রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।


 ১৮৭৯ সালে লাহিড়ী মহাশয় শোকে ভগ্ন ও রোগে জীর্ণ পরিবার পরিজনকে লইয়া যখন কলিকাতাতে উপস্থিত হইলেন তখন তাঁহাদের অবস্থা বর্ণনাতীত। গৃহে অগ্নি লাগিলে মানুষ যেমন সে গৃহ হইতে ছুটিয়া পলায়, কোথায় দাঁড়াইবে তাহা জানে না, তেমনি তাঁহারা যেন কৃষ্ণনগর হইতে ছুটিয়া আসিলেন, কোথায় দাঁড়াইবেন তাহা জানেন না। লাহিড়ী মহাশয়ের পেনশনের সামান্য ৭৫টা টাকা মাত্র তখনকার ভরসা; তাঁহাতে আর কত চলে! তৎপরে এত বৎসর ধরিয়া বিপদের উপরে বিপদ হইতেছে, একটা ধাক্কা সামলাইয়া উঠিতে না উঠিতে আর একটা আসিতেছে, সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে তখন তাঁহাদের কি অবস্থা। কিন্তু চরিত্রের সম্পদ যাহার আছে তাহার অন্য সম্পদ আপনি আসে। জননী ক্রোড়স্থিত শিশুকে বরং পরিত্যাগ করিতে পারেন, কিন্তু জগতজননী চরণাশ্ৰিত দীন ভক্তকে কখনও পরিত্যাগ করেন নাই। এই সাধু, পুরুষের জীবনে তাঁহার প্রচুর পরিচয় পাইয়াছি। তিনি শান্ত ক্লান্ত দেহ মন লইয়া সহরে আসিলেন বটে, কিন্তু এখানে তাহাকে অকপট প্রীতি ও শ্রদ্ধা দানে তৃপ্ত করিবার জন্য অনেক হৃদয় প্রস্তুত ছিল। তন্মধ্যে তাঁহার প্রিয় শিষ্য, তাঁহার পুত্ৰাধিক, স্বৰ্গীয় কালীচরণ ঘোষ মহাশয়ের নাম সৰ্ব্বাগ্রে উল্লেখ্য-যোগ্য। বলিতে সুখ হইতেছে, লিখিতে হৃদয় শ্রদ্ধাভরে নত হইতেছে, ইনি আপনার গুরুকে পিতৃসম জ্ঞানে যাহা করিয়াছেন, সস্তানে তাহার অপেক্ষা অধিক করিতে পারে না। বহুকাল হইতে লাহিড়ী মহাশয়ের সর্ববিধ সাহায্যের জন্য ইহার হস্ত উন্মুক্ত হইয়াছিল। নবকুমারকে পশ্চিমে পাঠাইয়া ইনি মাসে মাসে তাঁহার যাহা প্রয়োজন হইত জ্যেষ্ঠের ন্যায় যোগাইতেন; অনেক বিপদে লাহিড়ী মহাশয়কে বিবিধ প্রকারে সাহায্য করিতেন। এক্ষণে সেই শোকাৰ্ত্ত পরিবার দ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইল। কালীচরণ বাবু স্বীয় ব্যয়ে বাড়ী ভাড়া করিয়া তাহাতে ইহাদিগকে স্থাপন করিলেন; এবং সৰ্ব্ববিষয়ে জ্যেষ্ঠ পুত্রের ন্যায় তত্ত্বাবধান করিতে লাগিলেন। এই গ্রন্থে এত লোকের জীবন চরিত দিয়াছি ইহার সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত না দিয়া নিরস্ত থাকি কিরূপে? বলিতে কি এমন নীরব সাধুতা, এরূপ ধর্মভীরুতা ও এরূপ কৰ্ত্তব্য-পরায়ণতা আমরা অল্পই দেখিয়াছি। এই সকল মানুষ শিক্ষিত বাঙ্গালীদের গৌরব! শিক্ষিত বাঙ্গালীর নাম যে দেশে সম্মানার্হ হইয়াছে তাহা এইরূপ মনিষদিগকে দেখাইতে পায় যায় বলিয়া।

কালীচরণ ঘোষ।

 ১৮৩৫ সালের মে মাসে যশোর জেলার অন্তর্গত চৌগাছা গ্রামে ইহার জন্ম হয়। দুই বৎসর বয়সে মাতৃবিয়োগ হয়; এবং ৮ বৎসর বয়সে পিতৃবিয়োগ হয়। ইহার পিতা, গদাধর ঘোষ, গোবর-ডাঙ্গার জমিদার বাবুদের সরকারে বিষয় কৰ্ম্ম করিতেন। পিতার মৃত্যুর পর ইহাদের চারি সহোদরের রক্ষণাবেক্ষণের ভার ইহার পিতৃব্য শ্ৰীধর ঘোষ মহাশয়ের উপরে পড়ে। ৮ বৎসর বয়সের সময় হইতে দ্বিতীয় সহোদর অম্বিকাচরণ ঘোষের সহিত ইনি ৱিদ্যা শিক্ষার্থ কৃষ্ণনগরে প্রেরিত হন। অম্বিকাচরণ অল্পকালের মধ্যে কৃষ্ণনগর কালেজের একজন লব্ধ-প্রতিষ্ঠ ছাত্র হইয়া উঠেন। তিনি বিদ্যাশিক্ষা বিষয়ে সুবিখ্যাত অধ্যাপক উমেশচন্দ্র দত্তের সহাধ্যায়ী ও সমকক্ষ ছিলেন। এই দুই জনে এমনি প্রীতি ছিল যে, কৃষ্ণনগরে জনশ্রুতি আছে যে, যে দারুণ বসন্ত রোগে অম্বিকাচরণের মৃত্যু হয়, সেই রোগের মধ্যে যুবক উমেশচন্দ্রের অভিভাবকগণ যাহাতে তিনি পীড়িত বন্ধুর নিকটে না যান সেই জন্য তাহাকে ঘরে দ্বার বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন; কিন্তু উমেশচন্দ্র ঘরের চাল ফুড়িয়া পলাইয়া গিয়া অম্বিকাচরণের সেবা করেন। এই ঘটনা তখনকার এডুকেশন কাউনশিলের সভাপতি বাটন (বেথুন) সাহেবের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। তিনি ইহার উল্লেখ করিয়া উমেশচক্রকে প্রকাশ্য সভাতে প্রশংসা করেন।

Kalicharan Ghosh.jpg
কালীচরণ ঘোষ।

(৩৭০ পৃষ্ঠা)

 ১৮৫০ সালে ২০ বৎসর বয়সে অম্বিকাচরণের মৃত্যু হয়। ভ্রাতার মৃত্যুর পর কালীচরণ কৃষ্ণনগর কালেজেই পাঠ করিতে থাকেন। ১৮৫৭ সালে সেখান হইতে সিনিয়র বৃত্তি পাইয়া কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে আসেন। ১৮৬০ সালে বি, এল, পরীক্ষায় প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইয়া কৃষ্ণনগরে ওকালতী কার্য্যে প্রবৃত্ত হন। কিন্তু ওকালতী-কাজ তাঁহার ভাল লাগিল না; তাই সে কাজ পরিত্যাগ করিয়া, ১৮৬১ সালে, ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট কৰ্ম্ম গ্রহণ করেন। ক্রমে পদোন্নতি হইয়া নানাস্থানে বাস করিয়া অবশেষে তিনি কলিকাতার উপনগরে আলিপুরে আসিয়া প্রতিষ্ঠিত হন। সম্মানের সহিত এখানে কয়েক বৎসর থাকিয়া গবর্ণমেণ্ট কর্তৃক নড়াইলের জমিদারীর বিশৃঙ্খলা নিবারণার্থ প্রেরিত হন। সে কাৰ্য্য দক্ষতার সহিত সম্পাদন করিয়া ১৮৮২ সালে আবার কলিকাতাতে প্রতিনিবৃত্ত হন। ১৮৮২ সালে কলিকাতার হারিসন রোড ও খিদিরপুরের ডকের জমি কিনিবার ভার তাঁহার উপরে পড়ে। এ কার্য্য তিনি দক্ষতা সহকারে নিম্পন্ন করিয়া কর্তৃপক্ষের প্রশংসা-ভাজন হন। বিষয় কার্য্যে সৰ্ব্বসাধারণের প্রীতি ও শ্রদ্ধাভাজন হইয়া ১৮৯২ সালের এপ্রেল মাসে তিনি পেনশন লইয়া কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করেন; এবং কলিকাতাতে বাস করিতে থাকেন। পেনশন লওয়ার পর অধিক দিন জীবিত থাকেন নাই। ১৮৯৪ সালের ৩রা মে দিবসে কলিকাতার বাটীতে হৃদরোগে ইহার মৃত্যু হয়।

 জীবনের কঙ্কালময় কাঠামাখানা ত এই গেল। কিন্তু তিনি কি মানুষ ছিলেন তাহা সংক্ষেপে বলিবার নহে। তাহা দেখিয়া আমরা সৰ্ব্বদাই বলিতাম উপযুক্ত গুরুর উপযুক্ত শিষ্য। পঠদ্দশাতেই বারাসতের প্রসিদ্ধ ডাক্তার নবীনকৃষ্ণ মিত্রের কন্যা কুন্তীবালার সহিত ইঁহার বিবাহ হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই বিবাহের ঘটক ছিলেন; তিনিই কৃষ্ণনগরে গিয়া পাত্র দেখিয়া আশীর্ব্বাদ করিয়া আসিয়াছিলেন। কুন্তীবালার অল্পবয়সেই পিতৃবিয়োগ হয়। তখন নবীনকৃষ্ণের ভ্রাতা, বঙ্গসমাজে জ্ঞান ও সাধুতার জন্য সুপ্রসিদ্ধ, কালীকৃষ্ণ মিত্র মহাশয়ের প্রতি তাঁহার রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষার ভার পড়ে। কালীকৃষ্ণ বাবু নিজে যত্নপূর্বক কুন্তীবালাকে ইংরাজী ও বাঙ্গালা শিক্ষা দিয়াছিলেন। কিন্তু হায়! সুখের সমুদয় উপকরণ যখন বিদ্যমান, তখন এক দুর্ঘটনা ঘটিয়া ১৮৬৯ সাল হইতে চিরজীবনের জন্য কালীচরণ বাবুর পারিবারিক সুখ বিনষ্ট হয়। ঐ সালে অকালে এক পুত্র হারাইয়া কুন্তী উন্মাদ-রোগগ্ৰস্ত হন। তদবধি কালীচরণ বাবুর গৃহ শাস্তিহীন হইয়া যায়। উন্মাদরোগগ্রস্তা পত্নীকে লইয়া প্রাণভয়ে তাঁহাকে সৰ্ব্বদা সশঙ্কচিত্তে বাস করিতে হইত। তখন হইতে তাঁহার যে ধৈর্য্য ও কর্তব্যপরায়ণতার দৃষ্টান্ত আমরা দেখিয়াছি তাহা ভুলিবার নহে।

 আর একটা কথা এইখানেই বলিয়া রাখিবার যোগ্য। তাহা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহৃদয়তা৷ একদা কুন্তী তাঁহার উন্মাদ অবস্থাতে এই গো ধরিলেন যে বিদ্যাসাগর খাওয়াইয়া না দিলে খাইবেন না। অন্তে আহার করাইতে গেলে মুখ বন্ধ করিয়া থাকিতেন, কোনও ক্রমেই মুখে অল্পের গ্রাস লইতেন না। এই সংবাদ যখন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকটে গেল, তখন তিনি হাসিয়া বলিলেন—“তা আর কি হবে, মেয়েটা কি না খেয়ে মারা যাবে, আমি দুবেলা গিয়া খাওয়াইয়া আসিব।” তিনি সত্য সত্যই কয়েক মাস ধরিয়া দুবেলা আসিয়া কুন্তীকে খাওয়াইয়া যাইতেন! আমরা ইহা দেখিয়াছি। ইহা মিত্র পরিবারের প্রতি, বিশেষতঃ সুযোগ্য জামাতা কালীচরণের প্রতি, বিখ্যাসাগর মহাশয়ের প্রীতি ও শ্রদ্ধার পরিচায়ক মাত্র।

 পত্নীর উন্মাদরোগ-প্রাপ্তির দিন হইতে জীবনের শেষ দিন পর্য্যস্ত কালীচরণ বাবু কঠোর ব্রহ্মচর্য ব্ৰত ধারণ করিয়াছিলেন। আহারে বিহারে, পোষাকে পরিচ্ছদে, কেহ তাঁহাকে বিলাসের ত্রিসীমায় পদার্পণ করিতে দেখে নাই। কেবল জ্ঞান-চর্চা, সাধুসঙ্গ, সদালাপ ও স্বীয় কৰ্ত্তব্যসাধনে নিমগ্ন থাকিতেন। এই ভাবেই জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁহার দিন অতিবাহিত হইয়াছিল।

 একদিকে কালীচরণ বাবু অপর দিকে বিদ্যাসাগর মহাশর, দুই জনেই এই সময়ে ভগ্ন লাহিড়ী পরিবারের পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য বদ্ধ-পরিকল্প ইইলেন। ইঁহারা কলিকাতাতে প্রতিষ্ঠিত হইতেই, বিদ্যাসাগর মহাশয় রামতনু বাবুর দ্বিতীয় পুত্র শরৎকুমারকে ডাকিয়া মেট্ৰপলিটান কালেজের লাইব্রেরিয়ানের পদে নিযুক্ত করিলেন। কিছু কিছু অর্থাগম হইতে লাগিল। পুত্রের সাহায্যে কলিকাতাতে ইঁহাদের দিন একপ্রকায় চলিতে লাগিল।

 আর এক সাধু পুরুষের নাম এই খানেই উল্লেখ করা উচিত। ইনি সে সয়কার কলিকাতাবাসী শিক্ষিত ভদ্রলোকদিগের ও সৰ্ব্বসাধারণের প্রতি ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। ইঁহার নাম শ্যামাচরণ (দে) বিশ্বাস। কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের সন্মুখেই ইহার ভবন; সুতরাং প্রতিসূত্রে আবদ্ধ হইয়া, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, প্যাঁরীচরণ সরকার, প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ইঁহার ভবনে সৰ্ব্বদা গমন করিতেন। সেখানে প্রায় প্রতিদিন এই সকল মহাজনের একটা সুহৃদগোষ্ঠীর অধিষ্ঠান হইত। শ্যামাচরণ বাবু নিজে সাধু, সদাশয়, সত্যবাদী, স্পষ্টভাষী ও অকৃত্রিম মানুষ ছিলেন; এজন্য তাঁহাকে সকলেই ভাল বাসিত। এমন কি আমরা তখন কালেজের ছেলে, আমরাও তাঁহাকে অতিশয় ভক্তিশ্রদ্ধা করিতাম। তিনি কিরূপে স্বীয় ভ্রাতা বিমলাচরণ বিশ্বাসের গুরুতর ঋণভার স্বীয় স্কন্ধে লইয়া, নিজের উচ্চ বেতন ও পদ সত্ত্বেও, চিরদিন টানাটানির মধ্যে বাস করিয়াছিলেন, তাহা আমাদের ন্যায় যুবকগণের আদর্শ স্থলে ছিল। লাহিড়ী মহাশয় শ্যামাচরণ বাবুর সহিত গভীর প্রতিসূত্রে বদ্ধ ছিলেন। কৃষ্ণনগরে থাকিবার সময় যখনি তিনি কলিকাতায় আসিতেন তখন আর কোথাও থাকুন না থাকুন, বিশ্বাস মহাশয়ের ভবনে দুই চারিদিন বাস করিতেন। অন্তত্ব থাকিলেও প্রতিদিন একবার সে ভবনে পদার্পণ করিতেন। সে ভবন তার নিজের ভবনের ন্যায় ছিল। সে কেবল শ্যাম বাবুর সহৃদয়তার গুণে। যে সহৃদয়তা চিরদিন লাহিড়ী মহাশয়কে সেবা করিয়া আসিয়াছিল, সেই সহৃদয়তা তাঁর কলিকাতায় আসার পরে যে তাঁহাকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল তাহা বলা অত্যুক্তি মাত্র। লাহিড়ী মহাশয় সহরে প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাহাদের বন্ধুত্ব লাভ করিয়া আপ্যায়িত হইলেন, তাঁহাদের মধ্যে শ্যামাচরণ বিশ্বাস একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন।

 আর একজন বঙ্গসমাজের রত্নস্বরূপ ব্যক্তির সদাশয়তা এখানে উল্লেখযোগ্য৷ এই সময়ে বঙ্গবাসীর সুপরিচিত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয় সময় নাই, অসময় নাই, এই পরিবারের, বিশেষতঃ লাহিড়ী মহাশয়ের, কোনও অসুখের কথা শুনিবামাত্র নিজ শরীরের সুস্থতা অসুস্থতা গণনা না করিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। লাহিড়ী মহাশয়ের জীবনের শেষ সময় পৰ্য্যন্ত এই অকৃত্রিম প্রীতি ও সদ্ভাবের নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে।

 লাহিড়ী মহাশয়কে কলিকাতাতে প্রতিষ্ঠিত্ব করিয়া দিয়া কালীচরণ বাবু কয়েক বৎসরের জন্য নড়াইলের জমিদার পরিবারের ম্যানেজার হইয়া কলিকাতা পরিত্যাগ করিলেন। শরৎকুমার এন্টান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এল, এ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন কিন্তু ত্বরায় তাহাকে, সে সংকল্প পরিত্যাগ করিতে হইল। তাহাকে বৃদ্ধ পিতার চিন্তাভার লঘু করিবার উদ্দেশ্যে বিষয়কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইতে হইল। অগ্ৰেই বলিয়াছি বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাকে নিজ কালেজের লাইব্রেরিয়ানের পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। সেই পদে প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া তিনি নিজ অবস্থার উন্নতি করিবার জন্য ব্যস্ত হইলেন এবং নিজের শ্রম, মিতব্যয়িতা ও সততার গুণে সবিশেষ উন্নতি করিয়া তুলিলেন, তাহার বিশেষ বিবরণ পরে দেওয়া বাইবে।

 যে সময়ে লাহিড়ী মহাশয় কলিকাতাতে আসিলেন সে সময় গুরুতর আভ্যস্তরীণ বিবাদে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলিত হইতেছিল। তাহার সামান্য উল্লেখ অগ্ৰেই করিয়াছি। কুচবিহারের নাবালক রাজার সহিত কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের কন্যার বিবাহ হইলে, অধিকাংশ ব্রাহ্ম তাহার প্রতিবাদ করিয়া উহা হইতে স্বতন্ত্র হন, এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ নামে একটা স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করেন। ১৮৭৮ সালের মে মাসে ঐ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত সমাজের সভ্যগণ এই সময়ে তাঁহাদের নবপ্রতিষ্ঠিত সমাজের কার্য্যপ্রণালী নিৰ্দ্ধারণ ও নব নব কাৰ্য্যের উদ্ভাবনের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। লাহিড়ী মহাশয় কোনও দলের মানুষ ছিলেন না। চিরদিন তিনি দলাদলির বাহিরে থাকিয়া যেখানেই অকৃত্রিম সাধুতা দেখিয়াছেন সেই খানেই প্রীতি ও শ্রদ্ধা দিয়া আসিয়াছেন। কিন্তু তাহা বলিয়া যাহাক অসত্য বা অন্যায় মনে করিতেন তাহার প্রতিবাদ করিতে কুষ্ঠিত হইতেন না। কলিকাতায় আসিয়া তাঁহার প্রকৃতিগত উদারভাবে বাস করিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু কুচবিহারের বিবাহ সম্বন্ধে তাঁহার ভাব ব্যক্ত করিতে ক্রটী করিতেন না। তাহার তৎকালীন দৈনিক লিপিতে দেখিতেছি, তিনি লিখিতেছেন, যে একদিন তিনি “ভারতাশ্রমে" বেড়াইতে গিয়া, কেশব বাবুর গৃহিণীর সমক্ষেই উক্ত বিবাহের প্রতিবাদ করিয়া আসিয়া, হয়ত কেশব বাবুর পত্নীকে ক্লেশ দিয়াছেন বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিতেছেন।

 লাহিড়ী মহাশয় কলিকাতাতে আসিয়া যে কেবল ব্রাহ্মসমাজের নব আন্দোলনের মধ্যে পড়িলেন, তাহা নহে। ইহার কয়েক বৎসরের মধ্যেই হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের মহা আন্দোলন উপস্থিত হয়। প্রায় তাঁহার কলিকাতা আসিবার সমকালেই পঞ্জাবে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী কর্তৃক আৰ্য্যসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়; এবং কর্ণেল জালকট ও মাদাম ব্রাভার্টস্কি আসিয়া বোম্বাই সহরে প্রতিষ্ঠিত হইয়া থিওলফিকাল সোসাইটী স্থাপন করেন। প্রাচীন হিন্দুভাবের পুনঃপ্রতিষ্ঠা উক্ত উভয় সভার লক্ষ্য হওয়াতে হিন্দুধর্ম্মের পুনরুখান বিষয়ে দেশের সর্বত্রই আলোচনা উপস্থিত হয়। এই আলোচনার তরঙ্গ ক্রমে আসিয়া বঙ্গদেশকে অধিকার করে। এখানে কোনও কারণে হিন্দুসংবাদপত্র "বঙ্গবাসী" ও ব্রাহ্মসংবাদ-পত্ৰ “সঞ্জীবনী" এই উভয়ের মধ্যে বিবাদ ঘটনা হইয়া বঙ্গবাসীর পরিচালকদিগের প্রষত্বে হিন্দুধর্ম্মের পুনরুখানের আন্দোলন উঠে। প্রধানতঃ তাঁহাদেরই উদ্যোগ ও প্রয়াসে, শশধর তর্কচূড়ামণি প্রভৃতি কয়েকজন সনাতনধৰ্ম্ম-প্রচারক কলিকাতাতে পদার্পণ করেন; এবং নানা স্থানে বক্তৃতা করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহাদের উত্তরে ব্রাহ্মসমাজের দিক হইতেও নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করেন। ইহাতে মহা বাকৃযুদ্ধ উপস্থিত হয়। সেই যুদ্ধ ক্রমে মফস্বলেরও নানা স্থানে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। এই হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুত্থানের স্রোত এখনও চলিয়াছে; এবং দেশের লোকের মনে স্বদেশীভাবকে জাগ্ৰত করিয়াছে। ইহার পরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্যগণ রামকৃষ্ণ সম্প্রদায় নামে এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করিয়া সনাতনধৰ্ম্মের পুনরুত্থানের ভাবকে আরও প্রবল করিয়াছেন।

 এই সকল আন্দোলনের মধ্যে লাহিড়ী মহাশয় স্বীয় বিশ্বাস ও ধৰ্ম্মভাবে ধীর স্থির থাকিয়া কলিকাতাতে বাস করিতে লাগিলেন। তাঁহার একজন অনুগত শিষ্য একদিন বলিলেন—“তাঁহাকে দেখিলে মনে হইত যেন সত্যই তার ঈশ্বর”। ঠিক কথা, সত্যকে তিনি ঈশ্বর জানিয়া সেবা করিতেন। জানিতেন, সত্য-পরায়ণতা মানবের সৰ্ব্বোচ্চ ও সৰ্ব্বপ্রধান কর্তব্য। যেখানে সত্য সেইখানেই ঈশ্বর। তিনি কি ভাবে সত্যের অনুসরণ করিতেন তাহার কয়েকটা দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছি:—

 একদিন গিয়া দেখি লাহিড়ী মহাশয়েয় মন যেন উত্তেজিত। কারণ জিজ্ঞাসা করিতে বলিলেন—“দেখ, আমার বোধ হয় পরোক্ষভাবে পাপী হচ্চি।” প্রশ্ন—"ব্যাপারটা কি"? উত্তর—“আমাদের বাড়ীতে পীড়া আছে, মুরগী টুরগী সৰ্ব্বদা রাখতে হয়, আমি আশ্চৰ্য্য মনে করি আমাদের পাচক ব্রাহ্মণ তা রাঁধতে আপত্তি করে না; কিন্তু সে যে বাহিরে অন্য লোকের কাছে তাহা স্বীকার করে তা বোধ হয় না; হয়ত মিথ্যা কথা বলে। আমরা ঐ গরীব লোককে প্রকারান্তরে মিথ্যা কথা বলাচ্চি, এতে কি আমরা পাপী নই?” উত্তর—“বাহিরের লোকের কার বা মাথা ব্যথা পড়েছে যে আপনার বাড়ীর ভিতরে কি বাঁধে না রাঁধে তার খবর লয়। আপনার যদি মনে এতই বাঁধে তা হলে অন্য জেতের রাঁধুনী রাখতেই পারেন।” “উত্তর—আমিত তা রাখতে চাই, গৃহিণীর জন্য পারি না।"

 উত্তরপাড়া স্কুলে তিনি যখন হেড মাষ্টার তখন তাঁহার চাকরাণী একদিন শিশু নবকুমারকে ভূগাইবার জন্য বলিল—“থাম, থান, মিঠাই দিব; এই বাক্যে শিও থামিল। কিন্তু বাকাগুলি, লাহিড়ী মহাশয়ের কর্ণগোচর হইয়া ছিল। তিনি গিয়া চাকরাণীর হাতে পত্নসা দিয়া বলিলেন, “তুমি যখন মিঠাই দেব বলেছ তখন মিঠাই এনে দিতেই হধে, তা না হলে ছেলে মিথ্যে বলতে শিখবে।" এই বলিয়া চাকরাণীকে মিঠাই আনিয়া দিতে বাধ্য করিলেন। ভাগলপুর হইতে আর এক জন বন্ধু আর একটী ঘটনার কথা লিখি মাড়ুেন,। ভাগলপুরে অবস্থিতি কালে লাহিড়ী মহাশয় তদনীন্তন প্রসিদ্ধ। উকীল অতুলচন্দ্র মল্লিকের ভবনে সর্বদা যাইতেন। এক দিন তিনি তবনে প্রবেশ করিতেছেন, এমন সময়ে মল্লিক মহাশয়ের ভৃত্য প্রভুর আদেশে তাহার নিজের জ্য গুড় গুড়িতে তামাক সাজিয়া আনিতেছে। লাহিড়ী মহাশঙ্গ প্রবেশ করিতেছেন দেখিয়া মল্লিক মহাশয় ভৃত্যকে গুড়গুড়ী সরাইতে ইঙ্গিত করিলেন। তৎক্ষণা গুড়গুড়ি অস্তহিত হইল। কিন্তু ঘটনাটী লাহিড়ী মহাশয়েঃ নেত্রগোচর হইল i তিনি গৃহে প্রবেশ পূর্বক আসন পরিগ্রহ করিয়া মল্লিক মহাশয়কে বলিলেন—“তুমি তামাক কেন সরাইলে? যদ তামাক খাওয়া নিষিদ্ধ কার্য মনে কর, কাহারও স ষু থাইও না; আর যদি নিষিদ্ধ না মনে করসকলের সমক্ষেই থাইতে পার।” মনের কথাটা এই জগতের সহিত ব্যবহারে খাঁটি থাকিতে হইবে, রাখা ঢাকা আবার কি!

 ইহার অমুরূপ তাহার জীবনের আর একটা ঘটনা আছে, ‘স্বাহাতে যুগপৎ তাহার' ন্যায়পরায়ণতার ও সত্যপ্রিয়তার পরিচয় পাওয়া যায়। কৃষ্ণনগর কলেজে কৰ্ম্ম করিবার সময় একদিন তাহার দেরাজ হইতে একটী জিনিষ চুরি যায়। প্রণমে মধু নামক একজন ভূত্যের প্রতি তাহার সন্দেহ হয়। তিনি মধুকে কিছু বলেন নাই বটে, কিন্তু কালেজের লোকের। নিকট এসে সন্দেহ প্রকাশ করেন, এবং মধুকে সন্দেহের চক্ষে দেখিতে আরম্ভ করেন। ইহার কয়েক দিন পরে, সে দ্রব্যটা আবার পাওয়া যায়। তথন লাহিড়ী মহাশয় মধুকে জাকিয়া সর্বসমক্ষে বলিলেন: —‘মধু, অমুক জিনিষটী তুমি চুরি করিয়াছ মনে করিয়া আমি মনে মনে তোমাকে চোর ভাবিয়াছিলাম এবং অপরের নিকট সে কল বলিয়াছিগাম, তুমি আমার থে 'অপরাধ মার্জনা কর।

 ফলতঃ প্লাহার পরিবার পরিজনের মুখে শুনিয়াছি যে ঙাহার শেষ দশায়, কলিকাতাবাস কালে, পরোক্ষভাৰে অসত্য ও অসাধুতার প্রশ্ৰয় দেওয়া লইয়া সময়ে সময়ে মহা অশান্তি ঘটিত। একজন জেলের মেয়ে বাড়ীতে মাছ বিক্রয় করিতে আসিয়াছে; डांद्रे হাৰ ভাব দেখিয়া লাহিড়ী • মহাশয়ের বিরক্তি বোধ হইল; পরিবারদিগকে বলিলেন—“ওর স্বভাব চরিত্র ভাল নয় ওকে কেন বাড়ীতে প্রবেশ করতে দেও, ওর কাছে মাছ নিও না।” তাহারা"হয়ত বলিলেন—“পয়সা দেব, জিনিস নেব, তার স্বভাব চরিত্রের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ কি?” কোন ও লোক কোনও দ্রব্য বিক্রয় করিয়ু গিয়াছে, পরে যদি জানিতে পারিতেন যে সে ঠকাইয়া গিয়াছে বু মিথ্যা বলিয়া, গিয়াছে, তবে তাহাকে আর গৃহে আসিতে দিতেন না, ৰা তাহার নিকট কিছু লইতেন না। পরিবারস্থ ব্যক্তিগণ বলিত,—“জিনিসটার দর ত আমরা জানি, হাতের কাছে পাওয়া যাচ্চে নেওয়া যাকৃ, কে আবার বাজারে যায়।” তিনি বলিতেন,—“ন, তা হবে না,ও অসৎ লোক, ওর সঙ্গে কারবার করা হবে না।”

 আমাদের অনেকের চক্ষে এতটা করা বাড়াবাড়ি মনে इईउ পারে, কিন্তু সত্যপরায়ণত ধার জীবনের মহামন্ত্র ছিল, চিরদিন সৰ্ব্বপ্রযত্বে যিনি সত্যকে রক্ষা করিবার জন্য প্রয়াস পাইয়াছিলেন, তাহার পক্ষে ইছা স্বাভাবিক।

 যাহা হউক, কলিকাতাতে তিনি বিবাদ বিসম্বাদের অতীত হইরা, সৰ্ব্বসাধারণের প্রীতি ও শ্রদ্ধাতে প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া, বাস করিতে লাগিলেন। তাহার দ্বিতীয় পুত্র শরৎকুমার এখন হইতে পিতার স্কন্ধের ভার নিজস্কন্ধে লুইবার জন্য বদ্ধ পরিকর হইলেন। নবকুমান্সের মৃত্যুর পর বৃদ্ধ পিতা মাতাকে দেখিবার তার তাহার উপরে পড়িয়া গেল। সহোদর সুহোদরার মৃত্যু, ম্যালেরিরার প্রকোপে বার বার,দেশত্যাগ, পরিবারের ছিন্ন,বিচ্ছিন্ন অবস্থা, এইরূপ নানা প্রতিবন্ধক সত্ত্বেও শরৎ এন্টান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এল, এ, পড়িবার জন্য সহরে আসিয়াছিলেন। কিন্তু পরিবারের এমনি অবস্থা দাড়াইল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা লাভের আশা পরিত্যাগ করিয়া, তাহাকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রদত্ত তাঁহার কালেঞ্জের লাইবুেরিয়ানের পদ গ্রহণ করিতে হইল। কিন্তু এ পদ গ্রহণ করিয়াও তিনি ত্বরায় অনুভব করিলেন যে, ঐ পদের ৰৈ স্বল্প আয় তাঁহাতে আর কুলাইষ্ট্ৰেল, সহৃদয় বন্ধুগণের উপরে বার বার তার পিতা মাতার সেকর ভাল বন্দোবস্ত করিবার জ্য প্রতিজ্ঞাৰূঢ় হইলেন। অনেক ভাবিয়া চিথিা পুস্তক প্রকাশ ও বিক্রয়ের ব্যবসায় অবলম্বন করা স্থির করিbেন; এবং ১৮৮৩ সালে ঐ ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। ব্যবসাতে বিশেষ উন্নতিলাভ হইবে এই আশায় তাহার পিতার অনুরক্ত ছাত্র ও চিরবক্স কোন্নগরের বাবু ক্ষেত্রমোহন বস্তু তাহার উৎসাহদাতা হইলেন; এবং শরৎকুমার উক্ত ব্যবসায় .এফ বৎসর চালানর পর তিনি নিজের ভ্রাতুসূত্র পূৰ্ণচন্দ্র বসুকে কিছু টাকা দিয়া ঐ কারবারের অংশীদার করিয়া দিলেন। এই কাৰ্য্যে লাহিড়ী মহাশরের নাম যে শরতেন্ত্র প্রধান সহায় হইল তাহাতে সন্দেহ নাই। তিনি বৃদ্ধ পিতার সেবার জন্য সংগ্রাম করিতেছেন জানিয়া অনেক' গ্রন্থকায় ও অপরাপর লোক তাহাকে স্বীয় স্বীয় পুস্তকাদি দিয়া সাহায্য করিতে অগ্রসর হইলেন। দৈখিতে দেখিতে ইহাদের কারবার ফাপিয়া উঠিতে লাগিল। ১৮৮৫ সালের শেষে শরৎকুমারের বৈষয়িক অবস্থা এরূপ হইল,যে সেই সময়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কালেজের কাজ পরিত্যাগ করিয়া কারবারে আপনার সমুদয় সময় দিতে সমর্থ হইলেন; এবং ১৮৮৭ সালে পূর্ণচন্দ্ৰ বৰ্ময় অংশ ক্ৰয় করিম্না আপনি সমগ্র কারবারটীর মালিক হইলেন।

 এদিকে বৈবয়িক উন্নতি হইতে লাগিল ধটে, কিন্তু পরিবার বে। ভাঙ্গিতে অ'রম্ভ করিয়াছিল তাহ৷ আর থামিল না॥ 'লাহিড়ী মহাশয়ের কনিষ্ঠ পুত্ৰ বিনয়কুমার অনেক দিন হইতে মালেরিয়া জরে ভূগিলেছিল। একটু বিশেষ বোধ হওয়াতে লাহিড়ী মহাশস্ত্র সপরিবারে কৃষ্ণনগরের বাড়ীতে গিরা। কিছুদিন ছিলেন। ‘ভাহার ফল এই হইল। ধে, বিনয়ের ম্যালেরিয়া জর আবার প্রবল আকারে প্রকাশ পাইল; আবার তাহাকে লইয়া স্থানান্তরে যাওয়া অবখক হইল। এইবার ত’হায়া মুঙ্গেরে গেলেন। সেখানে তাহার পীড়ার। উপন্যম হইল না। ঐ ১৮৮৫ সালের ২৩শে আগষ্ট দিবসে বিনয় সেখানে অকালে কালগ্ৰাসে পতিত হইল। সকলে ভগ্ন-হৃদয়ে আবার কলিকাতাতে ফিরিয়া আাসিলেন।

 তাহারা কলিকাতাতে ফিরলে Wামরা অনেকে শোক প্রকাশ করিবার জন্য শাহিড়ী মহাশয়কে দেখিতে গেলাম। আমার স্মরণ শাছে সমাগও ব্যক্তি দিগের মধ্যে একন বলি লন—“কি হঃখের কথাএত গুলি সস্তান চক্ষের উপর মিলাইয়া গেল।• তাহাতে দেই সাধু পুরুষ বলিলেন —‘ও কথা কেন বল? এই কথা কেন বল না আমার মত অধমকে যে তিনি এত কৃপা করিলেন যে কয়েকট এখনও স্থাখিলেন এই ঢের। এগুলিকে নিলেই বা আমরা কি করিতে পার? যা রছিল তাহার জন্যই তাকে ধন্যবাদ। আমি অন্ধমনিকৃষ্ট মানুষ, জগতের মুখের উপরে আমার কি অধিকার আছে?”

 এই স্বৰ্গীয় বিনর তাহার প্রকৃতির একটা স্বাভাবিক গুণ ছিল। ভাগলপুরের প্রথমোক্ত বন্ধুটা লিপিয়াছেন—“রামতন্ত্র বাবু যখন উত্তরপাড়া স্কুলের হেড মাষ্টার তখন, অর্থাৎ ১৮৫৪ সালে, আমাকে সেখানে ভৰ্ত্তি করিষার প্রস্তাব ছ। আমার পিতা লাহিড়ী মহাশয়ের যৌবন-স্বহং কে এমৃ. বানাজিমহাশয়ের পত্র লইয়া লাহিড়ী মহাশয়ের নিকট যান। বাবা ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, যে কে, এম্‌, বানাজির পত্র লইয়। লাহিড়ী মহাশয় প্রথমে মস্তকের উপরে রাখিয়া বললেন, “আমার গুরুর পত্ৰ”। তিনি একজন সহাধ্যায়ীকে এত ভক্তি করিতে পারেন, তাহার বিনয়ের কথা কি বলিব।”

 যাহা হউক, বিনয়কুমারের শোক ক্রমে পুরাতন হইল। শরৎকুমারের বৈষ য়িক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পিতামাতার শুশ্রষার বন্দোবস্ত ভাল হইল।, চি গুরি ভারটা লঘু হওয়াতে সকলেরই মন অপেক্ষাকৃত প্রশান্তু হটতে লাগিল। ১৮৮৭ সালের প্রারম্ভে শরৎকুমারের বিবাহ হইল। জননী নব পুত্রবধুর মুখ দর্শন করিয়া সন্তান শোক কিয়ংপরিমাণে ভুলিতে লাগিলেন। যথা সময়ে, ১৮৮৯ সালে নব, বধু এক কন্যার মুখ, দর্শন করিলেন। কিন্তু হায়! জননী সে মুখ অধিকদিন সম্ভোগ করিতে, পারবেন না। তাহার দশ বার দিন পরেই বিষম জবুরোগে আক্রাস্ত হইয় তিনি ভবধাম পরিত্যাগ করিলেন।

 জীবনের এতদিনের মুখ, দুঃখের সঙ্গিনী, যখন চলয় গেলেন, তখন বুদ্ধ লাহিড়ী মহাশয় স্বয়ং প্রস্থানের জন্ত প্রস্তুত হইতে 'লাগিলেন। কিন্তু বিধাতা তাহার জন্ত আরও দুঃখ সঞ্চিত রাখিয়াছিলেন।

 যাইবার পূর্কে তাহাকে প্রিয় বন্ধু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিরোগ দুঃখ সন্থ করিতে হইল। বিদ্যাসাগর মহাশয় ১৮৫৮ সালে তদানীগুন শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টার গর্ডন ইয়ংএর সহিত বিবাদ করিয়া সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ পরিত্যাগ করেন। উক্ত পদ ত্ব্যাগ করার পর গ্রন্থ রচনা ও গ্রন্থ প্রকাশে মনে, নিবেশ করেন। ক্রমে মে তার গুনেকগুলি বাঙ্গাল ওসংস্কৃত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই সকল গ্রন্থের অল্প হইতে মাসে মাসে তিনি অনেক টাকা পাইডেন। যেমন আয় তেমনি ব্যয়-স্কুই হন্তে দান। 'নিজের জন্য তাঁহার যৎসামা দ্য ব্যয় ছিল। মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত সামান্ত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তানের ন্তায় বাস করিয়াছেন। সে জন্ত নিজের উপার্জিত অর্থের অধিক ব্যয় হইত না । गांशु' षषिा পুস্তকের সক ছিল। ভাল ভাল পুস্তক ক্রয় করা, উৎকৃষ্টরূপে বাধান ও সযত্নে রক্ষা করা, ইহা তাহার শেষ দশার একটা প্রধান কাজ হইয়াছিল !

 ১৮৬৬ সালে যখন মিস কাপেণ্টার এদেশে আগমন করেন। তখন র্তাহাকে বাঁইয়া বালি-উত্তরপাড়ার কোনও বালিকা বিদ্যালয় দেখাইতে যাইবার সময় বিদ্যাসাগর মহাশস্ব গাড়ী হইতে পড়িয়া গিয়া গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হন। তদবধি তাহার.পরিপাক শক্তি একেবারে নষ্ট হইয়া যায়। কিছুই ভাল করিয়া পরিপাক হইত না। তদবধি যে এত বৎসর বাচিয়াছিলেন, তাহ কেবল মনের জোরে রলিলে হয় ।

 সেই ভগ্ন স্বাস্থ্য ক্রমে ক্রমে ক্ষীণ হইয়। ১৮৯১ সালের ২৮শে জুলাই ফুরাইয়া গেল। ঐ সালের ঐ দিবসে তিনি এলোক হইতে অবস্থত হইলেন । বিদ্যাসাগর মহাশয় চলিয়া গেলে, লাহিড়ী মহাশয়ের হৃদয়ের আর এক গ্ৰন্থি ছিড়িয়া গেল । তিনি যেন এক প্রবল প্রেমবাহুর আলিঙ্গনের মধ্যে এতদিন ছিলেন, হঠাৎ সে বাহু কে সরাইয়া লইল । তিনি মুখে কিছু বলিলেন না; শোক প্রকাশ করিলেন না ; কিন্তু মৰ্ম্মস্থানে একটা শূন্তত রহিয়া গেল। তাহাত অনিবাৰ্য্য ! যৌবনের প্রারম্ভে যে বন্ধুতা জন্মিয়ছিল, তাহা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ছিল ; ইহা স্মরণ করিলেও মন পবিত্র হয়! বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অল্প বন্ধুতাই চিরস্থায়ী হইয়াছিল। র্তাহার তীব্র বিচারে পার পাইয়া চিরদিন তাহার প্রতি ও শ্রদ্ধাতে প্রতিষ্ঠিত থাক, অধিক লোকের পক্ষে সম্ভব হয় নাই। কিন্তু এই লাহিড়ী মহাশয়ের শিশু-সুলভ বিনয় ও বিশুদ্ধ সাধুতার পক্ষে তাহ সম্ভব হইয়াছিল।

 লাগরকুলে তীরদেশে জাহাজখানি একাধিক রজুর দ্বারা ৰন্ধ থাকে; ৰে দিন অকুলে ভাসিবার সময় আসে, সে মিন কিরৎক্ষণ পূৰ্ব্বে দেখা যায়, এক একটা করিয়া রঙ্গুর বন্ধন উন্মোচন করিতেছে। ঐ একটা রজ্জ খুলিয়া লইল, গোকে বগিল—”এইবার জাহাজ ছাড়বে”। কিৎক্ষণ পরে আবার একটা খুলিল; আবার ধ্বনি উঠিল “এই ছাড়ে রে ; কিৎক্ষণ পরে আবার একটা ধুলিল, তখন মাহুৰ উন্মুখ, এইবার অকুমে যাত্রা করিবার সময় আসিল। লাহিড়ী মহাশয়ের বের্ন সেই দশা ঘটিল! ৰে সকল রজ্জ দ্বারা তিনি আমা দের এই পৃথিবীর সহিত বাধা ছিলেন, বিধাতা একে একে সেগুলি খুলিয়া লইতে লাগিলেন ; আমরা উন্মুখ হইতে লগিলাম এইবার অনন্তধ্যমে যাত্র করিবার সময় আসিতেছে। অথবা বোধ হয় আমাদেরই ভুল ! তিনি কোনও রজ্জর দ্বারা আমাদের এ জগতের সহিত বাধা ছিলেন না। বাস্তবিকই তিনি পরপত্রের জলের ন্তায় আমাদের এ পৃথিবীতে বাস করিতেছিলেন ; তাহা ন হইলে কি এখানকার সুখ দুঃখের এতটা অতীত হইয়া এরূপে বাস করা যায় ?

 সে যাহা হউক, বিদ্যাসাগর মহাশয় চলিয়া যাওয়ার অল্পদিন পরেই আয় এক আঘাত আসিল ঐ ১৮৯১ সালের ৭ই অক্টোবর দিবসে তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, কৃষ্ণনগরের সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার কালীচরণ লাহিড়ী ভবধাম পরিত্যাগ করলেন। রামতনু বাবু আপনার সহোদর ভ্রাতাদিগকে কিরূপ ভালবাসিতেন ভাহা অগ্ৰেই বলিয়াছি। কনিষ্ঠের পীড়া হইলে তাহার মন অতিশয় উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল। দেখিয়া আমাদের মনে হইয়াছিল, এ শোক সম্বরণ কয় তাহার পক্ষে সহজ হইবে না ; কিন্তু ঈশ্বর যখন প্রিয়তম কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে লইলেন, তখনও সেই ঈশ্বরেছাতে আত্ম-সমর্পণের ভাব, সেই অপরাজিত ধৈৰ্য্য! কালীচরণ লাহিড়ী মহাশয় কিরূপ সৰ্ব্বজনের প্রিয় ছিলেন তাহা অগ্র কর্ণন করিয়াছি। সেই গুণধর সহোদরের বিরোগ-দুঃখ কিরূপ তীব্র হইবার সম্ভাবনা, তাহ, সকলেই অনুমান করিতে পারেন। কিন্তু লাহিড়ী মহাশয়ের অন্তরে, যাহাই থাকুক, এ শোকও তিনি জয় করিলেন। তাহার ধীর স্থির প্রশান্ত ও ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ ভাবের কিছুই ব্যত্যয় ঘটিল না। তিনি ধীরচিত্তে নিজের প্রস্থানের দিনের অপেক্ষায়, রছিলেন ।

 অবশেষে সৰ্ব্বাপেক্ষা দারুণ আঘাত আসিল। র্তাহার প্রাণের প্রিয় কালীচরণ ঘোষও তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেলেন। যে কালীচরণ যৌবনের প্রারম্ভ হইতে অহরক্ত পুত্রের ফায়, বিশ্বস্ত "আজ্ঞাবহ ভূত্যের ফায়, তাহার অমুসরণ করিয়া আসিতেছিলেন, সেই কালীচরণ যখন চলিয়া গেলেন তখন লাহিড়ী মহাশয় নিশ্চয় মনে মনে বলিয়া থাকিবেন—’হে বিধাতা, এ অধমকে আর কত দিন সংসারে রাখিবো?” আর বাস্তবিক লাহিড়ী মহাশয় সেই হইতেই যেন জরাজীর্ণ ও চশক্তি রহিত হইয়া পড়িলেন।

 দিন দিন পুত্র শরৎকুমারের অবস্থার উন্নতি হইতে লাগিল। ১৮৯৫ সালে তিনি স্বেপিার্জিত অর্থে কলিকাতার হারিসনরোডে একটী সুরম্য হৰ্ম্ম নির্মাণ করলেন। তাহাতে বৃদ্ধ পিতাকে স্থাপন করিলেন ; দাস দাদীর, দ্বারা পরিবৃত করিয়া দিলেন ; পরিচর্য্যার অবশিষ্ট রহিল না । জ্যেষ্ঠ কন্যা লীলাবতী এবং পুত্রদ্বয়, শরৎকুমার ও বসন্তকুমার, সৰ্ব্বাস্ত;করণে পিতার সেবা করিতে লাগিলেন। বর্মাতা ভাগতচিত্ত হইয়া বুদ্ধ শ্বশুরের সেবা করিতে লাগিলেন । কিন্তু হার! আমাদের মনে হইত লাহিড়ী মহাশয়ের প্রাণ যেন কিছুতেই বসিতেছে না ! পিঞ্জরাবন্ধ বিহঙ্গমের স্তায় উড়িয়া যেন কোন দেশে য:ইতে চাহিতেছে ! সৰ্বদা বাড়ীর বাহিরে যাইতে চাহিতেন ; যাহাদিগকে ভালবাসেন তাহাদিগকে দেখিতে চাঁহি তেন ; আমাদের কাহারও না কাহারও বাড়ীতে যাইতে চাইতেন ; মধ্যে মধ্যে প্রিয়শ্যি ক্ষেত্রমাহন বস্থর বাড়ীতে গিয়া গুই এক দিন যাপন করিতেন ; কিন্তু তাহার শরীরে বল ছিল না বলিয়া পরিবার পরিজন অনেক সময়ে যাইতে দিতেন না । 'ইহ' লইয়া অনেক দিন বিবাদ উপস্থিত হইত।

 বোধ হয় এমারসন একস্থানে বলিয়াছেন যে সচরাচর লোকে নিজের প্রতি অপর লোকের ব্যবহারের কি ক্রটা হইল তাহাই দেখে! ঐ অমুক আমাকে দেখিল না, অমুক আমাকে সাহায্য করিল না, অমুক আমার খবর লইল না, ইত্যাদি ইত্যাদি ; কিন্তু সাধুদের প্রকৃতি অন্ত প্রকার ; অপরের ব্যবহারের প্রতি তাছাদের দৃষ্টি তত নয়, যত নিজেদের ক্রটায় প্রতি। আমি অমুককে দেখিলাম না, ঐ অমুকের খবর লওর इहेण नां, ७ई সম, অমুককে সাহায্য করা উচিত ছিল, করা হইল না, ইত্যাদি। রামতনু লাহিড়ীতে আমরা,এই সময়ে তাহাঁই দেখিতাম। অনেক দিন গিয়াছে তাহাকে দেখা হয় নাই, অমৃতপ্ত অন্তরে যাইতেছি, ভাবিতেছি ধাহাকে প্রতিদিন দেখা উচিত তাহাকে এতদিন পরে দেখিতে যাইতেছি, মুখ দেখাইব কি করিয়া ; কিন্তু যেই উপস্থিত হইয়া প্রণাম কম্নিয়াছি, অমনি, আর এক ভাব —“ওহে দেখ, আমার কি অপরাধ হয়ে যাচ্চে মা লক্ষ্মীরা আমাকে এত ভালবাসেন, আমি যে একবার গিয়া তাহাদিগকে দেখে আসবে, তা হয় না।”তোমরা কাজে সৰ্ব্বদা वाड তোমরা কি সৰ্ব্বদা আসতে পার! আমারই গিয়ে দেখে মৃগাকৰ্ত্তব্য "মনে ভাবিলাম, হ৷ হরি। উলটাে বিচার! একেই বলে শিষ্টতা! একেই বলে সাধুতা !ঠিক ! ঠিক । যিনি পরের ভালটা ও নিজের মন্দটা দেখেন তিনিই সাধু।  লাহিড়ী মহাশয় যখন ভাঙ্গিয়া পড়িলেন, এবং চলৎশক্তি-রহিত হইলেন, তখনও তার হৃদয়-মন্দিরের পূজিত দেবতাগুলির প্রতি সজাগ প্রেম। এই সময়ে আমরা. দেখা করিতে গেলেই তিনি একটা বিবয়ে দুঃখ করিতেন, হেয়ায়ের স্মৃতি কেউ ভাল করিয়া রাখিল না। বলিতে গেলে তাহারই প্ররোচনাতে হেয়ার এনিভার্সারি কিছু কাল উঠিয়া ধাওয়ার পর আবার আরম্ভ হইল । তাহারই প্ররোচনাতে সিট কলেজের"তদানীন্তন হযোগ্য অধ্যক্ষ ভক্তিভাজন উমেশ চন্দ্র দত্ত মহাশয় কলেজের দিবীর মধ্যে হেয়ারের সমাধিমন্দিরের সন্নিকটে প্রতিবৎসর ১লা জুন দিবসে হেক্সারেয় স্মরণার্থ সভা আরম্ভ করিলেন। তখন আর কেহ যাক ন যাক বৃদ্ধ লাহিড়ী মহাশয়কে পালকী করিয়া লইয়া যাইতে হইত। আমরা গিয়া দেখি তিনি একখানি চেয়ার বা বেঞ্চে ভক্তি ভাবে বসিয়া আছেন । ধিনি বাল্যকালে মাতুলালয়ে প্রতিপালিত হইরাছিলেন বলিয়া উত্তরকালে, কৰ্ম্ম কাজ করিবার সময়, পালকী করিয়া মাতুলের দ্বায়ে উপস্থিত হইতেন না, কিয়দূরে পালক ত্যাগ করিয়া পদব্রজে মাতুল ভবনে যাইতেন, তাহার পক্ষে শিক্ষাদাতা গুরু হেয়ারের প্রতি এই কৃতজ্ঞতা স্বাভাবিক। যতদিন দেহে উঠিবার শক্তি ছিল, ততদিন তিনি হেরারের স্মরণার্থ সভায় যাইতে ছাড়িতেন না।

 মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তাহার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ভক্তি ছিল। মৃত্যুর কিছুদিন পূৰ্ব্বে র্তাহাকে একবার দেখিতে চাছিলেন। শুনিবা মাত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বাহক পৃষ্ঠে আসিয়া উপস্থিত। বৃদ্ধে বৃদ্ধে সমাগম, প্রাচীন ভাবে প্রাচীন আনন্দ জাগিয়া উঠিল। মহর্ষি বললেন—“স্বর্গে দেবগণ তোমার জন্ত অপেক্ষা করিতেছেন ; তোমাকে তাহারা সাদরে গ্রহণ করিবেন।”

 ইহার পর ১৮৯৮ সালের প্রারম্ভে একদিন তিনি কেমন করিয়া খাট इंद्देम्ङ পড়িয়া পা ভাঙ্গিরা ৫ফলিলেন । তখন একেবারে শষ্যাশায়ী হইতে হইল। ওদিকে জীবনের শক্তি দিন দিন ফুরাইরা আসিতে লাগিল, দিন দিন অবসন্ন হইয়া পড়িতে লাগিলেন ; স্মৃতির ব্যত্যয় ঘটিতে লাগিল ; আমরা তাহাকে হারাইবার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগুিলাম অবশেষে ঐ সালের ১৩ই আগষ্ট দিবসে তিনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া গেলেন।

 “রামত লাহিড়ী চলির গেলেন"-এই সংবাদ যখন সহরের লোকের কর্ণগোচর হইল, তখন সকল দলের বিশেষতঃ ব্রাহ্মসমাজের লোকে দ্রুতপদে শরৎকুমার লাহিড়ীর ভবনের অভিমুখে ছুটিল। দেখিতে দেখিতে হাসিন রোডে, শরৎকুমারের গৃহের সম্মুখে, জনতা ! আমরা উপরে গিয়া দেখি বৃদ্ধ লাহিড়ী মহাশয় চিরনিদ্রাতে অভিভূত্ব আছেন । যে মুখ কতবার ভক্তিঅশ্রতেসিক্ত বা ধৰ্ম্মোৎসাহে প্রদীপ্ত, বা পাপের প্রতি বিৰুগে আরক্তিম দেখিয়াছি, সেই মুখ সেই মুহূর্বে স্বপ্তমীন হ্রদের স্থায়, অথবা মাতৃক্রোড়ে নিদ্রিত শিশুর মুখের স্তা, নিরুপদ্রব শাস্তিতে পরিপূর্ণ। চাহিয়া চাহিয়া রহিলাম, মনে হইল সেই দেবশিপ্ত জগত-জননীর কোলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। হায়! এজীবনে কত মানুষ হারাইলাম, মানুষ আসে মানুষ যায়, সকল মানুষ ত মধুর স্বপ্নের স্মৃতির ন্যায় হৃদয়ে স্মৃতি রাখিয়া যায় না ! কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এ জীবনে কতকগুলি মানুষকে দেখিয়াছি যাহারা যাইবার সময় প্রাণে কিছু রাখিয়া গিয়াছেন,—যাহারা ভবধাম ত্যাগ করিলেই অন্তরাত্মা বলিয়াছে, "হা কি দেখিলাম, কি সঙ্গই পাইয়াছিলাম, এমন মানুষ আর কি দেখিব !” সে দিন দাড়াইয়া দাড়াইয়া কাদিলাম, আর ভাবিলাম এই সেই দলের একজন মাহুষ গেলেনু।

 যথা সময়ে আমরা বহুসংখ্যক ব্যক্তি লগ্নপদে র্তাহার মৃত-দেহ বহন করিয়া শ্মশানাভিমুখে যাত্রা করিলাম। সেদিন কি কেবল শরৎকুমার ও বসন্তকুমার পিতৃকৃত্য করিতে গেল ! তাহা নহে ; আমরা অনেকে পিতৃকৃত্য করিতে গেলাম। পথে আরও অনেক লোক যুটিল। জনতা দেখিয়া লোকে বলে—“কে যায় ? কে যায় ?”—উত্তর;—“রামতনু লাহিড়ী যান ?” 'अमनि শিক্ষিত ভদ্রলোকের মুখে একই বাণী—“যাঃ, দেশের একটা সাধুলোকু গেল।” রোমের পোপ অনেক খ্ৰীষ্টীয় নর নারীকে 'সাধু উপাধি দিয়াছেন-ইহাকে সাধারণ লোকে “সাধু" উপাধি দিয়াছিল। ক্রমে আমরা শ্মশানঘাটে প্লোছিয়। তাহার নশ্বর দেহ চিতানলে অৰ্পণ করিলাম ; অবিনশ্বর যাহা, তাহা অমৃতের ক্রোড়ে অগ্ৰেই আশ্রয় লইয়াছিল ।

 মুখ সময়ে শরৎকুমার ও বসন্তকুমার বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করির পিতার আদ্যশ্ৰাদ্ধ সম্পন্ন করিলেন। ,ৰে মঙ্গলময়, পুরুষের প্রতি লাহিড়ী মহাশয় জীবদ্দশায় অবিচলিত আস্থা রাখিয়াছিলেন, তাহারই অর্জনাপূর্বক শ্ৰাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন হইল। সভাস্থলে রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়, ঢাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, মিঃ কে, জি, গুপ্ত প্রভৃতি পরলোকগড় সাধুর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। শ্রাদ্ধস্থলে একম বন্ধ আমাকে কাণে কাণে একটী চমৎকার কথা বলিলেন । তাৰু এই--"ওরূপ চরিত্রের আলোচনা করিবার সময় ইহা দেখিাতে হইৰে অপৰে তাঁহাদিগকে কি ভাবে দেখিয়াছে, তাঁহাদের কোন কোন বিষয় স্মৃতিতে রাখিয়াছে। ইহার অধিক কিছু না করিলেও ষে স্মৃতি রাখিয়া যান তাহাই জগতের পক্ষে অমূল্য সম্পদ।" ঠিক কথা! ঠিক কথা! মহাজনের সহিত সামান্য মানবের তুলনাতে যদি অপরাধ না হয়, তাহা হইলে বলি, কোটি কোটি নরনারীর পূজিত বুদ্ধ বা বীণ্ড জগতে কি কাজ করিয়াছিলেন? তাঁহাদের কাজের কথা বলিতে গেলে দুই কথাতেই শেষ হয়। কিন্তু সেখানে তাঁহাদের মহত্ব নহে; লোকে তাঁহাদের সঙ্গে মিশিয়া, তাঁহাদেৱ কাছে বসিয়া, যাহা দেখিয়াছিল ও যাহা মনে রাখিয়াছিল, তাহাতেই তাঁহাদেৱ মহত্ত্ব। লাহিড়ী মহাশয়ের স্মৃতি তেমনি শত শত হৃদয়ে রহিয়াছে। এইমাত্র প্রার্থনা সেই স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে বাস করুক ও আমাদের চক্ষের আলোক হউক।




সম্পূর্ণ।