সিরাজদ্দৌলা/চন্দননগর ধ্বংস

সিরাজদ্দৌলা - অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (page 368 crop).jpg

ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ।

চন্দননগর-ধ্বংস।

 নবাবের প্রত্যুত্তর না পাইয়া ইংরাজেরা সহসা কিংকর্ততব্য স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না। ক্লাইব বলিতে লাগিলেন যে, হয় সন্ধি কর, না হয় এখনই যুদ্ধঘোষণা কর। ওয়াট্‌সন্ সন্ধিতেও অসম্মত, নবাবের অনুমতি না লইয়া যুদ্ধঘোষণা করিতেও অসম্মত। অগত্যা সন্ধির লেখাপড়া যেমন চলিতেছিল, সেইরূপই চলিতে লাগিল; অথচ কোন কথারই মীমাংসা হইল না।

 সিরাজদ্দৌলা যে ফরাসিদিগের সর্ব্বনাশসাধনে সহায়তা করিবেন না, সে বিষয়ে কাহারও সন্দেহ ছিল না। সুতরাং সকলেই বুঝিয়াছিলেন যে, ফরাসির সঙ্গে কলহ বিবাদ উপস্থিত করিলে প্রকারান্তরে সিরাজদ্দৌলার সঙ্গেই কলহ করার ফল হইবে। সেই জন্য সকলেই বলিয়াছেন,—“সন্ধিভঙ্গ মহাপাপ; নবাবের নিষেধ লঙ্ঘন করিয়া যুদ্ধ করা হইবে না।” কিন্তু এই সময়ে মান্দ্রাজ এবং বোম্বাই হইতে কয়েক পল্টন ফৌজ আসিবার সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া ইংরাজদিগের সকল ইতস্ততঃ মিটিয়া গেল; তাঁহারা দরবার বসাইয়া কর্তব্যনির্ণয়ে নিযুক্ত হইলেন!

 এই মন্ত্রণাসভায় ক্লাইব প্রধান মন্ত্রীর আসন গ্রহণ করিলেন; গবর্ণর ড্রেক, মেজর কিলপ্যাট্রিক, এবং বীচার সাহেব সদস্য হইলেন। ক্লাইবের বক্তৃতা শেষ হইলে সকলেই বুঝিলেন যে, আর নবাবের অনুমতিলাভের আশা নাই, বরং তিনি সসৈন্যে ফরাসিপক্ষ অবলম্বন করাই সম্ভব। সুতরাং সহসা চন্দননগর আক্রমণ করিলে আলিনগরের সন্ধিভঙ্গ হইয়া নবাবের সঙ্গে পুনরায় শত্রুতার সূত্রপাত হইবে। মেজর কিলপ্যাট্রিক এবং বীচার বলিলেন “এরূপ ক্ষেত্রে যুদ্ধ করা অনুচিত।” ক্লাইব তাঁহাদের কথায় বাধা দিয়া বলিয়া উঠিলেন, “কিসের সন্ধি? এই ত চন্দননগর আক্রমণের উপযুক্ত অবসর।” তখন সকলেই ড্রেক সাহেবের মুখের দিকে চাহিলেন; তিনি অনেক হত ইতি গজ করিলেন, কিন্তু উপস্থিত সমস্যার কোনই মীমাংসা করিতে পারিলেন না। তাঁহার ‘মত’ কেহ গণনার মধ্যে আনিলেন না। দুই জন সন্ধির পক্ষে, একজন যুদ্ধের পক্ষে, এরূপ অবস্থায় সন্ধি করাই স্থিরীকৃত বটে। কিন্তু মেজর সাহেব সহসা ক্লাইবকে জিজ্ঞাসা করিলেন —“আচ্ছা, এখন আমাদের যত সেনাবল সংগৃহীত হইয়াছে, তাহা লইয়া নবাব এবং ফরাসি দুইদলকেই পরাস্ত করা কি সম্ভব নহে?” ক্লাইব বলিলেন,—“নিশ্চয়ই সম্ভব।” তখন কিলপ্যাট্রিক মত পরিবর্ত্তন করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘তবে আমিও আর সন্ধি চাহি না।’[১] দরবার ভঙ্গ হইল; ক্লাইব বাহিরে আসিয়া ফরাসি-দূতকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘আর সন্ধি হইবে না; অতঃপর কেবল যুদ্ধ।’

 সহসা ইংরাজের মতিপরিবর্ত্তন হইল কেন, ফরাসিরা আর তাহা লইয়া কোনরূপ অন্দোলন করিলেন না। ইংরাজ তাঁহাদের পুরাতন বন্ধু (!) সুতরাং নূতন পণ্টন আসিয়াছে বলিয়াই যে তাঁহাদের মতিপরিবর্ত্তন হইল, ফরাসিরা তাহা সহজেই বুঝিতে পারিলেন। তাঁহারা চন্দননগরে সংবাদ পাঠাইলেন যে, আর সন্ধির আশা বৃথা; অতঃপর কেবল যুদ্ধ!

 ইংরাজ-দরবার স্থির করিলেন, অতঃপর কেবল যুদ্ধ! কিন্তু ওয়াট্‌সন্ তাহাতে সম্মত হইলেন না। নবাবের অনুমতি না পাইলে তিনি কিছুতেই যুদ্ধঘোষণা করিবেন না, এ সংবাদে ক্লাইব হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। জাহাজগুলি ওয়াট্‌সনের আজ্ঞাবহ, জাহাজ না লইয়া চন্দননগর আক্রমণ করা বিড়ম্বনা মাত্র; সুতরাং ওয়াট্‌সন কে বুঝাইবার জন্য সকলেই ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। কিন্তু ওয়াট্‌সনের সংকল্প অচল অটল। সকলেই বুঝিয়াছিলেন যে সিরাজদ্দৌলার অনুমতি পাওয়া অসম্ভব; তথাপি ওয়াট্‌সনের অনুরোধে নবাবের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করিতে হইল।

 ওয়াট্‌সন্ ভাবিয়াছিলেন যে, সিরাজদ্দৌলা দিল্লীর ভয়ে জড়সড় হইয়াছেন, এ সময়ে একটু তর্জ্জন গর্জ্জন করিয়া পত্র লিখিলে অবশ্যই অনুমতি পাওয়া যাইবে। তিনি সেই উদ্দেশ্যে লিখিয়া পাঠাইলেন:—

 স্পষ্ট কথা বলিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে। শান্তিরক্ষা করা যদি আপনার অভিপ্রেত হয়, অসহায় প্রজাপুঞ্জের ধনপ্রাণ রক্ষা করা যদি আপনার রাজধর্ম্ম হয়, তবে অদ্য হইতে দশ দিবসের মধ্যে আমাদের প্রাপ্য শেষ কপর্দ্দক পর্যন্ত পরিশোখ করিয়া দিবেন। অন্যথাচরণ করিলে সমূহ দুর্ঘটনা উপস্থিত হইবে। আমরা কেবল, সরল ব্যবহার করিয়া আসিতেছি, এখনও সরল ব্যবহার করিবার জন্যই বলিতেছি আমাদের অবশিষ্ট সেনাদল শীঘ্রই কলিকাতায় উপনীত হইবে, এবং আবশ্যক বুঝি ত আরও জাহাজ জাহাজ ফৌজ লইয়া আসিব। ইহাদের সহায়তায় এ দেশে এমন ভয়ানক সমরানল জ্বালিয়া দিব যে, সমস্ত জাহ্নবীজল শুষ্ক করিয়াও আপনি তাহা নির্ব্বাণ করিতে পারিবেন না। আপাততঃ বিদায় গ্রহণ করিতেছি; কিন্তু যিনি জীবনে কাহারও সঙ্গে কথার অন্যথা করেন নাই, তিনিই যে স্বহস্তে এই পত্র লিখিতেছেন, এ কথা যেন আপনি কদাচ বিস্মৃত না হন।[২]

 সিরাজদ্দৌলা এই পত্রের গূঢ়মর্ম্ম অনুধাবন করিয়া লিখিয়া পাঠাইলেন:—

 “তোমাদের নিকট যে সেনাসাহায্য চাহিয়াছিলাম তাহার কি হইল? সন্ধিপত্রের অঙ্গীকৃত অর্থ শীঘ্রই পাঠাইয়া দিতেছি, কেবল দোলযাত্রা উপলক্ষে রাজকর্ম্মচারিগণ উৎসব-মগ্ন ছিলেন বলিয়াই বিলম্ব হইয়াছে। সন্ধিভঙ্গ করা আমার অভ্যাস নাই, যাহা স্বীকার করিয়াছি তাহা প্রদান করিবার সময়ে বাক চাতুরী করিয়া কাল হরণ করিব না। কেহ যদি তোমাদিগকে আক্রমণ করে, তখন আমি তোমাদের সহায়তা করিব। আমি এ পর্য্যন্ত ফরাসিদিগকে কপর্দ্দক সাহায্য প্রেরণ করি নাই, কেবল প্রজারক্ষার জন্যই হুগলীর ফৌজদার নন্দকুমারের নিকট কতকগুলি ফৌজ পাঠাইয়াছি মাত্র। এদেশের চিরন্তর প্রথা উল্লঙ্ঘন করিয়া তোমরা আমার অধিকারে কোনরূপ যুদ্ধ কলহ উপস্থিত না কর—ইহাই আমার একান্ত অনুরোধ।”[৩]

 এই পত্র পাইয়া সকলেই বুঝিলেন যে, সিরাজদ্দৌলা কিছুতেই যুদ্ধের অনুমতি দিবেন না। যাহা সহজে হইবে না, তাহা কৌশল ক্রমে সাধন করা ওয়াট্‌সনের উদ্দেশ্য হইয়া উঠিল। কি জন্য, কাহার দোষে সন্ধি হইল না, সে সকল কথার আনুপূর্ব্বিক উল্লেখ না করিয়া ওয়াট্‌সন্ লিখিয়া পাঠাইলেন ফরাসীদিগের দোষে সন্ধি হইল না; এবং যাহারা এরূপ চরিত্রের লোক আহাদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করা কর্ত্তব্য, তদ্বিষয়ে সিরাজদ্দৌলার মত জিজ্ঞাসা করিলেন। সিরাজদ্দৌলা ইহাকে সাধারণ ভাবের পত্র মনে করিয়া সাধারণ ভাবেই প্রত্যুত্তর লিখিলেন:—

১০ মার্চ ১৭৫৬।

 “আমার পত্র পাইয়া যে প্রত্যুত্তর দানে বাধিত করিয়াছ, তাহা আমার হস্তগত হইয়াছে। তুমি লিখিয়াছি যে, “তোমাদের সকল সন্দেহ দূর হইয়াছে, আমার পত্র পাইয়া চন্দননগর আক্রমণ করিবার সংকল্প পরিত্যাগ করিয়াছ, ফরাসীদিগের সঙ্গে লেখা পড়াও শেষ করিয়াছিলে, কিন্তু ফরাসিরা নাকি স্বাক্ষর করিবার সময়ে বলিয়াছে যে তাহাদের সেনাপতিগণ এই সন্ধি পালন করবেন কি না তাহার নিশ্চয়তা নাই।” একজন ফরাসি যাহা স্বাক্ষর করিল, আর একজন আসিয়া তাহার অন্যথা করিলে তাহাদিগকে আর কেমন করিয়া বিশ্বাস করা যায়? সে যাহা হউক আমার অধিকারে যুদ্ধকলহ করিতে আমি নিতান্ত অসম্মত; তাহার কারণ এই যে, ফরাসিরাও আমার প্রজা এবং তোমাদের ভয়ে আমার শরণাগত হইয়াছে। সেই জন্যই আমি সন্ধি করিতে বলিয়াছিলাম। তাহাদিগকে যে অনুগ্রহ দেখাইব বা সহায়তা করিব এমন অভিসন্ধি ছিল না। তুমিও ত একজন বিজ্ঞ বিচক্ষণ সদাশয় মহাত্মা, তুমিই বিচার করিয়া দেখ যে, পরম শত্রুও যদি শরণাগত হয় তবে তাহাকে প্রাণভিক্ষা প্রদান কর কি না? তাহার সরলতায় যদি সন্দেহ না থাকে, তবে তুমিও তাহাকে দয়া করিয়া থাক; সরলতায় সন্দেহ হইলে পৃথক কথা,—তখন যেমন বুঝিতে পার সেইরূপ আচরণ করিয়া থাক।”[৪]

 এই পত্রের শেষোক্ত কথাগুলি সিরাজদ্দৌলার লিখিত কি না, তদ্বিষয়ে মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়। একজন সমসাময়িক ইংরাজ লিখিয়া গিয়াছেন যে, পত্রখানি যাহাতে এইরূপ ভাবে লিখিত হয়, তজ্জন্য মুন্সিখানায় সময়োচিত অর্থব্যয় করিতে ক্রটি হয় নাই।[৫]

 মূলপত্রখানি পারস্যভাষায় লিখিত। তাহার আর সন্ধান পাওয়া যায় না। ওয়াট্‌সন্ সাহেব মুন্সীখানায় ‘তদ্বির’ করিয়া যেরূপ অনুবাদ পাঠাইয়াছিলেন, তাহাই এখন ইতিহাসের একমাত্র সম্বল। আমরা তাহারই অনুবাদ প্রদান করিলাম। এই পত্রের কোন স্থলে অনুমতির নামগন্ধ নাই; ওয়াট্‌সন্ ইহাকেই নবাবের অনুমতিপত্র বলিয়া রাষ্ট্র করিয়া দিলেন।[৬] ওয়াট্‌সন্ও সমরোন্মুখ, কিন্তু পাছে উত্তরকালে ইহার জন্য গঞ্জনাভোগ করিতে হয়, বোধ হয় সেই জন্য তিনি কৈফিয়ৎ সংগ্রহের আয়োজন করিতেছিলেন। সেই কৈফিয়ৎ হস্তগত হইবামাত্র ওয়াট্‌সনের সকল ইতস্ততঃ মিটিয়া গেল। তখন ইংরাজের রণবাদ্য ঝম্ ঝম্ করিয়া বাজিয়া উঠিল:— জলপথে ওয়াট্‌সন্ আর স্থলপথে ক্লাইব, সসৈন্যে চন্দননগরের দিকে অগ্রসর হইলেন।

 ৭ই ফেব্রুয়ারী আলিনগরের সন্ধিপত্র লিখিত হইয়াছিল; আর ৭ই মার্চ্চ ইংরাজসেনা চন্দননগরের সম্মুখে আসিয়া শিবির-সংস্থাপন করিল। সিরাজদ্দৌলার সম্মুখে বাইবেল চুম্বন করিয়া ঈশ্বর ও যীশু খৃষ্টের পবিত্র নামে ওয়াট্‌সন্ ও ক্লাইব যে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়াছিলেন, তাহার ক্ষীণ পরমায়ু এইরূপে প্রভাতশিশিরের ন্যায় এত অল্পক্ষণের মধ্যেই বিলীন হইয়া গেল।

 মন্ত্রণাগৃহের উত্তেজনায় পড়িয়া ক্লাইব বলিয়াছিলেন ‘ফরাসির সহিত নবাবের সেনাদল মিলিত হইলেই বা ভীত হইব কেন? একাকী উভয় সেনাদল বাহুবলে পরাজয় করিব।’ কিন্তু চন্দননগরের সম্মুখে আসিয়া সে বাহুবল সহসা যেন শিথিল হইয়া পড়িল! ফরাসিরা বীরবিক্রমে দুর্গ রক্ষা করিতে কৃতসংকল্প, নিকটে নন্দকুমারের সেনাদল সতর্ক ভাবে দণ্ডায়মান! সুতরাং ক্লাইব শিহরিয়া উঠিলেন। কিন্তু বিপদে পড়িয়া উপায় উদ্ভাবন করিতে ক্লাইব বড়ই সিদ্ধমনোরথ। তিনি সাম দান ভেদ দণ্ডাত্মক নীতি পদ্ধতির সমাদর রক্ষা করিতে ত্রুটি করিলেন না। নন্দকুমারকে পরাজয় করিতে কতক্ষণ? কিন্তু পরাজয় করা অপেক্ষাও কি সহজ পথ নাই? ক্লাইব সেই সহজ পথের সন্ধান লইবার জন্য উমিচাঁদকে নন্দকুমারের শিবিরে পাঠাইয়া দিলেন।[৭] উমিচাঁদ সহজেই কৃতকার্য্য হইলেন;—নন্দকুমার সসৈন্যে ডঙ্কা বাজাইয়া দূরস্থানে সরিয়া পড়িলেন। যে সকল প্রতিভাশালী ইতিহাসলেখক ক্লাইবের গৌরব-বর্দ্ধনের জন্য লেখনী চালনা করিয়াছেন, তাঁহারাও স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়া গিয়াছেন যে, এ যাত্রা কেবল উৎকোচ-মহিমাতেই নন্দকুমার পরাজিত হইয়াছিলেন।[৮]

 ফরাসিরা ইংরাজের প্রচণ্ড বিক্রমের সম্মুখে অধিকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলেন না; প্রাণপণে দুর্গ রক্ষা করিতে গিয়া দলে দলে প্রাণবিসর্জ্জন করিলেন। যখন তাঁহাদের বাহুবল টুটিয়া আসিল, তখন তাঁহারা ধীরে ধীরে দুর্গত্যাগ করিলেন; ইংরাজসেনা ২৩শে মার্চ্চ অপরাহ্ণে মহোল্লাসে “হুরে ধ্বনিতে” জলস্থল প্রতিশব্দিত করিয়া ফরাসিদুর্গে ইংরাজের বিজয় বৈজয়ন্তী উড়াইয়া দিল! ইতিহাসে ইহারই নাম চন্দননগরের অলৌকিক মহাযুদ্ধ![৯]

 এই অলৌকিক মহাযুদ্ধের গুপ্ত-রহস্য কিন্তু ইংরাজের ইতিহাসে স্থানলাভ করে নাই। ইংরাজের গতিরোধ করিবার জন্য ফরাসি-সেনা গোপনে ভাগীরথীগর্ভে কতকগুলি জাহাজ জলমগ্ন করিয়া রাখিয়াছিল;— কেবল স্বপক্ষের জাহাজ চলাচলের জন্য একটি অতি সঙ্কীর্ণ পয়ঃপ্রণালী বর্তমান ছিল। কিন্তু দুর্গবাসী ফরাসিসেনা ভিন্ন আর কেহ তাহার সন্ধান জানিত না। ফরাসি দুর্গাধিপতি মসিয় রেলের কঠোর শাসনে অসন্তুষ্ট হইয়া টেরানু নামক একজন ফরাসি সৈনিক ইংরাজদিগের নিকট এই গুপ্ত সন্ধান বিক্রয় করিয়া চন্দননগর ধ্বংস করিবার সহায়তা করে![১০] এইরূপ সহায়তা পাইলে ইংরাজেরা যে সহজে চন্দননগরের নিকটবর্তী হইতে সক্ষম হইতেন, তাহার প্রধান প্রমাণ লর্ড ক্লাইব;—তিনি নিজেই বলিয়া গিয়াছেন যে, কেবল জলযুদ্ধেই এত সহজে চন্দননগর ইংরাজের হস্তগত হইয়াছিল।[১১] হতভাগ্য টেরানু আত্মবিক্রয় করিয়া যে অগাধ ধনরাশি সঞ্চয় করিয়াছিল, তাহাও তাহার ভোগে আসিল না;— সে আত্মহত্যা করিয়া আত্মাপরাধের ঘৃণিত-কলঙ্ক মোচন করিয়া গিয়াছে![১২]
এইরূপে,

“———গঙ্গা-তীরে, নীরে,
জলিল সমরানল ধরি ভীম সাজ;
ভয়ে ভীতা ভাগীরথীী বহিলেক ধীরে।
নবম দিবস পরে নভঃ আলো ক’রে,
উঠিল ব্রিটিশ-ধ্বজ চন্দননগরে!”

এইরূপে,

“ফরাসির সম যোদ্ধা নাহি ভূভারতে”
বঙ্গদেশে একবাক্যে বলিত সকলে।
সে ফরাসি-যশো-রবি সেই দিন হ’তে
ক্লাইবের “কটাক্ষেতে” গেছে আস্তাচলে!

[১৩]
 সংবাদ পাইয়াও সিরাজদ্দৌলা ফরাসিদিগকে রক্ষা করিতে পারিলেন না; ইহাই তাঁহার সর্ব্বনাশের মূল হইল। ইংরাজেরা বলেন “তিনি আহমদ শাহ আব্‌দালীর আক্রমণ-ভয়ে ব্যতিব্যস্ত হইয়া এ দিকে দৃষ্টিপতি করিবার অবসর পান নাই, এবং ইংরাজবন্ধু মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায় দুর্ল্লভ প্রভৃতি পাত্রমিত্রও নানাকৌশলে সিরাজদ্দৌলার হৃদয়ে আব্‌দালীর আক্রমণভীতি জাগরিত রাখিয়া তাঁহাকে কর্ত্তব্যভ্রষ্ট করিতে ক্রটি করেন নাই।” সিরাজদ্দৌলাকে যে দশজনে মিলিয়া নানা বিভীষিকায় ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা সত্য কথা; কিন্তু তিনি ব্যতিব্যস্ত হইয়াও ফরাসিদিগের পৃষ্ঠরক্ষার জন্য হুগলীতে সেনা-সমাবেশ করিতে বিস্মৃত হন নাই। ফরাসিদিগকে সর্ব্বপ্রযত্নে রক্ষা করাই যে তাঁহার পক্ষে মঙ্গলজনক তাহা সিরাজদ্দৌলা বিলক্ষণ জানিতেন, এবং জানিতেন বলিয়া সর্ব্বপ্রযত্নে ইংরাজদিগকে বাধা প্রদান করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন! কে জানিত যে মহারাজ নন্দ কুমার সিরাজদ্দৌলার লবণ খাইয়া সিরাজদ্দৌলার আজ্ঞালঙ্ঘন করিবেন?

  1. মন্ত্রণাব্যাপারের সমালোচনা করিতে গিয়া ইংরাজ ইতিহাসলেখক জেম্‌স্ মিল সদস্যদিগকে পরিহাস করিতে ত্রুটি করেন নাই।
  2. Ive's Journal.
  3. Ive's Journal.
  4. Ive's Journal.
  5. Scrafton's Reflection, 70.
  6. This letter may be very well understood, as a consent to our attacking the French, though it certainly was never meant as such.—Scrafton.
  7. Another well-applied bribe to Nun Comar,—Scrafton.
  8. A body of the Subadhar's troops was stationed within the bounds of Chandernagore previously to the attack. They belonged to the garrison of Hoogly, and were under the command of Nuncomar, governor of that place. Nuncoomar had been bought by Omichand for the English, and on their approach, the troops of Shirajodowla, were withdrawn from Chandernagore.—Thornton's. History of the British Empire, vol. I. p.221.
  9. Few naval engagements have excited more admiration, and even at the present time when the river is so much better known. the success with which the largest vessels of this fleet were navi- gated to Chandernagore, and laid alongside the batteries of that settlement, is a subject of wonder.-Sir John Malcolm's Life of Clive, vol. 1. 192.
  10. Tarikh-i-Mansuri.
  11. The Squardron “surmounted difficulties, which he believed no other ships could have done;and it is impossible for him to do the officers of the Squadron justice upon that occasion. The place surrrendered to them, and it was in a great measure taken by them.” —Clive's Evidence.”
  12. Mr. Terraneau, who in consequence of this treachery became infamous and “black faced, received from the English a large sum as a reword for his ingratitude. He sent a part of the money home to his old and infirm father, who however returned it, when he heard the disgraceful behaviour of his son. Mr. Terraneau felt much mortified at this. Shame 'seized the hem of his garment,” he shut himself up; after a few days his body was found hanging, at the gate of his house suspended by means of a towel. It was plain that he had committed suiside.—Blochmann's Notes on Sirajuddaulah, Journal of the Asiatic Society, I867.
  13. পলাশির যুদ্ধ কাব্য- প্রথম সর্গ। ক্লাইব কিরূপ “কটাক্ষেতে” চন্দননগর ধ্বংস করিয়াছিলেন, তৎসম্বন্ধে তিনি নিজে যাহা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা এইরূপ:—
     At a Select-Committee, held 10th April, 1757.

    Present
    Colonel Robert Clive
    Major Kilpatrick
    J. Z. Holwell Esqr.

     We the servants of the East India Company should always be greatful to that noble-minded and wealthy native merchant of Calcutta-Omichand. It was through his agency that we succeeded to secure the assistance and co operation of Dewan Nuncoomar, Phoujdar of Hoogly. A body of Subadhar's troops was stationed within the bounds of Chandernagore previously to our attack of that place, These troops belonged to the garrison of Hoogly, and were under the command of Dewan Nuncoomar. If these troops were not with-drawn, it would have been highly improbable to gain the victory.