প্রধান মেনু খুলুন


১২

 সেই প্রিয়দেহ অনাবৃত যজ্ঞশালায় পড়িয়াছিল, তৎপার্শ্বে নন্দিকেশ্বর আত্মহারা হইয়া কাঁদিতেছিল; দেবাদিদেব সেই দেহ অঙ্কে তুলিয়া লইলেন। সেই মৃতদেহের ভুজলতা তাঁহার কণ্ঠে লগ্ন হইল। শিব জগত ভুলিয়া সেই আনন্দে সতীকে লইয়া পর্ব্বতকন্দরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।

 সেই মৃতদেহ তাঁহার স্বন্ধে স্থাপিত হওয়াতে রৌদ্রে শুষ্ক হইল না, বাত্যাবৃষ্টিতে বিচলিত বা গলিত হইল না। একটি অম্লান কুসুমের মাল্যের ন্যায় তাহা স্কন্ধাবলম্বী হইয়া রহিল। সতীর বিধুমুখের উপর শিব-ললাটের অর্দ্ধেন্দুর জ্যোতিঃ পড়িতে লাগিল, সেই জ্যোতিঃ উদ্ভাসিত হইয় তাঁহার কেশ-বন্ধনীতে লগ্ন জবাকুসুমটি দীপ্ত মরকতের ন্যায় দেখা যাইতে লাগিল। দেবীর বল্কলবাস শিবের ব্যঘ্র-চর্ম্মকে আদরে স্পর্শ করিল; শিবের বিভূতি সতীর কোমল অঙ্গে যেন সস্নেহে স্বামিস্পর্শ আঁকিয়া দিল। একি মহিমান্বিত ছবি। চন্দ্রচূড় যেন হিমবানের ন্যায়—উন্নত দেহশ্রী, গঙ্গাধারা-নিক্কণে জটাকলাপ-নিনাদিত, তদূর্দ্ধে অর্দ্ধশশী, তাঁহার বরাঙ্গ অবলম্বন করিয়া অতলীকুসুমবর্ণা, বল্কলবসনা দেবী নিদ্রিতার ন্যায়।

 মহাদেব সেই স্পর্শসুখে উন্মত্ত হইলেন। তিনি কখনও মনে করেন, বধূবেশী সতী দক্ষগৃহ হইতে কৈলাসে তাঁহার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। তাঁহার কেশকলাপ সুগন্ধি তৈলনিষেকে উজ্জ্বলকান্তি, বেণীবদ্ধ স্বর্ণঝাঁপা পৃষ্ঠে দুলিতেছে, সিঁথীতে সিঁথীপাটি এবং বাহুতে কঙ্কণরাজিত, রক্তপট্টবাস মস্তকের উপর স্বর্ণবিন্দুসহ ঝলমল করিতেছে; চন্দনদীপ্তমূর্ত্তি সতী তাঁহার বামভাগে দাঁড়াইয়াছেন। কখনও ভাবেন, সতী কৈলাসে আসিয়া অঙ্গদ কঙ্কণ ত্যাগ করিতেছেন, যোগিনী সাজিবার জন্য রক্তপট্টবাস ত্যাগপূর্ব্বক বল্কল পরিতেছেন, সিঁথিপাটী ফেলিয়া দিয়া জবাফুল পরিতেছেন, স্বর্ণ-কুণ্ডল ফেলিয়া কর্ণিকার পুষ্পের কুণ্ডল গড়িয়া পরিতেছেন এবং সরসী-তীরে দাঁড়াইয়া আপনার যোগিনীর মূর্ত্তি প্রতিবিম্বিত দেখিয়া বিধুমুখে ঈষৎ হাস্য করিতেছেন। কখনও ভাবেন, যেন দেবী নদীর হস্ত হইতে সিদ্ধি ঘোটনদণ্ড নিজে গ্রহণ করিয়া সিদ্ধি ঘুটিতেছেন, কখনও বা সৌগন্ধিক বনের ফুল আনিয়া তাঁহার পদে অর্পণপূর্ব্বক মৃদুহাস্য করিতেছেন, কখনও তাঁহাকে অন্নব্যঞ্জনাদি পরিবেশন করিতে ক্ষীণাঙ্গে শ্রমজনিত স্বেদবিন্দু গড়াইয়া পড়িতেছে,—বিধুমুখে অপূর্ব্ব স্ফুর্ত্তি বিকশিত হইতেছে ও এক হস্তে বায়ু চালিত অবগুণ্ঠন টানিয়া দিতেছেন। কখনও দেখেন, সতী যেন স্নিগ্ধস্পর্শে তাঁহার পদসেবা করিতেছেন, সেই সুখ-স্পর্শে যোগানন্দ টুটিয়া যাইতেছে; কখনও বিল্বমূলে বসিয়া তিনি তাঁহাকে জয়ন্ত ও শবরের কাহিনী শুনাইতেছেন, সতী একাগ্র হইয়া শুনিতেছেন। কখনও দেখেন, কাঠের বোঝা হস্তে করিয়া নন্দী দাঁড়াইয়া আছে, সতী রন্ধনশালায় তাহা হইতে শুষ্ক কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতেছেন; কখনও বা বিজয়া তাঁহার আগুন্‌ফলম্বী মুক্ত-কেশপাশ আঁচড়াইয়া দিতেছেন। কখনও রন্ধন-স্থালীর কালী পদে লগ্ন হইয়াছে, অলকানন্দার তীরে বসিয়া তিনি বল্কলের খুঁট দিয়া তাহা মার্জ্জনা করিতেছেন; কখনও উদ্‌গ্রীব হইয়া শিবের থলিয়াতে ধুস্তূর ফল আছে কি না তাহাই পরীক্ষা করিতেছেন, কখনও মৃদু মনোরম বাক্যে শিবের কর্ণে অমৃত-নিষেক করিয়া পার্ব্বত্যোৎসবে মিলিত হইবার জন্য নন্দীর নিমিত্ত এক দিনের বিদায় প্রার্থনা করিতেছেন।

 শিব নৃত্য করিতে করিতে চলিয়া যাইতেছেন, পাহাড় নদী সরিয়া যাইয়া তাঁহার পথ করিয়া দিতেছে। শিব সতীর স্পর্শে বিরহব্যথা ভুলিয়া গিয়াছেন, অপূর্ব্ব মিলনানন্দে মাতোয়ারা হইয়া পড়িতেছেন। শিব দেখিলেন, সতীর স্পর্শ তাঁহার বাহু-বল, সতীর প্রেম তাঁহার যোগবল, সতীর সৌন্দর্য্য তাঁহার ত্রিনেত্রের বিলাস—আকাশের মেঘমালায় সতীর কেশপাশ মুক্ত, সমুদ্রের তরঙ্গ-ভঙ্গে সতীর বল্কলবসনের ভঙ্গী, পর্ব্বতের গাত্রে সতী বল্লরীরূপে, পুষ্পরূপে নয়নাভিরাম।

 এই জগৎ তিনি আপনার ও সতীর প্রকাশ বলিয়া বুঝিলেন; তিনি নিশ্চেষ্ট, অচল—সতী ক্রীড়াশীল, গতিময়ী ও তাঁহাকে কার্য্যের প্রেরণা দিতেছেন। তাঁহার রূপ নাই, গুণ নাই, তিনি অক্ষয়, অদ্বিতীয়। সতী রূপবতী, গুণবতী, তাঁহাকে নিরন্তর মুগ্ধ রাখিতে শক্তিশালিনী। সতীই তাঁহার সুখ—সতীই তাঁহার দুঃখ। সতীকে বাদ দিলে ত্রিজগতের সঙ্গে তিনি সম্বন্ধরহিত হইয় পড়েন, অপর দুই চক্ষু দৃষ্টিহারা হইয়া পড়ে,—কেবল ললাটের নেত্র কোন ঊর্দ্ধ রাজ্যে লক্ষ্যবদ্ধ হইয়া নিশ্চল হইয়া যায়। ত্রিজগৎ তাহার কোন সন্ধান বলিতে পারে না।

 এই আনন্দে বিহ্বল, প্রিয়তমাস্পর্শ-সুখে উন্মত্ত শিব নৃত্য করিয়া চলিতেছেন। যুগ যুগ চলিয়া গেল এই নৃত্য—এই পর্য্যটনের বিরাম নাই। যোগী ভোগী হইয়া পড়িলেন, শিব মায়াযুক্ত হইলেন। জগৎ আবার অকল্যাণ গণনা করিল।

 তখন বিষ্ণু সূক্ষ্মরূপে অধিষ্ঠান করিয়া চক্র দ্বারা সতীর দেহ খণ্ড বিখণ্ড করিয়া কাটিয়া ফেলিলেন।

 যেখানে ভারতীয় উপসাগর গুর্জ্জর-দেশের শৈল-কঠিন তটদেশে তরঙ্গাভিঘাত করিতেছে, সেই করাচির উত্তরস্থিত ছিঙগুলায় সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পতিত হইল।

 পঞ্চনদের তীরে আম্বালার সন্নিহিত চিত্রিত মেঘমালার ন্যায় পর্ব্বতশ্রেণীর উপান্তে জ্বালামুখীতে বিষ্ণুচক্রকর্ত্তিত হইয়া সতীর জিহ্বা পতিত হইল।

 বঙ্গদেশের দক্ষিণ প্রান্তস্থিত, বঙ্গোপসাগর-চুম্বিত তালখর্জ্জুরনিষেবিত বাক্‌লাপরগণান্তর্গত শিকারপুর সন্নিহিত সুগন্ধায় দেবীর নাসিকা পতিত হইল।

 বীরভূম জেলার অন্তর্গত আমোদপুরের সন্নিহিত লাভ-পুরে দেবীর ওষ্ঠ,—সীতাবিরহ-খিন্ন রামচন্দ্রের পদচারণপুণ্য জন-স্থানে দেবীর চিবুক, ভূস্বর্গ কাশ্মীরে দেবীর কণ্ঠ, কালীঘাটে অঙ্গুলী, বারাণসীতে কুণ্ডল, এই প্রকার ৫১ ভাগে বিভক্ত দেবীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিভিন্ন স্থানে পতিত হইল। সমস্ত ভারতবর্ষের সেই পুণ্য দেহাবশেষ বিক্ষিপ্ত হইয়া তত্তৎস্থান-সমূহকে পীঠস্থানে পরিণত করিল। সেই পুণ্যে ভারতবর্ষে পাতিব্রত্য ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠা পাইল। এদেশে যে রমণী স্বামী-প্রেমে প্রাণত্যাগ করেন, তিনি অদ্যাপি সতীর নামে পরিচিত হইয়া থাকেন। ভারতবর্ষের শত শত অজ্ঞাত পল্লীতে যজ্ঞাগ্নির ন্যায় পবিত্র চিতাগ্নিতে যুগে যুগে মহিলাগণ স্বামীপ্রেমে আত্মোৎসর্গ করিয়া ‘সতী’ নামে পূজা পাইয়াছেন।

 এখনও স্বামী-নিন্দাসহনাক্ষম সাধ্বীর নিশ্বাস এদেশের অন্তঃপুরকে পবিত্র করিতেছে; প্রিয়তমার শব স্বন্ধে ধারণ করিয়া ভোলানাথ যে উন্মত্ত অবস্থায় ভূপর্য্যটন করিয়াছিলেন, সহধর্ম্মিণীর প্রতি এই প্রগাঢ় অনুরাগের আদর্শ এদেশের চিত্রকরগণ আঁকিয়া ও কবিগণ বর্ণনা করিয়া ধন্য হইয়া থাকেন।

 সহসা মহাদেব বুঝিলেন, তাঁহার স্কন্ধে আর সেই স্পর্শ নাই। চমৎকৃত হইয়া দাঁড়াইয়া কণ্ঠে ও স্কন্ধে হস্ত-প্রদানপূর্ব্বক দেখিলেন—তাহা শূন্য। অকস্মাৎ তাঁহার ফুল্লারবিন্দতুল্য যুগ্ম নেত্র নিমীলিত হইল এবং ললাটনেত্র তীক্ষ্ণ বর্চ্চিঃ বিস্তার করিয়া হুতাশনের ন্যায় জ্বলিয়া উঠিল—কামনার শেষ সেই নেত্রের দৃষ্টিতে পুড়িয়া গেল। তিনি সূক্ষ্মতত্ত্বে আরূঢ় হইয়া যোগানদে নিমগ্ন হইলেন। ত্রিজগতের সঙ্গে তখন আর তাঁহার কোন সম্বন্ধ রহিল না। আবার কত যুগ যুগান্তর পরে সেই সমাধি ভঙ্গ হইবে—দেবতারা সম্ভ্রমের সহিত তাহার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।