সোনার তরী/দুর্ব্বোধ

 

দুর্ব্বোধ।

তুমি মােরে পার না বুঝিতে?
প্রশান্ত বিষাদ তরে
দুটি আঁখি প্রশ্ন করে’
অর্থ মাের চাহিছে খুঁজিতে,
চন্দ্রমা যেমন ভাবে স্থির নত মুখে
চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে।


কিছু আমি করিনি গােপন।
যাহা আছে, সব আছে
তােমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন।
দিয়েছি সমস্ত মাের করিতে ধারণা,
তাই মােরে বুঝিতে পার না?


এ যদি হইত শুধু মণি,
শত খণ্ড করি তারে
সযত্নে বিবিধাকারে,
একটি একটি করি’ গণি’
একখানি সূত্রে গাঁখি একখানি হায়
পরাতেম গলায় তােমার!

এ যদি হইত শুধু ফুল,
সুগােল সুন্দর ছোটো,
ঊষালােকে ফোটো-ফোটো,
বসন্তের পবনে দোদুল,
বৃন্ত হতে সযতনে আনিতাম তুলে,
পরায়ে দিতে কালাে চুলে!


এ যে সখি সম হৃদয়!
কোথা জল, কোথা কূল,
দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্য-নিলয়।
এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রাণী,
এ তবু তােমার রাজধানী!


কি তােমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয় মাঝে
নাহি জানি কি যে বাজে
নিশিদিন নীরব সঙ্গীতে!
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যাপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতন।

এ যদি হইত শুধু সুখ,
কেবল একটি হাসি
অধরের প্রান্তে আসি
আনন্দ করিত জাগরূক।
মুহূর্ত্তে বুঝিয়া নিতে হৃদয়-বারতা
বলিতে হত না কোন কথা!


এ যদি হইত শুধু দুখ,
দুটি বিন্দু অশ্রুজল
দুই চক্ষে ছল ছল,
বিষন্ন অধর ম্লান মুখ,
প্রত্যক্ষ দেখিতে পেতে অন্তরের ব্যথা,
নীরবে প্রকাশ হত কথা!


এ যে সখি হৃদয়ের প্রেম!
সুখ দুঃখ বেদনার
আদি অন্ত নাহি যার
চির দৈন্য চির পূর্ণ হেম!
নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবা রাতে
তাই আমি না পারি বুঝাতে!

নাই বা বুঝিলে তুমি মােরে!
চিরকাল চোখে চোখে
নূতন নূতনালােকে
পাঠ কর রাত্রি দিন ধরে।
বুঝা যায় আধ প্রেম, আধ খানা মন,
সমস্ত কে বুঝেছে কখন্‌!

 
১১ চৈত্র, ১২৯৯।