প্রধান মেনু খুলুন

শেষের কবিতা


গোড়ায় সবাই ঠিক করে রেখেছিল, অমিত দিন-পনেরোর মধ্যে কোলকাতায় ফিরবে। নরেন মিত্তির খুব মোটা বাজি রেখেছিল যে, সাত দিন পেরোবে না। এক মাস যায়, দু মাস যায়, ফেরবার নামও নেই। শিলঙের বাসার মেয়াদ ফুরিয়েছে, রংপুরের কোন্‌ জমিদার এসে সেটা দখল করে বসল। অনেক খোঁজ করে যোগমায়াদের কাছাকাছি একটা বাসা পাওয়া গেছে। এক সময়ে ছিল গোয়ালার কি মালীর ঘর, তার পরে একজন কেরানির হাতে পড়ে তাতে গরিবি ভদ্রতার অল্প একটু আঁচ লেগেছিল। সে কেরানিও গেছে মরে, তারই বিধবা এটা ভাড়া দেয়। জানলা-দরজা প্রভৃতির কার্পণ্যে ঘরের মধ্যে তেজ মরুৎ ব্যোম এই তিন ভুতেরই অধিকার সংকীর্ন, কেবল বৃষ্টির দিনে অপ্‌ অবতীর্ণ হয় আশাতীত প্রাচুর্যের সঙ্গে অখ্যাত ছিদ্রপথ দিয়ে।
ঘরের অবস্থা দেখে যোগমায়া একদিন চমকে উঠলেন বললেন, ‘বাবা, নিজেকে নিয়ে এ কী পরীক্ষা চলছে?’
অমিত উত্তর করলে,‘উমার ছিল নিরাহারের তপস্যা, শেষকালে পাতা পর্যন- খাওয়া ছেড়েছিলেন। আমার হল নিরাস্‌বাবের তপস্যা, খাট পালঙ টেবিল কেদারা ছাড়তে ছাড়তে প্রায় এসে ঠেকেছে শুন্য দেয়ালে। সেটা ঘটেছিল হিমালয় পর্বতে, এটা ঘটল শিলঙ পাহাড়ে। সেটাতে কন্যা চেয়েছিলেন বর, এটাতে বর চাচ্ছেন কন্যা। সেখানে নারদ ছিলেন ঘটক, এখানে স্বয়ং আছেন মাসিমা। এখন শেষ পর্যন- যদি কোন কারণে কালিদাস এসে না পৌছাতে পারেন, অগত্যা আমাকেই তাঁর কাজটাও যথাসম্ভব সারতে হবে।’ অমিত হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে, কিন’ যোগমায়াকে ব্যথা দেয়। তিনি প্রায় বলতে গিয়েছিলেন, আমাদের বাড়িতেই এসে থাকো-থেমে গেলেন। ভাবলেন, বিধাতা একটা কান্ড ঘটিয়ে তুলেছেন, তার মধ্যে আমাদের হাত পড়লে অসাধ্য জট পাকিয়ে উঠতে পারে। নিজের বাসা থেকে অল্প কিছু জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিলেন, আর সেইসঙ্গে এই লক্ষ্মীছাড়াটার’ পরে তাঁর করুণা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। লাবণ্যকে বার বার বললেন, ‘মা লাবণ্য, মনটাকে পাষাণ কোরো না।’


একদিন বিষম এক বর্ষনের অনে- অমিত কেমন আছে খবর নিতে গিয়ে যোগমায়া দেখলেন, নড়বড়ে একটা চারপেয়ে টেবিলের নীচে কম্বল পেতে অমিত একলা বসে একখানা ইংরেজি বই পড়ছে। ঘরের মধ্যে যেখানে-সেখানে বৃষ্টি বিন্দুর অসংগত আবির্ভাব দেখে টেবিল দিয়ে একটা গুহা বানিয়ে তার নীচে অমিত পা ছড়িয়ে বসে গেল। প্রথমে নিজে নিজেই হেসে নিলে এক চোট, তার পরে চলল কাব্যালোচনা। মনটা ছুটেছিল যোগমায়ার বাড়ির দিকে। কিন’ শরীরটা দিলে বাধা। কারণ, সেখানে কোনো প্রয়োজন হয় না সেই কোলকাতায় অমি কিনেছিল এক অনেক দামের বর্ষাতি, যেখানে সর্বদাই প্রয়োজন সেখানে আসবার সময় সেটা আনবার কথা মনে হয় নি। একটা ছাতা সঙ্গে ছিল, সেটা খুব সম্ভব কোনো একদিন সংকল্পিত গম্যস’ানেই ফেলে এসেছে, আর তা যদি না হয় তবে সেই বুড়ো দেওদারের তলে সেটা আছে পড়ে।
যোগমায়া ঘরে ঢুকে বললেন,‘ একি কান্ড অমিত!’
অমিত তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে থেকে বেরিয়ে এসে বললে,‘ আমার ঘরটা আজ অসম্বন্ধ প্রলাপে মেতেছে, দশা আমার চেয়ে ভারো নয়।’
‘অসম্বন্ধ প্রলাপ!’
‘ অর্থাৎ বাড়ির চালটা প্রায় ভারতবর্ষ বললেই হয়। অংশগুলোর মধ্যে সম্বন্ধটা আলগা। এইজন্যে উপর থেকে উৎপাত ঘটলেই চারি দিকে এলোমেলো অশ্রুবর্ষণ হতে থাকে, আর বাইরের দিক থেকে যদি ঝড়ের দাপট লাগে, তবে সোঁ সোঁ করে উঠতে থাকে দীর্ঘশ্বাস। আমি তো প্রটেষ্ট্‌-স্বরূপে মাথার উপরে এক মঞ্চ খাড়া করেছি-ঘরের মিসগর্নমেন্টের মাঝখানেই নিরুপদ্রব হোমরুলের দৃষ্টান্ত পলিটিকসের একটা মুলনীতি একানে প্রত্যক্ষ।’
‘ মুলনীতিটা কী শুনি।’
‘ সেটা হচ্ছে এই যে, যে ঘরওয়ালা ঘরে বাস করে না সে যত বড়ো ক্ষমতাশালীই হোক, তার শাসনের চেয়ে যে দরিদ্র বাসাড়ে ঘরে থাকে তার যেমন-তেমন ব্যবস’াও ভালো।’
আজ লাবণ্যর’পর যোগমায়ার খুব রাগ হল। অমিতকে তিনি যতই গভীর ক’রে স্নেহ করছেন ততই মনে মনে তার মুর্তিটা খুব উঁচু করেই গড়ে তুলছেন।-‘এত বিদ্যা, এত বুদ্ধি, এত পাস, অথচ এমন সাদা মন। গুছিয়ে কথা বলবার কী আসামান্য শক্তি। আর, যদি চেহারার কথা বল, আমার চোখে তো লাবণ্যর চেয়ে ওকে অনেক বেশি সুন্দর ঠেকে। লাবণ্যর কপাল ভালো, অমিত কোন্‌ গ্রহের চক্রানে- ওকে এমন মুগ্ধ চোখে দেখেছে! সেই সোনার চাঁদ ছেলেকে লাবন্য এত করে দুঃখ দিচ্ছে! খামকা বলে বসলেন কিনা বিয়ে করবেন না। যেন কোন রাজরাজেশ্বরী! ধনুক-ভাঙা পণ! এত অহংকার সইবে কেন! পোড়ারমুখীকে যে কেঁদে কেঁদে মরতে হবে।’
একবার যোগমায়া ভাবলেন, অমিতকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাবেন তাঁদের বাড়িতে। তার পরে কী ভেবে বললেন, ‘একুট বোসো বাবা, আমি এখনই আসছি।’
বাড়ি গিয়েই চোখে পড়ল লাবন্য তার ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে পায়ের উপর শাল মেলে গোর্কির ‘মা’ বলে গল্পের বই পড়ছে। ওর এই আরামটা দেখে ওঁর মনে মনে রাগ আরো বেড়ে উঠল।
বললেন, ‘চলো, একটু বেড়িয়ে আসবে।’
সে বললে,‘কর্তামা, আজ বেরোতে ইচ্ছে করছে না।’
যোগমায়া ঠিক বুঝলেন না যে, লাবণ্য নিজের কাছ থেকে ছুটে গিয়ে এই গল্পের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। সমস- দুপুরবেলা খাওয়ার পর থেকেই , তার মনের মধ্যে একটা অসি’র অপেক্ষা ছিল কখন আসবে অমিত। কেবইল মন বলেছে, এল বুঝি। বাইরে দম্‌কা হাওয়ার দৌরাত্ম্যে পাইন গাছগুলো থেকে থেকে ছট্‌ফট্‌ করে। আর, দুর্দান- বৃষ্টিতে সদ্যোজাত ঝর্নাগুলো এমনি ব্যতিব্যস- যেন তাদের মেয়াদের সময়টার সঙ্গে উর্ধ্বশ্বাসে তাদের পাল্লা চলেছে। লাবন্যর মধ্যে একটা ইচ্ছে আজ অশান- হয়ে উঠল-যাক সব বাধা ভেঙে, সব দ্বিধা উড়ে, অমিতের দুই হাত আজ চেপে ধরে বলে উঠি, জন্মে-জন্মান-রে আমি তোমার। আজ বলা সহজ। আজ সমস- আকাশ যে মরিয়া হয়ে উঠল, হু হু করে কী যে হেঁকে উঠছে তার ঠিক নেই, তারই ভাষায় আজ বন-বনান-র ভাষা পেয়েছে, বৃষ্টিধারায়-আবিষ্ট গিরিশৃঙ্গগুলো আকাশে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। অমনি করেই কেউ শুনতে আসুক লাবণ্যর কথা অমনি মস- করে, স-ব্ধ হয়ে, অমনি উদার মনোযোগে। কিন’ প্রহরের পর প্রহর যায়, কেউ আসে না। ঠিক মনের কথাটি বলার লগ্ন যে উত্তীর্ণ হয়ে গেল। এর পরে যখন কেউ আসবে তখন কথা জুটবে না, তখন সংশয় আসবে মনে, তখন তান্ডবনৃত্যোন্মত্ত দেবতার মাভৈঃ রব আকাশে মিলেয়ে যাবে। বৎসরের পর বৎসর নীরবে চয়ে যায়, তার মধ্যে বাণী একদিন বিশেষ প্রহরে হঠাৎ মানুষের দ্বারে আঘাত করে। এই সময়ে দ্বার খোলবার চাবিটি যদি না পাওয়া গেল তবে কোনোদিনই ঠিক কথাটি অকুন্ঠিত স্বরে বলবার দৈবশক্তি আর জোটে না। যেদিন সেই বাণী আসে সেদিন সমস- পৃথিবীকে ডেকে খবর দিতে ইচ্ছে করে , শোনো তোমরা, আমি ভালোবাসি। ‘ আমি ভালোবাসি’ এই কথাটি অপরিচিত সিন্ধুপারগামী পাখির মতো, কত দিন থেকে, কত দুর থেকে আসছে-সেই কথাটির জন্যেই আমার প্রাণে আমার ইষ্টদেবতা এতদিন অপেক্ষা করছিলেন। স্পর্শ করল আজ সেই কথাটি-আমার সমস- জীবন, আমার সমস- জগৎ সত্য হয়ে উঠল। বালিশের মধ্যে মুখ লুকিয়ে লাবণ্য আজ কাকে এমন করে বলতে লাগল ‘সত্য সত্য, এত সত্য আর কিছু নেই’!
সময় চলে গেল, অতিথি এল না। অপেক্ষার গুরুভারে বুকের ভিতরটা টন টন করতে লাগল, বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে লাবণ্য খানিকটা ভিজে এল জলের ঝাপটা লাগিয়ে। তার পরে একটা গভীর অবসাদে তার মনটাকে ঢেকে ফেললে নিবিড় একটা নৈরাশ্যে; মনে হল ওর জীবনে যা জ্বলবার তা একবার মাত্র দপ্‌ ক’রে জ্বলে তার পরে গেল নিবে, সামনে কিছুই নেই। অমিতকে নিজের ভিতরকার সত্যের দোহাই দিয়ে সম্পূর্ণ করে স্বীকার করে নিতে ওর সাহস চলে গেল। এই কিছু আগেই ওর প্রবল যে একটা ভরসা জেগেছিল সেটা ক্লান- হয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ চুপ করে পড়ে থেকে অবশেষে টেবিল থেকে বইটা টেনে নিলে। কিছু সময় গেল মন দিতে; তার পরে গল্পের ধারার মধ্যে প্রবেশ করে কখন নিজেকে ভুলে গেল তা জানতে পারে নি। এমন সময় যোগমায়া ডাকলেন, বেড়াতে যেতে। ওর উৎসাহ হল না।
যোগমায়া একটা চৌকি টেনে লাবণ্যর সামনে বসলেন, দীপ্ত চোখ তার মুখে রেখে বললেন,
‘ সত্যি করে বলো দেখি লাবণ্য, তুমি কি অমিতকে ভালোবাস?’
লাবণ্য তাড়াতাড়ি উঠে বসে বললে, ‘ এমন কথা কেন জিজ্ঞাসা করছ কর্তামা?’
‘ যদি না ভালোবাস ওকে স্পষ্ট করেই বলো-না কেন। নিষ্ঠুর তুমি, ওকে যদি না চাও তবে ওকে ধরে রেখো না।’
লাবণ্যর বুকের ভিতরটা ফুলে উঠল, মুখ দিয়ে কথা বেরোল না।
‘ এইমাত্র যে দশা ওর দেখে এলুম, বুক ফেটে যায়। এমন ভিক্ষুকের মতো কার জন্যে এখানে ও পড়ে আছে! ওর মতো ছেলে যাকে চায় সে যে কত বড়ো ভাগ্যবতী তা কি একটুও বুঝতে পার না?’
চেষ্টা করে রুদ্ধ কন্ঠের বাধা কাটিয়ে লাবণ্য বলে উঠল, ‘ আমার ভালবাসার কথা জিজ্ঞাসা করছ কর্তামা? আমি তো ভেবে পাই নে, আমার চেয়ে ভালোবাসতে পারে পৃথিবীতে এমন কেউ আছে। ভালোবাসায় আমি যে মরতে পারি। এতদিন যা ছিলুম সব যে আমার লুপ্ত হয়ে গেছে। এখন থেকে আমার আর-এক আরম্ভ, এ আরম্ভের শেষ নেই। আমার মধ্যে এ যে কত আশ্চার্য সে আমি কাউকে কেমন করে জানাব? আর কেউ কি এমন করে জেনেছে?’
যোগমায়া অবাক হয়ে গেলেন। চিরদিন দেখে এসেছেন লাবণ্যর মধ্যে গভীর শানি-, এত বড়ো দুঃসহ আবেগ কোথায় এতদিন লুকিয়ে ছিল! তাকে আসে- আসে- বললেন, ‘মা লাবণ্য, নিজেকে চাপা দিয়ে রেখো না। অমিত অন্ধকারে তোমাকে খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে; সম্পূর্ণ করে তার কাছে তুমি আপনাকে জানাও-একটুও ভয় কোরো না। যে আলো তোমার মধ্যে জ্বলেছে সে আলো যদি তার কাছেও প্রকাশ পেত তা হলে তার কোন অভাব থাকত না। চলে মা, এখনই চলো আমার সঙ্গে।’ দুজনে গেলেন অমিতর বাসায়।