প্রধান মেনু খুলুন

অস্পষ্ট জানলার ফঁাকে ফঁাকে দেখা যায় সামনের বাড়ির জীবনযাত্রা। রেখা আর ছেদ, দেখা আর না-দেখা দিয়ে সেই ছবি আঁকা। একদিন পড়ার বই পড়ে রইল, বনমালীর চোখ গেল সেই দিকে । সেদিন দেখে, সে বাড়ির ঘরকন্নার পুরোনো পটের উপর দু’জন নতুন লোকের চেহারা। একজন বিধবা প্রবীণা, আরেকটি মেয়ের বয়স ষোল হবে, কি সতেরো । সেই প্রবীণ জানালার ধারে বসে মেয়েটির চুল বেঁধে দিচ্চে, আর মেয়ের চোখ বেয়ে জল পড়চে । আরেকদিন দেখা গেল চুল বাধবার লোকটি নেই। মেয়েটি দিনান্তের শেষ আলোতে,বুকে পড়ে বোধ হল যেন একটি পুরোনো ফোটোগ্রাফের ফ্ৰেম আঁচল দিয়ে মাজচে । d অস্পষ্ট ቖፃ তারপর দেখা যায় জানলার ছেদগুলির মধ্যে দিয়ে ওর প্রতিদিনের কাজের ধারা । কোলের কাছে ধাম৷ নিয়ে ডাল-বাছ ; জাতি হাতে স্থপুরি কাটা ; স্নানের পরে বা হাত দিয়ে নেড়ে নেড়ে ভিজে চুল শুকোনো ; বারান্দার রেলিঙের উপরে বালাপোষ রোদরে মেলে দেওয়া । দুপুরবেলায় পুরুষের আপিসে ; মেয়ের কেউ বা ঘুমোয়, কেউ বা তাস খেলে ; ছাতে পায়রার খোপে পায়রাদের বক্‌বকম মিইয়ে আসে। সেই সময়ে মেয়েটি ছাতের চীলে-কোঠায় পা-মেলে বই পড়ে, কোনো দিন বা বইয়ের উপর কাগজ রেখে চিঠি লেখে, আর্বাধ। চুল কপালের উপরে থমকে থাকে, আর আঙল যেন চলতে চলতে চিঠির কানে কানে কথা কয়। একদিন বাধা পড়ল। সেদিন সে খানিকটা লিখচে চিঠি, খানিকট খেলচে কলম নিয়ে, আর আলসের উপরে একটা কাক অাধ-খাওয়া আমের আঁঠি ঠুকরে ঠুকরে খাচ্চে । এমন সময়ে যেন পঞ্চমীর অন্তমনা চাদের কণার পিছনে পা টিপে টিপে একটা মোট মেঘ এসে দাড়াল । মেয়েটি আধাবয়সী। তার মোটা হাতে মোটা কাকন। তার সামনের চুল ফাক, সেখানে সিথির জায়গায় মোট সিদুর আঁকা। Sty লিপিক। বালিকার কোল থেকে তার না-শেষ-করা চিঠিখানা সে আচমকা ছিনিয়ে নিলে। বাজপাখী হঠাৎ পায়রার পিঠের উপর পড়ল। ছাতে আর মেয়েটিকে দেখা যায় না। কখনো বা গভীর রাতে কখনো বা সকালে বিকালে ঐ বাড়ি থেকে এমন সব আভাস আসে, যার থেকে বোঝা যায় সংসারটার তলা ফাটিয়ে দিয়ে একটা ভূমিকম্প বেরিয়ে আসবার জন্যে মাথা ঠক্‌চে। এদিকে জানলার ফঁাকে ফঁাকে চলচে ডাল বাছা, আর পান সাজা,—ক্ষণে ক্ষণে হুধের কড়া নিয়ে মেয়েটি চলেচে উঠোনে কলতলায়। এমনি কিছুদিন যায়। সেদিন কাৰ্ত্তিক মাসের সন্ধ্যাবেলা ; ছাদের উপর আকাশপ্রদীপ জ্বলেচে, আস্তাবলের ধোয়া অজগর সাপের মত পাক দিয়ে আকাশের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিলে । বনমালী বাইরে থেকে ফিরে এসে যেমনি ঘরের জানলা খুলল, অমনি তার চোখে পড়ল সেই মেয়েটি ছাদের উপর হাত জোড় করে স্থির দাড়িয়ে । তখন গলির শেষ প্রান্তে মল্লিকদের ঠাকুরঘরে আরতির কাসর ঘন্ট বাঙ্গ চে। অনেকক্ষণ পরে ভূমিষ্ঠ হয়ে মেঝেতে মাথা ঠুকে ঠুকে স্কারবার সে প্রণাম করলে ; তারপরে চলে গেল । অস্পষ্ট వివి সেদিন বনমালী নীচে গিয়েই চিঠি লিখলে। লিখেই নিজে গিয়ে তখনি ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে এল। রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে একমনে কামনা করতে লাগল সে চিঠি যেন না পৌছয়। সকালবেলায় উঠে সেই বাড়ির দিকে যেন মুখ তুলে চাইতে পারলে না। সেই দিনই বনমালী মধুপুরে চলে গেল, কোথায় গেল কাউকে বলে গেল না। কলেজ খোলবার সময় সময় ফিরে এল। তখন সন্ধ্যাবেলা। সামনের বাড়ির আগাগোড়া সব ৰন্ধ, সব অন্ধকার । ওরা সব গেল কোথায় ! বনমালী বলে উঠল, “যাক, ভালই হয়েচে !” ঘরে ঢুকে দেখে ডেস্কের উপরে একরাশ চিঠি। সব নীচের চিঠির শিরোনাম মেয়েলি হাতের ছাদে লেখা, অজানা হাতের অক্ষরে, তাতে পাড়ার পোষ্টঅাপিসের ছাপ । চিঠিখানি হাতে করে সে বসে রইল। লেফাফা খুললে না। কেবল আলোর সামনে তুলে ধরে দেখলে। জানালার ভিতর দিয়ে জীবনযাত্রার যেমন অস্পষ্ট ছবি, আবরণের ভিতর দিয়ে তেমনি অস্পষ্ট অক্ষর । একবার খুলতে গেল, তারপরে স্বাক্সের মধ্যে চিঠিটা রেখে চাবি বন্ধ করে দিলে ; শপথ করে ৰঙ্গলে- “এ চিঠি কোনো দিন খুলৰ লা।”