শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত/আদি খণ্ড/প্রথম তরঙ্গ/৩

টেমপ্লেট ত্রুটি: দয়া করে খালি প্যারামিটার অপসারণ করবেন না (শৈলীর নির্দেশিকা টেমপ্লেটের নথি দেখুন)।

পুনর্ব্বা‌র অবতারের প্রয়োজন ও পূর্ব্ব‌
পূর্ব্ব‌ পুরান ও ভাগবত প্রসঙ্গ

ত্রিপদী

ত্রেতাযুগে সূর্য্য বংশে, এক বিষ্ণু চতুরংশে,
হ’ল দশরথের নন্দন।
দ্বাপরেতে কারাগারে, জন্ম বসুদেব ঘরে,
যশোদার হৃদয় রতন।।
যোগমায়ার প্রভাবে, দেবকীর গর্ভস্রাবে,
রোহিনী গর্ভেতে আকর্ষন।
যোগমায়া আকর্ষণে, জন্মিলেন বৃন্দাবনে,
বলরাম নাম সংকর্ষণ।।
নন্দের নন্দন যেই, শচীসুত হৈল সেই,
নিত্যানন্দ হৈল বলরাম।
সেই লীলা সম্বরণ, খেতর জন্মধারণ,
নিত্যানন্দ হৈল নরোত্তম।।
শ্রীঅদ্বৈত রামচন্দ্র, শ্রীনিবাস গৌরচন্দ্র,
তিন প্রভু প্রেম প্রচারিলা।
যে জন্যে এ অবতার, পশ্চাতে করি প্রচার,
ওঢ়াকান্দী কৈলা শেষ লীলা।।
যস্য পুত্র যস্য নাম, যথা হ’ল জন্মধাম,
করিলাম লিখিতে আশায়।
রসিক সজ্জন বিজ্ঞ, দেহ মোরে এই ভাগ্য,
মনোজ্ঞ নিস্ফল যেন নয়।।
মানব কুলে আসিয়ে, যশোমন্ত সুত হ’য়ে,
জন্ম নিল সফলা নগরী।
প্রচারিল গূঢ়গম্য, সূক্ষ্ম সনাতন-ধর্ম্ম,
জানাইল এ জগত ভরি।।

---


পয়ার

কি ধন্য প্রভুর লীলা এই কলিযুগে।
সব লীলা হ’তে ধন্য হ’ল ভক্তিযোগে।।
দশরথ-গৃহে জন্ম লইয়া শ্রীরাম।
ভূভার হরণ পূর্ণ ভক্ত নমস্কাম।।
বৈকুণ্ঠনায়ক হরি হৈল লীলাকারী।
নন্দের নন্দন কৃষ্ণ গোলোকবিহারী।।
ভূভার হরণ ভক্ত মনোরম্য কারী।
ভক্তসঙ্গে প্রেমরস মধুর মাধুরী।।
তিন শক্তি একত্র হইয়া ভগবান।
দেবকীর বায়ুগর্ভে দুই শক্তি যান।।
ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে মীমাংসা র’য়েছে।
যশোদার গর্ভে মহাবিষ্ণু জন্মিয়াছে।।
চারি শক্তি একযোগে হয় কৃষ্ণলীলা।
ভাগবতে সুকদেব মীমাংসা করিলা।।
বহুত প্রমাণ লাগে সে সব লিখিতে।
অন্যান্য প্রমাণ গ্রন্থে র’য়েছে বলিতে।।
চৈতন্যচরিতামৃত তাহার প্রমাণ।
বহুযুগ গত পরে এল ভগবান।।
নন্দসুত ব’লে যারে ভাগবতে গাই।
সেই কৃষ্ণ অবতীর্ণ চৈতন্য গোঁসাই।।
বহুত দ্বাপর কলি আসে আর যায়।
স্বয়ং এর অবতার তাতে নাহি হয়।।
অষ্টাবিংশ মন্বন্তর শেষ যেই কলি।
অবতীর্ণ ভক্তবৃন্দ লইয়া সকলি।।
যে দ্বাপরে অন্য শক্তি বিবর্জ্জিত হ’য়ে।
গোলোক বিহারী লীলা গোকুলে আসিয়ে।।
দ্বাপরের শেষে সেই কলির সধ্যায়।
শ্রীগৌরাঙ্গরূপে প্রভু জন্ম নদিয়ায়।।
এই সেই কলি এই অবতার।
অনর্পিত প্রেমভক্তি অর্পিল এবার।।
সেই ত গৌরাঙ্গ প্রভু এই কলিকালে।
অবতীর্ণ নদিয়াতে হরি হরি বলে।।
উৎকলেতে লীলা সাঙ্গ অল্পেতে করিল।
মনের কামনা বহু মনেতে রহিল।।
চৈতন্য চরিতামৃত মঙ্গলাচরণে।
প্রভুর মনের কথা লিখিল যতনে।।
দাস্য সখ্য বাৎসল্য মধুর চারিরস।
চারিভাবে ভক্ত যত কৃষ্ণ তার বশ।।
আপনিও এই ধর্ম্ম করিব যাজন।
ইহাদ্বারা করাইব ভক্তের শিক্ষণ।।
সন্ন্যাস করিল প্রভু এই ধর্ম্ম লয়ে।
রাগানুগা প্রেমভক্তি হাটে বাহুড়িয়ে।।
গৌড়িয়ার ভক্ত তার নাহি পায় লেশ।
শুদ্ধাচার সেবা ভক্তি নাম ভাবাবেশ।।
আটচল্লিশ বর্ষ মধ্যে প্রভু দিল ফাকী।
এইত প্রতিজ্ঞা এক রহিলেক বাকী।।

কাশীতে বসিয়া সনাতনে শিক্ষা দিলা।
সনাতনে শিক্ষাকালে অনেক কহিলা।।
অকামনা প্রেম ভক্তি কেবলার রীতি।
আপনি বা তাহা কই পারিল বর্ত্তাইতি।।
কেবলার রীতি এই কৃষ্ণেতে ঐকান্তি।
তার আগে ভুক্তি মুক্তি সকলি অশান্তি।।
কৃষ্ণগত প্রাণ হ’বে কৃষ্ণ সুখে সুখী।
কার দেহ লয়ে প্রভু মারে ঝাকি ঝুকি।।
কৃষ্ণেতে অর্পিত দেহ এ দেহ কৃষ্ণের।
আছুক অন্যের কার্য নিজে হৈল ফের।।
হাত পা বাহির হ’য়ে সন্ধি কল ছুটে।
কচ্ছপ আকার হ’য়ে ক্ষণে পৈশে পেটে।।
যদ্যপি প্রভুর মনে থাকে কোন ভাব।
যা দেখিনু তা লিখিনু গ্রন্থের যে ভাব।।
তবেত প্রভুর মনে কামনা রহিল।
অকমনা প্রেমভক্তি কই পাওয়া গেল।।
কামনা রহিল আছে দৃষ্টান্ত তাহার।
অদ্বৈতের করে ধরি বলে বার বার।।
বৈকুণ্ঠাদ্যে নাহি যেই লিলার প্রচার।
শেষ যে করিব লীলা মোরে চমৎকার।।
তুমি আমি নিত্যানন্দ এই তিন জন।
করিব নিগূঢ় লীলারস আস্বাদন।।
তুমি হ’বে রামচন্দ্র আমি শ্রীনিবাস।
দাদা নিত্যানন্দ হবে নরোত্তম দাস।।
শেষ লীলা তিন জন করিল আসিয়া।
প্রচারিল প্রেমভক্তি খেতর যাইয়া।।
নিগূঢ় ভজন লীলা করে তিন জন।
ভাগ্যবান ভক্ত যারা করে দরশন।।
তাদের ভজনগ্রন্থ পড়ে দেখ ভাই।
অকামনা প্রেমভক্তি তাতে বর্ত্তে নাই।।
উদ্দেশ্য থাকিল পুন আসিয়া ধরায়।
ঐ প্রেম আস্বাদিবে তিন মহাশয়।।
সে কারণ অবতার হৈল প্রয়োজন।
সফলা নগরী যশোমন্তের নন্দন।।
শচীর নন্দন যাবে পড়ে পাঠশালে।
পড়ুয়ার সঙ্গে সদা হরি হরি বলে।।
যে জন না বলে হরি কর্ম্মসূত্রে মরে।
ঠেঙ্গা ল’য়ে যায় প্রভু তারে মারিবারে।।
সেই গিয়া করে সায় পাষণ্ড সঙ্গেতে।
মারিব মিশ্রের সুতে আইল মারিতে।।

অন্তর্য্যামী ভগবান জানিলেন চিতে।
এরূপে না পারিলাম হরিনাম দিতে।।
একবার মাতাকে দিলাম পরিচয়।
গ্রহণের বেড়ি গড়ি দিল মোর পায়।।
স্বীয় পরিচয় তাহে দিবার কারণে।
উদয় হইনু হাত গণকের স্থানে।।
সে মোরে গনিয়া বলে নন্দের নন্দন।
এবে শচীসুত জীব উদ্ধার কারণ।।
কর্ম্মসুত্রে বদ্ধ জীব না চিনিল মোরে।
গণিয়া দেখিয়া বলে একি হ’তে পারে।।
প্রভু কন তার পূর্ব্ব জন্মে কেবা আমি।
ঠিক করি গণনা করহ দেখি তুমি।।
গণক বলেন ছিলে অযোধ্যায় ধাম।
কৌশল্যা জননী পিতা দশরথ নাম।।
তুমি ছিলা রামচন্দ্র জগতের মূল।
ফিরে বলে এ গণনা হইয়াছে ভুল।।
বদ্ধ কর্ম্মসুত্রে জীবে উদ্ধারি কেমনে।
কাঙ্গাল হইব আমি তাহার কারণে।।
কেশ মুড়ি কড়া ধরি হইব কাঙ্গাল।
ঘরে ঘরে মেগে খাব হইয়া বেহাল।।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া পুরাইব মনস্কাম।
হাতে ধরি পায়ে ধরি দিব হরিনাম।।
কাঙ্গাল দেখিয়া মোরে দয়া উপজিবে।
চিত্ত দ্রবীভূত হ’য়ে হরিনাম ল’বে।।
মুকুন্দ মুরারী আর নিত্যানন্দ ল’য়ে।
কহিলেন মনোকথা নিভৃতে বসিয়ে।।
পরে কহিলেন শচী মাতাকে কাঁদিয়া।
তাহা শুনি শচীরাণী অধৈর্য্য হইয়া।।
কহিছেন শচী মাতা বাপরে নিমাই।
ছেড়ে যদি যাও রাখিবার সাধ্য নাই।।
অনেক প্রলাপ মাতা করিল তাহাতে।
সান্ত্বনা করিল মাকে মধুর বাক্যেতে।।
শচী বলে তুমি যদি মোরে ছেড়ে যাবে।
এ ব্রহ্মাণ্ডে তবে আর মাতা কে মানিবে।।
এ সময় গৌরাঙ্গ করিল অঙ্গীকার।
তোমাকে ছাড়িতে মাতা শক্তি কি আমার।।
শোধিতে নারিব মাতা তব ঋণ ধার।
জন্মে জন্মে তব গর্ভে হ’ব অবতার।।
ধর্ম সংস্থাপন আর জীবের উদ্ধার।
এরূপ লইব জন্ম আর দুইবার।।

তারপর শ্রীনিবাসরূপে জন্ম নিল।
নরোত্তম রূপে নিত্যানন্দ জনমিল।।
আর এক জন্ম বাকী রহিল প্রভুর।
এই সেই অবতার শ্রীহরি ঠাকুর।।
মহানন্দ চিদানন্দ রচিতে পুস্তক।
পয়ার প্রবন্ধ ছন্দে রচিল তারক।।