পেশোয়াজ ছাড়িয়া একখানি কালাপেড়ে স্বক্ষ ধুতি পরিয়া গৃহে প্রবেশ করিল, যেন স্বর্গবিদ্যাধরী অবতীর্ণ হইলেন দর্শকবৃন্দের দুলু ঢুলু নয়নে এইরূপ দৃষ্ট হইল। নিমন্বিত মহাশয়দিগের মধ্যে কি প্রধান, কি বিজ্ঞ, কি পদস্থ, প্রায় সকলেই তাহার নৃত্যে বিমোহিত হইলেন। প্রথমে কয়েক অবিজ্ঞ যুবা আপন আপন চরণ নিজ বশে রাখিতে পারিলেন না। তাহারা ঐ সঙ্গে নৃত্য আরম্ভ করিলেন। প্রাচীন ও পদস্থ একজনও দণ্ডায়মান হইলেন। এক বিজ্ঞবর প্রথমাবধি গম্ভীরভাবে ছিলেন, তাঁহার পদ শেষে অস্থির হইয়া উঠিল। তিনি উক্ত প্রাচীনকে নাচাইবার ছলে আপনি নাচিতে লাগিলেন।”

 যে সমাজে সমাজপতি রাজা বন্ধুগণ-সহ একটা দাসী শ্রেণীস্থ বালিকাকে সুরাপান করাইয়া তাহার সহিত হাস্ত পরিহাস করিতে লজ্জা বোধ করেন না, যে সমাজে সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির ভবনে-নিমন্ত্রিত ভদ্রমণ্ডলীর মধ্যে এইরূপ আমোদ চলিতে পারে, সে সমাজের নীতির অবস্থা কিরূপ দাড়ায় তাহা সকলেই অনুমান করিতে পারেন।

 ইহা পরবর্তী ঘটনা হইলেও গিরীশচন্দ্রের সময়ে যে ইহা অপেক্ষ উচ্চতর অবস্থা ছিল না, তাহ বলিতে পারা যায়। রাজসংসারের সম্পৰ্কীয় ও আশ্রিত ব্যক্তিদিগের নীতি এই পুকার হাওয়াতেই বদ্ধিত হইত।

 দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদিগের অনেক বিদেশে বাস করিতেন সুতরাং কৃষ্ণনগরের তদানীন্তন সামাজিক অবস্থার সহিত তাঁহাদের যোগ ছিন্ন না, এজন্য তাঁহাদের বিষয়ে আলোচনা ত্যাগ করা গেল। ষে সকল বিদেশীয় আমলা প্রভৃতি কৰ্ম্মস্থত্রে গোয়াড়ীতে বাস করিতেন, তাহাদের অবস্থা কি ছিল দর্শন করুন। কাৰ্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় বলিতেছেন ঃ-“গোয়াড়ীতে কয়েকঘর গোপ মালোগাড়ার ও অন্যান্য নীচজাতির বসতি ছিল। পরে যখন ইংরাজ গবর্ণমেন্ট স্থান প্রশস্ত ও নদীতীরস্থ দেখিয়া ইহাতে বিচারালয় সকল স্থাপন করিলেন, সেই সময় সাহেবেরা গোয়াড়ীর পশ্চিম দিকে ও তাঁহাদের আমল, উকীল ও মোক্তারের ইহার পূর্বদিকে আপন আপন বাসস্থান নিৰ্ম্মাণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে বিদেশে পরিবার লইয়া যাইবার প্রথা অপ্রচলিত থাকাতে এবং পরস্ত্রীগমন নিনিত বা বিশেষ পাপজনক না থাকাতে, প্রায় সকল আমলা, উকীল, বা মোক্তারের এক একটী উপপত্নী আবশ্রাক হইত। সুতরাং তাহাদের বাসস্থানের সন্নিহিত স্থানে স্থানে গণিকালয় সংস্থাপিত হইতে লাগিল। পূৰ্ব্বে গ্ৰীসদেশে যেমন পণ্ডিত সকলও বেগুলিয়ে একত্রিত হইয়। সদালাপ করিতেন, সেইরূপ প্রথা এখানেও প্রচলিত হইয়া উঠিল! যাহারা ইন্দ্রিয়াসক্ত নহেন, তাহারাও আমোদের ও পরস্পর সাক্ষাতের নিমিত্ত এই সকল গণিকালয়ে যাইতেন। সন্ধ্যার পর রাত্রি দেড় প্রহর পর্য্যন্ত বোলয় লোকে পূর্ণ থাকিত। বিশেষতঃ পর্বোপলক্ষে সেথায় লোকের স্থান হুইয়া উঠিত না। লোকে পূজার রাত্রিতে যেমন প্রতিমা দর্শন করিয়া বেড়াইতেন, বিজয়ার রাত্রিতে তেমনি বেশু দেখিয়া বেড়াইতেন।”

 এ সকল বিবরণ উদ্ধৃত করিতেও লজ্জা বোধ হইতেছে। কিন্তু লজ্জা বোধ করিয়া প্রকৃত অবস্থার প্রতি চক্ষু মুদিয়া থাকিলে কি হইবে। দেওয়ানজী তদানীন্তন কৃষ্ণনগরের যে অবস্থা বর্ণন করিয়াছেন, তদনুরূপ অবস্থা তখন দেশের অনেক নগরেই বিদ্যমান ছিল। সে সময়ের যশোহর নগরের বিষয়ে এরূপ শুনিয়াছি যে আদালতের আমলা, মোক্তার প্রভৃতি পদস্থ ব্যক্তিগণ কোনও নবাগত ভদ্রলোকের নিকটে পরস্পরকে পরিচিত করিয়া দিবার সময়ে—“ইনি ইহার রক্ষিতা স্ত্রীলোকের পাকা বাড়ী করিয়া দিয়াছেন,” এই বলিয়া পরিচিত করিতেন। রক্ষিতা স্ত্রীলোকের পাকাবাড়ী করিয়া দেওয়া একটা মানসন্ত্রমের কারণ ছিল। কেবল কি যশোহরেই? দেশের সর্বত্রই এ সম্বন্ধে নীতির অবস্থ৷ অতীব শোচনীয় ছিল। অন্যান্য প্রদেশের ত কথাই নাই, বঙ্গদেশেও ভদ্রসন্তানের প্রকাগুভাবে দুষিতচরিত্র নারীগণের সহিত মিশিতে লজ্জা বোধ করিতেন না। এখনও কি করিতেছেন? এখনও প্রকাশু রঙ্গভূমিতে কলিকাতা সহরের ভদ্র পরিবারের যুবকগণ ঐ শ্রেণীর স্ত্রীলোকদিগের সহিত নাচিতেছে, আর দেশের অপরাপর বহু ভদ্রলোক গিয়া অর্থ প্রদান করিয়া উৎসাহ দিয়া আসিতেছেন। অপরাপর প্রদেশে এখনও যে অবস্থা রহিয়াছে তাহা অতীব লজ্জাজনক। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে ও পঞ্জাবে কুলটাগণ প্রকাশুভাবে ভদ্রবংশীয় পুরুষগণের মধ্যে যাতায়াত করিতে সংকুচিত হয় না; পঞ্জাবে এই শ্রেণীর স্ত্রীলোকগণ পিতা ভ্রাতা প্রভৃতির, সঙ্গে বাস করে, তাহারা ইহাদের উপার্জনের দ্বারা পালিত হয়; ইহাদের গৰ্হিত কাজটাও একটা ব্যবসায়ের মধ্যে দাড়াইয়াছে! বোম্বাই ও মান্দ্রাজ প্রদেশে অনেক দেবমন্দিরে কতকগুলি স্ত্রীলোক থাকে, নামে তাহাদের দেবতাদিগের সহিত বিবাহ হয়, কিন্তু ফলে তাহারা বিগৰ্হিত উপায়ে অর্থোপার্জন করে। ইহাদের সমাজিক অবস্থা প্রকাগু গণিকাদিগের অবস্থা অপেক্ষা একটু উন্নত। ইহার অসংকোচে ভদ্রপরিবারের মধ্যে যাতায়াত করে; যাত্রা মহোৎসবাদিতে নৃত্যগীত করে; এবং অনেক স্থলে ভদ্রকুল-' কামিনীগণের অপেক্ষা অধিক সমাদর পায়। সুতরাং সে সময়কার কৃষ্ণনগরের সামাজিক অবস্থার বিষয়ে শোক করিয়া আর কি করিব।

 এই সকল বিষয় উল্লেখ করিবার প্রয়োজন এই তখন এ সম্বন্ধে দেশের সামাজিক অবস্থা কিরূপ ছিল তাহাই প্রদর্শন করা। তখন অল্পবয়স্ক বালকদিগেরও আচার ব্যবহার আলাপ পরিচয়ে দূষিত নীতি প্রবেশ করিত। তরলমতি বালকেরাও এমন সকল বিষয় জানিত যাহা তাহাদিগের জানা উচিত নয়। সুতরাং লাহিড়ী মহাশয়ের বয়ঃক্রম দ্বাদশ বর্ষ হইতে না হইতে পিতা রামকৃষ্ণ ও মাতা জগদ্ধাত্রী যে তাঁহাকে কৃষ্ণনগরের বালকদিগের সঙ্গ হইতে দূরে রবিবার জন্য বাগ্র হইয়াছিলেন এইরূপ অনুমান অযৌক্তিক নয়। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি সাধু রামকৃষ্ণ সন্তানদিগকে সৰ্ব্বদা চক্ষে চক্ষে রাথিতেন। কিন্তু নিজের বিষয় কৰ্ম্মের মধ্যে সৰ্ব্বদা চক্ষে চক্ষে রাখা ও সম্ভব ছিল না। এরূপ অনুমান হয়, যে পিতা মাতা দেখিতেন যে তাঁহাদের সহস্র সতর্কতা সত্ত্বেও সন্তান পল্লীর বালকদলে মিশিত, এবং এমন অনেক বিষয় শিক্ষা করিত, যায় তাহার জানা উচিত নয়। তখন তাহারা উভয়ে তাঁহাকে স্থানান্তরিত করিবার জন্য বাগ্র হইয়া উঠিলেন। কেশবচন্দ্র তখন আলিপুরে কাজ করিতেন ও কালীঘাটের সন্নিহিত চেতলা নামক স্থানে বাসা করিয়া থাকিতেন। পিতা মাতার উদ্ভেগ দেখিয়াই কেশবচন্দ্র বাগকে কলিকাতায় আনিবার ইচ্ছা করিয়া থাকিবেন। যাহা হউক ১৮২৬ সালে দ্বাদশ বর্য বয়সে.কেশবচন্দ্র তাহাকে কলিকাতাতে আনিলেন।