সিরাজদ্দৌলা/অন্ধকূপ-হত্যা—রহস্য-নির্ণয়

সিরাজদ্দৌলা - অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (page 317 crop).jpg

ষোড়শ পরিচ্ছেদ।


অন্ধকূপ-হত্যা—রহস্যনির্ণয়।

 যে অন্ধকুপ-হত্যার লোমহর্ষণ অত্যাচারকাহিনী সভ্যজগতের নিকট নবাব সিরাজদ্দৌলাকে নরশোণিতলোলুপ নৃশংস নরপতি বলিয়া শত কলঙ্কে কলঙ্কিত করিয়া রাখিয়াছে, দুর্ভাগ্যক্রমে এদেশের অধিবাসীদিগের নিকট তাহার অস্তিত্ব পর্য্যন্তও সর্ব্বজনসম্মত সন্দেহশূন্য ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে নাই।[১]

 এ কালের লোকের কথা বলিতে চাহিনা;— আমরা একালের লোক, ইংরাজ-ইতিহাসলেখকদিগের বর্ণনালালিত্যে বিমুগ্ধ হইয়া অন্ধকূপ হত্যার শোকসমাচার পাঠ করিতে করিতে কতবার সাশ্রুনয়নে হাহাকার করিতেছি; কত ছন্দোবন্ধে কবিতা রচনা করিয়া স্বজাতিসমাজে সেই শোকসমাচার প্রচারিত করিয়া সহৃদয়তার পরিচয় প্রদান করিতেছি; কখন বা রঙ্গমঞ্চের সুশিক্ষিত অভিনেতৃদলের নাট্যনৈপুণ্যে আত্মহারা হইয়া, “নিরখি নিবিড় নৈশ আকাশের পানে” শত বিভীষিকামুর্ত্তিতে বারম্বার, শিহরিয়া উঠিতেছি! যাঁহারা সেকালের লোক, যাঁহাদের চক্ষুর সম্মুখে ইংরাজ বাঙ্গালীর কুটিল কৌশলজালে পিঞ্জরাবদ্ধ হইয়া সিরাজদ্দৌলা ইহলোক হইতে অবসরগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারা কিন্তু এই অন্ধকূপ-হত্যার বিন্দুবিসর্গও জানিতেন না!

 মুসলমানদিগের ইতিহাসে অন্ধকূপহত্যার নাম গন্ধও দেখিতে পাওয়া যায় না।[২] সাইয়েদ গোলাম হোসেনের রচিত “মুতক্ষরীণ” গ্রন্থ সেকালের সর্ব্বজনসমাদৃত সুবিস্তৃত ইতিহাস;—তাহাতে সিরাজদ্দৌলার অনেক কুকীর্ত্তির উল্লেখ আছে, ইংরাজদিগেরও অনেক দুঃখদৈন্যের সমাচার আছে; কিন্তু সমগ্র মুতক্ষরীণ গ্রন্থে, আকারে ইঙ্গিতেও, অন্ধ- কূপ-হত্যার উল্লেখ নাই![৩] হাজি মুস্তাফা নামধারী সুবিখ্যাত ফরাসীপণ্ডিত মুতক্ষরীণের যে সুবৃহৎ অনুবাদ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহাতে তিনি টীকাচ্ছলে লিখিয়া রাখিয়াছেন যে,—“সমসাময়িক বাঙ্গালীদিগের নিকট সবিশেষ অনুসন্ধান করিয়া জানিয়াছেন,—অন্যলোকের কথা দূরে থাকুক, নিজ কলিকাতার অধিবাসিরাই অন্ধকুপ-হত্যার সংবাদ জানিত না।” যাহাদের বুকের উপর এরূপ ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছিল, তাহারা ইহার কিছুই জানিল না;— ইহা কি আদৌ সম্ভব হইতে পারে? শুধু তাহাই নহে,—হতাবশিষ্ট ইংরাজগণ মুক্তিলাভ করিয়া কলিকাতার কুটীরে কুটীরে আশ্রয়গ্রহণ করিয়াছিলেন; তাঁহারাও কি এই শোকসমাচার রটনা করিতে ইতস্ততঃ করিয়াছিলেন?

 মুসলমানের কথা ছাড়িয়া দাও। তাঁহারা না হয় স্বজাতিকলঙ্ক বিলুপ্ত করিবার জন্য স্বরচিত ইতিহাস হইতে এই শোচনীয় কাহিনী সযত্নে দূরে রাখিতে পারেন। কিন্তু যাঁহারা নিদারুণ যন্ত্রণায় মর্ম্মপীড়িত হইয়া অন্ধকূপ-কারাগারে জীবনবিসৰ্জ্জন করিলেন, তাঁহাদের স্বদেশীয় স্বজাতীয় সমসাময়িক ইংরাজদিগের কাগজপত্রে অন্ধকূপ হত্যার নাম পর্য্যন্তও দেখিতে পাওয়া যায় না কেন?

 রণপলায়িত ইংরাজবীরপুরুষগণ পল্‌তার বন্দরে বসিয়া দিন দিন যে সকল গুপ্তমন্ত্রণা করিতেন, তাহার বিবরণ-পুস্তকের কোন স্থানেই অন্ধকুপ-হত্যার উল্লেখ নাই। সুদূর সমুদ্রকূলে বলিয়া মাদ্রাজের ইংরাজমণ্ডলী কলিকাতার পুনরুদ্ধারকল্পে যে সকল বাগ্‌বিতণ্ডায় দীর্ঘকাল অতিবাহিত করিয়াছিলেন, তাহার মধ্যেও অন্ধকুপ-হত্যার উল্লেখ নাই! মাদ্রাজের ইংরাজ দরবারের অনুরোধ রক্ষার্থে দাক্ষিণাত্যের নিজাম এবং আরকটের নবাব বাহাদুর সিরাজদ্দৌলাকে যে পত্র লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন, তাহার মধ্যে অন্ধকূপ-হত্যার উল্লেখ নাই। মাদ্রাজদরবারের সর্ব্বময় কর্ত্তা শ্রীল শ্রীযুক্ত পিগট সাহেব বাহাদুর সিরাজদ্দৌলার নিকট তর্জ্জনগর্জ্জনপূর্ণ পত্র লিখিয়া কর্ণেল ক্লাইবকে বঙ্গদেশে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন;—তাহার মধ্যেও অন্ধকূপ হত্যার উল্লেখ নাই। ক্লাইব এবং ওয়াট্‌সন্ বঙ্গদেশে শুভাগমন করিয়া পলাশিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব্ব পর্য্যন্ত সিরাজদ্দৌলাকে যত সুতীব্র সামরিক লিপি লিখিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে অন্ধকূপ হত্যার উল্লেখ নাই! সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে ইংরাজদিগের যে আলিনগরের সন্ধি সংস্থাপিত হয়, তাহার মধ্যেও অন্ধকূপ-হত্যার উল্লেখ নাই।[৪]

 কলিকাতার পুনরুদ্ধারকল্পে যাঁহারা একে একে মাদ্রাজ হইতে বঙ্গদেশে শুভাগমন করিয়াছিলেন, তাঁহারা সকলেই নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পত্র লিখিয়াছিলেন। অন্ধকূপ-হত্যা সত্য হইলে ইঁহাদের প্রত্যেকের পত্রেই সে কথার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যাইত। মেজর কিলপ্যাট্রিক সর্ব প্রথম পত্র লিখেন,—তাহাতে অন্ধকুপ-হত্যার উল্লেখ নাই"।[৫]! কর্ণেল ক্লাইবের প্রথম পত্রে এবং পলাশির যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব্বের লিখিত তর্জ্জনগর্জ্জনপূর্ণ শেষ পত্রেও অন্ধকূপ-হত্যার নাম গন্ধ দেখিতে পাওয়া যায় না![৬] সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করা হইল কেন, তদ্বিষয়ে ক্লাইব কোর্ট অব ডিরেক্টরকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহাতেও অন্ধকূপ হত্যার উল্লেখ নাই![৭] স্বয়ং হলওয়েল ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ৪ঠা আগষ্টের বৈঠকে সিলেক্ট কমিটির সম্মুখে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের রাজবিপ্লব সম্বন্ধে যে মন্তব্যলিপি পাঠ করেন, তাহাতে স্পষ্টাক্ষরে অন্ধকূপ-হত্যার কোন উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় না;—কেবল ইহাই দেখিতে পাওয়া যায় যে, সিরাজদ্দৌলা নির্দ্দয়রূপে ইংরাজদিগের অনিষ্ট করিয়াছিলেন বলিয়া ইংরাজেরা গরজে পড়িয়াই তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছিলেন।[৮] ইহার মধ্যেও অন্ধকুপ-হত্যার প্রতিহিংসা সাধনের দৃঢ়সংকল্পের কথা দেখিতে পাওয়া না। কেবল পরবর্ত্তী ইতিহাসেই দেখিতে পাওয়া যায় যে, অন্ধকূপ-হত্যার প্রতিহিংসা সাধনার্থেই ক্লাইবের শুভাগমন এবং তজ্জন্যই সিরাজদ্দৌলার অধঃপতন![৯] সমসাময়িক কাগজপত্রে কেবল বাণিজ্যের ক্ষতি এবং কোম্পানীর দুর্গতির কথাই বিবিধ বিধানে বিবৃত রহিয়াছে;— অন্ধকুপ-হত্যার বা নরহত্যার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় না!

 মীরজাফরের সঙ্গে ইংরাজদিগের যে সন্ধি সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহাতে ইংরাজেরা প্রত্যেক শ্রেণীর ক্ষতিপূরণের জন্য কড়ায় গণ্ডায় অঙ্কপাত করাইয়া লইয়াছিলেন। যাহারা নিদারুণ মর্ম্মযাতনায়-অন্ধকূপে জীবনবিসৰ্জ্জন করিয়াছিল, সন্ধিপত্রে তাহাদের স্ত্রীপুত্রের জন্য কপর্দ্দকও লিখিত হয় নাই কেন? এই সকল দেখিয়া শুনিয়া অনেকের ধারণা হইয়াছে যে, অন্ধকূপ-হত্যাকাহিনী নিতান্তই কাহারও রচাকথা।

 অন্ধকূপ হত্যাকাহিনী কবে কাহার কৃপায় জনসমাজে প্রথম প্রচারিত হইয়াছিল,—সে ইতিহাসও সবিশেষ রহস্য-পরিপূর্ণ! হলওয়েল সাহেব তাহার প্রথম প্রচারক। ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ২৮শে ফেব্রুয়ারী তারিখে হলওয়েল তাঁহার প্রিয়বন্ধু উইলিয়ম ডেভিসকে যে পত্র লিখেন, তাহাতেই অন্ধকূপ হত্যার প্রথম এবং শেষ পরিচয়! হলওয়েল ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে ‘সাইরেণ’[১০] নামক পোতারোহণে বিলাতযাত্রাকালে অনন্যকর্ম্মা হইয়া এই বিষাদকাহিনী রচনা করিয়াছিলেন; কিন্তু পলাশির যুদ্ধের পূর্ব্বে ইহা যে জনসমাজে পরিচিত হইয়াছিল, সেরূপ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না। পলাশির যুদ্ধাবসানে ভারত প্রবাসী ইংরাজ-বণিকের অপকীর্ত্তির উল্লেখ করিয়া ইংলণ্ডের নরনারী যখন তুমুল কোলাহল উপস্থিত করিল, সেই সময়ে (তৎপূর্ব্বে নহে!) এই পত্রখানি জনসাধারণের নিকট প্রথম প্রকাশিত হইল! ইংলণ্ডের নরনারী নরপিশাচ সিরাজদ্দৌলার নামে শিহরিয়া উঠিল;—ইংরাজের কুকীর্ত্তির কথা কোথায় বিস্মৃতিগর্ভে বিলীন হইয়া গেল;—সিরাজদ্দৌলার কলঙ্ককাহিনীতে সভ্যজগৎ ধ্বনিত হইয়া উঠিল![১১]

 যে উদ্দেশ্যে অন্ধকূপহত্যার করুণ-কাহিনী সভ্যজগতে প্রচারিত হইয়াছিল, তাহা যখন সুসিদ্ধ হইয়া গেল, তখন আর কেহ তাহার সত্য মিথ্যার আলোচনা করিলেন না! কালক্রমে সেই সকল কথা ইংরাজলিখিত ইতিহাস-পৃষ্ঠায় সিরাজদ্দৌলার শতধিক্কৃত দুর্দ্দান্ত নামের সঙ্গে চিরসংযুক্ত হইয়া, পরবর্ত্তী লেখকসম্প্রদায়ের কল্পনাপ্রবাহ খরতর করিয়া দিয়াছে। আজ বহুবৎসরের বিলুপ্ত কাহিনীর চিতাভস্মাচ্ছন্ন জীর্ণ কঙ্কাল আলোড়ন করিয়া, কে তাহার রহস্যভেদ করিবে? যে সন্দেহ মুতক্ষরীণের অনুবাদক ফরাসী পণ্ডিত হাজি মুস্তাফাকে বিস্ময়াবিষ্ট করিয়াছিল, সে সন্দেহ আর দূর হইল না। যতই আলোচনা হউক, ইতিহাসলেখকদিগের নিকট অন্ধকূপকাহিনী চিরদিনই সন্দেহপূর্ণ থাকিবে; কেবল কল্পনানিপুণ ভারতীর বরপুত্রগণ কখন কখন বিমুক্ত গগনের নক্ষত্র-লোক হইতে কবিতাবৃষ্টি করিয়া অন্ধকূপ-হত্যার করুণকাহিনী জনসমাজে জাগরূক করিয়া রাখিবেন।

 ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায় যে, কেবল অন্ধকূপ-হত্যাই এদেশে বৃটিশ রাজশক্তি সংস্থাপিত হইবার মূলকারণ।[১২] তাহাই যদি সত্য হইত, তবে তদনুরূপ স্মৃতিস্তম্ভ দেখিতে পাইতেছি না কেন? কানপুরের হত্যাকাণ্ডে স্মৃতিস্তম্ভ সযত্নে সুরক্ষিত হইতেছে; মণিপুরের হত্যাকাণ্ডকে চিরস্মরণীয় করিবার জন্য স্মৃতিচিহ্ন সংস্থাপিত হইয়াছে; অথচ যাহারা অন্ধকূপ-কারাগারে জীবনবিসর্জ্জন করিয়া বৃটিশরাজশক্তি সুসংস্থাপিত করিল, সেই সকল হতভাগাদিগের স্মৃতিচিহ্নের জন্য একটি ইষ্টকস্তম্ভও দেখিতে পাই না কেন? ইহা কি বিস্ময়ের স্থল নহে?

 ইহা অপেক্ষাও বিস্ময়ের স্থল আছে। যাহারা অন্ধকুপকারাগারে জীবনবিসর্জ্জন করে, তাহাদের নামে কলিকাতায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মিত হইয়াছিল; কালক্রমে ইংরাজেরাই তাহা স্বহস্তে ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছেন! যাহাদের বাণিজ্য রক্ষার জন্য এই সকল হতভাগারা অকালে জীবন দান করিয়াছিল, সেই কোম্পানী বাহাদুর কোনরূপ স্মৃতিচিহ্ন নির্ম্মাণ করেন নাই;—করিয়াছিলেন অন্ধকূপ-হত্যাকাহিনীরচয়িতা হলওয়েল বাহাদুর। কবে এই স্মৃতিচিহ্ন সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। কেহ কেহ বলেন যে, ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে হলওয়েল ভারতবর্ষ পরিত্যাগ করিবার সময়ে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মাণ করিয়া দিয়াছিলেন।[১৩] হলওয়েলের প্রকাশিত পুস্তকে ইহার একটি চিত্রপট আছে, এবং পাঠকদিগের চিত্তাকর্ষণের জন্য “অন্ধকুপকারাগারে গভর্ণর হলওয়েল” নামে আর একখানি কাল্পনিক ছবিও প্রদত্ত হইয়াছে।

 এই স্মৃতিস্তম্ভে লিখিত ছিল:—

To

THE MEMORY

OF

Edw. Eyre, Wm. Baillie, Esqrs,
The Revd. Fervas Bellamy, Messrs.
Jenks, Revely, Law, Coales, Nalicourt
Jebb, Torriano, E. Page, S. Page,
Grub, Street, Harod, P. Jolinstone,
Bellard, N. Drake, Carse Knapton,

Gosling, Dod, Dalrymple, Cap-
tains Clayton, Buchanan, Wither
ington, Lieuts. Bishop, Hays, Blagg.
Simpson, J. Bellamy, Ensigns Pac
card, Scott, Hastings, C. Wedderburn,
Dumbleton, Sea-captains Hunt,
Osburn, Purnell, Messrs. Carey,
Leech, Stevenson, Gay, Porter, Parker,
Caulker, Bendall Atkinson, who
with sundry other inhabitants, Military
and Militia to the number of 123
persons were by the Tyrranic Violence
of Suraj-ud-Dowla, Subą of Bengal
suffocated in the Black Hole prison
of Fort William in the Night of the 20th day
of June 1756 and promiscuously thrown
the succeeding morning into the Ditch of
the Ravelin of this place

This
Monument is erected
by
Their Surviving fellow.sufferer
J. Z, HOLWELL.

পূর্ব্বোক্ত প্রস্তরফলক ভিন্ন আর একখানি ফলকে লিখিত ছিল:—

This Horrid Act of Violence
was as amply
as deservedly revenged
on Siraju'D Dowla,
by his Majesty's Arms,
Under the Conduct of
Vice Admiral Watson and Colonel Clive,
Anno, 1757

 এই স্মৃতিস্তম্ভ এখন আর দেখিতে পাওয়া যায় না।[১৪] তাহা বর্ত্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে, মারকুইস্ অব হেষ্টিংসের শাসন-সময়ে (১৮২১ খৃষ্টাব্দে) “কষ্টম ঘর” নির্ম্মাণ করিবার জন্য ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছে!! অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ডে যাহারা জীবনবিসৰ্জ্জন করিয়াছিল, তাহাদের শবদেহের সমাধিগহ্বরের উপর এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মিত হইয়াছিল;— ইতিহাসে এইরূপই লিখিত আছে। তজ্জন্য তাহা সকল জাতির নিকটেই পবিত্র বলিয়া পরিগণিত হইতে পারিত, এবং খ্রীষ্টিয়ান ইংরাজ স্বাভাবিক ধর্ম্মবুদ্ধিবশতই তাহাকে রক্ষা করিতে বাধ্য হইতেন। অন্ধকূপকাহিনী সত্য হইলে, সেই পবিত্র সমাধিস্তম্ভ ধূলিসাৎ হইতে পারিত না সামান্য “কষ্টম ঘরের” স্থান সংকুলনের জন্য এরূপ পবিত্র সমাধিমন্দিরে লৌহদণ্ডাঘাত করিলে খৃষ্টীয়-সমাজ সে বর্ব্বরতা সহ্য করিতেন না! এই সমাধিস্তম্ভ ধূলিসাৎ হইল, অথচ কেহ ক্ষীণস্বরেও প্রতিবাদ করিলেন না?[১৫] একজন ইংরাজ লেখক ইহার একটি মুখরোচক সুন্দর কৈফিয়ৎ সৃষ্টি করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন যে, “বোধ হয় বৃটিশ বাহিনীর পরাজয়কলঙ্কের স্মৃতিস্তম্ভ বলিয়াই ইহাকে লোকচক্ষুর অন্তরাল করা হইয়াছে।”[১৬] ইহাই কি সম্ভবপর কৈফিয়ৎ? এমন কলঙ্কস্তম্ভ কি ভারতবর্ষে আর নাই?

 অন্ধকূপ কোথায় ছিল, এখন আর তাহা চর্ম্মচক্ষুতে দর্শন করিবার উপায় নাই। কলিকাতার ‘জেনারেল পোষ্টাপিস’-সংলগ্ন উত্তরদিকে যে ফটক দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার স্তম্ভগাত্রে পশ্চিমদিকে একটি ফলকলিপিমাত্র খোদিত আছে।[১৭]

 ইহাতে “অন্ধকূপের” স্থান নির্দ্দেশের চেষ্টা ভিন্ন অন্ধকূপ-হত্যার কথা নাই, এবং যাঁহারা অন্ধকূপে জীবনবিসর্জ্জন করেন, তাঁহাদের কোন কথাই দেখিতে পাওয়া যায় না।

 এই ফলকলিপিতে যে প্রস্তরনির্ম্মিত প্রাঙ্গণের কথা লিখিত আছে, সে প্রাঙ্গণ হলওয়েলবর্ণিত ১৮ ফিট আয়তনের নহে, কিম্বা মেকলেবর্ণিত ২০ ফিটও নহে;—তাহা দীর্ঘে ২২ ফিট, প্রস্থে ১৪ ১/২ ফিট। ইহাই কি অন্ধকূপ-করাগারের একমাত্র নিদর্শন? ইহাও পুরাতন নহে;—১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে সংস্থাপিত। সে বৎসর নাকি মৃত্তিকা খনন করিবার সময়ে অন্ধকূপ-কারাকক্ষ বাহির হইয়া পড়িয়াছিল! ইহাই যে সেই অন্ধকুপের যথার্থ আয়তন, সে কথা কেহ কেহ অই- 'দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করিয়া গিয়াছেন![১৮] আমরা কিন্তু অন্যত্র দেখিপের না ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে অন্ধকূপ কারাগার একেবারে ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল।[১৯] ভাঙ্গিবার পূর্ব্বে যিনি স্বচক্ষে দর্শন করিয়াছিলেন, তিনি আত্মপরিচয় গোপন করিয়া “এসিয়াটিক্‌স্” নাম স্বাক্ষর করিয়া কোন সুবিখ্যাত পত্রিকায় লিখিয়া গিয়াছেন যে, “তিনি ১৮১২ খৃষ্টাব্দে এই ইতিহাস-বিখ্যাত কারাগার সন্দর্শন করেন, তখনই তাহা পড় পড়,–এখন আর তাহার চিহ্নমাত্রও নাই!”।[২০] ১৮২১ খৃষ্টাব্দে যাহা ধূলিসাৎ হইল, ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে তাহাই আবার কেমন করিয়া আবিষ্কৃত হইল?

 হলওয়েল যে কারাগৃহের বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা ১৮ ফিট দীর্ঘ এবং ১৮ ফিট প্রস্থ। এরূপ ক্ষুদ্রায়তন সংকীর্ণকক্ষে ১৪৬ জন নরনারী কিরূপে কারারুদ্ধ হইতে পারে, সে কথা কিন্তু অল্পলোকেই আলোচনা করিয়া দেখিয়াছেন![২১] অল্পায়তন গৃহকোটরে নিদারুণ গ্রীষ্মকালে ১৪৬ জন নরনারীকে কারারুদ্ধ করাই অন্ধকূপ-হত্যার সর্ব্ব প্রধান কলঙ্ক;—সে কলঙ্ক কি নিতান্ত অতিরঞ্জিত বা সর্ব্বথা কাল্পনিক কলঙ্ক নহে?

 সিরাজদ্দৌলা দুর্গজয় করিবার সময়ে আদৌ ১৪৬ জন লোক বন্দী হওয়াই বিশেষ সন্দেহের কথা! হলওয়েল যেদিন দুর্গরক্ষার ভারগ্রহণ করেন, সেদিন দুৰ্গমধ্যে কেবল ১৭০ জন বর্ত্তমান ছিল; আর আর সকলেই দুর্গাধিপতি মহামতি ড্রেক সাহেবের অসাধুদৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া প্রাণ লইয়া পলায়ন করিয়াছিল। এই ১৭০ জন লোকের মধ্যে দুই দিবসের অক্লান্ত রণতরঙ্গে অনেকেই জীবনবিসর্জ্জন করে; যাহারা জীবিত ছিল, তন্মধ্যে আহত ও মুমূর্ষর সংখ্যাও অল্প ছিল না। যে সকল লোক কোনরূপে পলায়ন করিতে পারে নাই, তাহারাই আত্মসমর্পণ করিয়াছিল; তদ্ভিন্ন যাহাদের শক্তি ছিল, সাহস ছিল, পলায়নের প্রবৃত্তি ছিল, তাহারা অনেকেই দুর্গজয়ের কোলাহলের অবসর পাইয়া প্রাণ লইয়া পলায়ন করিয়াছিল। যে সকল নরনারী মিরজা আমীরবেগের হস্তে পতিত হয়, মীরজাফরের কৃপায় তাহারা সেই দিনই নিরাপদে পলতায় প্রেরিত হইয়াছিল।[২২] এরূপ অবস্থায় হলওয়েলের কথিত ১৪৬ জন বন্দী কারারুদ্ধ হওয়া বিশেষ সন্দেহস্থল। হলওয়েল স্বপ্রণীত পুস্তকে[২৩] যে সকল মৃত ও মৃতকল্প সহযোগীদিগের নামোল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, তাহাতেও ৬৬ জনের অধিক নাম প্রাপ্ত হওয়া যায় না। হলওয়েলের স্বরচিত পুস্তকে দেখিতে পাওয়া যায় যে, সিরাজদ্দৌলা কলিকাতা আক্রমণের কয়েকদিন পূর্ব্বে কলিকাতাদুর্গবাসী ইংরাজদিগের যে জনসংখ্যা গৃহীত হইয়াছিল, তাহাতে সর্ব্বসাকল্যে ১৯০ জন যোদ্ধা গণিত হইয়াছিলেন, তন্মধ্যে ৬০ জন মাত্র ইউরোপীয়।[২৪] ইহাদের মধ্যে গভর্ণর ড্রেক, সেনাপতি মিন্‌চিন্‌, কাপ্তান গ্রান্ট, মিষ্টার ম্যাকেট, ম্যানিংহাম, ফ্রাঙ্কল্যাণ্ড, রেভারেণ্ড কাপ্তান লেপ্‌টেনান্ট মেপল্‌ফট, কাপ্তান হেন্‌রী ওয়েডারবরণ, সম্‌নার, চার্লস ডগলাস, প্রভৃতি দশজন বীরপুরুষের পলায়নের কথা হলওয়েলের পুস্তকেই প্রকাশিত আছে। ইঁহাদের পলায়নের পর ১৭০ জন দুর্গমধ্যে অবরুদ্ধ ছিল; তন্মধ্যে ২৫ জন গতাসু এবং ৭০ জন আহত ও মৃতকল্প হইয়াছিল।[২৫] হলওয়েলের হিসাব অনুসারে দুর্গজয়ের সময়ে দুর্গমধ্যে ৫০ জনের অধিক ইউরোপীয় থাকা প্রমাণ হয় না। পঞ্চাশজনের মধ্যে ১২১ জন ইউরোপীয় অন্ধকূপে মরিল, ১০ জন অন্ধকূপে আবদ্ধ হইয়াও জীবিত রহিল,—ইহা কি নিতান্তই হাস্যাস্পদ কথা নহে?

 ইংরাজবন্দীদিগের জন্য সিপাহীরা যে সে রজনীতে সুকোমল পুষ্প, শয্যা রচনা করিয়া দেয় নাই, তাহা সত্য হইলেও হলওয়েল যেরূপ ক্ষুদ্রকক্ষে যে পরিমাণ নরনারী কারারুদ্ধ করিবার কথা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা কিছুতেই সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে সাহস হয় না![২৬]

 ইংরাজ-ইতিহাস-লেখকমাত্রেই হলওয়েল-বর্ণিত অন্ধকুপ-হত্যাকাহিনী সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছেন। কিন্তু কাহার দোষে এরূপ দুর্ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল, সে বিষয়ে তাঁহাদের মধ্যেও বিস্তর মতভেদ উপস্থিত হইয়াছে। মুর্শিদাবাদের ভূতপূর্ব্ব বিচারপতি স্বনাম খ্যাত মহাত্মা বিভারিজ বলেন যে, “আমাদের পক্ষে অন্ধকূপ হত্যার কথা তুলিয়া নবাব সিরাজদ্দৌলার নিষ্ঠুর স্বভাবের কলঙ্কঘোষণা করা শোভা পায় না। এ বিষয়ে বোধ হয় বাঙ্‌নিষ্পত্তি না করাই কর্ত্তব্য। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের ১লা আগষ্ট অমৃতসর প্রদেশে কি দুর্ঘটনাই না সংঘটিত হইয়াছিল।”[২৭] বিভারিজ সাহেব যে দুর্ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন, তাহার নিকট অন্ধকুপ-হত্যা লজ্জায় মলিন হইয়া যায়। একটি ক্ষুদ্রায়তন গোলাকার কক্ষের মধ্যে বহুসংখ্যক সিপাহীকে কারারুদ্ধ করিয়া ইংরাজেরা তাহার মধ্য হইতে একটি একটি করিয়া ২৩৭ জন হতভাগাকে বাহিরে টানিয়া আনিয়া গুলি করেন; তখন বন্দীদিগের মধ্যে আর কেহ বাহিরে আসিতে স্বীকার করিল না। ইংরাজের আদেশে কক্ষদ্বার অবরুদ্ধ হইয়া গেল। তাহার পর যখন দ্বার উন্মুক্ত হইল, তখন সংজ্ঞাশূন্য ৪৫ জন হতভাগার অবসন্ন দেহ টানিয়া বাহির করিতে হইল;—ভয়ে, রণশ্রমে, গলদঘর্ম্মে, গ্রীষ্মাতিশয্যে, দমবন্ধ হইয়া না জানি কত ক্লেশেই তাহাদের প্রাণবিয়োগ হইয়াছিল![২৮] জ্ঞানোজ্জল ঊনবিংশ শতাব্দীর সুসভ্য সহৃদয় বৃটিশশাসনে যে এরূপ ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়া গেল, ইহার জন্য কয়জন ইতিহাস-লেখক লজ্জায় অধোবদন হইয়াছেন? যুদ্ধাবসানে বন্দীদিগের ভাগ্যে অনেক সময়ে এরূপ নিদারুণ নির্যাতন উপস্থিত হইয়া থাকে;—তাহারা অন্নজল পায় না, বিশ্রাম করিবার উপযুক্ত অবসর পায় না, কখন কখন নৃশংসস্বভাব প্রহরিগণের নির্যাতনে জীবন্মৃত হইয়া পড়ে। এ সকল যুদ্ধব্যাপারের অপরিহার্য্য অপকীর্ত্তি;—কেহই ইহার গতিরোধ করিতে পারেন না। কিন্তু যাঁহারা একদিন স্বদেশে গ্লেন্‌কোর হত্যাকাণ্ডে রুধির-কর্দ্দমে কলঙ্কিত হইয়া, এদেশে আসিয়া কত শত স্থানে ভীষণ হত্যাকাণ্ডে পাশবশক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, যাঁহাদের দয়া দাক্ষিণ্যের অমোঘ নিদর্শনস্বরূপ কত শত হতভাগা ভারতবাসীর জীর্ণকঙ্কাল হিন্দু স্থানের অশ্বখশাখায় বহু বৎসর পর্যন্ত দোদুল্যমান ছিল, যাঁহাদের প্রতিহিংসাতাড়িত উদ্ধত সেনাদল কানপুরের শত শত নাগরিকদিগকে সন্দেহমূলে বা ঈর্ষাবশতঃ অবিচারে শোণিতলেহন করাইয়া তাহার পর ধনে বংশে বিনাশ করিতে মমতা প্রকাশ করে নাই, তাঁহাদের ইতিহাসে অন্ধকূপহত্যার অতিরঞ্জিত অথবা সর্ব্বথা কাল্পনিক কাহিনী লইয়া সিরাজদ্দৌলার কলঙ্ক রটনা করা বড়ই পরিতাপের বিষয়।

 অন্ধকূপহত্যা সত্য হইলেও সিরাজদ্দৌলার অপরাধ কি? স্বয়ং হলওয়েল সাহেবই লিখিয়া গিয়াছেন যে, ইহার সহিত সিরাজদ্দৌলার কিছুমাত্র সংশ্রব থাকা তিনি বিশ্বাস করেন নাই;—তাঁহার ধারণা এইরূপ যে, নবাব-সেনাদিগের প্রতিহিংসাপ্রবৃত্তির জন্যই এরূপ দুর্ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল।[২৯] ইতিহাস সঙ্কলন করিবার জন্য আদ্যোপান্ত সকল ঘটনার অনুসন্ধান করিতে গিয়া আমাদিগের এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছে যে, নবাব সিরাজদ্দৌলা সর্ব্বজনসমক্ষে হলওয়েলের বন্ধনমোচন করিয়া প্রকৃত বীরপুরুষের ন্যায় তাঁহাকে এবং তাঁহার সঙ্গিগণকে অভয়দান করিয়াছিলেন। অন্যায় উৎপীড়ন করাই যদি সিরাজদ্দৌলার অভিপ্রায় হইত, তিনি কখনও এরূপ ব্যবহার করিতেন না। তাঁহার আশা ছিল যে, হলওয়েল তাঁহাকে গুপ্তধনের সন্ধান বলিয়া দিবেন। এরূপ ক্ষেত্রে যাহাতে হলওয়েলের জীবনসংশয় হইয়া ধনলাভের পথ অবরুদ্ধ হইয়া যায়, সিরাজদ্দৌলা কিছুতেই তাহাতে সম্মতিদান করিতেন না।

 হলওয়েল এবং তাঁহার সঙ্গিগণ সমস্ত দিন বীরের ন্যায় দুর্গরক্ষা করিয়া দৈববিড়ম্বনায় পরাজিত হইয়াছিলেন। তথাপি তাঁহাদিগকে স্বচ্ছন্দভাবে সুবিস্তৃত প্রাঙ্গণে সান্ধ্যসমীরণ উপভোগ করিবার অবসর প্রদান করা হইয়াছিল। সেই সুযোগে তাঁহারা যদি সিপাহীদিগের উপর লাফাইয়া পড়িবার আয়োজন না করিতেন, ইতস্ততঃ বিচরণ করিয়া পলায়নপথের সন্ধান লইবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ না করিতেন, তবে হয়ত তাঁহাদিগকে কক্ষমধ্যে আদৌ অবরুদ্ধ হইতে হইত না। যখন অবরোধের আয়োজন হইল, তখন ইংরাজেরাই কারাকক্ষ দেখাইয়া দিয়াছিলেন; নবাবসেনা তাহার আয়তনবিষয়ে কিছুমাত্র সন্ধান রাখিত না।[৩০] হলওয়েল সর্ব্বাগ্রে গৃহপ্রবেশ করিয়া কোনরূপ আপত্তি না করায়, তাহারা সকলকেই তন্মধ্যে প্রবিষ্ট করাইয়া দিয়াছিল। ইহাতে যদি কষ্ট হইয়াছিল, তবে সে কষ্টের কথা বুঝাইয়া না বলিয়া বা কোন সেনাপতিকে সংবাদ না পাঠাইয়া, উদ্ধত ইংরাজসেনা বাহুবলে দ্বার ভাঙ্গিয়া ফেলিবার আয়োজন করিয়া প্রহরীদিগকে যে অতিমাত্র ভীত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ হইতে পারে না। হলওয়েলের কাহিনী যদি সত্য হয়, তবে ইহাও বোধ হয় সত্য যে, ইংরাজসেনার আস্ফালন দেখিয়াই প্রহরিগণ নবাবের বিনানুমতিতে দ্বার মোচন করিতে সম্মত হয় নাই। ইহার জন্য তাহাদিগের অপরাধ হইতে পারে না। আর তাহারা বাহিরে দাঁড়াইয়া জানালার ধারে যাহাদিগকে দেখিতে পাইতেছিল, তাহারা ত বিশেষ যন্ত্রণাভোগের পরিচয় প্রদান করে নাই। অন্ধকার কারাকক্ষের অপরাংশে লোকচক্ষুর অগোচরে যাহারা মর্ম্মযাতনায় ছটফট করিতেছিল, বাহির হইতে প্রহরিসেনা তাহার বিষয় বোধ হয় কিছুই জানিতে পারে নাই।[৩১] এ সকল কথার যথোপযুক্ত আলোচনা না করিয়াই কোন কোন ইতিহাস-লেখক অবলীলাক্রমে লিখিয়া গিয়াছেন যে, সিরাজদ্দৌলা নিজেই বন্দীদিগকে অন্ধকুপ কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। এরূপ সিদ্ধান্ত করিবার উপযুক্ত প্রমাণ নাই; কেবল অনুমানের উপর নির্ভর করিয়াই ইঁহারা সিরাজদ্দৌলাকে অপরাধী বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন। একজন স্পষ্টই লিখিয়াছেন যে, “প্রমাণ না থাকিলেও কার্য্যকারণশৃঙ্খলার বিচার করিয়া সিরাজদ্দৌলাকেই অপরাধী করিতে হয়। নচেৎ তাঁহার আদেশ ব্যতীত দ্বার উন্মোচন করিতে কাহারও সাহস হইল না কেন, এবং এতগুলি নরনারীর জীবনরক্ষার জন্য ক্ষণকালের জন্যও তাঁহার সুনিদ্রার ব্যাঘাত জন্মাইতে ইতস্ততঃ হইল কেন? ইহাই ত যথেষ্ট প্রমাণ। ইহা হইতেই বুঝা যাইতেছে যে, সিরাজদ্দৌলার আদেশক্রমেই এরূপ অত্যাচার সংঘটিত হইয়াছিল।”[৩২]

 সিরাজদ্দৌলাই যে হতভাগ্য ইংরাজবন্দীদিগকে অন্ধকূপ-কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার আদেশ দিয়াছিলেন, তাহার কিছুমাত্র প্রমাণ নাই। বরং হলওয়েলের লিখিত কাহিনী অনুসরণ করিয়া সিরাজদ্দৌলাকে নিরপরাধ বলিবার অনুকুল প্রমাণের অভাব নাই। এই সকল প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া বর্ত্তমান যুগের অনেক ইংরাজ-লেখক স্বপ্রণীত ইতিহাসে সিরাজদ্দৌলার কলঙ্কমোচন করিয়া গিয়াছেন।

 অন্ধকূপ-হত্যা যদি সত্য হয়, তবে ইংরাজেরাই যে তাহার সর্ব্বপ্রধান সহকারী অপরাধী তদ্বিষয়ে সন্দেহ হইতে পারে না। মহাত্মা হাওয়ার্ডের আবির্ভাবের পূর্ব্বে তাঁহাদের দেশেই এইরূপ পূতিগন্ধময় আলোকসম্পাতশূন্য অন্ধকূপ দেখিতে পাওয়া যাইত। তাঁহারা গ্রীষ্মপ্রধান বঙ্গদেশে আসিয়াও, স্বদেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া সেইরূপ অন্ধকূপ রচনা করিয়াছিলেন। এই সকল অন্ধকূপে কত হতভাগাই না অকালে অন্যায় উৎপীড়নে জীবনবিসর্জ্জন করিত। কত উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক, কত মদমত্ত নাবিক, কত অন্নহীন দাদনগ্রস্ত দরিদ্র বাঙ্গালী যমযাতনায় ছটফট করিয়া মরিত! ইতিহাসলেখক জেমস্ মিল্ এই সকল কথা স্মরণ করিয়া মর্ম্মবেদনায় লিখিয়াছেন যে, “হায়! যদি অন্ধকূপ না থাকিত, তাহা হইলে ত ইংরাজবন্দীদিগের এরূপ শোচনীয় পরিণাম উপস্থিত হইতে পারিত না!”[৩৩]

 হলওয়েল যেরূপ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অন্ধকুপ-হত্যাকাহিনী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা পাঠ করিতে করিতে স্বভাবতই মনে হয় যে, এত কথা কখনই একেবারে মিথ্যা কথা হইতে পারে না!কিন্তু হলওয়েলের সত্যনিষ্ঠা কতদূর প্রবল তাহার পরিচয় পাইলে, তাঁহার কথায় আর আস্থা স্থাপন করিতে প্রবৃত্তি হয় না। যে হলওয়েল অন্ধ-কূপ হত্যার প্রধান প্রচারক, সেই হলওয়েলই মীরজাফরকে পদচ্যুত করিবার সময় ঢাকার হত্যাকাহিনী রচনা করিয়াছিলেন।[৩৪] তিনি বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষদিগের নিকট লিথিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে,—“নবাব মীরজাফর খাঁর জঘন্য চরিত্রের কথা আর কি বলিব? তিনি ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে নওয়াজেস-মহিষী ঘসেটি বেগম, সিরাজ জননী আমিনা বেগম প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত মহিলাবর্গকে ঢাকার রাজকারাগারে নিষ্ঠুরূপে হত্যা করাইয়াছেন!”[৩৫] উত্তরকালে কলিকাতার ইংরাজ-দরবার অর্থাৎ হলওয়েলের স্বদেশীয় সহযোগিগণ এই হত্যাকাহিনীর তথ্যানুসন্ধান করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন যে, হলওয়েলের হত্যাকাহিনী সর্ব্বৈব মিথ্যা।[৩৬] যিনি মীরজাফরের পদচ্যুতি সমর্থন করিবার জন্য মীরকাশিমের টাকা খাইয়া এমন মিথ্যা হত্যাকাহিনী রচনা করিয়া স্বজাতিসমাজে মিথ্যাবাদী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন, তিনিই অন্ধকূপ-হত্যাকাহিনী রচনা করিয়া গিয়াছেন! তাহাও যে এইরূপ সর্ব্বৈব মিথ্যাকাহিনী নহে, তাহার প্রমাণ কি?

 হলওয়েল ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দে ডাক্তারি করিবার জন্য এদেশে পদার্পণ করিলে, কলিকাতার ইংরাজ-দরবার তাঁহাকে কলিকাতার কলেক্টর পদে নিযুক্ত করেন। এই কার্য্যে হলওয়েল মাসিক ৫০০ টাকা বেতন পাইতেন, ইহা ভিন্ন সেকালের রীত্যনুসারে নজর, ভিক্ষা, পার্ব্বনী প্রভৃতিতেও বিলক্ষণ আয় হইত।[৩৭] তিনি কলিকাতার “কালা আদ্‌মীদিগের” উপর বড়ই উৎপীড়ন করিতেন বলিয়া সিরাজদ্দৌলার বিশ্বাস হইয়াছিল, এবং সেই জন্য এ কথা কাশিমবাজারের মুচলিকাপত্রেও লিখিত হইয়াছিল।[৩৮] কলিকাতাজয়কালে হলওয়েল সর্ব্বস্বান্ত হইয়া মুসলমান সেনাপতির আদেশে মুর্শিদাবাদে কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন! পলাশির যুদ্ধাবসানে মীরজাফরের অনুকম্পায় হলওয়েল লক্ষ টাকা পুরস্কার,[৩৯] এবং যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ লাভ করিয়া কলিকাতার নিকটে ১২৩৫০ টাকা মুল্যের জমিদারী ক্রয় করেন;[৪০] ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে দিনকতক কলিকাতার গভর্ণর হইয়া বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষের সঙ্গে কলহ করিয়া সেই বৎসরেই পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। অবশেষে ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দে বিলাতে তাঁহার জীবনলীলার অবসান হয়।[৪১] যিনি মীরজাফরের কৃপায় আশাতীত পুরস্কার ও পদগৌরব লাভ করিয়া তাঁহার নামে এমন মিথ্যা কলঙ্ক রটনা করিতে কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করেন নাই, তিনি যে সর্ব্বস্বান্ত ও কারারুদ্ধ হইয়া প্রতিহিংসা সাধনের জন্য অন্ধকূপহত্যার অলীক কাহিনী রচনা করেন নাই, তাহার প্রমাণ কি? হলওয়েল যেরূপ সত্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়া গিয়াছেন, তাহাতে তাঁহার সম্বন্ধে এরূপ অনুমান কি নিতান্তই অসঙ্গত? এই সকল স্বাধীন সমালোচনায় উত্যক্ত হইয়া কলিকাতার জনৈক ‘ইংলিশম্যান’—সম্পাদক এই গ্রন্থের কঠোর সমালোচনা করেন। কিছুদিন পরে উক্ত সম্পাদক পুনরায় লিখিয়াছেন যে, হলওয়েলের বর্ণনার উপর নির্ভর করা যে নিরাপদ নহে, তাহা আধুনিক ঐতিহাসিক আন্দোলনে বিশেষরূপে সংস্থাপিত হইয়া গিয়াছে।

 সিরাজদ্দৌলার অদৃষ্টবিড়ম্বনা! ঘসেটি বেগম সিরাজদ্দৌলার জননীর সহিত সসম্ভ্রমে রাজান্তঃপুরে বসতি করিলেন, পলাশির যুদ্ধাবসানে মীর জাফরের সুশাসনে ঢাকায় কারারুদ্ধ হইলেন, অথচ ইতিহাসে তাহার সমুচিত সমালোচনা না হওয়ায় কল্পনাকুশল বাঙ্গালী কবি অবলীলাক্রমে সিরাজশিবিরে ঘসেটি বেগমের প্রেতাত্মাকে উপনীত করিয়া তাঁহার মুখে সিরাজদ্দৌলাকে শুনাইয়া দিলেন:—

“সিরাজ, তোমার আমি পিতৃব্য-কামিনী;
হরি মম রাজ্যধন, করি দেশান্তর,
অনাহারে বধিলি এ বিধবা দুঃখিনী;
কেমনে রাখিবি ধন, এবে চিন্তা কর্।”[৪২]

এই কবি-কাহিনীর ভিত্তিমূল কোথায়?[৪৩] অথচ এই সকল কাহিনী রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হইয়া কত করতালি আকর্ষণ করিতেছে, সিরাজ-চরিত্র কত ভীষণতর করিয়া তুলিতেছে!

    কি ঘটনা নহে? যদি তাহাই ঘটনা হয় এবং তাহারই নাম অন্ধকূপ হত্যা হয়, তবে ইতিহাসে সে ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় না। যে ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহা অন্ধকূপ হত্যা নামে কথিত হইতে পারে না। রাম নাই রামায়ণ, ১৪৬ জন অবরুদ্ধ 'হইয়া ১২৩ জন নিহত-—ইহা মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত—তথাপি তাহার নাম অন্ধকুপ হত্যা!!

  1. সংপ্রতি নবাবী আমলের বাঙ্গালার ইতিহাসে বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় লিখিয়াছেন—“হলওয়েলের জ্বলন্ত বর্ণনায় অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী কিয়ৎ পরিমাণে অতিরঞ্জিত হইলেও ঘটনা একবারে অস্বীকার করিবার উপায় নাই।” এই মতের উপর নির্ভর করিয়া তিনি সন্দীহান লেখক বর্গকে ভ্রান্ত বলিয়াছেন, কিন্তু ঘটনাটা কি? ১৮ ফুট ঘরে ১৪৬ জনের অবরোধ ও তজ্জনিত ১২৩ জনের অকাল মৃত্যুই
  2. It is interesting to contrast the lights and shades of Orme's history with those of the Mahomedan historian. Thus the latter does not say a word about the Black Hole.—H. Beveridge, c. s.
  3. This event, which cuts so capital a figure in Mr. Watt's performance, is not known in Bengal—Haji Mustapha.
  4. আলিনগরের সন্ধিপত্রে অন্ধকূপ হত্যার উল্লেখ নাই বলিয়া একজন ইংরাজ ইতিহাসলেখক মর্ম্মবেদনায় লিখিয়া গিয়াছেন যে:—“No satisfaction was obtained for the atrocities of the Black Hole; and the absence of any provision for this purpose is the greatest scandal attached to the treaty. For this no sufficient apology can be found. Peace was desirable, but even peace is bought too dearly when the sacrifice of national honor is the price,”—Thornton's History of the British Empire, vol. I. 212-213.
  5. Major Kilpatrick on the 15th instant (August 1756) wrote a complimentary letter to the Nowab Surajed Dowla complaining a little of the hard usage of the English Honorable Company, assuring him of his good intentions notwithstanding what had happened.—Long's Selection.
  6. ক্লাইবের প্রথম পত্রখানি এইরূপ:—The Admiral Watson, Commander of the King's invincible ships, and himself, a soldier whose conquests in Decan might have reached his ears, were come to revenge the injuries he had done the English Company; and it would better become him to show his love of justice, by making them ample satisfaction for all their losses, than expose his country to be the seat of war.—Scrafton.
     ক্লাইবের শেষ পত্রখানি এইরূপ:—That from his great reputation for justice, and faithful observance of his word, he had been induced to make peace with him, and to pass over the loss of many crores of Rupees sustained by the English in the capture of Calcutta, and to rest content with whatever he, in his justice and generosity, should restore to them, &c. &c—Scrafton.
  7. Some of. Suraja Dowla's letters to the French having fallen into my hands, I enclose a translate of them just to show you the necessity we were reduced to of attempting his overthrow.—Clive's letter to Court, August 6, 1757.
  8. Necessity and a just resentment for the most cruel injuries obliged us to enter into a plan to deprive Sirajedowla of his government.—Holwell's address to Mr. Vânsittart. এই cruel injuries কি অন্ধকূপ হত্যা, না—হলওয়েল ও তাঁহার সঙ্গিগণের মুর্শিদাবাদের কারাবাস, না—পলায়িত ইংরাজদিগের পল্‌তার অন্নকষ্ট?
  9. The barbarities practiced on the English, and the horrible death of 123 of them in the Black Hole, called aloud for vengeance.—The Great battles of the British Army, p. 162.
  10. Early Records of British India.
  11. ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দের নবেম্বর মাসে ফলতার পত্রে হলওয়েল কি লিখিয়াছিলেন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাহা উদ্ধৃত করিয়াও লিখিয়াছেন যে, ডেভিসের পত্রকে অন্ধকূপ হত্যার প্রথম বিবরণ বলা ভুল হইয়াছে। ১৪৬ জন বন্দীর মধ্যে ১২৩ জন নিহত হওয়ার কথা ডেভিসের নিকট লিখিত পত্রেই প্রথম প্রচারিত হয়। তৎপূর্ব্বে ফলতাপত্রে কেবল অবরুদ্ধ হইয়া অকথ্য কষ্ট পাওয়ার কথা ছিল, কাহারও নিহত হওয়ার কথা ছিল না; ১৪৬ জন অবরুদ্ধ হওয়ারও কোন উল্লেখ ছিল না, যথা:— I was with the rest of my fellow sufferers about eight at night crammed into the Black Hole prison and past a night of horrors, I will not attempt to describe as they can all descriptions."—এই ফলতার পত্রও কিন্তু পলাশীযুদ্ধের উত্তরকালে জনসমাজে প্রকাশিত হয়।
  12. The Great battles of the British Army.
  13. Echoes from Old Calcutta.
  14. অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মিত হইয়াছিল তাহা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়। আবার বিংশ শতাব্দীর প্রথম বর্ষে সেই স্মৃতিস্তম্ভ পুননির্ম্মিত হইতেছে। প্রথমে লালদিঘীর উত্তর পশ্চিম কোণে স্যর এসলি ইডেনের প্রস্তরমূর্ত্তি স্থানান্তরিত করিয়া হলওয়েলের স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মিত করিয়া অল্প কয়েক দিন পরে ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়; আবার পোষ্টাপিসের পার্শ্বে তাহা নির্ম্মিত হইতেছে!
  15. কলিকাতায় এবং অন্যান্য স্থানে সেকালের ইংরাজদিগের যে সকল জরাজীর্ণ সমাধিক্ষেত্র দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা আজিও কত যত্নে, কত ব্যয়ে, কত সমাদরে রক্ষিত হইতেছে! আর এমন পবিত্র সমাধিস্তম্ভ বিলুপ্ত হইল,—অথচ কেহ কোনরূপ উচ্চবাচ্য করিলেন না!
  16. Calcutta,—Its highways and by-paths,—By Edmund Mitchell, M. A}}
  17. “The stone pavement close to this, marks the position and size of the prison-cell in old Fort William known in history as the Black Hole of Calcutta.”
  18. I bid.
  19. Early Records of British India.
  20. Asiatic Journal of Bengal.
  21. As to the Black Hole tragedy,—the unburried site of which is the subject to much fuss in our day,—I have a very doubtful faith in mount. Holwell, one of the fellow sufferers, was the first to furnish it to the world. But I have always questioned it to myself, how could 146 beings be squeezed into a room 18 feet square even if it were possible to closely pack them like the seeds within a pomegranate, or like the bags in a ship's hold made into one mass by packets, shoved in here and there into the interstices? Geometry contradicting arithmetic gives a lie to the story. It is little better than a bogey against which was raised an uproar of pity.—Dr. Bhola Nath Chunder (Calcutta University Magazine).
  22. Mutakherin
  23. India Tracts.
  24. The troops in garrison consisted, by the muster rolls laid before us about the 6th or 8th of June, of 145 in battalion, and 45 of the train, officers included in both only 60 Europeans.—Holwell's letter to the Hon'ble the Court of Directors, dated Fulta 30th November 1756. (para.36)
  25. Those remaining, including officers, volunteers, soldiers, and militia, did not exceed 170 men; and of these there were 25 killed and about 70 wounded before noon of the 20th. —Ibib. অথচ এই হলওয়েলই লিখিয়া গিয়াছেন যে, অন্ধকূপে ১২১ জন ইউরোপীয় প্রাণত্যাগ করে তন্মধ্যে ৫২ জনের নাম জ্ঞাত, ৬৯ জনের নাম তাঁহার অজ্ঞাত!!
  26. অন্ধকূপহত্যা নামে যে কাহিনী ইতিহাসে স্থান লাভ করিয়াছে, এই পরিচ্ছেদে তাহাই সমালোচিত হইয়াছে। প্রকৃত প্রস্তাবে কি ঘটিয়াছিল, তাহা কে বলিবে? হলওয়েল ও তাঁহার সহকারিগণ সে রজনীতে কারারুদ্ধ ছিলেন-সুতরাং তাঁহাদের পক্ষে সে নিদাঘ সন্তপ্ত রজনী সুখকর না হইবারই কথা। কিন্তু তাহা যে কাহারও অকাল মৃত্যুর কারণ হইয়াছিল, সে কথা সমসাময়িক কাগজপত্রে উল্লিখিত নাই। আলিনগরের সন্ধিপত্রে সকলের ভাগ্যেই ক্ষতিপুরণ নির্দ্দিষ্ট হইয়াছিল; কারারোধে মৃত্যু ঘটিয়া থাকিলে, তাহাদের বংশধরগণের পক্ষেও সুব্যবস্থা হইত। হতাহত ব্যক্তিগণ যে হলওয়েল-লিখিত মৃতের সংখ্যা বর্দ্ধন করে নাই, তাহ কে বলিবে? বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের মনেও সে সন্দেহ রহিয়া গিয়াছে!
  27. Calcutta Review, April, 1892.
  28. “The doors were opened, and behold! they were all dead. Unconsciously the tragedy of Holwell's Black Hole had been reenacted. Forty five bodies,—dead from fright, exhaustion, fatigue, heat and partial suffocation—were dragged into light.” The Crisis in the Punjab, p. 162.
  29. একথা সত্য হইলে দুর্গপ্রবেশের সময়েও সিপাহীরা সাহেবদিগকে হত্যা করিতে ত্রুটি করিত না, কিন্তু ষ্টুয়ার্ট বলেন যে,—“The English having surrendered their arms, the Nawab's troops refrained from bloodshed.”
  30. Mill, vol. iii.
  31. মেকলে লিখিয়া গিয়াছেন;—“The gaolers in the meantime held tights to the bars, and shouted with laughter at the frantic struggles of their victims.” বলা বাহুল যে, স্বয়ং হলওয়েলও এ কথা লিখেন নাই!
  32. But the probability is, that the Subahdar had himself made or sanctioned the selection of the Black Hole as the place of confinement, for when the miserable prisoners besought that they might be relieved by the removal of part of their number to some other place, their prayer was unavailing, because it could not be granted without the express orders of the Subahder, whose sleep no one dared to disturb for so trivial a purpose as the preservation from death of nearly one hundred and fifty human beings.—Thornton' History of the British Empire, vol. i. 197.
  33. What had they to do with a Black Hole? Had no 'black hole existed, (as none ought to exist anywhere, least of all in the sultry and unwholesome climate of Bengal) those who perished in the Black Hole of Calcutta would have experienced a different fate.—Mill’s History of British India, vol. iii. 149 note
  34. মীরজাফরকে পদচ্যুত করিয়া মীরকাশিমকে সিংহাসন দান করায় হলওয়েল সাহেব মীরকাশিমের নিকট তিন লক্ষ নয় হাজার তিন শত সত্তর টাকা পুরস্কার পাইয়াছিলেন!—Report of the Committee of the House of Commons, 1772
  35. Long's Selections from the Records of the Govt. of India, vol. I.
  36. In justice to the memory of the late Nabob Meer Jaffier, we think it incumbent on us to acquaint you that the horrible massacres wherewith he is charged by Mr. Holwell in his address to the proprietors of East India Stock (page 46) are cruel aspersions on the character of that prince, which have not the least foundation in truth. Letter to Court, 30 September, 1766, supplement.
  37. Long's Selections.—Introduction, xiv,
  38. Hasting's MSS, vol. 29.209.
  39. Evidence of Beecher before the Committee of the House of Commons, 1772.
  40. Long's Selections, vol. i. 205.
  41. Long's Selections.—Introduction, xiv.
  42. পলাশির যুদ্ধকাব্য—তৃতীয় সর্গ; দ্বিতীয় স্বপ্ন।
  43. লর্ড মেকলের গদ্য প্রবন্ধের ছায়া লইয়াই কি এই সকল বিচিত্র স্বল্পকাহিনী রচিত হয় নাই? কল্পনানিপুণ লর্ড মেকলে লিখিয়া গিয়াছেন,—Appalled by the greatness and meanness of the crisis, distrusting his captains, dreading every one who approached him, dreading to be left alone, he sat gloomily in his lent, haunted, a Greek poet would have said, by the Turies of those who had cursed him with their last breath in the Black Hole. —Macaulay's Lord Clive.