সিরাজদ্দৌলা/সিরাজ না শওকতজঙ্গ, কাহাকে চাও?

সিরাজদ্দৌলা - অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (page 317 crop).jpg

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।

সিরাজ না শওকতজঙ্গ,—কাহাকে চাও?

 ইংরাজদিগের যেরূপ অসাধারণ অধ্যবসায়, তাহাতে এদেশের লোকের ধারণা ছিল যে, ইংরাজদমন করা বোধ হয় মানুষের সাধ্য নহে। দাক্ষিণাত্যে বৃটীশ “বেয়নেটে” ফরাসী সেনা উপর্য্যুপরি পরাজিত হইতেছিল; সে সংবাদে ইংরাজের প্রবল প্রতাপ ক্রমেই উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছিল। এমন সময়ে নবাব সিরাজদ্দৌলা বাহুবলে সেই অজেয় মহাশক্তিকে মুহূর্ত্তে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া মহাসমারোহে রাজধানী প্রত্যাগমন করায় দেশের মধ্যে হুলস্থূল পড়িয়া গেল;—যাঁহারা আত্মোদর পূর্ণ করিবার জন্য দরিদ্রের মুখের গ্রাস অপহরণ করিতে কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করিতেন না, সেই সকল পাত্রমিত্রদল বিষাদে অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। রাষ্ট্রবিপ্লবের শেষ আশা শওকত জঙ্গ;—কিন্তু অতঃপর তিনিও যে সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে শক্তিপরীক্ষা করিতে সম্মত হইবেন, তাহারই বা সম্ভাবনা কোথায়? সুতরাং সিরাজদ্দৌলা কথঞ্চিত নিশ্চিন্তহৃদয়ে রাজকার্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার আয়োজন করিতে লাগিলেন।

 সিরাজদ্দৌলার কপালে নিরুদ্বেগ হইবার অবসর ঘটিল না। এক মাস কালও নির্ব্বিবাদে কাটিল না। পূর্ণিয়াধিপতি শওকতজঙ্গ সসৈন্যে মুরশিদাবাদ আক্রমণ করিতে আসিতেছেন;—এইরূপ জনরব আবার দেশরাষ্ট্র হইয়া পড়িতে লাগিল! গুপ্তচরসহায়ে সিরাজদ্দৌলা শীঘ্রই সংবাদ পাইলেন যে, এই জনরব অলীক নহে। দিল্লীর বাদশাহ দীর্ঘকাল রাজকর না পাইয়া অবশেষে মন্ত্রীদলের মন্ত্রণাক্রমে শাহজাদাকেই বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত করিয়াছেন;— তদনুসারে শাহজাদা সসৈন্যে পূর্ণিয়ার দিকে অগ্রসর হইতেছেন। শাহজাদা ও শওকতজঙ্গ যুগপৎ রাজধানী আক্রমণ করিয়া সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করিতে পারিলে শাহজাদার নামে শওকতজঙ্গ রাজ্যশাসন করিবেন। সিরাজ নীরবে এই রণসমাচার লুকাইয়া রাখিতে পারিলেন না;—তিনিও সিংহাসন রক্ষার জন্য সেনাসংগ্রহে মনোনিবেশ করিলেন।

 সিরাজদ্দৌলা জানিতেন যে, তাহার মন্ত্রীদলের চক্রান্তবলেই এই অভিনব অভিযানের সূত্রপাত হইয়াছে। যাহারা সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করিয়া শওকতজঙ্গকে সেই সিংহাসনে বসাইয়া দিবার জন্য লালায়িত, তাঁহারা যে কিরূপ স্বদেশহিতৈষী পরিণামদর্শী বীরপুরুষ, সিরাজদ্দৌলা তাহা বিলক্ষণ জানিতে পারিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি আর কাহারও কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারিলেন না। শওকতজঙ্গ কুক্রিয়াসক্ত তরুণযুবক, তাহার মন্ত্রিদল স্বার্থলুব্ধ চাটুকার মাত্র— তাঁহাকে পরাজয় করা কঠিন কার্য্য নহে। কিন্তু শাহজাদা যদি শওকতজঙ্গের সঙ্গে মিলিত হন, তবে সে সম্মিলিত শক্তি পরাজয় করা বড়ই অসাধ্য হইয়া উঠিবে। যদিও দিল্লীর প্রবল প্রতাপ চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, তথাপি বাদশাহের নামের ঐন্দ্রজালিক মহাশক্তি সর্ব্বথা বিলুপ্ত হইয়াছিল না। সিরাজদ্দৌলা জানিতেন যে, সেই বাদশাহের নামের দোহাই দিয়া বাদশাহজাদা সম্মুখসমরে দণ্ডায়মান হইলে এ দেশের গণ্যমান্য সকল লোকেই মুহূর্ত্তমধ্যে বাদশাহের পক্ষে ঢলিয়া পড়িবে, সিরাজকে হয়ত বিনাযুদ্ধে তাঁহার আত্মপক্ষীয় পাত্রমিত্রেরাই বাদশাহের নিকট বাঁধিয়া পাঠাইয়া দিবে। সুতরাং তিনি আর কালক্ষয় না করিয়া শাহজাদার শুভাগমনের পূর্ব্বেই পূর্ণিয়ার বিদ্রোহদলনে কৃতসংকল্প হইলেন।

 শওকতজঙ্গ রাজবিদ্রোহী। তথাপি শওকতজঙ্গ পরমাত্মীয়। আলিবর্দ্দীর বংশধর বলিয়া তিনিও লোকসমাজে সবিশেষ সুপরিচিত। সুতরাং সহসা তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করিলে পাত্রমিত্রগণ নানারূপ চক্রান্ত করিয়া সিরাজদ্দৌলার মনোরথ পূর্ণ করিবার অবসর প্রদান করিবেন না। সিরাজ সেইজন্য কৌশলজাল বিস্তার করিলেন।

 পূর্ণিয়া প্রদেশে বীরনগরে একজন ফৌজদার থাকিত। সেই পদ শূন্য রহিয়াছে দেখিয়া সিরাজদ্দৌলা রাসবিহারী নামক এক জন অনুগত ব্যক্তিকে ফৌজদার নিযুক্ত করিয়া শওকতজঙ্গের নিকট পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন।[১] সিরাজ যাহা চাহেন, তাহাই হইল শওকতজঙ্গ পত্রপাঠ লিখিয়া পাঠাইলেন যে,—“আমি বাদশাহী সনন্দ পাইয়া বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হইয়াছি। তুমি আমার নিতান্ত পরমাত্মীয়। তোমার প্রাণবধ করিতে ইচ্ছা নাই। যদি প্রাণ লইয়া পূর্ব্ববঙ্গের কোন নির্জ্জন পল্লীতে পলায়ন করিতে চাও, আমি তাহাতে বাধা দিতে চাহি না। বরং তুমি অন্নবস্ত্রে কষ্ট না পাও, তাহারও ব্যবস্থা করিতে সম্মত আছি। আর বিলম্ব করিও না;—পত্রপাঠ রাজধানী ছাড়িয়া পলায়ন কর। কিন্তু সাবধান! রাজকোষের কপর্দ্দকেও হস্তক্ষেপ করিও না। যত শীঘ্র পার প্রত্যুত্তর পাঠাইও। সময় নাই। অশ্ব সুসজ্জিত। আমিও রেকাবদলে পা তুলিয়া দিয়াছি। কেবল তোমার প্রত্যুত্তর পাইতে যাহা কিছু বিলম্ব।”[২]

 সিরাজদ্দৌলা যথাকালে এই উদ্ধতলিপি নবাব-দরবারের পাত্রমিত্রদিগের কর্ণগোচর করিলেন। তাঁহার আশা ছিল যে, অতঃপর কেহ আর যুদ্ধযাত্রাকালে বাধা প্রদান করিবে না, এবং রাজবিদ্রোহী শওকতজঙ্গের পক্ষ সমর্থনার্থ বাদানুবাদ করিতে সাহস পাইবে না। কিন্তু কথা উঠিতে না উঠিতেই প্রতিবাদ আরম্ভ হইল। মন্ত্রিদল বুঝিলেন যে, শাহজাদা শুভাগমন করিতে এখনও অনেক বিলম্ব; তিনি সশরীরে শুভাগমন না করিলে প্রকাশ্যে শওকতজঙ্গের পক্ষাবলম্বন করা বিড়ম্বনামাত্র;—ইহার মধ্যেই যদি সিরাজদ্দৌলা যুদ্ধযাত্রা করেন, তবে শওকতজঙ্গের সকল চক্রান্তই চুর্ণ হইয়া যাইবে। সুতরাং তাঁহারা সকলেই প্রতিবাদের প্রতিধ্বনিতে সিরাজদ্দৌলাকে উত্যক্ত করিয়া তুলিলেন। জগৎশেঠ মুখপাত্র হইয়া বুঝাইতে লাগিলেন,—“দিল্লীশ্বরই বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার স্বামী; সুবাদার তাঁহার সনন্দবলে শাসনভার পরিচালন করেন। সিরাজদ্দৌলার সনন্দ নাই; শওকতজঙ্গ সনন্দ পাইয়াছেন। এরূপ ক্ষেত্রে কে রাজা কে প্রজা তাহার মীমাংসা হইতে পারে না।” সিরাজ বুঝিলেন যে চক্রান্ত বড়ই কুটিল পন্থা অবলম্বন করিয়াছে। তিনি ক্রোধান্ধ হইয়া জগৎশেঠকে কারারুদ্ধ করিবার আদেশ দিয়া সভাভঙ্গ করিয়া দিলেন; কেহ কেহ এরূপও রটনা করিতে লাগিলেন যে, নবাব ক্রোধকম্পিতকলেবরে জগৎশেঠের গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করেন, তাহাতেই সভাভঙ্গ হইয়া গেল।[৩] বলা বাহুল্য, সিরাজদ্দৌলার আর কিছুমাত্র ইতস্ততঃ রহিল না;—তিনি বাহুবলে পূর্ণিয়া আক্রমণের জন্য সসৈন্যে ধাবিত হইলেন।

 শাহজাদা শুভাগমন করিবার পূর্ব্বে পূর্ণিয়া আক্রমণ করিতে হইলে পূর্ব্ব পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক হইতে একসঙ্গে আক্রমণ করা আবশ্যক;— উত্তরে হিমালয়, সে পথে আক্রমণ করাও অসম্ভব, পলায়ন করাও অসম্ভব। সিরাজদ্দৌলা তিনদিক হইতে তিনদল সেনাসহায়ে পূর্ণিয়া আক্রমণ করাই স্থির করিলেন, কিন্তু বিশ্বস্ত রণকুশল তিনজন সেনাপতি কোথায়? জগৎশেঠকে কারারুদ্ধ করিবার আদেশ প্রদান করায় মীরজাফর সর্ব্বসমক্ষে অসিস্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, তিনি আর সিরাজদ্দৌলার জন্য অস্ত্রধারণ করিবেন না। বিদ্রোহের স্পষ্ট সূচনায় সিরাজদ্দৌলা কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। জগৎশেঠকে কারামুক্ত করিতে হইল, মীরজাফরকে চিনিতে পারিয়াও তাঁহাকে সঙ্গে রাখিতে হইল, এবং রাজা মাণিকচাঁদকে কলিকাতা প্রদেশে রাখিয়া অন্যান্য দলবল লইয়া পূর্ণিয়া যাত্রা করিতে হইল। একদল স্বয়ং নবাবের সঙ্গে রাজমহলের পথে ধাবিত হইল, এই দলে মীরজাফরকে সেনাপতি করিয়া সিরাজদ্দৌলা তাঁহাকে চক্ষে চক্ষে রাখিলেন। একদল রাজা রামনারায়ণের আজ্ঞায় পাটনা হইতে পশ্চিমপ্রান্ত আক্রমণ করিয়া শাহজাদার গতিরোধের আদেশ প্রাপ্ত হইল, আর একদল মহারাজ মোহনলালের আজ্ঞায় জলঙ্গী বহিয়া, পদ্মা উত্তীর্ণ হইয়া, সরদহ হইতে রাণী ভবানীর রাজ্যের ভিতর দিয়া স্থলপথে, পুর্ণিয়া আক্রমণের ভারপ্রাপ্ত হইল।[৪]

 শওকতজঙ্গ ইন্দ্রিয়াসক্ত গর্ব্বোন্মত্ত অকর্মণ্য তরুণ যুবক। তিনি কাহারও পরামর্শে কর্ণপাত না করিয়া নিজেই সেনাদলের অধিনায়ক হইয়া নবাবগঞ্জ নামক স্থানে শিবির-সন্নিবেশ করিলেন। জীবনে একদিনের জন্যেও যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ করেন নাই, ধূমপুঞ্জে আকাশ অন্ধকার করিয়া কামানমুখে মুহুর্মুহুঃ গোলাবর্ষণ হইলে, কোথায় কেমন করিয়া সেনাসমাবেশ করিতে হয়, তাহার কিছুমাত্র অভিজ্ঞতা নাই, অথচ প্রবীণ সেনানায়কগণ কোন বিষয়ে পরামর্শ দিবার চেষ্টা করিলে শওকতজ স্পষ্টই বলিয়া উঠেন যে,—তিনি এই বয়সে এমন একশত যুদ্ধে সেনাচালনা করিয়াছেন। শওকতজঙ্গ প্রভু,—সেনানায়কগণ পদানত ভৃত্য। তাঁহারা আর কি করিবেন? সসম্ভ্রমে ‘কুর্ণিশ’ করিয়া পটমণ্ডপে প্রস্থান করিতে লাগিলেন।

 তথাপি শওকতজঙ্গের প্রবীণ সেনাপতিগণ তাঁহার পক্ষে অনুকুল স্থানেই যুদ্ধভূমি নির্দ্দেশ করিয়া দিয়াছিলেন। অল্প সেনা লইয়া সিরাজদ্দৌলার সেনাতরঙ্গের সম্মুখীন হইবার পক্ষে সেরূপ যুদ্ধভূমি সহজে প্রাপ্ত হওয়া যায় না। সম্মুখে বহুক্রোশবিস্তৃত জলাভূমি, তাহার উপর দিয়া শত্রদলের গোলন্দাজ বা অশ্বারোহীদিগের অগ্রসর হইবার সম্ভাবনা নাই;—সেই জলাভূমি উত্তীর্ণ হইয়া শওকতজঙ্গকে আক্রমণ করিবার উপযোগী একটিমাত্র সঙ্কীর্ণ পথ, তাহার মুখে অল্প কয়েকশত সেনা সমাবেশ করিলেই শত্রুসেনা ব্যূহভেদ করিতে পারিবে না। এমন অনুকূল স্থানে শিবির-সন্নিবেশ করিয়াও শওকতজঙ্গ বুদ্ধির দোষে ব্যূহ রচনা করিতে পারিলেন না। তিনি এই বয়সে এমন একশত যুদ্ধে সেনা-সমাবেশ করিয়াছেন,—সুতরাং তাঁহার কথার প্রতিবাদ করিবে কে? তিনি দুই দুই ক্রোশ ব্যবধানে এক এক সেনাপতির পটমণ্ডপ নির্দ্দেশ করিয়া দিলেন।

 শওকতজঙ্গ যখন মহাসমারোহে যুদ্ধক্ষেত্রে পদার্পণ করিলেন, তখন মোহনলালের সেনাদলের সঙ্গে মীরজাফরের সেনাদল মিলিত হইয়া মার মার শব্দে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে। কিন্তু কেহই তাহাদের গতিরোধ করিবার চেষ্টা করিতেছে না। তাহারা ক্রমে জলাভূমির সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। সেখানে দাঁড়াইয়া মোহনলালের সেনাদল গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিল; কিন্তু তাহাদের অধিকাংশ গোলাই অর্দ্ধপথে পঙ্কসলিলে নিমজ্জিত হইতে লাগিল। যে দুই একটি গোলা ক্কচিৎ শওকতজঙ্গের সেনানিবাসে পতিত হইতে লাগিল, তাহাতেই তাঁহার সেনাদল ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। কি করি বেন কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া শওকতজঙ্গ বাহাদুর হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন! সেনাদল ক্রমেই বিপন্ন হইয়া পড়িতেছে, অবসর পাইয়া মোহনলাল ক্রমে সেই সঙ্কীর্ণ পথের দিকে অগ্রসর হইতেছেন,—এমন সময়ে একজন প্রবীণ আফগান সেনাপতি শওকতজঙ্গের সম্মুখে আসিয়া করযোড়ে নিবেদন —“জাঁহাপনা! এ কিরূপ সমরকৌশল? আমরা দাক্ষিণাত্যে নিজাম-উল্-মোল্‌কের অধীনে অনেক যুদ্ধ যুঝিয়াছি; কিন্তু এমন যুদ্ধ ত কখনও দেখি নাই। যাহার যাহা ইচ্ছা সে তাহাই করিতেছে; যে যেদিকে পারিতেছে সেইপথেই পলায়ন করিতেছে! এমন করিয়া কতক্ষণ শত্রুসেনার গতিরোধ করিবেন? গোলন্দাজদিগকে সম্মুখে সাজাইয়া দিয়া তাহার পশ্চাতে অশ্বারোহী রাখিয়া যথাশাস্ত্র যুদ্ধব্যাপারে অগ্রসর হউন।” শওকতজঙ্গের তরুণহৃদয়ে এই উপদেশবাক্য তীব্র তীরের মত বিঁধিয়া পড়িল তিনি স্ফুরিতাধরে গর্জ্জন করিয়া উঠিলেন;—“যাও! যাও! আমাকে আর যুদ্ধ শিখাইতে আসিও না। নিজাম-উল-মোল্‌ক গাধা! তাই সে তোমাদের কথা শুনিয়া সেনাচালনা করিত। আমি এই বয়সে এমন তিনশত যুদ্ধ যুঝিলাম, আজ কিনা তুমি আমাকে যুদ্ধকৌশল শিক্ষা দিতে অগ্রসর হইয়াছ!” আফগান সেনাপতি সসম্ভ্রমে সরিয়া পড়িলেন।

 শ্যামসুন্দর নামক একজন হিন্দু সেনাপতি নিকটে দাঁড়াইয়া ছিলেন। তিনি আর শওকতজঙ্গৈর আদেশের অপেক্ষা করিলেন না। যে সকল পদাতিসেনা সম্মুখে দাঁড়াইয়া তাঁহার কামান চালনার প্রতিবন্ধক হইতেছিল, তাহাদিগকে পশ্চাতে ফেলিয়া শ্যামসুন্দর কামান লইয়া সম্মুখে অগ্রসর হইলেন। শ্যামসুন্দর একজন প্রভুভক্ত মসিজীবী হিন্দু;— যুদ্ধব্যবসায়ে সম্পূর্ণ অশিক্ষিত।[৫] শত্রুসেনার আগমনসংবাদে তিনি লেখনী ত্যাগ করিয়া গোলন্দাজদলের সেনাপতি হইয়াছিলেন। অশিক্ষিত শ্যামসুন্দর এরূপ বীরপ্রতাপে অনলবর্ষণ করিতে লাগিলেন যে, রণপণ্ডিত মোহনলাল স্তম্ভিত হইয়া অর্দ্ধপথে অশ্বরশ্মি সুসংযত করিতে বাধ্য হইলেন। শ্যামসুন্দরের কামান ভীম কলরবে ঘন ঘন অনলবর্ষণ করিয়া মোহনলালের সেনাপ্রবাহ আলোড়িত করিয়া তুলিল।

 শ্যামসুন্দরের বীরপ্রতাপে শওকতজঙ্গ এতই উত্তেজিত হইলেন যে, তিনি আর অগ্র পশ্চাৎ বিচার না করিয়া অশ্বসেনাকেও অগ্রসর হইবার আদেশ প্রচার করিলেন। বিচক্ষণ অশ্ব-সেনানায়কগণ নবাবের ভ্রমপ্রদর্শন করিয়া বুঝাইতে লাগিলেন যে, অশ্বসেনা অগ্রসর হইলে একজনও প্রত্যাগমন করিবে না; উভয় পক্ষের গোলাবর্ষণে মধ্যপথেই পঞ্চত্বলাভ করিবে। শওকতজঙ্গ তাহা বুঝিতে পারিলেন না। তিনি ক্রোধান্ধ হইয়া বলিয়া উঠিলেন; “হিন্দু শ্যামসুন্দর কেমন বীরপ্রতাপে অগ্রসর হইতেছে,সে মরিল না,—আর তোমরা মুসলমান বীরপুরুষ! তোমরাই মৃত্যুভয়ে জড়সড় হইয়াছ? বুঝিলাম তোমরা সকলেই কাপুরুষ।” সেনাপতিগণ সে ধিক্কার সহ্য করিতে পারিলেন না; পলকমধ্যে দলে দলে অশ্বারোহণ করিয়া সমর-তরঙ্গের মধ্যে সগর্ব্বে অশ্বচালনা করিয়া দিলেন! শওকতজঙ্গ ভাবিলেন যে, আর যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া থাকা নিষ্প্রয়োজন,—যেরূপ বীর প্রতাপে অশ্বসেনা অগ্রসর হইল, তাহারা অপর পারে উত্তীর্ণ হইতেই যাহা কিছু বিলম্ব;—নচেৎ যুদ্ধজয়ে আর সন্দেহ কি? তিনি তখন বিজয়োৎফুল্ল-হৃদয়ে পটমণ্ডপে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া পানপাত্র উঠাইয়া লইলেন। সারঙ্গী সারঙ্গ ধরিয়া ঝঙ্কার দিয়া উঠিল; তাহার সহচরীগণ সেই সুরে সুর মিলাইয়া কটাক্ষে কুটিল সন্ধান পূরণ করিতে বিলম্ব করিল না;—শওকতজঙ্গ ভাঙ্গ ও সঙ্গীতমোহে অচেতন হইয়া পড়িলেন।[৬]

 এদিকে অশ্বসেনা জলাভূমি উত্তীর্ণ হইবার চেষ্টা করিবামাত্র পঙ্কসলিলে চলচ্ছক্তিহীন হইয়া দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মৃত্যুক্রোড় আশ্রয় করিতে লাগিল। যুদ্ধ হইল না, কেবল অনবরত নরহত্যায় যুদ্ধভূমি রুধিররঞ্জিত হইতে লাগিল। এরূপ নিরাশ্রয় অবস্থায় কে কতক্ষণ মৃত্যু কামনায় অটলভাবে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারে? সেনাদল একে একে পশ্চাৎপদ হইতে লাগিল। সেনাপতিগণ ভাবিলেন যে, এই সময়ে শওকতজঙ্গ সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকিলে হয়ত সেনাদলের উৎসাহ বৃদ্ধি হইতে পারে। তাঁহারা তাড়াতাড়ি নবাবের পটমণ্ডপে প্রবেশ করিলেন। নবাব তখন সংজ্ঞাশূন্য;—উষ্ণীষ খসিয়া পড়িতেছে, অসি কক্ষচ্যুত হইয়াছে, হস্তপদ শ্লথ হইয়া পড়িয়াছে, পটমণ্ডপ প্রতিধ্বনিত করিয়া নূপুর কঙ্কণ রুনুঝুনু বাজিয়া উঠিতেছে। তথাপি সেনাপতিগণ প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন না;—তাঁহারা ধরাধরি করিয়া শওকতজঙ্গকে হস্তিপৃষ্ঠে উঠাইলেন এবং সেইরূপভাবেই তাঁহাকে রণভূমে আনয়ন, করিলেন।[৭] তাঁহাকে দেখিয়া সেনাদলের সাহস হইবে কি, তাঁহার দৃষ্টান্তে সকলেই অবসন্ন হইয়া পড়িল। শত্রুশিবির হইতে মুহুর্মুহু লৌহপিণ্ড ছুটিয়া আসিতেছে, সাহসী সুচতুর প্রভুভক্ত ফৌজদারী ফৌজ মুহূর্ত্তে মুহূর্ত্তে প্রচণ্ড পীড়নে ধরাশায়ী হইতেছে। সেনাপতিগণ অনন্যোপায় হইয়া নবাবকে চেতন করিবার জন্য নানারূপ চেষ্টা করিতেছেন; —কিন্তু হায়! শওকতজঙ্গ তখন একেবারে সংজ্ঞাশূন্য; কেবল চক্ষুর্দ্বয় মুদ্রিত করিয়া মধ্যে মধ্যে “বহুত আচ্ছা বিবিজান” বলিয়া সংগীতের তালরক্ষা করিতেছেন।

 হায়! সিরাজদ্দৌলা! এই শওকতজঙ্গকে সিংহাসনে বসাইয়া তোমাকে রসাতলে দিবার জন্য যাহারা বদ্ধপরিকর হইয়াছিল, তাহারাই আজ ইতিহাসের নিকট সম্মানাস্পদ;—আর তুমি তাহাদের রাজা আশ্রয়দাতা, প্রতিপালক হইয়াও, শতকলঙ্কে কলঙ্কিত!

 শওকতজঙ্গকে বহুক্ষণ বিড়ম্বনা ভোগ করিতে হইল না। অব্যর্থসন্ধান-নিপুণ সিরাজ সৈনিকের গুলি আসিয়া তীরবেগে তাঁহার ললাট ভেদ করিল; শওকতজঙ্গের সকল যন্ত্রণার অবসান হইয়া গেল!

 পূর্ণিয়া শান্তমূর্তি ধারণ করিল। মহারাজ মোহনলাল তাহার শাসনভার গ্রহণ করিয়া যথাযযাগ্য ব্যক্তিগণকে রাজপদ মন্ত্রিপদ বিতরণ করিবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।[৮] সিরাজ রাজকোষ হস্তগত করিয়া শওকত-জননীকে সসম্ভ্রমে মুর্শিদাবাদে আনয়ন করিলেন; সেখানে সিরাজ-জননীর সহিত শওকত-জননী অন্তঃপুরে স্থানলাভ করিলেন।

  1. Stewart's History of Bengal.
  2. Stewart's History of Bengal.
  3. ওয়ারেণ হেষ্টিংশ্ এই কথা রটনা করিয়া গিয়াছেন;—ইহার সত্য মিথ্যা নির্ণয় করিবার উপায় নাই।
  4. Stewart's History of Bengal.
  5. বাঙ্গালী কায়স্থ শ্যামসুন্দর শওকতজঙ্গের পিতার আমল হইতে গোলন্দাজ সৈন্যের বেতনাধ্যক্ষ ছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলেন—ইনি “কেবল মসিজীবী ছিলেন না। সেকালের বাঙ্গালী ভদ্রসন্তানের নিকট অসি-মসীর সাপত্ন্য সম্বন্ধ পরিজ্ঞাত ছিল না।” কিন্তু এই যুদ্ধের পূর্ব্বে শ্যামসুন্দরের সেনা চালনা বা সমর শিক্ষার কোন প্রমাণ দেখি নাই।
  6. It being then about three O'clock in the day, Shokot Jung, having taken his inebriating draught, retired to his tent, to amuse himself with the songs of his women—Stewart.
  7. At this time he was so much intoxicated that he could not sit erect.—Stewart.
  8. He then regulated the country, and having placed his own son in charge of Purneah, he went to join his master.—Stewart.