রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

Page131-1024px-রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ cropped.jpg

প্রাচীন ও নবীনের সংঘর্ষণ ও ঘোর সামাজিক
বিপ্লবের সূচনা।

 অতঃপর আমরা বঙ্গদেশের সামাজিক ইতিবৃত্তের সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হইতেছি। ১৮২৫ হইতে ১৮৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত বিংশতিবর্ষকে বঙ্গের নবযুগের জন্মকাল বলিয়া গণনা করা যাইতে পারে। এই কালের মধ্যে কি রাজনীতি, কি সমাজনীতি, কি শিক্ষাবিভাগ, সকলদিকেই নবযুগের প্রবর্তন হইয়াছিল। তাহার ক্রম কিঞ্চিং নির্দ্দেশ করা আবশ্যক বোধ হইতেছে।
 ইংরাজগণ এদেশে বাণিজ্য করিতে আসিয়া কিরূপে রাজা হইয়া বসিলেন, সে ইতিবৃত্ত আর বর্ণনা করিবার প্রয়োজন নাই। তাহা ইতিহাস-পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন। কিন্তু বণিকদিগের মনে রাজভাব প্রবেশ করা, ইহা দুই দশ দিনে ঘটে নাই। যতদিন তাঁহারা বণিক ছিলেন, ততদিন ভাবিতেন এদেশের লোকের সুখ দুঃখের সঙ্গে, উন্নতি অবনতির সঙ্গে, আমাদের সম্বন্ধ কি? আমরা বৈধ অবৈধ যেরূপ উপায়েই হউক এখান হইতে অর্থোপার্জ্জন করিয়া লইয়া দেশে যাইব এইমাত্র আমাদের কাজ। এইভাব কোম্পানির কর্তৃপক্ষের মনে এবং ব্যক্তিগতভাবে কোম্পানির সমুদয় কৰ্মচারীর মনে বহুদিন প্রবল ছিল। প্রথম। প্রথম কোম্পানির কর্মচারিগণ এরূপ স্বল্প বেতন পাইতেন যে, সেরূপ স্বল্প বেতনে ভদ্রলোক এত দূরদেশে আসে না। কিন্তু অবৈধ অর্থোপার্জনের উপায় এত অধিক ছিল যে, তাহার প্রলোভনে লোকে এদেশে আসিতে ব্যগ্ৰ হইত। এই সকল কর্মচারীর অধিকাংশকে ফ্যাক্টর বা কুঠীওয়াল বলিত। কুঠওয়ালগণ কোম্পানির কুঠী সকলের পরিদর্শন করিতেন, বাণিজ্য দ্রব্যের ক্রয় বিক্রয়ের তত্ত্বাবধান করিতেন, হিসাব পত্র রাথিতেন এবং বিবিধ প্রকারে কোম্পানির সওদাগরী কার্য্যের সহায়তা করিতেন।

 ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে কোম্পানি যখন দেওয়ানী সনন প্রাপ্ত হইলেন, তখন রাজস্ব আদায়ের ভার কোম্পানির কর্মচারীদিগকে লইতে। হইল। ফৌজদারী। কার্য্যের ভার মুরশিদাবাদের মুসলমান গবৰ্ণমেণ্টের হস্তেই থাকিল। যখন রাজস্ব আদায়ের ভার কোম্পানির হস্তে আসিল, তখন কোম্পানির কুঠীওয়াল গণই কালেক্টর হইল্প দাড়াইলেন। তাহায়া জেলায় জেলায় থাকিয়া কোম্পানির এজেন্টের দায় সওদাগরীর তত্ত্বাবধান করিতেন, সেই সঙ্গে কালেক্টরেয় কাজ ও করিতেন। বণিকের ভাব তখনও তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিল ন৷। যেরূপে হউক অর্থ সংগ্রহ। করিতে হইবে, এই ভাবটা তাঁহাদের মনে প্রবল। থাকিল। ” আমরা দেশের রাজা, প্রজাদিগের সুখ দুঃখের জন্য অমরা দায়ী, এভাব তাঁহাদের মনে প্রবেশ করিল না। প্রমাণ স্বরূপ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের। উল্লেখ করা যাইতে পাবে॥ অগ্রেই বলিয়াছি নবপ্রতিষ্ঠিত রাজগণ তখন প্রজাকুসের দুর্ভিক্ষ-ক্লেশ নিবারণের জষ্ঠ্য কিছুই করেন নাই। কেবল তাহা নছে; ইহা স্মরণ করিতেও ক্লেশ হর যে দুর্ভিক্ষের বৎসরে সমগ্ৰ বঙ্গদেশের প্ৰজ-সংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ কালগ্ৰাসে পতিত হইয়াছিল, তথাপি রাজস্বের এক 'কপর্দক ও ছাড়া হয় নাই। সে বৎসরে যাহ! আদায় হইতে পারে নাই পর বৎসরে সে সমগ্র আদায় করিয় লওয়া হইয়াছিল। তদানীন্তন গবর ওয়ারেণ হেষ্টিংস বাহাদুর ১৭৭২ সানের ৩ রা নবেম্বর দিবসে ইংলণ্ডের কর্তৃ পক্ষকে যে। পত্র লেখেন তাহাতে রাজস্ব আদামের নিম্নলিখিত তালিকা। প্রাপ্ত হওয়া যায়। ১৭৬৮-৬৯ সালে ১৫২৫৪৮৫৬ টাকা; ১৭৬৯-১৭৭০ সালে। ১৩১৪৯১৪৮ টাকা; ১৭৭০-৭১ সালে অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের বৎসংর ১৪•৭৬০৩• টাকা; এবং ১৭৭১-৭২ সালে অর্থাৎ চর্ভিক্ষের পর বৎসরে,। ১৫৭২৬৫৭৬ টাকা। তবেই দেথা যাইতেছে তন রাজগণ দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট প্রজাবৃন্দের রক্ত শোধণ করিতে ছাড়েন নাই। কেহ, প্ৰশ্ন করিতে পারেন, ছর্ভিক্ষের বৎসরে প্রজা৷ সংখ্যার এক। তৃতীয়াংশ যদি কালগ্ৰাসে পতিত হইল, তবে পর বৎসরে। এত রাজস্ব আদায় হইল কিপে? ইহার উত্তরে হেষ্টিংস বাহারে তাহার পত্রে যাহা বলিয়াছেন তাহ নিম্নে উদ্ধ ত করিতেছি।

 “It was naturally to be expected that the diminution of the revenue। should have kept an equal pace with the other consequences of so great a calamity. that it did not was owing to its being violently kept up to its former standard . to ascertain all the neans by which this was effected will not be easy. ক * * * One taxhowever, we will endeavour to deseribcns it inny serve to account for the equality which has been preserved in the past collections, and to which it has principally contributcod. It is called Najagy, and it is an assessment upon the actual inhabiteunts of every inferior description of lands to Imake up for the loss sustained in the rents of thoir neighbors, who are either dend or fied froIn the country.”

 অর্থাৎ দুর্ভিক্ষে এক তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হইল্লা রাজস্বের যে ক্ষতি হইয়াছিল, তাহ৷ অবশিষ্ট দুই তৃতীয়াংশের নিকট হইতে শুদে আসলে বলপূর্বক আদায় করা হইয়াছিল। এই ব্যবহারের স্বপক্ষে হেস্টিংস বাহাদর এইমাত্র বলিয়াছেন যে এরূপ নিয়ম সে সময়ে দেশে প্রচলিত ছিল, এবং গবর্ণ মেন্ট সাক্ষাৎভাবে এ প্রকারে রাজথ আদায় করিতে আাদেশ করেন নাই। কিন্তু ইহাতে সংশয় নাই, তাহারা অধীনস্থ কর্মচারিদিগকে রাজস্বের এক কপর্দক ও ছাড়িতে নিষেধ করিয়াছিলেন; এবং এইরূপ গহিত উপায়ে রাজস্ব আদায় হইতেছে জানিয়া ও উপেক্ষা করিয়াছিথেন। আমার মূল বক্তব্য এই যে ইংরাজগণ দেশের রাজারাপে প্রতিষ্ঠিত হুইয়াও বহুদিন রাজার দারিত্ব অনুভব করিতে পারেন নাই। রাঙ্গার দাম্ভিৱ বুঝিলে প্রজার প্রতি এরূপ ব্যবহার সম্ভব নয়। গ্রামের একজন। সাম্য জমিদার যাহা করিয়া থাকেন, তাহাও ভূাহার করেন নাই। দেশীয় রাজগণ সর্বদাই ছুর্ভিক্ষ মহামারী প্রভৃতি বিপদের সময় রাজস্ব রেহাই দিয়া থাকেন এবং এখনও দিতেছেন॥ আমাদের বাস-গ্রামে জনশ্রুতি আছে, একবার ছর্ভিক্ষের সময় গ্রামের জমিদারগণ পৰ্ব্বত সমান অল্পের স্তুপ, ও শালতী ভরিয়া ডাল রাধিয়া শত শত দুর্ভিক্ষগ্রস্ত প্রজাকে বহুদিন। আহার করাইয়া বীচাইয়াছিলেন।

 এইরূপে বণিকগণের রাজা হইয়া বসিতে ও রাজার কৰ্ত্তব্য সকল। হৃদয়ে ধারণ করিতে অনেক দিন গেল॥ অপর দিকে প্রজাদিগেরও নূতন রাজাদিগের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করিতে বহুদিন লাগিল। প্রথম প্রথম এদেশের লোক বুঝিতে পারে নাই, ইংরাজেরা এদেশে স্থায়ী হইয়া বসিতে পারিবেন কি না? পলাশীর যুদ্ধে হ্রাহারা দেশ জয় করিলেন বটে, কিন্তু চারিদিকে অস্তবিদ্রোহ চলিল। একদিকে মুসলমান নবাবদিগের সহিত বিবাধ, অপরদিকে পশ্চিমে ও দাক্ষিণাতো মহারাষ্ট্রীদিগের ও পূর্বে মগ দিগের সহিত বিরোধ চলিতে লাগিল। দেশের মধোও বিষ্ণুপুর, বীরভূম প্রভৃতি স্থানে দলে দলে বিদ্রোহী দেখা দিতে লাগিল। ১৮২৫ সালের মধ্যে এই সকল উপদ্রবের অধিকাংশ প্রশমিত হইল। বিগত শতাব্দীর প্রারম্ভ হইতেই এদেশীয়ুগণ অফুভব করিতে লাগিলেন যে ইংরাজরাজ্য স্থায়ী হইল, এবং তাহাদিগকে এই নবরাজ্যের ও নূতন রাজাদিগের প্রয়োজনানুসারে গঠিত হইতে হইবে। ইংরাজ-রাজপুরুষগণও হৃদয়ঙ্গম করিতে লাগিলেন যে ভারতসাম্রাজ্য বহুবিস্তীর্থহইতে যাইতেছে; এবং সেই সাজ্যের দায়িত্বভার তাহাদের মস্তকে।

 রাজা ও প্রজা উভয়ের মনে এই পরিবর্তন ঘটিয়া উভয় শ্রেণীর মনে একই প্রশ্নের উদয় হইল। রাজারা ভাবিতে লাগিলেন, কি প্রকারে এদেশ শাসন করি, প্রাচীন বা নবীন রীতি অনুসারে? প্রজগণও চিন্তা করিতে লাগিলেন, কাহাকে এখন আলিঙ্গন করি;-প্রাচীনকে বা নবীনকে? ১৮২৫ হইতে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত বিংশতি বর্ষের মধ্যে উক্ত উভয় প্রশ্নের বিচার ও মীমাংসা হইয়াছিল বলিয়া ঐ কালকে বঙ্গদেশের সামাজিক ইতিবৃত্তের সন্ধিক্ষণ বলিয়া বৰ্ণন কমিয়াছি। যেরূপে মীমাংসা হইয়াছিল তাহ৷ পরে নির্দেশ করিতছি।

 নূতন রাজারা যতদিন এদেশ ও এদেশবাসীদিগকে বুঝিয়া লইতে পারেন নাই, ততদিন কোনও বিভাগেই লঘুভাবে প্রাচীনকে বিপৰ্য্যন্ত করেন নাই। সর্ববিভাগেই ভয়ে ভয়ে প্রাচীনের প্রতি হস্তাপণ করিয়াছেন। রাজনীতি বিভাগে সর্বাগ্রে দেশীয় কর্মচারীদিগের দ্বারা, দেশীয় রীতিতেই, সকল কার্য্য করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। প্রথম প্রথম এক একজন এদেশীয় নায়েব-দেওরান নিযুক্ত করিয়া তাহদের হস্তে রাজস্ব আদায়ের ভার দিয়াছেন। কিন্তু বহুকাথের পরাধীনতাজাত দায়িত্ব-হীনতা দ্বারা জাতীয় চরিত্রের এমনি দুৰ্গতি হইয়াছিল যে, অনেক স্থলে এই নায়েব দেওয়ানগণ মনে করিতেন বিদেশীয়ের ত বেশ লুটিয়া লইয়া যাইবে, আমরা লাভ লোকসানের ভাগী নই, সুতরাং আমরা যাহা কিছু সংগ্ৰহ করিতে পারি করিয়া লই; এইরূপে তাহদের উৎপীড়ন ও উৎকোচাদিতে লোকে এত জালাতন হইয়া উঠিল যে অবশেষে সে সকল পদ তুলিয়া দিতে হইল। ক্লাইবের নায়েব-দেওয়ান গোবিন্দ রামের ও হেষ্টিংসের দেওয়ান গঙ্গাগোবিন্দ। সিংহের কথা অনেকেই অবগত আছেন। এইরূপে কিছুদিন গেল; শেষে, লড় কর্ণওয়ালিস বাহাদুর এদেশীয়দিগকে উচ্চ উচ্চ পদ হইতে অপসারিত করিয়া সেই সকল পদে ইউরোপীয়দিগকে স্থাপন করিলেন। তখন হইতে এদেশীয়গণ সৰ্ব্ববিধ উচ্চপদ হইতে চুত হইয়া হীন-দশায় পতিত হইলেন। তৎপরে ১৮৩৩ সাল পর্য্যন্ত এদেশীয়দিগের শেরেস্তাদারের উপরের পদে উঠিবার অধিকার থাকিল না। এই কালকে এদেশীয়দিগের প্রকৃত পতনের কাল বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। কারণ এই সময় হইতেই এদেশীয়গণ সৰ্ব্বব্য সম্মানের পদ হইতে অধ:কৃত হইয়া উন্নতির সম্ভাবন ও তজ্জনিত উচ্চাকাঙ্ক্ষ হইতে বিদূরিত হইয়া, ক্ষুদ্র লক্ষ্য ও ক্ষুদ্রাশয়তার মধ্যে নিমগ্ন হইলেন। এই ক্ষুদ্র লক্ষ্য ও ক্ষুদ্রশয়তার গৰ্ত্তে এদেশীয়গণ এখনও পড়িয়: রহিয়াছেন। এই লক্ষ্য, চিন্ত ও আকাঙ্ক্ষার ক্ষুদ্রতাকে পরাধীনতার সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ শোচনীয় ফল বলিয়া গণনা করা যাইতে পারে। কারণ কোনও জাতি কিছুকাল এই অবস্থাতে বাস করিলে তাহদের জাতীয় জীবন হইতে মনুষ্যত্ব ও মহত্ব লাভের স্পৃহ বিলুপ্ত হইয়া যার।

 আইন আদালত সম্বন্ধে ও রাজারা ভয়ে ভয়ে বহুকাল যথাসাধ্য প্রাচীন রীতি রক্ষা করিয়া চলিয়াছিলেন। ইহা অগ্রেই উক্ত হইয়াছে যে ১৮০০ খ্ৰীষ্টাৰে লর্ড ওয়েলেসলি বিলাত হইতে নবাগত সিবিলিয়ানদিগকে এদেশীয় ভাষা ও এদেশীয় আইন প্রভৃতি শিক্ষা দিবার জন্য ফোর্ট উইলিয়ম কালজ স্থাপন করিয়াছিলেন। তদ্ভিন্ন বহু বৎসর জেলার জজদিগের সঙ্গে এক একজন হিন্দু পণ্ডিত-ও মুসলমান মৌলবী য়াখার নিয়ম হয় তাহার এদেশীয় আইনের ব্যাখ্যা করিয়া জজের সাহায্য করিতেন।

 শিক্ষা বিস্তার বিষয়েও উহার যে বহুবৎসর প্রাচীনের পক্ষপাতী ছিলেন তাহাও পূৰ্ব্বে নির্দেশ করিয়াছি। এমন কি এদেশীয়দিগকে চিকিৎসাশাস্ত্র শিখাইবার জন্ত কিছুদিন সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে চরক সুশ্রুতের ক্লাস ও মাদ্রা সার সঙ্গে আবিসেয়ার ক্লাস রাখা হইয়াছিল। ইহার বিবরণ পরে বিস্তৃতরূপে দেওয়া যাইবে।

 অতএব ইহা নিশ্চিত যে ইংরাজগণ লঘুভাবে প্রাচীনের প্রতি হস্তার্পণ করেন নাই; কতক ভয়ে, কতক লোকরঞ্জনার্থে, কতক প্রকৃষ্ট রাজনীতি বোধে, র্তাহারা প্রারম্ভে সৰ্ব্ববিষয়ে প্রাচীনকে রক্ষা করিয়াই চলিতেন। এই সন্ধিক্ষণের মধ্যে মহা তর্ক-বিতর্কের পর প্রাচীনকে বিপৰ্য্যস্ত করিয়া নবীনের প্রতিষ্ঠা করা হইল। ইংরাজ পক্ষে মেকলে ও বেণ্টিঙ্ক এই নবযুগের সারথি হইয়াছিলেন।

 এই আন্দোলন এদেশীয়দিগের মনেও উঠিয়াছিল। তাহারাও এই সন্ধিক্ষণুে বিচার করিতে লাগিলেন, প্রাচীন ও নবীন ইঙ্গার মধ্যে কাহাকে বরণ করিবেন? তাহাদের মধ্যে শিক্ষিত ও অগ্রসর ব্যক্তিরা স্থির করিলেন যে প্রাচীনকে বর্জন করিয়া নবীনকেই বরণ করিতে হইবে। দেশীয় পক্ষে রামমোহন রায়, ডেবিড হেয়ার ও ডিরোজিও এই পুরুষত্রয় সারথ্য কার্য্যের ভার লইয়াছিলেন।

 রামমোহন রায় ১৮২৩ সালে লর্ড আমহাষ্টকে যে পত্র লেখেন তাহাকেই এই নবযুগের প্রথম সপ্তরিক শঙ্খধ্বনি মনে করা যাইতে পারে। তিনি যেন স্বদেশবাসীদিগের মুখ পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমদিকে ফিরাইয়া দিলেন। তবে ইহা স্মরণীয় যে তাহাতে যাহা ছিল অপর কোনও নেতাতে তাহ হয় নাই। তিনি নবীনের অভ্যর্থনা করিতে গিয়া প্রাচীন হইতে পা তুলিয়া লন নাই। হিন্দুজাতির কোথায় মহত্ব তিনি তাই পরিষ্কাররূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন, এবং তাহা সযত্নে বক্ষে ধারণ করিয়াছিলেন, অথচ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, পাশ্চাত্যনীতি ও পাশ্চাত্য জনহিতৈষণাকে অনুকরণীয় মনে করিয়াছিলেন। কিন্তু সামাজিক সকল প্রকার বিপ্লবেরই একটা ঘাত প্রতিঘাত আছে। প্রাচীন পক্ষাবলম্বিগণ এক দিকে অতিরিক্ত মাত্রাতে যাওয়াতে এই সন্ধিক্ষণে নবীন পক্ষপাতিগণ ও অপরদিকে অতিরিক্ত মাত্রাতে গিয়াছিলেন। যাহা কিছু প্রাচীন সকলি মন্দ, এবং যাহা কিছু নবীন সকলি ভাল, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইরাছিলেন। ইহার ফল কিরূপ দাড়াইয়াছিল পরেনির্দেশ করিতেছি।

 এই নবীনে অতিরিক্ত আসক্তির আরও একটু কারণ ছিল। ফরাসি বিপ্লবের আন্দোলনের তরঙ্গসকল ভারতক্ষেত্রেও আসিয়া পৌঁছিয়াছিল। ১৮২৮ সালে যাহারা শিক্ষাকাৰ্য্যে নিযুক্ত ছিলেন ও যে যে কবি ও গ্রন্থকারের গ্রন্থাবলী অধীত হইত, সেই সকল শিক্ষকের মন ও উক্ত গ্রন্থাবলী ফরাসিবিপ্লবজনিত স্বাধীনতা-প্রবৃত্তিতে সিক্ত ছিল বলিলে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গীয় যুবকগণ যখন ঐ সকল শিক্ষকের চরণে বসিয়া শিক্ষা লাভ করিতে লাগিলেন, এবং ঐ সকল গ্রন্থাবলী পাঠ করিতে লাগিলেন তখন তাঁহাদের মনে এক নব আকাঙ্ক্ষা জাগিতে লাগিল। সৰ্ব্বপ্রকার কুসংস্কার, উপধৰ্ম্ম ও প্রাচীন প্রথা ভগ্ন করিবার প্রবৃত্তি তাঁহাদের মনে প্রবল হইয়া উঠিল। ভাঙ্গ, ভাঙ্গ, ভাঙ্গ, এই তাঁহাদের মনের ভাব দাঁড়াইল। ইহাও অতিরিক্ত পাশ্চাত্য পক্ষপাতিত্বের অন্যতম কারণ। ফরাসি-বিপ্লবের এই আবেগ বহুবৎসর ধরিয়া বঙ্গসমাজে কাৰ্য্য করিয়াছে; তাহার প্রভাব এই সুদূর পর্যন্ত লক্ষ্য করা গিয়াছে।
 যে ১৮২৮ সালের মার্চ্চমাসে ডিরোজিও হিন্দুকালেজের শিক্ষক হইয়া আসিলেন, সেই মার্চমাসেই তদানীন্তন গবর্ণর জেনেরাল লর্ড আমহার্ষ্ট এদেশ পরিত্যাগ করিলেন। তখন তাঁহার পদাভিষিক্ত লর্ড উইলিয়ম বেণ্টিঙ্ক সমুদ্রপথে আসিতেছেন। পরবর্ত্তী জুলাই মাসে লর্ড উইলিয়ম বেণ্টিঙ্ক এদেশে পৌঁছিলেন। বঙ্গে মণিকাঞ্চনের যোগ হইল। একদিকে রামমোহন রায়ের প্রবর্ত্তিত ধৰ্ম্ম ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন, এবং নবপ্রবৰ্ত্তিত ইংরাজী শিক্ষার উন্মাদিনী শক্তি, অপরদিকে বেণ্টিঙ্ক বাহাদুরের শুভাগমন,—বিধাতা যেন সময়োপযোগী আয়োজন করিলেন।
 এই নবযুগের প্রবর্ত্তনের সময় সৰ্ব্বোচ্চ পদাধিষ্ঠিত রাজপুরুষের যে দুইটী সদগুণের বিশেষ প্রয়োজন ছিল, লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্কে সেই গুণদ্বয় পূর্ণমাত্রাতে বিদ্যমান ছিল। তাঁহাতে কৰ্ত্তব্য-নির্দ্ধারণের পূৰ্ব্বে ধীরচিত্ততা, বিচারশীলতা, সকল দিক দেখিয়া কাজ করিবার প্রবৃত্তি, যেমন দেখা গিয়াছিল, কৰ্ত্তব্য পথ একবার নির্দ্ধারিত হইলে তদবলম্বনে দৃঢ়চিত্ততা তেমনি দৃষ্ট হইয়াছিল। সহমরণ নিবারণ, ঠগীদমন, ইংরাজী শিক্ষা প্রচলন, মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রভৃতি সমুদয় কার্য্যে তাঁহার গুণের সম্যক্ পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছিল। তিনি এদেশের সর্ব্ববিধ উন্নতির সহায় হইবেন এই সংকল্প করিয়া রাজকাৰ্য্যের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন, এবং যে সপ্ত বৎসর গৱর্ণর জেনেরালের পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সেই ব্ৰত পালন করিয়াছিলেন। এজন্য তিনি তাঁহার স্বদেশীয়দিগের অপ্রিয় হইরাছিলেন।
 লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ক এদেশে পদার্পণ করিলে রামমোহন রায়ের কার্য্যোৎসাহ বাড়িয়া গেল। তাঁহার বন্ধু উইলিয়াম এডাম ত্রীশ্বর বাদ পরিত্যাগ করিয়া একেশ্বর-বাদী হওয়ার পর তাঁহাকে শ্রীরামপুরের বাপ্তিষ্টমিশনারিগণের সংশ্ৰব পরিত্যাগ করিতে হয়। তদবধি শ্রীরামপুরের মিশনারিগণ রামমোহন রায়ের প্রতি জাতক্রোধ হন; এবং বৈরভাবে তাঁহাকে আক্রমণ করিতে আরম্ভ করেন। এই উপলক্ষে খ্ৰীষ্টীয়দিগের সহিত রামমোহন রায়ের ঘোরতর বাগযুদ্ধ উপস্থিত হয়। রামমোহন রায় উপর্য্যুপরি Precepts of Jesus, Appeals to the Christian public, Brahmanical Magazine প্রভৃতি মুদ্রিত ও প্রচারিত করেন। অগ্ৰে হিন্দুগণ তাঁহার বিরোধী ছিলেন, এক্ষণে খ্ৰীষ্টীয়গণও বিরোধী হইলেন। রামমোহন রায় কিছুতেই স্বীয় অভীষ্টপথ পরিত্যাগ করিবার লোক ছিলেন না। মিশনারিগণ আপনাদের প্রেসে তাঁহার লিখিত ইংরাজী গ্রন্থ মুদ্রিত করিতে অস্বীকৃত হইলে, তিনি ধৰ্ম্মতলাতে “ইউনিটেরিয়ান প্রেস” নামে একটা প্রেস স্থাপন করিলেন; হরকরা নামক তদানীন্তন ইংরাজী সংবাদ পত্রের আফীস গৃহের উপরতালায় তাঁহার বন্ধু এডামের জন্য সাপ্তাহিক উপাসনার ব্যবস্থা করিলেন; আচার্য্যরূপে এডামের ভরণ পোষণার্থ অর্থ সংগ্ৰহ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন; এবং স্বীয় সস্তানগণ ও বন্ধুগণ সহ তাঁহার উপাসনালয়ে গতায়াত করিতে লাগিলেন এরূপ জনশ্রুতি আছে, যে বন্ধুবর এডামের জন্য রামমোহন রায় দশ হাজার টাকা দিয়াছিলেন। ইহা তিনি নিজে দিয়াছিলেন কি চাঁদা তুলিয়া দিয়াছিলেন বলিতে পারি না। বোধ হয় ইহার অধিকাংশ তাঁহার প্রদত্ত ও অপরাংশ বন্ধুদিগের মধ্য হইতে সংগ্ৰহ করিয়া থাকিবেন।
 লর্ড আমহার্ষ্ট বাহাদুরের রাজত্বের প্রারম্ভেই সহমরণ নিবারণের জন্য যে আন্দোলন উঠিয়াছিল, তাহা এই ১৮২৮ সালেও সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত হয় নাই। সে বিষয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদিগের মত জানা, ইংলণ্ডর প্রভুদিগের সহিত চিঠী পত্র লেখা, নানা স্থান হইতে সহমরণ প্রথা সম্বন্ধীয় সংবাদ সংগ্রহ করা হইতেছিল। তৎকালের নিজামত আদালতের কোর্টনি স্মিথ, (Courtney Smith) আলেকজণ্ডার রস (Alexander Ross) আর, এইচ্, রাট্রে (R. H. Rattray) প্রভৃতি বিশিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ঐ প্রথা নিবারণের জন্য পরামর্শ দিয়াছিলেন। কোন কোনও উচ্চপদস্থ কৰ্ম্মচারী সতর্কতায় পক্ষাবলম্বন করিয়া বলিয়াছিলেন যে প্রথমে নন-রেগুলেশন প্রদেশে চেষ্টা করিয়া দেখা উচিত, প্রজারা সহ্য করে কি না। এই সকল সংবাদ ও মত সংগ্ৰহ করিতে ১৮২৭ সাল অতীত হইয়া গেল। ১৮২৮ সালের প্রারম্ভে লর্ড আমহার্ষ্ট লিখিলেন — I think there is reason to believe and expect that, except on the occurrence of some very general sickness, such as that which prevailed in the lower parts of Bengal in 1825, the progress of general instruction and the unostentations exertions of our local officers will produce the happy effect of a gradual diminution, and at no very distant period, the final extinction of the barbarous rite of suttee."—অর্থাং এরূপ আশা করা যায় যে শিক্ষা বিস্তারের গুণে ও গবর্ণমেণ্টের কৰ্ম্মচারীদিগের চেষ্টায় অচিরকালের মধ্যে এই নৃশংস প্রথা তিরোহিত হইবে। বলা বাহুল্য গবর্ণর জেনেরালের এইরূপ মীমাংসা রামমোহন রায় প্রভৃতি সমাজ সংস্কারকগণের বিরক্তি উৎপাদন করিয়াছিল। তাঁহারা এ বিষয়ে আন্দোলন করিতে প্রবৃত্ত রহিলেন। এখন তাঁহাদের প্রধান কাৰ্য্য এই হইল যে, কোনও স্থানে কোন ও রমণী সহমৃতা হইতেছেন এই সংবাদ পাইলেই কতিপয় বৎসর পূৰ্ব্বে এই প্রথাকে দমনে রাখিবার জন্য যে সকল নিয়ম প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল, তাহা প্রতিপালিত হইল কি না তাঁহারা দেখিবার চেষ্টা করিতেন, সে কারণে তাঁহারা দলে দলে সহমরণের স্থলে উপস্থিত থাকিতেন। এই চেষ্টা এ প্রথা দমনের পক্ষে অনেক সহায়তা করিতে লাগিল।
 এই বৎসরের (১৮২৮ সাল) ৬ই ভাদ্র দিবসে রামমোহন রায় কলিকাতার চিৎপুর রোডে ফিরিঙ্গী কমল বসু নামক এক ভদ্রলোকের বাহিরের বৈঠকখানা ভাড়া লইয়া সেখানে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করিলেন। একদিন রবিবার রামমোহন রায় বন্ধুবর এডামের উপাসনা হইতে গৃহে প্রতিনিবৃত্ত হইতেছিলেন। তখন তারাচাঁদ চক্ৰবৰ্ত্তী ও চন্দ্রশেখর দেব তাঁহার গাড়িতে ছিলেন। পথিমধ্যে চন্দ্রশেখর দেব বলিলেন,—‘দেওয়ানজী বিদেশীয়ের উপাসনাতে আমরা গতায়াত করি, আমাদের নিজের একটা উপাসনার ব্যবস্থা করিলে হয় না? এই কথা রামমোহন রায়ের মনে লাগিল। তিনি- কালীনাথ মুসী, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মথুরানাথ মল্লিক প্রভৃতি আত্মীয়-সভায় বন্ধুগণকে আহবান করিয়া এই প্রস্তাব উপস্থিত করিলেন। সকলের সম্মতিক্রমে সাপ্তাহিক ব্রহ্মোপাসনার্থ একটী বাড়ী ভাড়া করা স্থির হইল। তদনুসারে উক্ত ফিরিঙ্গী কমল বসুর বাড়ী ভাড়া করিয়া তথায় সমাজের কার্য্য আরম্ভ হইল। প্রতি শনিবার সন্ধ্যাকালে ব্রহ্মোপাসনা হইত। কার্যপ্রণালী এইরূপ ছিল, প্রথমে দুইজন তেলুগু ব্ৰাহ্মণ বেদপাঠ করিতেন। তৎপরে উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশ উপনিষৎ পাঠ করিতেন। পরে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ উপদেশ প্রদান করিলে সংগীতানন্তর সভা ভঙ্গ হইত। তারাচাঁদ চক্ৰবৰ্ত্তী এই প্রথম সমাজের সম্পাদক ছিলেন।
 ব্ৰহ্মসভা স্থাপিত হইলে কলিকাতার হিন্দুসমাজ মধ্যে আন্দোলন উঠিল। তাঁহাদের অনেকে রামমোহন রায়ের সভার কার্য্যপ্রণালী পরিদর্শনের জন্য সভাতে উপস্থিত হইতে লাগিলেন। রামমোহন রায় যে কেবল ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিলেন তাহা নহে, সামাজিক বিষয়ে তাঁহার আচার ব্যব্যহার হিন্দুসমাজের লোকের নিতান্ত অপ্রিয় হইয়া উঠিল। এই সকল বিষয় লইয়া পথে ঘাটে, বাবুদের বৈঠকখানায়, রামমোহন রায়ের দলের প্রতি সৰ্ব্বদা কটুক্তি বর্ষণ হইত।
 যখন একদিকে এই সকল বাগবিতণ্ডা ও আন্দোলন চলিতেছে তখন হিন্দুকলেজের মধ্যে ঘোর সামাজিক বিপ্লবের সূচনা দৃষ্ট হইল। ডিরোজিও হিন্দুকলেজে পদার্পণ করিয়াই, চুম্বকে যেমন লৌহকে টানে, সেইরূপ কলেজের প্রথম চারিশ্রেণীর বালককে কিরূপ আকৃষ্ট করিয়া লইলেন তাহা অগ্ৰেই বলিয়াছি। এরূপ অদ্ভূত-দাকর্ষণ, শিক্ষক ছাত্রে এরূপ সম্বন্ধ, কেহ কখনও দেখে নাই। ডিরোজিও তিন বৎসর মাত্র হিন্দুকালেজে ছিলেন, কিন্তু এই তিন বৎসরের মধ্যে তাঁহার শিষ্যদলের মনে এমন কিছু রোপণ করিয়া দিলেন যাহা তাহাদের অন্তরে আমরণ বিদ্যমান ছিল। তাঁহাদের অনেকেই উত্তর কালে এক এক বিভাগে প্রসিদ্ধ হইয়াছিলেন। কিন্তু যিনি যে বিভাগেই গিয়াছিলেন, কেহই ডিরোজিওর শিক্ষাকে পশ্চাতে ফেলিয়া যাইতে পারেন নাই। তাঁহার অপরাপর প্রধান প্রধান শিষ্যের পরিচয় পরে দিব, একজনের বিষয় সাধারণের জ্ঞাত নহে এই জন্য কিছু বলিতেছি।
 একবার বোম্বাই প্রদেশে-গিয়া তথাকার প্রার্থনাসমাজের সুযোগ্য ও সম্মানিত সভ্য পরকালগত নারায়ণ মহাদেব পরমানন্দ মহাশয়ের মুখে শুনিলাম যে তাঁহাদের যৌবনকালে বোম্বাই সহরে এক অদ্ভুত সন্ন্যাসী দেখা দিয়াছিলেন। তাঁহার অবলম্বিত নামটা এখন বিস্তৃত হইয়াছি। তিনি ইংরাজী ভাষাতে সুশিক্ষিত ছিলেন। সন্ন্যাসী বোম্বাই হইতে গুজরাটের অন্তবৰ্ত্তী কাটিওয়াড় প্রদেশে গমন করিলেন। কিছুদিন পরে বোম্বায়ের প্রসিদ্ধ কোনও সংবাদপত্রে Misgovernment at Kntiwad”—“কাটিওয়াড়ে অরাজকতা” নাম দিয়া পত্র সকল মুদ্রিত হইতে লাগিল। ঐ সকল পত্রে এমন বিজ্ঞতা, রাজনীতিজ্ঞতা, ও লোকচরিত্রদর্শনক্ষমতার পরিচয় ছিল যে, কয়েকখানি পত্র মুদ্রিত হইতে না হইতে চতুর্দ্দিকে সেই চর্চ্চা উঠিয়া গেল। রাজপুরুষদিগের দৃষ্টিও সে দিকে আকৃষ্ট হইল। কাটিওয়াড়ের রাজা অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন কে এই সকল পত্র লিখিতেছে। ক্রমে সন্ন্যাসী ধরা পড়িলেন। সন্ন্যাসী কিছুই গোপন করিলেন না; রাজাকে বলিলেন,—“আপনার প্রজারা আমার নিকট আসিয়া কাঁদে, তাই তাহাদের দুঃখে দুঃখী হইয়া লিখিয়াছি, ইচ্ছা হয় আপনি শাসনকার্য্যের উন্নতি করুন, নতুবা আপনার যেরূপ অভিরুচি হয় করুন।” রাজা সন্ন্যাসীকে কারাগারে নিক্ষেপ করিলেন। সন্ন্যাসী একবর্ষকাল কারাদণ্ড ভোগ করিলেন। এদিকে দেশময় প্রবল আন্দোলন চলিল। একবর্ষ পরে রাজা সন্ন্যাসীকে কারামুক্ত করিয়া তাঁহাকে প্রধান মন্ত্রীর পদ গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিলেন। সন্ন্যাসী বলিলেন—“আমার রাজপদের লালসা নাই, থাকিলে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিব কেন? তবে মহারাজ যদি দেশ সুশাসন করিতে চান, সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারি।” তদবধি সন্ন্যাসীর রাজত্ব আরম্ভ হইল। সন্ন্যাসী প্রথম পরামর্শ এই দিলেন যে “পুরাতন উৎকোচগ্রাহী কৰ্ম্মচারীদিগকে পদচ্যুত করিরা তৎ তৎ পদে ইংরাজী-শিক্ষিত ও ইংরেজ গবর্ণমেণ্টের কার্য্যকলাপে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদিগকে নিযুক্ত করিতে হইবে।” তদনুসারে সন্ন্যাসী বোম্বাই সহরে আসিলেন, এবং একদল ইংরাজী-শিক্ষিত কৰ্ম্মচারী লইয়া গেলেন। নারায়ণ মহাদেব পরমানন্দ মহাশয় সেই সঙ্গে গিয়াছিলেন। তাঁহার মুখে শুনিয়াছি তাঁহারা প্রায় এক বৎসরকাল সন্ন্যাসীর অধীনে থাকিয়া রাজ্যশাসন করিয়াছিলেন। তৎপরে পূর্বপদচ্যুত কৰ্ম্মচারীগের চক্রাস্তে রাজার আবার মতিভ্রম হইল, এবং এই আদেশ প্রচার হইল যে সন্ন্যাসীর দলকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কাটিওরাড় ছাড়িয়া যাইতে হইবে। তদনুসারে সন্ন্যাসীর সহিত তাঁহারা সকলে চলিয়া আসিলেন। তাঁহার মুখে শুনিয়াছি সন্ন্যাসী তাঁহাদের নিকট তাঁহার গুরু ডিরোজিওর নাম সৰ্ব্বদা করিতেন এবং তাঁহার অশেষ প্রশংসা করিতেন। আমি কলিকাতায় ফিরিয়া রামতনু লাহিড়ী মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম তাঁহাদের দলের মধ্যে কে সন্ন্যাসব্রত লইয়া দেশত্যাগী হইয়াছিলেন, তিনি বলিতে পরিলেন না।
 ডিরোজিওর কার্য গ্রহণের পর একবৎসর যাইতে না যাইতে তাঁহার শিষ্যগণ এক ঘননিবিষ্ট দলে পরিণত হইয়া পড়িলেন। এই ১৮২৮ সালের মধ্যেই শিষ্যদলের মনের উপরে ডিরোজিওর কি প্রভাব জন্মিয়াছিল, তাহার বিবরণ তৎকালীন কালেজের কেরাণী হরমোহন চট্টোপাধ্যায় মহাশয় লিখিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। তাহা হইতে ডিরোজিওর জীবনচরিত লেখক মিঃ এডোয়ার্ডস্ কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাহাতে নিম্নলিখিত বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায় –
 “The students of the first, second, and third classes had the advantage of attending a conversazione established in the school by Mr. Derozio, where readings in poetry, and literature, and moral philosophy were carried on. The meetings were held almost daily after or before school hours. Though they were without the knowledge or sanction of the authorities yet Mr. Derozio's disinterested zeal and devotion in bringing up the students in these subjects was unbounded, and characterised by a love and philanthropy which, up to this day, has not been equalled by any teacher either in or out of the service. The students in their turn loved him most tenderly; and were ever ready to be guided by his counsels and imitate him in all their daily actions in life. In fact, Mr. Derozio acquired, such an ascendancy over the minds of his pupils that they would not move even in their private concerns without his counsel and advice. On the other hand, he fostered their taste in literature: taught the evil effects of idolatry and superstition; and so far formed their moral conceptions and feelings, as to place them completely above the antiquated ideas and aspirations of the age. Such was the force of his instructions, that the conduct of the students out of the College was most exemplary and gained them the applause of the outside world, not only in a literary or scientific point of view, but what was of still greater importance, they were all considered men of truth. Indeed, the College boy was a synonym for truth, and it was a general belief and saying amongst our countrymen, which, those that remember the time, must acknowledge, that 'such a boy is incapable of falsehood because he is a college boy.'
 ডিরোজিও এইরূপ উপাদান লইয়া তাঁহার Academic Association একাডেমিক এসোসিএশনের কার্য্য আরম্ভ করিলেন। প্রথমে কিছুদিন অন্য কোনও স্থানে উক্ত সভার অধিবেশন হইয়া, শেষে মাণিকতলার একটা বাটীতে অধিবেশন হইত। ডিরোজিও নিজে উক্ত সভার সভাপভি ও উমাচরণ বহু নামক একজন যুবক প্রথম সম্পাদক ছিলেন। রসিককৃষ্ণ মল্লিক, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, হরচন্দ্র ঘোষ প্রভৃতি উক্ত সভার প্রধান বক্তা, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব. প্যারীচাঁদ মিত্র, প্রভৃতি অপরাপর উৎসাহী সভ্য শ্রোতারূপে উপস্থিত থাকিতেন। এই সভা অল্পদিনের মধ্যে লোকের দৃষ্টিকে এতদূর আকর্ষণ করিয়াছিল যে উহার অধিবেশনে এক এক দিন ডেবিড হেয়ার, লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্কের প্রাইভেট সেক্রেটারি Col. Benson, পরবৰ্ত্তী সময়ের এডজুটান্ট জেনেরাল Col. Beatson, বিশপ কলেজের অধ্যক্ষ Dr. Mills প্রভৃতি সন্ত্রান্ত ব্যক্তিগণ উপস্থিত থাকিতেন, এবং সভ্যগণের বক্তৃভা শুনিয়া বিস্ময় ও আনন্দ প্রকাশ করিতেন।
 এই সভায় অধিবেশনে সমুদয় নৈতিক ও সামাজিক বিষয় স্বাধীন ও অসংকুচিত ভাবে বিচার করা হইত। তাহার ফলস্বরূপ ডিরোজিওর শিষ্যদিগের মনে স্বাধীন চিন্তার স্পৃহা উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল; এবং তাহারা অসংকোচে দেশের প্রাচীন রীতি নীতির আলোচনা আরম্ভ করিলেন। তাহার ফল কিরূপ দাঁড়াইল তাহা পূৰ্ব্বোক্ত হরমোহন চট্টোপাধ্যার মহাশয়ের লিখিত বিবরণ হইতে উদ্ধৃত করিতেছি;—
 “The principles and practices of Hindu religion were openly ridiculed and condemned, and angry disputes were held on moral subjects: the sentiments of Hume had been widely diffused and warmly partonised * * * *. The most glowing harangues were made at Debating Clubs which were then numerous. The Hindu religion was denounced as vile and corrupt and unworthy of the regard of rational beings. The degraded state of the Hindus formed the topic of many debates; their ignorance and superstition were declared. to be the causes of such a state, and it was then resolved that nothing but “a liberal education could enfranchise the minds of the people. The degradation of the female mind was viewed with indignation; the question at a very large meeting was carried unanimously that Hindu women should be taught; and we are Assured of the fact that the wife of one of the leaders of this movement was a most accomplished lady, who included amongst the subjects, with which she was acquainted, moral philosophy and mathematics.”
 হিন্দুকালেজের অপেক্ষাকৃত অধিক বয়স্ক বালকদিগের এই সকল ভাব ক্রমে অপরাপর বালকদিগের মধ্যে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। ঘরে ঘরে বৃদ্ধাদিগের সহিত বালকদিগের বিবাদ, কলহ, ও তাহাদিগের প্রতি অভিভাবকগণের তাড়না চলিতে লাগিল। ডেবিড় হেয়ারের চরিতাখ্যায়ক স্বৰ্গীয় প্যারীচাঁদ মিত্র বলেন,— “ছেলেরা উপনয়নকালে উপবীত লইতে চাহিত না; অনেকে উপবীত ত্যাগ করিতে চাহিত; অনেকে সন্ধ্যা আহ্নিক পরিত্যাগ করিয়াছিল; তাহাদিগকে বলপূৰ্ব্বক ঠাকুরঘরে প্রবিষ্ট করিয়া দিলে তাহারা বসিয়া সন্ধ্যা আহ্নিকের পরিবর্তে হোমরের ইলিয়ড গ্রন্থ হইতে উদ্ধত অংশ সকল আরক্তি করিত”। আবার সেকালের লোকের মুখে শুনিয়াছি যে অনেক বালক ইহা অপেক্ষাও অতিরিক্ত সীমাতে যাইত। তাহারা রাজপথে যাইবার সময়, মুণ্ডিত-মস্তক ফোটাধারী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত দেখিলেই তাহাদিগকে বিরক্ত করিবার জন্য “আমরা গরু খাইগো, আমরা গরু খাইগো” বলিয়া চীৎকার করিত। কেহ কেহ স্বীয় স্বীয় ভবনে, ছাদের উপরে উঠিয়া প্রতিবেশিগণকে ডাকিয়া বলিত, “এই দেখ মুসলমানের জল মুখে দিতেছি” এই বলিয়া পিতা পিতৃব্য প্রভৃতির তামাক খাইবার টিকা মুখে দিত।
 তখন সহরে বৃন্দাবন ঘোষাল নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছিল। সে ব্রাহ্মণের কাজকৰ্ম্ম কিছু ছিল না, প্রাতে গঙ্গাস্নান করিয়া কোশাকুশি হস্তে ধনীদের বাড়ীতে বাড়ীতে ঘুরিত এবং এই সকল সংবাদ ঘরে ঘরে দিয়া আসিত। সে বলিয়া বেড়াইত যে ডিরোজিও ছেলেদিগকে বলেন, ঈশ্বর নাই, ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম নাই, পিতামাতাকে মান্য করা অবশ্য কর্তব্য নয়, ভাই বোনে বিবাহ হওয়াতে দোষ নাই; দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সহিত ডিরোজিওর ভগিনীর বিবাহ হইবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্রমে সহরে একটা হুলস্থল পড়িয়া গেল। হিন্দুকালেজের কমিটী প্রথমে হেড মাষ্টার ডি, আন্‌সলেম সাহেবকে সতর্ক করিয়া দিলেন, যেন মাষ্টারেরা স্কুলের সময় বা অপর সময়ে বালকদিগের সহিত ধৰ্ম্মবিষয়ে কথোপকথন না করেন। হেড মাষ্টার ডিরোজিওর উপরে চটিয়া গেলেন। একদিন ডিরোজিও তাঁহার কার্য্যের বিবরণ দিবার জন্য হেড মাষ্টারের নিকট গেলেন, তখন মহাত্মা হেয়ার সেখানে দণ্ডায়মান। আন্‌সলেম সাহেব উক্ত কাৰ্য্যবিবরণের মধ্যে কিঞ্চিং খুঁত, ধরিয়া ডিরোজিওকে মারিতে গেলেন। ডিরোজিও সরিয়া দাঁড়াইলেন। তখন আন্‌সলেম রাগিয়া হেয়ারকে খোসামুদে বলিয়া গালি দিলেন। হেয়ার হাসিয়া বলিলেন—“কার খোসামুদে?” হেয়ারের অপরাধ এই যে তিনি ডিরোজিওর শিক্ষাপ্রণালী অতি উংকৃষ্ট বলিয়া মনে করিতেন এবং তাহাকে ভালবাসিতেন। হিন্দুস্কুল কমিটী আবার আদেশ করিলেন যে শিক্ষকেরা বালকদিগের সহিত ধৰ্ম্মবিষয়ে আলোচনা করিতে পারিবেন না, এবং স্কুলঘরে খাবার অনিয়া খাইতে পারিবেন না।
 একদিকে যখন এইরূপ সংগ্রাম চলিতেছে তখন অপর দিকে ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর মহামতি লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ক সতীদাহ নিবারণ করিয়া নিম্নলিখিত আদেশ প্রচার করিলেন:—
 “It is hereby declared, that after the promulgation of this regulation, all persons convicted of aiding and abetting in the sacrifice of a Hindu widow by burning or burying her alive, whether the sacrifice be voluntary on her part or not, shall be doomed guilty of culpable homicide and shall be liable to punishment by fine or imprisonment or both by fine and imprisonment.”—Regulation of 4th December, 1829.
 ইহার অল্পদিন পরেই অর্থাৎ ১৮৩০ সালের ১১ই মাঘ দিবসে রামমোহন রায় তাঁহার নবনিৰ্ম্মিত গৃহে ব্রহ্মসভাকে স্থাপন করিলেন। প্রতিষ্ঠার দিনে সেই ভবনের ট্রষ্টডীড্ হইতে বচন উদ্ধৃত করিয়া বলিয়া দেওয়া হইল যে ঐ ভবন জাতি বর্ণ সম্প্রদায় নিৰ্ব্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানবের ব্যবহারার্থ থাকিবে, এবং সেখানে একমাত্র নিরাকার সত্যস্বরূপ পরমেশ্বরের উপাসন হইবে; তদ্ভিন্ন তথায় কোনও পরিমিত দেবতার পূজা হুইবে না।
 উক্ত উভয় ঘটনাতে কলিকাতাবাসী হিন্দুগণকে অতিশয় উত্তেজিত করিয়া তুলিল। রাধাকান্ত দেব সারথি হইয়া ধৰ্ম্মসভা নামে এক সভা স্থাপন করিলেন। মতিলাল শীল কলুটোলাতে তাহার এক শাখা ধৰ্ম্মসভা স্থাপন করিলেন। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি পূৰ্ব্ব হইতেই চন্দ্রিকার সম্পাদক রূপে কাৰ্য্য করিতেছিলেন, তিনি এক্ষণে দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম প্রচারে প্রবৃত্ত হইলেন। যে দিন ধৰ্ম্মসভার অধিবেশন হইত সে দিন সহরের ধনীদের গাড়িতে রাজপথ পূর্ণ হইয়া যাইত। সভাতে সমবেত সভ্যগণ আক্রোশ প্রকাশ করিয়া বলিতেন যে তাঁহারা অনেক দিন রাম মোহন রায়ের সভার প্রতি উপেক্ষা প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন, আর উপেক্ষা করিবেন না, এবার তাহাকে সমূলে বিনাশ করিবেন। এই আক্রোশ কার্য্যেও প্রকাশ পাইতে লাগিল। তাঁহার রামমোহন রায়ের দলস্থ ব্যক্তিদিগকে সমাজচ্যুত করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। এমন কি যে সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তাঁহার দলস্থ লোকদিগের ভবনে বিদায় আদায় গ্রহণ করিতেন, তাহাদিগকেও বর্জ্জন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
 এইরূপে সমাজ মধ্যে আন্দোলন উঠিয়া গেল। রামমোহন রায় অবিচলিত চিত্তে আপনার কতিপয় বন্ধু সমভিবাহারে নব প্রতিষ্ঠিত সমাজে গিয়া উপাসনাদি করিতে লাগিলেন। সে কালের লোকের মুখে শুনিয়াছি, তাঁহার এই নিয়ম ছিল যে তিনি উপাসনা মন্দিরে আসিবার সময়ে পদব্রজে আসিতেন, ফিরিবার সময়ে নিজ গাড়িতে ফিরিতেন। গাড়িতে যাইবার সময় কোন কোনও দিন পথের লোকে ইট পাথর, কাদা ছুড়িয়া মারিত ও বাপান্ত করিত; তিনি নাকি হাসিয়া গাড়ির দ্বার টানিয়া দিতেন ও বলিতেন কোচম্যান হেঁকে যাও।” সতীদাহনিবারণ ও ব্রহ্মসভা স্থাপন নিবন্ধন কলিকাতাবাসী হিন্দুগণের মন এমনি উত্তেজিত হইয়াছিল যে সতীদাহ-নিবারণবিষয়ক আইন রদ করিবার জন্য এক আবেদন পত্রে বহুসংখ্যক লোকের স্বাক্ষর হইতে লাগিল। রামমোহন রায় লর্ড উইলিরম বেটিঙ্ককে সহমরণ নিবারণের জন্য ধন্যবাদ করিবার উদ্দেশে যে অভিনন্দন পত্র লিখিলেন তাহাতে তাঁহার কতিপয় বন্ধু ভিন্ন অপর কেহ স্বাক্ষর করিলেন না।
 এইরূপে কয়েক মাস কাটিয়া গেল। ইতি মধ্যে সুবিখ্যাত খ্ৰীষ্টীয় মিশনারি আলেকজাণ্ডার ডফ কলিকাতাতে পদার্পণ করিলেন। তখন রামমোহন রায় বিলাত যাত্রা করিবার আয়োজন করিতেছেন। ডফ রামমোহন রায়ের সহিত কথাবাৰ্ত্তা কহিয়া অনুভব করিলেন যে এদেশে ইংরাজী স্কুল স্থাপন করিয়া ইংরাজী শিক্ষার ভিতর দিয়া খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম প্রচার করিতে হইবে। তদনুসারে তিনি এক প্রকার স্কটলণ্ডস্থিত কর্ত্তৃকপক্ষের অনভিমতে একটা ইংরাজী স্কুল স্থাপন করিতে অগ্রসর হইলেন। রামমোহন রায় সে জন্য ব্রাহ্মসমাজের পূৰ্ব্ব-ব্যবহৃত ফিরিঙ্গী কমল বসুয় বাড়ী নামক বাটী স্থির করিয়া দিলেন; এবং প্রথম ছয়টি ছাত্র জুটাইয়া দিলেন। সেই কতিপয় ছাত্রের মধ্যে ক্ষেত্রমোহন চট্টোপাধ্যায় পরে সহরের বড়লোক হইয়াছিলেন।
 ডফ স্কুল স্থাপন করিয়া নবশিক্ষিত যুবকদলের নিকটে থাকিবার আশয়ে বর্তমান হিন্দুকালেজের সন্নিকটে বাসা করিয়া বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করিলেন। রামমোহন রায় ডফকে স্বীয় কার্য্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিয়া বিলাত যাত্রা করিলেন। কালেজের বালকেরা অনেকে ডফ ও ডিয়ালটির বক্তৃতাতে উপস্থিত হইতে লাগিল। ইহাও হিন্দুকালেজ কমিটীর পক্ষে অসহনীয় হইয়া উঠিল। তাঁহারা আদেশ প্রচার করিলেন যে কালেজের বালকগণ কোনও বক্তৃতা শুনিতে যাইতে পরিবে না। এই আদেশ প্রচার হইলে চারি দিকে লোকে ছিছি করিতে লাগিল। লোকের স্বাধীন চিন্তার উপরে এতটা হাত দেওয়া কাহারও সহ্য হইল না।
 অবশেষে ১৮৩১ সালের এপ্রেল মাসে কালেজ কমিটীর হিন্দুসভ্যগণ ডিরোজিওকে তাড়াইবার জন্য বদ্ধপরিকর হইয়া দাঁড়াইলেন। স্বৰ্গীয় কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের পিতামহ সুপ্রসিদ্ধ রামকমল সেন মহাশয় হিন্দুসভ্যগণের মুখ-পাত্র স্বরূপ হইয়া এক বিশেষ অনুরোধপত্র প্রেরণ করিয়া সভা ডাকিলেন। ঐ সভায় এই প্রশ্ন উঠিল—ডিরোজিওর স্বভাব চরিত্র এরূপ কি না, এবং তাঁহার সংসর্গে বালকদিগের এরূপ অপকার হইতেছে কি না, যাহাতে তাঁহাকে আর শিক্ষকের পদে প্রতিষ্ঠিত রাখা উচিত বোধ হয় না? ডাক্তার উইলসন ও মহামতি হেয়ার ডিরোজিওর সপক্ষে মত দিলেন, এবং হিন্দুসভ্যগণের অনেকেও এতটা বলিতে প্রস্তুত হইলেন না। অবশেষে এই প্রস্তাব ত্যাগ করিয়া আর এক ভাবে প্রস্তাব উপস্থিত করা হইল যে, দেশীয় সমাজের বর্তমান অবস্থাতে ডিরোজিও শিক্ষকরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকিলে কালেজের অনিষ্ট হইবে কি না? উইলসন ও হেয়ার দেশীয় সমাজের অবস্থা বিষয়ে নিজে অনভিজ্ঞ বলিয়া এ বিষয়ে সাহসের সহিত কিছু বলিতে পারলেন না; সুতরাং কোনও পক্ষেই মত প্রকাশ করিলেন না। অধিকাংশের মতে ডিরোজিওকে পদচ্যুত করা স্থির হইল।
 ডাক্তার উইলসন ডিরোজিওকে এই সংবাদ দিলেন। তিনি তৎক্ষণাং পদত্যাগ করিয়া পত্র লিখিলেন। তাঁহার প্রতি যে যে দোষারোপ করা হইয়াছিল তিনি সে সমুদয় দৃঢ়তার সহিত অস্বীকার করিলেন। বলিলেন তিনি কখনই নাস্তিকতা প্রচার করেন নাই, তবে ঈশ্বরের সপক্ষ বিপক্ষ দুই যুক্তি তুলিয়া বালকদিগকে বিচার করিতে উৎসাহিত করিয়াছেন বটে; ভ্রাতা ভগিনীর বিবাহ যুক্তিসিদ্ধ এরূপ অদ্ভুত মত তিনি কখনও প্রচার করেন নাই; এবং পিতামাতার প্রতি অবাধ্যতা শিক্ষা দেওয়া দূরে থাক, সেরূপ ব্যবহার কোনও বালকে দেখিলে তাহাকে সাজা দিয়াছেন। ডিরোজিও কালেজ পরিত্যাগ পূর্ব্বক ইষ্ট ইণ্ডিয়ান নামক একখানি দৈনিক সংবাদ পত্র বাহির করিয়া তাহার সম্পাদনে নিযুক্ত হইলেন। ঐ কাগজ ত্বরায় প্রতিষ্ঠা লাভ করিল। ডিরোজিও কলিকাতার ফিরিঙ্গীদলের এক জন নেতা বলিয়া পরিগণিত হইলেন। তৎপরে যে কয়েকমাস তিনি জীবিত ছিলেন, সে সময়ের মধ্যে ফিরিঙ্গসমাজের উন্নতির জন্য যে কিছু অনুষ্ঠান হইত তন্মধ্যে তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকিতেন। তাঁহাকে ছাড়িয়া কোনও কাজ হইত না। এইরূপে খাটিতে খাটিতে ১৮২১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর শনিবার তিনি দুরারোগ্য ওলাউঠা রোগে আক্রান্ত হইলেন। ছয় দিন তিনি রোগশয্যায় শয়ান ছিলেন। তাঁহার পীড়ার সংবাদ পাইবামাত্র, মহেশ চন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি তাঁহার শিষ্যদল আসিয়া উপস্থিত হইল; এবং দিন রাত্রি পড়িয়া তাঁহার সেবা করিতে লাগিল। কিন্তু কিছুতেই তাঁহার জীবন রক্ষা হইল না। ২৪শে ডিসেম্বর প্রাণবায়ু তাঁহার দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গেল। ইহার পরে ইষ্টইণ্ডিয়ান কাগজ একজন অপদার্থ ইংরাজের হস্তে গেল। সে ব্যক্তি ডিরোজিওর মাতা ও ভগিনীকে ধনে প্রাণে সারা করিল। কয়েক বৎসরের মধ্যে তাঁহারা জন্মের মত সমাজসাগরবক্ষে চিরবিস্মৃতির তলে ডুবিয়া গেলেন। ডিরোজিও অন্তর্হিত হইলে কিছুদিন তাঁহার স্মৃতিচিহ্ণ স্থাপনের প্রস্তাব চলিয়াছিল; এবং তদৰ্থ একটা কমিটীও গঠিত হইয়াছিল; কিন্তু কালাবর্ত্তে সকলি মিলাইয়া গেল! নব্যবঙ্গের একজন প্রধান শিক্ষক ও দীক্ষা-গুরুর চিহ্নমাত্রও রহিল না।
 ডিরোজিও হিন্দুকালেজ ছাড়িয়া গেলেন বটে, কিন্তু যে তরঙ্গ তুলিয়া দিয়া গেলেন তাহা আর খামিল না। ১৮৩১ সালের ২৩ আগষ্ট তাঁহার শিষ্যগণ এক মহা বিভ্ৰাট বাঁধাইয়া বসিলেন। সে সময়ে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবনে ডিরোজিওর শিষ্যদলের একটা আড্ডা ছিল। উক্ত দিবস কৃষ্ণমোহনের সমুপস্থিতি কালে তাঁহার যুবক বন্ধুগণ সেখানে জুটিলেন। তখন তাহাদের সর্বপ্রধান সৎসাহসের কৰ্ম্ম ছিল মুসলমানের রুটী, ও বাজার হইতে সিদ্ধ করা মাংস আনিয়া খাওয়া। সেইরূপ আহারের পর হাড়গুলি পার্শ্বস্থ এক গৃহস্থের ভবনে ফেলিয়া দিয়া যুবকদল চীৎকার করিতে লাগিলেন, “ঐ গোহাড়, ঐ গোহাড়।” আর কোথায় যায়। সমুদয় পল্লীস্থ হিন্দুগণ মার মার শব্দে বাহির হইয়া পড়িলেন। যুবকদল যিনি যেদিকে পারিলেন পলায়ন করিলেন। তৎপরে প্রতিবেশিগণ দলবদ্ধ হইয়া কৃষ্ণমোহনের মাতামহ রামজয় বিদ্যাভূষণ মহাশয়কে ধরিয়া বসিল—“আপনার দৌহিত্রকে বর্জ্জন করিতে হইবে নতুবা আপনাকে লইয়া চলিব না।” ব্রাহ্মণ স্বীয় দৌহিত্রের প্রতি কোপে অধীর হইয়া গেলেন। বেচারা কৃষ্ণমোহন এ সকলের কিছুই জানেন না। তিনি সায়ংকালে গৃহে সমাগত হইলে, সে ভবনে আর আশ্রয় পাইলেন না। সে রাত্রে যান কোথায়, উপায়ান্তর না পাইয়া স্বীয় বন্ধু দক্ষিণারঞ্জনের ভবনে গিয়া আশ্রয় লইলেন। তখন কৃষ্ণমোহন ও রসিককৃষ্ণ মল্লিক হেয়ারের স্কুলে শিক্ষকতা করিতেন। কৃষ্ণমোহন এই বৎসরের মে মাস হইতে Inquirer নামে এক সংবাদপত্র প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। সেই পত্রে তিনি নির্যাতনকারী হিন্দুগণের প্রতি উপহাস বিদ্রুপবর্ষণ করিতে লাগিলেন। নব্যদলের সমরভেরী বাজিয়া উঠিল।
 ১৮৩২ সালের ২৮ আগষ্টের Inquirer পত্রিকাতে প্রকাশ হইল যে ডিরোজিওর শিষ্যদলের একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি মহেশচন্দ্র ঘোষ খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইয়াছেন। মহেশ বাল্যকালে অত্যন্ত জেঠা, ইয়ার ও উচ্ছৃঙ্খল বলিয়া বিদিত ছিলেন। একারণে রামগোপাল ঘোষ তাঁহার সঙ্গে বড় মিশিতেন না। কিন্তু ডিরোজিওর সংশ্রবে আসিয়া মহেশের জীবনে পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছিল। তিনি ধৰ্ম্মানুরাগ ও সচ্চরিত্রতাগুণে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছিলেন।
 সেই ১৮৩২ সালেরই ১৭ই অক্টোবর কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় খ্রীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলেন। সে কালের লোকের মুখে শুনিয়াছি তখন এরূপ জনরব উঠিয়াছিল যে হিন্দুকালেজের সমুদয় ভাল ভাল ছাত্র খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম অবলম্বন করিবে।
 ১৮৩৩ সালে লাহিড়ী মহাশয় কালেজ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া হিন্দুকালেজে শিক্ষকতা পদ গ্রহণ করিলেন। এই বৎসরে রামমোহন রায় ইংলণ্ডের ব্রিষ্টল নগরে ২৭শে সেপ্টেম্বর দেহত্যাগ করিলেন; এবং রামমোহন রায়ের চেষ্টায় ও মহামতি লর্ড উইলিয়ম বেটিঙ্কের পরামর্শে, গরর্ণমেণ্টের অধীনে উচ্চ উচ্চ পদ এদেশীয় ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের জন্য উন্মুক্ত হইল। ঐ সালে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সনদপুনগ্রহণের সময় পার্লেমেন্ট মহাসভা ভারতশাসনের উন্নতিবিধানের উদ্দেশে এক নুতন আইন বিধিবদ্ধ করেন। তাহার ৮৭ ধারাতে লিখিত হইল;—  “And be it enacted that no native of the said territories, nor any natural born subject of his Majesty resident therein, shall by reason only of his. religion, place of birth, descent, colour, or any of them, be disabled from holding any place, office, or employment, under the said Company.”
 লর্ড কর্ণওয়ালিসের সময় হইতে এদেশীয়গণ হাজার বড় হইলেও শেরেস্তাদার উর্দ্ধে উঠিতে পারিতেন না। এমন কি রামমোহন রায়ও পদের উহার উপরে উঠিতে পারেন নাই। তিনি বিলাতবাসকালে এদেশ শাসন সম্বন্ধে যে যে পরামর্শ দিয়াছিলেন, তন্মধ্যে এদেশীয়দিগকে উন্নত পদ দেওয়ার বিষয়ে বিশেষরূপে অনুরোধ করিয়াছিলেন। এই বিধি প্রচার হওয়ার পর সে দ্বার উন্মুক্ত হইল। এই আইন বিধিবদ্ধ হওয়ার পর হইতে ইংরাজী-শিক্ষিত ব্যক্তিদিগকে ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটী কালেক্টর করা হইতে লাগিল। অতএব এই ১৮৩৩ সাল হইতে এদেশীয়দিগের বক্ষ হইতে একখান পাথর তোলা হইল। সুখের বিষর সে সময় হইতে এদেশীয়দিগকে যে অধিকার দেওয়া হইয়াছে তাঁহারা তাহার অপব্যবহার করেন নাই, প্রত্যুত ঐ সকল পদকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন।