প্রধান মেনু খুলুন

উপসংহার ভোজরাজের দেশে যে-মেয়েটি ভোর বেলাতে দেবমন্দিরে গান গাইতে যায় সে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে । আচাৰ্য্য বলেন, “একদিন শেষরাত্রে আমার কানে একখানি মুর লাগল। তার পরে সেইদিন যখন সাজি নিয়ে পারুল-বনে ফুল তুলতে গেছি তখন এই মেয়েটিকে ফুলগাছতলায় কুড়িয়ে পেলেম ।” সেই অবধি আচাৰ্য্য মেয়েটিকে আপন তমুরাটির মত কোলে নিয়ে মানুষ করেচে ; এর মুখে যখন কথা ফোটেনি এর গলায় তখন গান জাগল। অাজ আচার্য্যের কণ্ঠ ক্ষীণ, চোখে ভাল দেখেন না । মেয়েটি তাকে শিশুর মত মানুষ করে। কত যুবা দেশ বিদেশ থেকে এই মেয়েটির গান শুনতে আসে। তাই দেখে মাঝে মাঝে আচার্য্যের উপসংহার 事 > S > বুক কেঁপে ওঠে, বলেন,—“যে বেঁটা আলগা হয়ে আসে ফুলটি তাকে ছেড়ে যায়।” মেয়েটি বলে, “তোমাকে ছেড়ে আমি এক পলক বাচি নে ৷” আচাৰ্য্য তার মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে বলেন, “যে গান আজ আমার কণ্ঠ ছেড়ে গেল, সেই গান তোরই মধ্যে রূপ নিয়েচে । তুই যদি ছেড়ে যাস তা হলে অামার চিরজন্মের সাধনাকে আমি হারাব ।” ミ ফাগুন পূর্ণিমায় আচার্য্যের প্রধান শিষ্য কুমারসেন গুরুর পায়ে একটি আমের মঞ্জরী রেখে প্রণাম করলে। বললে, “মাধবীর হৃদয় পেয়েচি এখন প্রভুর যদি সম্মতি পাই তা হলে দুজনে মিলে আপনার চরণ সেবা করি।” আচার্য্যের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। বললে, “আন দেখি আমার তমুর। আর তোমরা দুইজনে রাজার মত রাণীর মত আমার সামনে এসে বস ” তক্ষুরা নিয়ে আচাৰ্য্য গান গাইতে বসলেন । জুলহ লহীর গান সাহানার সুরে । বললেন, “আজ আমার জীবনের শেষ গাম-গাৰ ।” ১১২ লিপিকা এক পদ গাইলেন । গান আর এগোয় না, বৃষ্টির ফোটায় ভেরে’-ওঠা জুই ফুলটির মত হাওয়ায় কাপতে কাপতে খসে পড়ে। শেষে তমুরাটি কুমার সেনের হাতে দিয়ে বললেন, “বৎস, এই লও আমার যন্ত্র।” তারপরে মাধবীর হাতখানি তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এই লও আমার প্রাণ ।” তার পরে বললেন, “আমার গানটি দুজনে মিলে শেষ করে দাও, আমি শুনি ।” মাধবী আর কুমার, গান ধরলে—সে যেন আকাশ আর পূর্ণচাদের কণ্ঠ মিলিয়া গাওয়া । এমন সময়ে দ্বারে এল রাজদূত, গান থেমে গেল। আচাৰ্য্য কাপতে কাপতে আসন থেকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহারাজের কি আদেশ ?” দূত বললে, “তোমার মেয়ের ভাগ্য প্রসন্ন, মহারাজ তাকে ডেকেচেন ।” আচাৰ্য্য জিজ্ঞাসা করলেন, “কি ইচ্ছা তার ?” দূত বললে, “আজ রাত পোয়ালে রাজকন্যা কাম্বোজে পতিগৃহে যাত্রা করবেন, মাধবী তার সঙ্গিনী হয়ে যাবে।” উপসংহার ১১৩ রাত পোয়াল, রাজকন্যা যাত্রা করলে । মহিষী মাধবীকে ডেকে বললে, “আমার মেয়ে প্রবাসে গিয়ে যাতে প্রসন্ন থাকে সে ভার তোমার উপরে ।” মাধবীর চোখে জল পড়ল না, কিন্তু অনাবৃষ্টির আকাশ থেকে যেন রৌদ্র ঠিক্রে পড়ল । রাজকন্যার ময়ুরপংখী আগে যায়, আর তার পিছে পিছে যায় মাধবীর পান্ধী । সে পান্ধী কিংখাবে ঢাকা, তার দুই পাশে পাহারা । পথের ধারে ধুলোর উপরে ঝড়ে-ভাঙা অশ্বখ ডালের মত পড়ে রইলেন আচাৰ্য্য, আর স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইল কুমারসেন। পার্থীরা গান গাইছিল পলাশের ডালে ; আমের বোলের গন্ধে বাতাস বিহবল হয়ে উঠেছিল। পাছে রাজকন্ত্যার মন প্রবাসে কোনোদিন ফাগুন সন্ধ্যায় হঠাৎ নিমেষের জন্ত উতলা হয় এই চিন্তায় রাজপুরীর লোকে নিঃশ্বাস ফেললে ।