স্বদেশ/নূতন ও পুরাতন

নূতন ও পুরাতন আমরা পুরাতন ভারতবর্ষীয় ; বড়ো প্রাচীন, বড়ো শ্রান্ত। আমি অনেক সময়ে নিজের মধ্যে আমাদের সেই জাতিগত প্রকাগু প্রাচীনত্ব অনুভব করি। মনোযোগপূর্বক যখন অস্তরের মধ্যে নিরীক্ষণ করে দেখি তখন দেখতে পাই, সেখানে কেবল চিন্তা এবং বিশ্রাম এবং বৈরাগ্য। যেন অস্তরে বাহিরে একটা স্বদীর্ঘ ছুটি। যেন জগতের প্রাতঃকালে আমরা কাছারির কাজ সেরে এসেছি, তাই এই উত্তপ্ত মধ্যাহ্নে যখন আর-সকলে কার্ষে নিযুক্ত তখন আমরা দ্বার রুদ্ধ করে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করছি ; আমরা আমাদের পুরা বেতন চুকিয়ে নিয়ে কর্মে ইস্তফা দিয়ে পেন্সনের উপর সংসার চালাচ্ছি। বেশ আছি। এমন সময়ে হঠাৎ দেখা গেল, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বহু কালের যে ব্ৰহ্মত্রটুকু পাওয়া গিয়েছিল তার ভালো দলিল দেখাতে পারি নি বলে নূতন রাজার রাজত্বে বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। হঠাৎ আমরা গরিব । পৃথিবীর চাষারা যেরকম খেটে মরছে এবং খাজনা দিচ্ছে আমাদেরও তাই করতে হবে । পুরাতন জাতিকে হঠাৎ নৃতন চেষ্টা আরম্ভ করতে হয়েছে। অতএব চিন্তা রাখো, বিশ্রাম রাখো, গৃহকোণ ছাড়ো ; ব্যাকরণ ন্যায়শাস্ত্র শ্রুতিস্মৃতি এবং নিত্যনৈমিত্তিক গার্হস্থ্য নিয়ে থাকলে আর চলবে না ; কঠিন মাটির ঢেলা ভাঙো, পৃথিবীকে উর্বরা করে এবং নব-মানব রাজার রাজস্ব দাও ; কালেজে পড়ো, হোটেলে খাও এবং আপিসে চাকরি করে । হায়, ভারতবর্ষের পুরপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এই অনাবৃত বিশাল কর্মক্ষেত্রের মধ্যে আমাদের কে এনে দাড় করালে! আমরা চতুর্দিকে २ ।। স্বদেশ মানসিক বঁধে নির্মাণ করে কালস্রোত বন্ধ করে দিয়ে সমস্ত নিজের মনের মতো গুছিয়ে নিয়ে বসে ছিলুম। চঞ্চল পরিবর্তন ভারতবর্ষের বাহিরে সমুদ্রের মতো নিশিদিন গর্জন করত, আমরা অটল স্থিরত্বের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে গতিশীল নিখিল সংসারের অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে বসে ছিলুম। এমন সময় কোন ছিদ্রপথ দিয়ে চির-অশাস্ত মানবস্রোত আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে সমস্ত ছারখার করে দিলে । পুরাতনের মধ্যে নূতন মিশিয়ে, বিশ্বাসের মধ্যে সংশয় এনে সস্তোষের মধ্যে দুরাশার অাক্ষেপ উৎক্ষিপ্ত করে দিয়ে সমস্ত বিপর্যস্ত করে দিলে ! মনে করে, অামাদের চতুর্দিকে হিমাদ্রি এবং সমুদ্রের বাধা যদি আরো দুর্গম হত তা হলে এক দল মানুষ একটি অজ্ঞাত নিভৃত বেষ্টনের মধ্যে স্থির শাস্ত ভাবে এক প্রকার সংকীর্ণ পরিপূর্ণতা লাভের অবসর পেত । পৃথিবীর সংবাদ তারা বড়ো একটা জানতে পেত না এবং ভূগোলবিবরণ সম্বন্ধে তাদের নিতান্ত অসম্পূর্ণ ধারণা থাকত ; কেবল তাদের কাব্য, তাদের সমাজতন্ত্র, তাদের ধর্মশাস্ত্র, তাদের দর্শনতত্ত্ব, অপূর্ব শোভা স্থষমা এবং সম্পূর্ণতা লাভ করতে পেত ; তারা যেন পৃথিবী-ছাড়া আর-একটি ছোটো গ্রহের মধ্যে বাস করত ; তাদের ইতিহাস, তাদের জ্ঞানবিজ্ঞান মুখসম্পদ তাদের মধ্যেই পর্যাপ্ত থাকত। সমুদ্রের এক অংশ কালক্রমে মৃত্তিকাস্তরে রুদ্ধ হয়ে যেমন একটি নিভৃত শান্তিময় সুন্দর হ্রদের স্বষ্টি হয়, সে কেবল নিস্তরঙ্গভাবে প্রভাতসন্ধ্যার বিচিত্র বর্ণচ্ছায়ায় প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে, এবং অন্ধকার রাত্রে স্তিমিত নক্ষত্রালোকে স্তম্ভিতভাবে চিররহস্তের ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকে । কালের বেগবান প্রবাহে, পরিবর্তনকোলাহলের কেন্দ্রস্থলে, প্রকৃতির সহস্ৰ শক্তির রণরঙ্গভূমির মাঝখানে সংক্ষুব্ধ হয়ে, খুব একটা শক্ত রকম শিক্ষা এবং সভ্যতা লাভ হয় সত্য বটে, কিন্তু নির্জনতা নিস্তব্ধতা গভীরতার মধ্যে অবতরণ করে যে কোনো রত্ন সঞ্চয় করা যায় না তা নূতন ও পুরাতন סא কেমন করে বলব ? এই মথ্যমান সংসারসমুদ্রের মধ্যে সেই নিস্তব্ধতার অবসর কোনো জাতিই পায় নি ; মনে হয়, কেবল ভারতবর্ষই এক কালে দৈবক্রমে সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে সেই বিচ্ছিন্নতা লাভ করেছিল এবং অতলম্পর্শের মধ্যে অবগাহন করেছিল । জগৎ যেমন অসীম, মানবের আত্মাও তেমনি অসীম, যারা সেই অনাবিষ্কৃত অন্তর্দেশের পথ অনুসন্ধান করেছিলেন তারা যে কোনো নূতন সত্য এবং কোনো নূতন আনন্দ লাভ করেন নি তা নিতান্ত অবিশ্বাসীর কথা । ভারতবর্ষ তখন একটি রুদ্ধদ্বার নির্জন রহস্যময় পরীক্ষাকক্ষের মতো ছিল ; তার মধ্যে এক অপরূপ মানসিক সভ্যতার গোপন পরীক্ষা চলছিল। যুরোপের মধ্যযুগে যেমন আলকেমি-তত্ত্বাম্বেষীরা গোপন গৃহে নিহিত থেকে বিবিধ অদ্ভুত যন্ত্রতন্ত্র-যোগে চিরজীবনরস (Elixir of Life) আবিষ্কার করবার চেষ্টা করেছিলেন, আমাদের জ্ঞানীরাও সেইরূপ গোপন সতর্কতা-সহকারে অধ্যাত্মিক চিরজীবন-লাভের উপায় অন্বেষণ করেছিলেন। তারা প্রশ্ন করেছিলেন, যেনাহং নামৃতা স্যাম কিমহং তেন কুর্যাম । এবং অত্যন্ত দুঃসাধ্য উপায়ে অস্তরের মধ্যে সেই অমৃতরসের সন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। ** তার থেকে কী হতে পারত কে জানে! আলকেমি থেকে যেমন কেমিস্ট্রর উৎপত্তি হয়েছে তেমনি তাদের সেই তপস্যা থেকে মানবের কৗ এক নিগুঢ় নূতন শক্তির আবিষ্কার হতে পারত তা এখন কে বলতে পারে! কিন্তু হঠাৎ দ্বার ভগ্ন করে বাহিরের দুর্দান্ত লোক ভারতবর্ষের সেই পবিত্র পরীক্ষাশালার মধ্যে বলপূর্বক প্রবেশ করলে এবং সেই অন্বেষণের পরিণামফল সাধারণের কাছে অপ্রকাশিতই রয়ে গেল। এখনকার নবীন দুরন্ত সভ্যতার মধ্যে এই পরীক্ষার তেমন প্রশাস্ত অবসর আর কখনো 8 স্বদেশ পাওয়া যাবে কি না কে জানে ! পৃথিবীর লোক সেই পরীক্ষাগারের মধ্যে প্রবেশ করে কী দেখলে ? একটি জীর্ণ তপস্বী ; বসন নেই, ভূষণ নেই, পৃথিবীর ইতিহাস সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নেই। সে যে কথা বলতে চায় এখনো তার কোনো প্রতীতিগম্য ভাষা নেই, প্রত্যক্ষগম্য প্রমাণ নেই, আয়ত্তগম্য পরিণাম নেই। অতএব হে বৃদ্ধ, হে চিন্তাতুর, হে উদাসীন, তুমি ওঠে ; পোলিটিকাল অ্যাজিটেশন করো ; অথবা দিবাশয্যায় পড়ে পড়ে আপনার পুরাতন যৌবনকালের প্রতাপ-ঘোষণাপূর্বক জীর্ণ অস্থি আস্ফালন করো, দেখো, তাতে তোমার লজ্জা নিবারণ হয় কি না । কিন্তু আমার ওতে প্রবৃত্তি হয় না। কেবলমাত্র খবরের কাগজের পাল উড়িয়ে এই দুস্তর সংসারসমুদ্রে যাত্রা আরম্ভ করতে আমার সাহস হয় না। যখন মৃত্যু মুকু অমুকুল বাতাস দেয় তখন এই কাগজের পাল গর্বে স্ফীত হয়ে ওঠে বটে কিন্তু কখন সমুদ্র থেকে ঝড় আসবে এবং দুর্বল দম্ভ শতধা ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে যাবে। এমন যদি হত, নিকটে কোথাও উন্নতি-নামক একটি পাকা বন্দর আছে, সেইখানে কোনোমতে পৌছলেই তার পরে দধি এবং পিষ্টক, দীয়তাং এবং ভূজ্যতাং, তা হলেও বরং একবার সময় বুঝে আকাশের ভাবগতিক দেখে অত্যন্ত চতুরতা-সহকারে পার হবার চেষ্টা করা যেত । কিন্তু যখন জানি উন্নতিপথে যাত্রার আর শেষ নেই, কোথাও নৌকা বেঁধে নিদ্রা দেবার স্থান নেই, উর্ধের্ব কেবল ধ্রুবতারা দীপ্তি পাচ্ছে এবং সম্মুখে কেবল তটহীন সমুদ্র, বায়ু অনেক সময়েই প্রতিকুল এবং তরঙ্গ সর্বদাই প্রবল, তখন কি বসে বসে কেবল ফুলস্ক্যাপ কাগজের নৌকা নির্মাণ করতে প্রবৃত্তি হয় ? অথচ তরী ভাসাবার ইচ্ছা আছে। যখন দেখি মানবস্রোত চলেছে— চতুর্দিকে বিচিত্র কল্লোল, উদাম বেগ, প্রবল গতি, অবিশ্রাম নূতন ও পুরাতন (: কর্ম— তখন আমারও মন নেচে ওঠে ; তখন ইচ্ছা করে, বহু বৎসরের গৃহবন্ধন ছিন্ন করে একেবারে বাহির হয়ে পড়ি । কিন্তু তার পরেই রিক্ত হস্তের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবি পাথেয় কোথায় ! হৃদয়ে সে অসীম আশা, জীবনে সে অশ্রান্ত বল, বিশ্বাসের সে অপ্রতিহত প্রভাব কোথায় ! তবে তো পৃথিবীপ্রান্তে এই অজ্ঞাতবাসই ভালো, এই ক্ষুদ্র সস্তোষ এবং নিজীব শাস্তিই আমাদের যথালাভ । তখন বসে বসে মনকে এই বলে বোঝাই যে, আমরা যন্ত্র তৈরি করতে পারি নে, জগতের সমস্ত নিগৃঢ় সংবাদ আবিষ্কার করতে পারি নে, কিন্তু ভালোবাসতে পারি, ক্ষমা করতে পারি, পরম্পরের জন্যে স্থান ড়ে দিতে পারি। দুঃসাধ্য দুরাশা নিয়ে অস্থির হয়ে বেড়াবার আবশ্যক কী ! নাহয় এক পাশেই পড়ে রইলুম, টাইমসের জগৎপ্রকাশক স্তম্ভে আমাদের নাম নাহয় নাই উঠল। কিন্তু দুঃখ আছে, দারিদ্র্য আছে, প্রবলের অত্যাচার অাছে, অসহায়ের ভাগ্যে অপমান আছে— কোণে বসে কেবল গৃহকর্ম এবং আতিথ্য করে তার কী প্রতিকার করবে ? হায়, সেই তো ভারতবর্ষের দুঃসহ দুঃখ । আমরা কার সঙ্গে যুদ্ধ করব ? রূঢ় মানবপ্রকৃতির চিরন্তন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ? যিশুখস্টের পবিত্র শোণিতস্রোত যে অমুর্বর কাঠিন্যকে আজও কোমল করতে পারে নি সেই পাষাণের সঙ্গে ? প্রবলতা চিরদিন দুর্বলতার প্রতি নির্মম, আমরা সেই আদিম পশুপ্রকৃতিকে কী করে জয় করব ? সভা করে ? দরখাস্ত করে ? আজ একটু ভিক্ষা পেয়ে, কাল একটা তাড়া খেয়ে ? তা কখনোই হবে না । তবে প্রবলের সমান প্রবল হয়ে ? তা হতে পারে বটে। কিন্তু যখন ভেবে দেখি, যুরোপ কতখানি প্রবল, কত কারণে প্রবল, যখন এই দুর্দান্ত শক্তিকে একবার কায়মনে সর্বতোভাবে অনুভব করে দেখি, তখন Wo স্বদেশ কী আর অাশা হয় ? তখন মনে হয়, এসো ভাই, সহিষ্ণু হয়ে থাকি এবং ভালোবাসি এবং ভালো করি। পৃথিবীতে যতটুকু কাজ করি তা যেন সত্যসত্যই করি, ভান না করি । অক্ষমতার প্রধান বিপদ এই যে, সে বৃহৎ কাজ করতে_পারে_নL বলে বৃহৎ ভানকে শ্রেয়স্কর জ্ঞান করে. জানে না যে মনুষ্যত্বলাভের পক্ষে বড়ো মিথ্যার চেয়ে ছোটো সত্য ঢের বেশি মূল্যবান। কিন্তু উপদেশ দেওয়া আমার অভিপ্রায় নয়। প্রকৃত অবস্থাটা কী তাই আমি দেখতে চেষ্টা করছি। তা দেখতে গেলে যে পুরাতন বেদ পুরাণ সংহিতা খুলে বসে নিজের মনের মতো শ্লোক সংগ্রহ করে একটা কাল্পনিক কাল রচনা করতে হবে তা নয়, কিম্বা অন্য জাতির প্রকৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনাযোগে আপনাদের বিলীন করে দিয়ে আমাদের নবশিক্ষার ক্ষীণ ভিত্তির উপর প্রকাণ্ড দুরাশার দুর্গ নির্মাণ করতে হবে তাও নয় ; দেখতে হবে এখন আমরা কোথায় অাছি । আমরা যেখানে অবস্থান করছি এখানে পূর্ব দিক থেকে অতীতের এবং পশ্চিম দিক থেকে ভবিষ্যতের মরীচিকা এসে পড়েছে, সে দুটোকেই সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য সত্যস্বরূপে জ্ঞান না করে একবার দেখা যাক আমরা যথার্থ কোন মৃত্তিকার উপরে দাড়িয়ে আছি । আমরা একটি অত্যন্ত জীর্ণ প্রাচীন নগরে বাস করি ; এত প্রাচীন যে এখানকার ইতিহাস লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে ; মনুষের হস্তলিখিত স্মরণচিহ্নগুলি শৈবালে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে ; সেইজন্যে ভ্রম হচ্ছে যেন এ নগর মানব-ইতিহাসের অতীত, এ যেন অনাদি প্রকৃতির এক প্রাচীন রাজধানী। মানবপুরাবৃত্তের রেখা লুপ্ত করে দিয়ে প্রকৃতি আপন শু্যামল অক্ষর এর সর্বাঙ্গে বিচিত্র আকারে সজ্জিত করেছে। এখানে সহস্র বৎসরের বর্ষ আপন অশ্রুচিহ্নরেখা রেখে গিয়েছে এবং সহস্ৰ বৎসরের বসন্ত এর প্রত্যেক ভিত্তিছিদ্রে আপন যাতায়াতের তারিখ হরিদবর্ণ অঙ্কে নূতন ও পুরাতন a অঙ্কিত করেছে । এক দিক থেকে একে নগর বলা যেতে পারে, এক দিক থেকে একে অরণ্য বলা যায়। এখানে কেবল ছায়া এবং বিশ্রাম, চিন্তা এবং বিষাদ বাস করতে পারে । এখানকার ঝিল্পিমুখরিত অরণ্যমর্মরের মধ্যে, এখানকার বিচিত্রভঙ্গী জটাভারগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ও রহস্যময় পুরাতন অট্টালিকাভিত্তির মধ্যে শতসহস্র ছায়াকে কায়াময়ী ও কায়াকে মায়াময়ী বলে ভ্রম হয়। এখানকার এই সনাতন মহাছায়ার মধ্যে সত্য এবং কল্পনা ভাই-বোনের মতো নির্বিরোধে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ প্রকৃতির বিশ্বকার্য এবং মানবের মানসিক স্বষ্টি পরম্পর জড়িত বিজড়িত হয়ে নানা আকারে ছায়াকুঞ্জ নির্মাণ করেছে। এখানে ছেলেমেয়েরা সারাদিন খেলা করে কিন্তু জানে না তা খেলা, এবং বয়স্ক লোকেরা নিশিদিন স্বপ্ন দেখে কিন্তু মনে করে তা কর্ম। জগতের মধ্যাহ্ন-স্বর্যালোক ছিদ্রপথে প্রবেশ করে কেবল ছোটো ছোটো মানিকের মতো দেখায়, প্রবল ঝড় শত শত সংকীর্ণ শাখাসংকটের মধ্যে প্রতিহত হয়ে মৃদু মর্মরের মতো মিলিয়ে আসে। এখানে জীবন ও মৃত্যু, স্থখ ও দুঃখ, আশা ও নৈরাতের সীমাচিহ্ন লুপ্ত হয়ে এসেছে ; অদৃষ্টবাদ এবং কর্মকাণ্ড, বৈরাগ্য এবং সংসারযাত্রা একসঙ্গেই ধাবিত হয়েছে। অবিশু্যক এবং অনাবশ্বক, ব্ৰহ্ম এবং মৃংপুত্তল, ছিন্নমূল শুষ্ক অতীত এবং উদ্ভিন্নকিশলয় জীবন্ত বর্তমান সমান সমাদর লাভ করেছে। শাস্ত্র যেখানে পড়ে আছে সেইখানে পড়েই আছে। এবং শাস্ত্রকে আচ্ছন্ন করে যেখানে সহস্ৰ প্রথাকীটের প্রাচীন বল্মীক উঠেছে সেখানেও কেহ অলস ভক্তিভরে হস্তক্ষেপ করে না । গ্রন্থের অক্ষর এবং গ্রন্থকীটের ছিদ্র দুই এখানে সমান সম্মানের শাস্ত্র । এখানকার অশ্বখবিদীর্ণ ভগ্ন মন্দিরের মধ্যে দেবতা এবং উপদেবতা একত্রে আশ্রয় গ্রহণ করে বিরাজ করছে। এখানে কি তোমাদের জগৎযুদ্ধের সৈন্যশিবির স্থাপন করবার স্থান । এখানকার ভগ্ন ভিত্তি কি তোমাদের কলকারখানা, তোমাদের অগ্নি Ե- স্বদেশ শ্বসিত সহস্ৰবাহু লৌহদানবদের কারাগার নির্মাণের যোগ্য ! তোমাদের অস্থির উদ্যমের বেগে এর প্রাচীন ইষ্টকগুলিকে ভূমিসাৎ করে দিতে পার বটে, কিন্তু তার পরে পৃথিবীর এই অতি প্রাচীন শয্যাশায়ী জাতি কোথায় গিয়ে দাড়াবে ! এই নিশ্চেষ্ট নিবিড় মহা নগরণরণ্য ভেঙে গেলে সহস্ৰ মৃত বৎসরের যে একটি বৃদ্ধ ব্রহ্মদৈত্য এখানে চিরনিভৃত আবাস গ্রহণ করেছিল সেও যে সহসা নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে। এরা বহু দিন স্বহস্তে গৃহনির্মাণ করে নি, সে অভ্যাস এদের নেই, এদের সমধিক চিন্তাশীলগণের সেই এক মহৎ গর্ব । তারা যে কথা নিয়ে লেখনীপুচ্ছ আস্ফালন করে সে কথা অতি সত্য, তার প্রতিবাদ করা কারো সাধ্য নয় । বাস্তবিকই অতি প্রাচীন আদিপুরুষের বাস্তুভিত্তি এদের কখনো ছাড়তে হয় নি। কালক্রমে অনেক অবস্থাবৈসাদৃশু, অনেক নূতন স্থবিধা-অস্থবিধার স্বষ্টি হয়েছে ; কিন্তু সবগুলিকে টেনে নিয়ে মৃতকে এবং জীবিতকে, সুবিধাকে এবং অসুবিধাকে প্রাণপণে সেই পিতামহপ্রতিষ্ঠিত এক ভিত্তির মধ্যে ভুক্ত করা হয়েছে। অসুবিধার খাতিরে এরা কখনো স্পর্ধিত ভাবে স্বহস্তে নূতন গৃহ-নির্মাণ বা পুরাতন গৃহ-সংস্কার করেছে এমন গ্লানি এদের শত্রুপক্ষের মুখেও শোনা যায় না। যেখানে গৃহছাদের মধ্যে ছিদ্র প্রকাশ পেয়েছে সেখানে অযত্নসভূত বটের শাখা কদাচিৎ ছায়া দিয়েছে ; কালসঞ্চিত মৃত্তিকাস্তরে কথঞ্চিৎ ছিদ্ররোধ করেছে । এই বনলক্ষ্মীহীন ঘন বনে, এই পুরলক্ষ্মীহীন ভগ্ন পুরীর মধ্যে, আমরা ধুতিটি চাদরটি পরে অত্যন্ত মৃদুমন্দভাবে বিচরণ করি ; আহারান্তে কিঞ্চিৎ নিদ্রা দিই ; ছায়ায় বসে তাস পাশা খেলি ; যা-কিছু অসম্ভব এবং সাংসারিক কাজের বাহির তাকেই তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি ; যা-কিছু কার্যোপযোগী এবং দৃষ্টিগোচর তার প্রতি মনের অবিশ্বাস কিছুতে সম্যক দূর হয় না ; এবং এরই উপর কোনো ছেলে নূতন ও পুরাতন ) যদি সিকিমাত্রা চাঞ্চল্য প্রকাশ করে তা হলে আমরা সকলে মিলে মাথা নেড়ে বলি, সর্বমত্যন্তং গর্হিতম্ । এমন সময় তোমরা কোথা থেকে হঠাৎ এসে আমাদের জীর্ণ পঞ্জরে গোটা দুই তিন প্রবল খোচা দিয়ে বলছ, ‘ওঠে ওঠে ; তোমাদের শয়নশালায় আমরা আপিস স্থাপন করতে চাই। তোমরা ঘুমচ্ছিলে বলে যে সমস্ত সংসার ঘুমচ্ছিল তা নয়। ইতিমধ্যে জগতের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। ওই ঘণ্টা বাজছে, এখন পৃথিবীর মধ্যাহ্নকাল, এখন কর্মের সময় ।” তাই শুনে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ধড়ফড় করে উঠে ‘কোথায় কর্ম’ ‘কোথায় কর্ম’ করে গৃহের চার কোণে ব্যস্ত হয়ে বেড়াচ্ছে এবং ওরই মধ্যে যারা কিঞ্চিৎ স্থূলকায় স্ফীতস্বভাবের লোক, তারা পাশমোড়া দিয়ে বলছে, ‘কে হে ! কর্মের কথা কে বলে ! তা, আমরা কি কর্মের লোক নই বলতে চাও ! ভারি ভ্রম । ভারতবর্ষ ছাড়া কর্মস্থান কোথাও নেই। দেখো-না কেন, মানব-ইতিহাসের প্রথম যুগে এইখানেই আর্য-বর্বরের যুদ্ধ হয়ে গেছে ; এইখানেই কত রাজ্যপত্তন, কত নীতিধর্মের অভু্যদয়, কত সভ্যতার সংগ্রাম হয়ে গেছে। অতএব কেবলমাত্র আমরাই কর্মের লোক । অতএব আমাদের অার কর্ম করতে বোলো না । যদি অবিশ্বাস হয় তবে তোমরা বরং এক কাজ করো— তোমাদের তীক্ষু ঐতিহাসিক কোদালখানা দিয়ে ভারতভূমির যুগসঞ্চিত বিস্মৃতির স্তর উঠিয়ে দেখো মানবসভ্যতার ভিত্তিতে কোথায় কোথায় আমাদের হস্তচিহ্ন আছে। আমরা ততক্ষণ অমনি আর-একবার ঘুমিয়ে নিই।” এই রকম করে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ অর্ধ-অচেতন জড় মূঢ় দাম্ভিক ভাবে, ঈষৎ-উন্মীলিত নিদ্রাকষায়িত নেত্রে, আলস্তবিজড়িত অস্পষ্ট রুষ্ট হুংকারে, জগতের দিবালোকের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করছে। এবং কেউ কেউ গভীর আত্মগ্লানি-সহকারে শিথিলস্বায়ু অসাড় উদ্যমকে У о স্বদেশ ভূয়োভূয় আঘাতের দ্বারা জাগ্রত করবার চেষ্টা করছে। এবং যারা জাগ্রতস্বপ্নের লোক, যারা কর্ম ও চিস্তার মধ্যে অস্থিরচিত্তে দোদুল্যমান, যারা পুরাতনের জীর্ণতা দেখতে পায় এবং নূতনের অসম্পূর্ণতা অনুভব করে সেই হতভাগ্যেরা বারম্বার মুণ্ড আন্দোলন করে বলছে— ‘হে নূতন লোকেরা, তোমরা যে নূতন কাণ্ড করতে আরম্ভ করে দিয়েছ এখনো তো তার শেষ হয় নি, এখনো তো তার সমস্ত সত্যমিথ্যা স্থির হয় নি, মানব-অদৃষ্টের চিরন্তন সমস্যার তো কোনোটারই মীমাংস হয় নি । ‘তোমরা অনেক জেনেছ, অনেক পেয়েছ, কিন্তু সুখ পেয়েছ কি ? আমরা যে বিশ্বসংসারকে মায়া বলে বসে অাছি এবং তোমরা যে একে ধ্রুবসত্য বলে খেটে মরছ, তোমরা কি আমাদের চেয়ে বেশি সুখী হয়েছ ? তোমরা যে নিত্য নূতন অভাব আবিষ্কার করে দরিদ্রের দারিদ্র্য উত্তরোত্তর বাড়াচ্ছ, গৃহের স্বাস্থ্যজনক আশ্রয় থেকে অবিশ্রাম কর্মের উত্তেজনায় টেনে নিয়ে যাচ্ছ, কর্মকেই সমস্ত জীবনের কর্তা করে উন্মাদনাকে বিশ্রামের স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছ, তোমরা কি স্পষ্ট জানো তোমাদের উন্নতি তোমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ? ‘আমরা সম্পূর্ণ জানি আমরা কোথায় এসেছি। আমরা গৃহের মধ্যে অল্প অভাব এবং গাঢ় স্নেহ নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে নিত্যনৈমিত্তিক ক্ষুদ্র নিকটকর্তব্যসকল পালন করে যাচ্ছি। আমাদের যতটুকু সুখসমৃদ্ধি আছে ধনী দরিদ্রে, দূর ও নিকট-সম্পৰ্কীয়ে, অতিথি অনুচর ও ভিক্ষুকে মিলে ভাগ করে নিয়েছি ; যথাসম্ভব লোক যথাসম্ভবমত মুখে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি, কেউ কাউকে ত্যাগ করতে চায় না, এবং জীবনবাঞ্চার তাড়নায় কেউ কাউকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয় না। ‘ভারতবর্ষ সুখ চায় নি, সন্তোষ চেয়েছিল, তা পেয়েওছে এবং সর্বতোভাবে সর্বত্র তার প্রতিষ্ঠা স্থাপন করেছে। এখন আর তার কিছু নূতন ও পুরাতন > S. করবার নেই। সে বরঞ্চ তার বিশ্রামকক্ষে বসে তোমাদের উন্মাদ জীবন-উৎপ্লব দেখে তোমাদের সভ্যতার চরম সফলতা সম্বন্ধে মনে মনে সংশয় অনুভব করতে পারে। মনে করতে পারে, কালক্রমে অবশেষে তোমাদের যখন এক দিন কাজ বন্ধ করতে হবে তখন কি এমন ধীরে, এমন সহজে, এমন বিশ্রামের মধ্যে অবতরণ করতে পারবে ? আমাদের মতো এমন কোমল, এমন সহৃদয় পরিণতি লাভ করতে পারবে কি ? উদ্দেশ্য যেমন ক্রমে ক্রমে লক্ষ্যের মধ্যে নিঃশেষিত হয়, উত্তপ্ত দিন যেমন সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে অবগাহন করে, সেই রকম মধুর সমাপ্তি লাভ করতে পারবে কি ? না, কল যেরকম হঠাৎ বিগড়ে যায়, উত্তরোত্তর অতিরিক্ত বাষ্প ও তাপ সঞ্চয় করে এঞ্জিন যেরকম সহসা ফেটে যায়, একপথবর্তী দুই বিপরীতমুখী রেলগাড়ি পরস্পরের সংঘাতে যেমন অকস্মাৎ বিপর্যস্ত হয় সেই রকম প্রবল বেগে একটা নিদারুণ অপঘাত-সমাপ্তি প্রাপ্ত হবে ? ‘যাই হোক, তোমরা এখন অপরিচিত সমুদ্রে অনাবিষ্কৃত তটের সন্ধানে চলেছ— অতএব তোমাদের পথে তোমরা যাও, আমাদের গৃহে আমরা থাকি, এই কথাই ভালো।” কিন্তু মানুষে থাকতে দেয় কই ? তুমি যখন বিশ্রাম করতে চাও, পৃথিবীর অধিকাংশ লোকই যে তখন অশ্রাস্ত । গৃহস্থ যখন নিদ্রায় কাতর গৃহছাড়ারা যে তখন নানা ভাবে পথে পথে বিচরণ করছে। তা ছাড়া এটা স্মরণ রাখা কর্তব্য, পৃথিবীতে যেখানে এসে তুমি থামবে সেখান হতেই তোমার ধ্বংস আরম্ভ হবে। কারণ তুমিই কেবল একলা থামবে আর কেউ থামবে না । জগৎপ্রবাহের সঙ্গে সমগতিতে যদি না চলতে পারো তো প্রবাহের সমস্ত সচল বেগ তোমার উপর এসে আঘাত করবে, একেবারে বিদীর্ণ বিপর্যস্ত হবে কিম্বা অল্পে অল্পে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কালস্রোতের তলদেশে অস্তহিত হয়ে যাবে। > & স্বদেশ হয় অবিশ্রাম চলো এবং জীবনচর্চা করো, নয় বিশ্রাম করে এবং বিলুপ্ত হও, পৃথিবীর এই রকম নিয়ম। অতএব আমরা যে জগতের মধ্যে লুপ্তপ্রায় হয়ে আছি, তাতে কারো কিছু বলবার নেই। তবে সে সম্বন্ধে যখন বিলাপ করি তখন এই রকম ভাবে করি যে, পূর্বে যে নিয়মের উল্লেখ করা হল সেটা সাধারণত খাটে বটে কিন্তু আমরা ওরই মধ্যে এমন একটু স্থযোগ করে নিয়েছিলুম যে আমাদের সম্বন্ধে অনেক দিন খাটে নি। যেমন মোটের উপরে বলা যায় জরামৃত্যু জগতের নিয়ম কিন্তু আমাদের যোগীরা জীবনীশক্তিকে নিরুদ্ধ করে মৃতবৎ হয়ে বেঁচে থাকবার এক উপায় আবিষ্কার করেছিলেন । সমাধি-অবস্থায় তাদের যেমন বৃদ্ধি ছিল না তেমনি হ্রাসও ছিল না। জীবনের গতিরোধ করলেই মৃত্যু আসে কিন্তু জীবনের গতিকে রুদ্ধ করেই তারা চিরজীবন লাভ করতেন । আমাদের জাতি সম্বন্ধেও সেই কথা অনেকটা খাটে । অন্য জাতি যে কারণে মরে আমাদের জাতি সেই কারণকে উপায়স্বরূপ করে দীর্ঘ জীবনের পথ আবিষ্কার করেছিলেন । অণকাজক্ষার আবেগ যখন হ্রাস হয়ে যায়, শ্রাস্ত উদ্যম যখন শিথিল হয়ে আসে তখন জাতি বিনাশপ্রাপ্ত হয়। আমরা বহু যত্নে দুরাকাজক্ষাকে ক্ষীণ ও উত্তমকে জড়ীভূত করে দিয়ে সমভাবে পরমায়ু রক্ষা করবার উদ্যোগ করেছিলুম। মনে হয় যেন কতকটা ফললাভও হয়েছিল । ঘড়ির কাটা যেখানে আপনি থেমে আসে সময়কেও কৌশলপূর্বক সেইখানে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবী থেকে জীবনকে অনেকটা পরিমাণে নির্বাসিত করে এমন একটা মধ্য-আকাশে তুলে রাখা গিয়েছিল যেখানে পৃথিবীর ধুলো বড়ো পৌছত না, সর্বদাই সে নির্লিপ্ত নির্মল নিরাপদ থাকত। কিন্তু একটা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে, কিছুকাল হল নিকটবর্তী কোন এক অরণ্য থেকে এক দীর্ঘজীবী যোগমগ্ন যোগীকে কলিকাতায় নূতন ও পুরাতন S \O. আনা হয়েছিল । এখানে বহু উপদ্রবে তার সমাধি ভঙ্গ করাতে তার মৃত্যু হয়। আমাদের জাতীয় যোগনিদ্রাও তেমনি বাহিরের লোক বহু উপদ্রবে ভেঙে দিয়েছে। এখন অন্যান্য জাতির সঙ্গে তার অার কোনো প্রভেদ নেই, কেবল প্রভেদের মধ্যে এই যে, বহু দিন বহির্বিষয়ে নিরুদ্যম থেকে জীবনচেষ্টায় সে অনভ্যস্ত হয়ে গেছে। যোগের মধ্যে থেকে একেবারে গোলযোগের মধ্যে এসে পড়েছে । কিন্তু কী করা যাবে ! এখন উপস্থিতমত সাধারণ নিয়মে প্রচলিত প্রথায় আত্মরক্ষণর চেষ্টা করতে হবে । দীর্ঘ জটা ও নখ কেটে ফেলে নিয়মিত স্নানাহার-পূর্বক কথঞ্চিং বেশভূষা করে হস্তপদচালনায় প্রবৃত্ত হতে হবে। কিন্তু সম্প্রতি ব্যাপারটা এই রকম হয়েছে যে, আমরা জটা নখ কেটে ফেলেছি বটে, সংসারের মধ্যে প্রবেশ করে সমাজের লোকের সঙ্গে মিশতেও আরম্ভ করেছি, কিন্তু মনের ভাবের পরিবর্তন করতে পারি নি । এখনো আমরা বলি, আমাদের পিতৃপুরুষেরা শুদ্ধমাত্র হরীতকী সেবন করে নগ্নদেহে মহত্বলাভ করেছিলেন, অতএব আমাদের কাছে বেশভূষা আহারবিহার চালচলনের এত সমাদর কেন ? এই বলে আমরা ধুতির র্কোচাটা বিস্তার-পূর্বক পিঠের উপর তুলে দিয়ে দ্বারের সম্মুখে বসে কর্মক্ষেত্রের প্রতি অলস অনাসক্ত দৃষ্টিপাত-পূর্বক বায়ু সেবন করি। এটা আমাদের স্মরণ নেই যে, যোগাসনে যা পরম সম্মানাহঁ সমাজের মধ্যে তা বর্বরতা। প্রাণ না থাকলে দেহ যেমন অপবিত্র, ভাব না থাকলে বাহাকুষ্ঠানও তদ্রুপ । তোমার আমার মতো লোক যারা তপস্যাও করি নে, হবিষ্যও খাই নে, জুতো মোজা পরে ট্র্যামে চড়ে পান চিবোতে চিবোতে নিয়মিত আপিসে ইস্কুলে যাই ; যাদের আদ্যোপাস্ত তন্ন তন্ন করে দেখে কিছুতেই প্রতীতি হয় না, এরা দ্বিতীয় যাজ্ঞবল্ক্য বশিষ্ঠ গৌতম জরৎকারু TS 8 স্বদেশ বৈশম্পায়ন কিম্বা ভগবান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ; ছাত্রবৃন্দ, যাদের বালখিল্য তপস্বী বলে এ পর্যস্ত কারো ভ্রম হয় নি ; একদিন তিন সন্ধ্যা স্নান করে একটা হরীতকী মুখে দিলে যাদের তার পরে একাদিক্রমে কিছুকাল আপিস কিম্বা কলেজ কামাই করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে— তাদের পক্ষে ওইরকম ব্রহ্মচর্যের বাহাড়ম্বর করা, পৃথিবীর অধিকাংশ উদ্যোগপরায়ণ মান্তজাতীয়ের প্রতি খর্ব নাসিক সিটুকার করা, কেবলমাত্র যে অদ্ভুত অসংগত হাস্যকর তা নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ ক্ষতিজনক। বিশেষ কাজের বিশেষ ব্যবস্থা আছে। পালোয়ান লেংটি প’রে, মাটি মেখে, ছাতি ফুলিয়ে চলে বেড়ায়, রাস্তার লোক বাহবা-বাহবা করে ; তার ছেলেটি নিতাস্ত কাহিল এবং বেচারা এবং এণ্টে ক্ষ, পর্যন্ত পড়ে আজ পাচ বৎসর বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট আপিসের অ্যাপ্রেটিস, সেও যদি লেংটি পরে, ধুলো মাখে এবং উঠতে বসতে তাল ঠোকে এবং ভদ্রলোকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে ‘আমার বাবা পালোয়ান’, তবে অন্ত লোকের যেমনি আমোদ বোধ হোক আত্মীয়-বন্ধুরা তার জন্য সবিশেষ উদবিগ্ন না হয়ে থাকতে পারে না । অতএব হয় সত্যই তপস্যা করো নয় তপস্যার আড়ম্বর ছাড়ো । পুরাকালে ব্রাহ্মণেরা একটি বিশেষ সম্প্রদায় ছিলেন, তাদের প্রতি একটি বিশেষ কার্যভার ছিল। সেই কার্যের বিশেষ উপযোগী হবার জন্য তারা আপনাদের চারি দিকে কতকগুলি আচরণ-অনুষ্ঠানের সীমারেখা অঙ্কিত করেছিলেন । অত্যন্ত সতর্কতার সহিত র্তারা আপনার চিত্তকে সেই সীমার বাহিরে বিক্ষিপ্ত হতে দিতেন না। সকল কাজেরই এইরূপ একটা উপযোগী সীমা আছে যা অন্য কাজের পক্ষে বাধা মাত্র । ময়রার দোকানের মধ্যে অ্যাটনি নিজের ব্যবসায় চালাতে গেলে সহস্র বিল্পের স্বারা প্রতিহত না হয়ে থাকতে পারেন না এবং ভূতপূর্ব অ্যাটর্নির অাপিসে যদি বিশেষ কারণ-বশত ময়রার দোকান খুলতে হয় তা হলে