রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(পৃ. ১০৮-১৩০)

[ ১ ০ ৮ ] ভগ্ন তরণী । (গtথা) প্রথম সঙ্গ । জুবিছে তপন, আসিছে অর্ণধার, দিবা হল অবসান, ঘুমায় সাঝের সাগর, করিয়া কনক-কিরণ পান । অলস লহরি তটের চরণে ঘুমে পড়িতেছে চুলি, এ উহার গায়ে পড়েছে এলায়ে ভাঙ্গাচোরা মেঘ গুলি । কনক-সলিলে লহরী তুলিয়৷ তরণী ভাসিয়া যায় ; উড়িয়াছে পাল, নাচিছে নিশান, বহে অনুকুল-বায় । শত কণ্ঠ হতে সাঝের আকাশে উঠিছে হুখের গীত, তালে তালে তার, পড়িতেছে দাড় ধবনিতেছে চারি ভিত । ভগ্নতরী । বাজিতেছে বীণা, বাজিতেছে বাশি, বাজিতেছে ভেরি কত, কেহ দেয় তালি, কেহ ধরে তান, কেহ নাচে জ্ঞানহত । তারকা উঠিছে ফুটিয়া ফুটিয়া, আকাশে উঠিছে শশি, উছলি উছলি উঠিছে সাগর জোছনা পড়িছে খসি । অতি নিরিবিলি, নিরালায় দেখ না মিশিয়া কোলাহলে, ললিতা হোথায়, পতি সাথে তার বসি আছে গলে গলে । আজিতের গলে বাধি বাছপাশ বুকেতে মাথাটি রাখি, "ঢলঢল তনু গল’গল” কথা ঢুলু ঢুলু দুটি অ"াখি । আধো আধো হাসি অধরে জড়িত, সুখের নাহি যে ওর, প্রণয়-বিভল প্রাণের মাঝারে লেগেছে ঘুমের ঘোর । ఏ e S ు : o শৈশব সঙ্গীত । পরশিছে দেহ নিশীথের বায়ু অতি ধীর মৃদু-শ্বাসে, লহরীর আসি করে কলরব তরণীর আশে পাশে । মধুর মধুর সকলি মধুর মধুর আকাশ ধরা, মধু-রজনীর মধুর অধর মধু জোছনায় ভরা। যেতেছে দিবস, চলেছে তরণী অনুকুল বায়ু ভরে। ছোট ছোট ঢেউ মাথা-গুলি তুলি টল মল করি পড়ে । প্রণয়ীর কাল যেতেছে, তুলিয়৷ শত বরণের পাখা, মৃদু বায়ু ভরে লঘু মেঘ যেন সাঝের কিরণ মাখা । আদরে ভাসিয়া গাহিছে অজিত চাহি ললিতার পানে । মরম গলানো সোহাগের গীত আবেশ-আবশ প্রাণে ; – ভগ্নতরী । Y S > গান । পাগলিনী তোর লাগি কি আমি করিব বল্‌ ? কোথায় রাখিব তোরে খুজে না পাই ভূমণ্ডল । আদরের ধন তুমি আদরে রাখিব আমি আদরিণি, তোর লাগি পেতেছি এ বক্ষস্থল । আয় তোরে বুকে রাখি, তুমি দেখ আমি দেখি, শ্বাসে শ্বাস মিশাইব অাখি জলে আখি জল । হরষে কভুবা গাইছে ললিতা অজিতের হাত ধরি, মুখ পানে তার চাহিয়৷ চাহিয়৷ প্রেমে অাখি দুটি ভরি। গান ৷ ওই কথা বল সখা, বল আর বার, ভুাল বাস’ মোরে তাহ বল বার-বার ! কতবার শুনিয়াছি তবুও আবার যাচি, ভাল বাসো মোরে তাহা বল গে। আবার । সান্ধ্য দিকবধু স্তব্ধ ভয় ভারে, একটি নিশ্বাস পড়ে না তার ; ১১২ শৈশব সঙ্গীত । ঈশান-গগনে করিছে মন্ত্রণ মিলিয়া অযুত জলদ-ভার। তড়িত-ছুরিতে বিধিয়া বিধিয়া ফেলিছে অtধারে শতধা করি, দূর ঝটিকার রথ চক্ররব ঘোষিছে অশনি ত্রিলোক ভরি । সহস উঠিল ঘোর গরজন প্রলয় ঝটিকা আসিছে ছুটে, ছিন্ন মেঘ-জল দিগ্বিদিকে ধায়, ফেনিল তরঙ্গ আকুলি উঠে। পাগলের মত তরীযাত্ৰী যত হেথা হোথা ছুটে তরণী পরে, ছিড়িতেছে কেশ, হানিতেছে বুক, করে হাহাকার কাতর স্বরে । ছিন্ন-তার বীণা যায় গড়াগড়ি, অধীরে ভাঙ্গিয়া ফেলেছে বঁাশি, ঝটিকার স্বর দিতেছে ভুবায়ে শতেক কণ্ঠের বিলাপ রাশি । তরণীর পাশে নীরব অজিত, ললিতা অবাক হিয়া, ভগ্নতরী। মাথাটি রাখিয়া অজিতের কাধে রহিয়াছে দাড়াইয়া । কি ভয় মরণে, এক সাথে যবে মরিবে দুজনে মিলি ? মুকুতা শয়নে সাগরের তলে ঘুমাইবে নিরিবিলি ! দুইটা প্রণয়ী বাধা গলে গলে কাছাকাছি পাশাপাশি, পশিবে না সেথা দ্বেষ কোলাহল, কুটিল কঠোর হাসি। ঝটিকার মুখে হীনবল তরী করিতেছে টলমল, উঠিছে, নামিছে, আছাড়ি পড়িছে ভিতরে পশিছে জল । বাধিল ললিতা অজিতের বাহু দৃঢ়তর বাহু ভোরে, আদরে অজিত ললিত-অধর চুমিল হৃদয় ভোরে । ললিতা-কপোলে বাহিয়া পড়িল নয়নের জল দুটি, > ○。 ●">'○ YS 38 শৈশব সঙ্গীত । নবীন সুখের স্বপন, হায়রে, মাঝখানে গেল টুটি । “আয় সখি আয়,” কহিল অজিত হাত ধরাধরি করি— দুজনে মিলিয়া ব্যাপায়ে পড়িল, আকুল সাগর পরি ॥ দ্বিতীয় সৰ্গ । নব-রবি সুবিমল কিরণ ঢালিয়। নিশার অর্ণধার রাশি ফেলিল ক্ষালিয়া । ঝটিকার অবসানে প্রকৃতি সহাস, ংযত করিছে তার এলোথেলো বাস ৷ খেলায়ে খেলায়ে শ্রান্ত সারাটি যামিনী, মেঘ-কোলে ঘুমাইয় পড়েছে দামিনী । থেকে থেকে স্বপনে তে চমকিয়া চায়, ক্ষীণ হাসি খানি হেসে আবার ঘুমায় । শান্ত লহরীরা এবে তপ্রান্ত পদক্ষেপে তীর-উপলের পরে পড়ে কেঁপে কেঁপে। দ্বীপের শৈলের শির প্লাবিত করিয়া, অজস্র কনক ধারা পড়িছে ঝরিয়া । ভগ্নভরণী । S S& মেঘ, দ্বীপ, জল, শৈল, সব স্বরঞ্জিত, সমস্ত প্রকৃতি গায় স্বর্ণ ঢালা গীত । বহু দিন হতে এক ভগ্নতরী खन করিছে বিজন দ্বীপে জীবন যাপন । বিজনতা-ভারে তার অবসন্ন বুক, কত দিন দেখে নাই মানুষের মুখ । এত দিন মৌন আছে না পেয়ে দোসর, শুনিলে চমকি উঠে আপনার স্বর। স্বরেশ প্রভাতে আজি ছাড়িয়া কুটীর ভ্ৰমিতে ভ্ৰমিতে এল সাগরের তীর । বিমল প্রভাতে আজি শান্ত সমীরণ ধীরে ধীরে করে তার দেহ আলিঙ্গন । নীরবে ভ্ৰমিছে কত—একিরে—একিরে – স্বমুখে কি দেখিতেছি সাগরের তীরে ? রূপসী ললনা এক রয়েছে শয়ান, প্রভাত-কিরণ তার চুমিছে বয়ান ; মুদিত নয়ন দুটি, শিথিলিত কায় ; সিক্ত কেশ এলোথেলে শুভ্র বালুকায় । প্রতিক্ষণে লহরীরা ঢলিয়া বেলায়, এলানো কুন্তল লোয়ে কতনা খেলায় । ১১৬ 8**द नहौड । বহু দিন পরে যথা কারামুক্ত জন হর্ষে অধীরিয়া উঠে হেরিয়া তপন, বহুদিন পরে হেরি মানুষের মুখ, উচ্ছসি উঠিল মুখে মুরেশের বুক। দেখিল এখনো বহে নিশ্বাস-সমীর, এখনো তুষার-হিম হয়নি শরীর। যতনে লইল তারে বাহুতে তুলিয়া, কেশ পাশ চারি পাশে পড়িল খুলিয়। সুকুমার মুখ-খানি রাখি স্বন্ধোপরে, দ্রুত পদে প্রবেশিল কুটার ভিতরে । কতক্ষণ পরে তবে লভিয় চেতন, ললিতা সুধীরে অতি মেলিল নয়ন । দেখিল যুবক এক রয়েছে আসীন, বিশাল নয়ন তার নিমেষ বিহীন ; কুঞ্চিত কুন্তল-রাশি গৌর গ্রীবা পরে— এলাইয়া পড়ি আছে অতি অনাদরে । চমকি উঠিল বালা বিস্ময়ে বিহ্বল, সরমে সম্বরে তার শিথিল অঞ্চল । ভয়েতে অবশ দেহ, দুরু দুরু হিয়— আকুল হইয়া কিছু না পায় ভাবিয়া । ভগ্নতরী। SS o সহসা তাহার মনে পড়িল সকলি— সহসা উঠিল বসি নব-বলে বলী । সুরেশের মুখ পানে চাহিয়া চাহিয়া, পাগলের মত বালা উঠিল কহিয়া ; “কেন বঁাচাইলে মোরে কহ-মোরে কহ— দুই প্রণয়ীর কেন ঘটালে বিরহ ? অনন্ত মিলন যবে হইল অদূর— দ্বার হতে ফিরাইয়া আনিলে নিষ্ঠুর ! দয়া কর একটুকু দুখিনীর প্রতি, দিওনা তাপস-বর বাধা এক রতি— মরিব—নি ভাব প্রাণ সাগরের জলে মিলিব সখার সাথে নীল সিন্ধুতলে, উপরে উঠিবে ঝড়—উৰ্ম্মি শৈলাকার, নিক্ষে কিছু পশিবে না কোলাহল তার ” তৃতীয় সৰ্গ । মরুমের ভার বহি– দারুণ যাতনা সহি ললিতা সে কাটাইছে দিন । নয়নে নাই সে জ্যোতি—হৃদয় অবশ অতি শরীর হইয়া গেছে ক্ষীণ । > \b* শৈশব সঙ্গীত । আলু থালু কেশ পাশ, বধিতে নাহিক আশ, উড়িয়া পড়িছে থাকি থাকি । কি করুণ মুখ খানি—একটি নাইক বাণী কেঁদে কেঁদে শ্রান্ত দুটা আখি । যে দিকে চরণ ধায়, সে দিকে চলেছে হায়, কিছুতে ক্ৰক্ষেপ নাই মনে, গাছের র্কাটার ধার, ছিড়িছে অাচল তার লতা-পাশ বাধিছে চরণে । একাকী আপন মনে, ভ্ৰমিতে ভ্ৰমিতে বনে যাইত সে তটিনীর তীরে, লতায় পাতায় গাছে—অর্ণধার করিয়৷ আছে, সেই খানে শুইত স্বধীরে । জল কলরব রাশি, প্রাণের ভিতরে আসি ঢালিত কি বিষাদের ধারা । ফাটিয়া যাইত বুক, বাহুতে ঢাকিয়া মুখ • কাদিয়া কাদিয়া হ’ত সারা । কানন-শৈলের পায়ে, মধ্যান্ত্রে গাছের ছায়ে মলিন অঞ্চলে রাখি মাথ, কত কি ভাবিত হায়—উচ্ছ সি উঠিত বায় ঝরিয়া পড়িত শুষ্ক পাতা । ভগ্নতরী । to Y Sto গভীর নীরব রাতে—উঠিয়া শৈলের মাথে বসিয়া রহিত একাকিনী— তারা-পানে চেয়ে চেয়ে, কত-কি ভাবিত মেয়ে, পড়িত কি বিষাদ কাহিনী । কি করিলে ললিতার—ঘুচিবে হৃদয় ভার সুরেশ না পাইত ভাবিয়া— কাতর হইয়া কত, যুবা তারে শুধাইত, আগ্রহে অধীর তার হিয়া । “রাখ কথা, শুন সখি, একবার বল দেখি, কি করিব তোমার লাগিয়া ? কি চাও, কি দিব বালা, বল গে। কিসের জ্বালা ? কি করিলে জুড়াবে ও হিয়া ?” করুণ মমতা পেয়ে—সুরেশের মুখ চেয়ে অশ্রু উচ্ছসিত দর দরে । ললিত কাতর রবে রুদ্ধকণ্ঠে কহে তবে “সখা গে৷ ভেবনা মোর তরে, আমারে দিওনা দেখা—বিজনে রহিব এক বিজনেই নিপাতিব দেহ । এ দগ্ধ জীবন মোর, কাদিয়া করিব ভোর জানিতেও পারিবে না কেহ ।” S Sa শৈশব সঙ্গীত । সুরেশ ব্যথিত-হিয়া, একেল বিজনে গিয়া ভাবিত-কাদিত আনমনে— প্রাণপণ করি তার, তবুও ত ললিতার পারিল না অশ্র বিমোচনে । সুরেশ প্রভাতে উঠি—সারাটি কানন লুটি তুলিয়া আনিত ফুল-ভার, ফুলগুলি বাছি বাছি, গাথি লয়ে মালাগাছি ললিতারে দিত উপহার । নিৰ্ব্বরে লইত জল- তুলিয়া অানিত ফল আহারের তরে বালিকার । যতন করিয়া কত—পর্ণ-শয্যা বিছাইত । গুছাইত ঘর খানি তার । শীੋੜ ੱਚ। ਸਿ-ਲਮਾਂ কিরণে দহি, করিয়া শতেক অত্যাচার, মনের ভাবনা ভরে অবসন্ন কলেবরে পাড়া অতি হল ললিতার । অনলে দহিছে বুক—শুকায়ে যেতেছে মুখ, শুষ্ক অতি রসনা তৃষায়, নিশ্বাস অনলময় শয্যা অগ্নি মনে হয়, ছটফট করে যাতনায় । ভগ্নতরী । 33> ত্যজিয়া আহার পান সারা রাত্রি দিনমান স্বরেশ করিছে তার সেবা, তুষার্ত অধরে তার ঢালিছে সলিল ধার, ব্যজন করিছে রাত্রি দিবা । নিশীথে সে রুগ্ন-ঘরে, একটি শিলার পরে দীপ-শিখা নিভ’নিভ’ বায়ে, জ্যোতি অতি ক্ষীণতর, দু পা হয়ে অগ্রসর, অন্ধকারে যেতেছে হারায়ে । আকুল নয়ন মেলি, কাতর নিশ্বাস ফেলি, একটিও কথা না কহিয়া, শিয়রের সন্নিধানে সুরেশ সে মুখ পানে একদৃষ্ট্রে রহিত চাহিয়া । বিকারে ললিতা যত—বকিত পাগল মত, ছট ফট করিত শয়নে – ততই সুরেশ ছিয়া—উঠিত গো ব্যাকুলিয়া, অশ্রুধারা পূরিত নয়নে । যখনি চেতনা পেয়ে – ললিত উঠিত চেয়ে, দেখিত সে শিয়রের কাছে মান-মুখ করি নত—নিস্তব্ধ ছবির মত সুরেশ নীরবে বসি আছে । )\9 ১২2, শৈশব সঙ্গীত । মনে তার হত তবে, এ বুঝি দেবতা হবে, অসহায়া অবল বালারে করুণা-কোমল প্রাণে, এ ঘোর বিজন স্থানে রক্ষা করে নিশার অাধারে । অশ্রুধারা দরদরি কপোলে পড়িত ঝরি সুরেশের ধরি হাত খানি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রাণে, আঁখি তুলি মুখ পানে নীরবে কহিত কত বাণী । রোগের অনল-জ্বালা, সহিতে না পারি বাল। করিত সে এ-পাশ ও-পাশ, হেরিয়ে করুণাময় সুরেশের অtখিছয়— অনেক যাতনা হত হ্রাস । ফল মূল অন্বেষণে—যুবা যবে যেত বনে একেল ঠেকিত ললিতার । চাহিত উৎসুক-হিয়। প্রতি শব্দে চমকিয়া” সমীরণে নড়িলে তুয়ার। বনে বনে বিহুরিয়া—ফুল ফল আহরিয়া— সুরেশ আসিত যবে ফিরে— অণখি পাতা বিমুদিত – অতি স্থতু উঠাইত হাসিটি উঠিত ফুটি ধীরে । ভগ্নতরী । ృ్చలి দিন রাত্ৰি নাহি মানি—বনৌষধি তুলি অনি স্বরেশ করিছে সেবা তার । রোগ চলি গেল ধীরে, বল ক্রমে পেলে ফিরে, স্বস্থ হল দেহ ললিতার । রোগ-শষ্য তেয়াগিয়া—মুক্ত সমীরণে গিয়া, মন-সুখে বনে বনে ফিরি, পার্থীর সঙ্গীত শুনি – সিন্ধুর তরঙ্গ গুণি, জীবনে জীবন এল ফিরি । চতুর্থ সর্গ। বসন্ত-সমীর আসি, কাননের কানে কানে প্রাণের উচ্ছ সি ঢালে নব যৌবনের গানে। এক ঠাই পাশাপাশি, ফুটে ফুল রাশি রাশি— গলাগলি ফুলে ফুলে, গায়ে গায়ে ঢলাঢলি । খেলি প্রতি ফুল পরে, স্বরভি-রাশির ভরে । শ্রান্ত সমীরণ পড়ে প্রতি পদে টলি টলি । কোথায় ডাকিছে পাখী, খুজিয়া না পায় অাখি বনে বনে চারিদিকে হাসিরাশি বাদ্যগান। দুরগম শৈল যত, ঢাকা লতা গুলো শত তাদের হরিত হৃদে তিল মাত্র নাই স্থান । S及8 শৈশব সঙ্গীভ । ললিতার অাখি হতে শুকায়েছে অশ্রুধার । বসন্ত-গীতের সাথে বাজিছে হৃদয় তার । পুরাণে পল্লব ত্যজি নব-কিশলয়ে যথা চারি দিকে বনে বনে সাজিয়াছে তরুলতা,— তেমনি গে। ললিতার হৃদয় লতাটি ঘিরে নবীন হরিত-প্রেম বিকশিছে ধীরে ধীরে । ললিতা সে সুরেশের হাতে হাত জড়াইয়া বসন্ত হসিত বনে, ভ্ৰমিত হরষ মনে, করুণ চরণক্ষেপে ফুল রাশি মাড়াইয়া । একটি দুর্গম শৈল সাগরে পড়েছে বুকি অতি ক্লেশে সেথা উঠি, বসিয়া রহিত দুটি, সায়াহু কিরণ, জলে করিত গো ঝিকিমিকি । লহরীরা শৈল পরে, শৈবাল গুলির তরে দিন রাত্রি খুদিতেছে নিকেতন শিলাসার । ফুল-ভরা গুলাগুলি, সলিলে পড়েছে বুলি” তরঙ্গের সাথে সাথে ওঠে পড়ে শতবার । বিভলা মেদিনীবালা জোছনা-মদিরা পানে হাসিছে সরসীখানি কাননের মাঝখানে, সুরেশ যতনে অতি বাধি তরুশাখা গুলি, নৌকা নিরমিয়া এক সরসে দিয়াছে খুলি,— ভগ্নভরী । >&Q。 চড়ি সে নৌকার পরে, জোৎস্না-সুপ্ত সরোবরে সুরেশ মনের সুখে ভ্ৰমিত গো ফিরি ফিরি, ললিতা থাকিত শুয়ে — কোলে তার মাথ৷ পুয়ে কখন বা মধুমাখা গান গেয়ে ধীরি ধীরি। কখন বা সায়াহ্লের বিষণ্ণ কিরণ-জালে, অথবা জোছনা যবে কাপে বকুলের ডালে, মৃদুস্তু বসন্তের স্নিগ্ধ সমীরণ লাগি, সহসা ললিতা-হৃদি আকুলি উঠিত যদি– সহসা দুয়েক কথা স্মরণে উঠিত জাগি,— সহসা একটি শ্বাস বাহিরিত আনমনে, দুইটি অশ্রুর রেখা দেখা দিত দুনয়নে – অমনি সুরেশ আসি ধরি তার মুখখানি, কহিত করুণ-স্বরে কত অাদরের বাণী । মুছাইত অ'খিধারা যতন করিয়া অতি, শরত মেঘের মত হৃদয় অর্ণধার যত মুহুর্তে ছুটিত আর ফুটিত হাসির জ্যোতি । অমনি সে স্বরেশের কাধে মুখ লুকাইয়। আধো কাদি অাধো হাসি, হৃদয়ের ভার-রাশি সোহাগের পারাবারে দিত সব বিসর্জিয়। ما جة لا শৈশব সঙ্গীত । পঞ্চম সর্গ। নারিকেল-তরুকুঞ্জে বসিয়া দোহায় একদা সেবিতেছিল প্রভাতের বায় ;— সহস দেখিল চাহি প্রাণপণে দাড় বাহি তরণী আসিছে এক সে দ্বীপের পানে, দেখিয়া দোহার হিয়া উঠিল গো উথলিয়া বিস্ময় হরষ আর নাহি ধরে প্রাণে । হরষে ভাবিল দোহে দেশে যাবে ফিরে কুটার বাধিবে এক, বিপাশার তীরে। দুখ শোক ভুলি গিয়—একত্রে দুইটি হিয়৷ সুখে জীবনের পথে করিবে ভ্রমণ একত্রে দেখিবে দোহে সুখের স্বপন । উঠিল তরণী পরে, অনুকুল বায়ু ভরে” স্বদেশে করিল আগমন ; বাধিয়া পরণ-শালা, না জানিয়া কোন জ্বালা করিতেছে জীবন যাপন । নির্বর কানন নদী, দ্বীপের কুটার যদি তাহাদের পড়িত স্মরণে ভগ্নতরী । Ֆ ՀԳ দুটিতে মগন হয়ে, অতীতের কথা লয়ে ফুরাতে নারিত সারাক্ষণে । আধ’ ঘুমঘোরে প্রাতে, পল্লব-মৰ্ম্মর সাথে শুনি বিপাশার কলস্বর— স্বপনে হইত মনে, দূর সে দ্বীপের বনে শুনিতেছে নিঝর ঝঝর । দ্বীপের কুটির খানি, কল্পনায় মনে আনি ভাবিত সে শূন্য আছে পড়ি, ভগ্ন ভিতে উঠে লতা, গৃহসজ্জা হেথা হোথা প্রাঙ্গণে যেতেছে গড়াগড়ি ; হয় ত গে৷ কাটা গাছে এতদিনে ঘিরিয়াছে ললিতার সাধের কানন— এত দিনে শাখা জুড়ি ফুটেছে মালতী কুড়ি দেখিবার নাই কোন জন । সেই যে শৈলেতে উঠি বসিয়া রহিত দুট, নারিকেল কুঞ্জটির কাছে— চারিদিকে শিলা রাশি, ছড়াছড়ি পাশাপাশি তাহার তেমনি রহিয়াছে। মজিয়া কল্পনা-মোহে, কত কি ভাবিত দোহে মাঝে মাঝে উঠিত নিশ্বাস, >&bア শৈশব-সঙ্গীত । অতীত আসিত ফিরে, গায়ে যেন ধীরে ধীরে লাগিত সে দ্বীপের বাতাস । একদা চাদিনী রাতি, দুজনে প্রমোদে মাতি গেছে এক বিজন কাননে— ভ্ৰমিতে ভ্ৰমিতে তথা, কহিতে কহিতে কথা কতদূরে গেল আন মনে । সহসা সে বিভাবরী, আইল অাধার করি— গগনে উঠিল মেঘরাশি, পথ নাহি দেখা যায়, ক্ষণে ক্ষণে ঝলকায় বিদ্যুতের পরিহাস-হাসি । প্রতি বজ গরজনে, ললিত শঙ্কিত মনে স্বরেশে জড়ায় দৃঢ় তর । অবসর পদ তায়, প্রতি পদে বাধা পায় তরাসেতে তনু থর থর । ঝলিল বিদ্যুৎ-শিখা, ভগ্ন এক অট্টালিকা অদূরেতে প্রকাশিল তথা— কক্ষ এক হতে তার, দু-আলোক ধার কহে কি রহস্যময় কথা ! চলিল আলয় পানে, দোহে আশ্বাসিত প্রাণে সহসা জাগিল নীরবতা, ভগ্নতরী। ১২৯ উঠিল সঙ্গীত-স্বর, বালার হৃদয় পর প্রবেশিল দু একটি কথা— “পাগলিনী তোর লাগি কি আমি করিব বল কোথায় রাখিব তোরে খুজে না পাই ভূমণ্ডল ।” . কঁাপিছে বালার বুক, . নীল হয়ে গেছে মুখ, কপোলে বহিছে ঘৰ্ম্ম জল— ঘুরিছে মস্তক তার, চরণ চলে না আর, শরীরে নাইক বিন্দুবল । তবুও অবশ মনে অলক্ষিত আকর্ষণে চলিল সে ভীষণ অালয়ে, অঙ্গন হইয়া পার, খুলি এক জীর্ণ দ্বার গৃহে পদাপিল ভয়ে ভয়ে। ভগ্ন ইষ্টকের পরে, দীপ মিট মিট করে বিদ্যুৎ ঝলকে বাতায়নে, cर्डनि গৃহ-ভিত্তি যত, বটমূল শত শত হেথা হোথা পড়িছে নয়নে । বিছানো শুকানো পাতা, শুয়ে আছে রাখি মাথা, পুরুষ একটি শ্রান্ত-কায়, অতি শীর্ণ দেহ তার এলোথেলো জটাভার, মুখশ্ৰী বিবর্ণ অতি ভায় । So రిe শৈশব সঙ্গীত । জ্যোতিহীন নেত্র তার ; পাতাটিও তুলিবার নাই যেন আখির শকতি; দ্বারে শুনি পদধবনি হৃদয়ে বিস্ময় গণি তুলে মুখ ধীরে ধীরে অতি । সহসা নয়নে তার জ্বলিল অনল, সহসা মুহুর্ত তরে দেহে এল বল । “ললিতা” “ললিতা” বলি করিয়া চীৎকার— দু-পা হয়ে অগ্রসর-কম্পবান কলেবর শ্রান্ত হয়ে ভূমিতলে পড়িল আবার । করুণ নয়নে অতি—ললিতা-মুখের প্রতি অজিত রহিল স্তব্ধ একদৃষ্ট্রে চাহি ; দীপশিখা অতি স্থির – স্তব্ধ গৃহ সুগভীর, চারিদিকে একটুকু শাড়াশব্দ নাহি । দুই হাতে আঁখি চাপি, থরথর কপি কঁপি মুচ্ছিয়। ললিত বালা পড়িল অমনি ; বাহিরে উঠিল ঝড়, গর্জিল অশনি, জীর্ণ গৃহ কঁপাইয়-ভগ্ন বাতায়ন দিয়া প্রবেশিল বায়ুচ্ছাস গৃহের মাঝারে, নিভিল প্রদীপ,-গৃহ পূরিল আঁধারে ।