প্রধান মেনু খুলুন

হরিলক্ষ্মী/চতুর্থ পরিচ্ছেদ






 হরিলক্ষ্মীর রোগগ্রস্ত দেহ সম্পূর্ণ নিরাময় হইতে এবার কিছু দীর্ঘ সময় লাগিল। প্রায় বৎসরাধিক কাল পরে সে বেলপুরে ফিরিয়া আসিল। শুধু কেবল জমিদারের আদরের পত্নী বলিয়াই নয় সে এত বড় সংসারের গৃহিণী। পাড়ার মেয়েরা দল বাঁধিয়া দেখিতে আসিল, যে সম্বন্ধে বড়, সে আশীর্ব্বাদ করিল, যে ছোট সে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইল। আসিল না শুধু বিপিনের স্ত্রী। সে যে আসিবে না, হরিলক্ষ্মী তাহা জানিত। এই একটা বছরের মধ্যে তাহারা কেমন আছে, যে-সকল ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা তাহাদের বিরুদ্ধে চলিতেছিল, তাহার ফল কি হইয়াছে, এ সব কোন সংবাদই সে কাহারও কাছে জানিবার চেষ্টা করে নাই। শিবচরণ কখনও বাটীতে, কখনও বা পশ্চিমে স্ত্রীর কাছে গিয়া বাস করিতেছিলেন, যখনই দেখা হইয়াছে, সর্ব্বাগ্রে ইহাদের কথাই তাহার মনে হইয়াছে, অথচ একটা দিনের জন্য স্বামীকে প্রশ্ন করে নাই। প্রশ্ন করিতে তাহার যেন ভয় করিত। মনে করিত, এত দিনে হয় ত যা হোক একটা বোঝা-পড়া হইয়া গিয়াছে, হয় ত ক্রোধের সে প্রখরতা আর নাই—জিজ্ঞাসাবাদের দ্বারা পাছে আবার সেই পূর্ব্বক্ষত বাড়িয়া উঠে, এ আশঙ্কায় সে এমনই একটা ভাব ধারণ করিয়া থাকিত, যেন সে সকল তুচ্ছ কথা আর তাহার মনেই নাই। ও দিকে শিবচরণও নিজে হইতে কোন দিন বিপিনদের বিষয় আলোচনা করিত না। সে যে স্ত্রীর অপমানের ব্যাপার বিস্মৃত হয় নাই, বরঞ্চ তাহার অবর্ত্তমানে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছে, এই কথাটা সে হরিলক্ষ্মীর কাছে গোপন করিয়াই রাখিত। তাহার সাধ ছিল লক্ষ্মী গৃহে ফিরিয়া নিজের চোখেই সমস্ত দেখিতে পাইয়া আনন্দিত বিস্ময়ে আত্মহারা হইয়া উঠিবে।

 বেলা বাড়িয়া উঠিবার পূর্ব্বেই পিসিমার পুনঃ পুনঃ সস্নেহ তাড়নায় লক্ষ্মী স্নান করিয়া আসিলে তিনি উৎকণ্ঠা প্রকাশ করিয়া বলিলেন, তোমার রোগা শরীর বৌমা, নিচে গিয়ে কাজ নেই, এইখানেই ঠাঁই ক’রে ভাত দিয়ে যাক্।

 লক্ষ্মী আপত্তি করিয়া সহাস্যে কহিল, শরীর আগের মতই ভাল হয়ে গেছে পিসিমা, আমি রান্নাঘরে গিয়েই খেতে পারবো, ওপরে বয়ে আন্‌বার দরকার নেই। চল, নিচেই যাচ্চি।

 পিসিমা বাধা দিলেন, শিবুর নিষেধ আছে জানাইলেন এবং তাঁহারই আদেশে ঝি ঘরের মেঝেতে আসন পাতিয়া ঠাঁই করিয়া দিয়া গেল। পরক্ষণে রাঁধুনী অন্নব্যঞ্জন বহিয়া আনিয়া উপস্থিত করিল। সে চলিয়া গেলে লক্ষ্মী আসনে বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, রাঁধুনীটি কে, পিসিমা? আগে ত দেখি নি?

 পিসিমা হাস্য করিয়া বলিলেন, চিন্‌তে পার্‌লে না বৌমা, ও যে আমাদের বিপিনের বৌ।

 লক্ষ্মী স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। মনে মনে বুঝিল, তাহাকে চমৎকৃত করিবার জন্যই এতখানি ষড়যন্ত্র এমন করিয়া গোপনে রাখা হইয়াছিল। কিছুক্ষণে আপনাকে সামলাইয়া লইয়া জিজ্ঞাসু মুখে পিসিমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

 পিসিমা বলিলেন, বিপিন মারা গেছে, শুনেছ ত?

 লক্ষ্মী শুনে নাই কিছুই, কিন্তু এইমাত্র যে তাহার খাবার দিয়া গেল, সে যে বিধবা, তাহা চাহিলেই বুঝা যায়। ঘাড় নাড়িয়া কহিল, হাঁ।

 পিসিমা অবশিষ্ট ঘটনাটা বিবৃত করিয়া কহিলেন, যা ধূলোগুঁড়ো ছিল, মাম্‌লায় মাম্‌লায় সর্ব্বস্ব খুইয়ে বিপিন মারা গেল। বাকি টাকার দায়ে বাড়িটাও যেতো, আমরা পরামর্শ দিলাম, মেজবৌ, বছর দুবছর গতরে খেটে শোধ দে, তোর অপগণ্ড ছেলের মাথা গোঁজবার স্থানটুকু বাঁচুক।

 লক্ষ্মী বিবর্ণ মুখে তেমনই পলকহীন চক্ষুতে নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল। পিসিমা সহসা গলা খাটো করিয়া বলিলেন, তবু আমি এক দিন ওকে আড়ালে ডেকে বলেছিলাম, মেজবৌ, যা হবার তা ত হ’লো, এখন ধার-ধোর ক’রে যেমন ক’রে হোক, একবার কাশী গিয়ে বৌমার হাতে পায়ে গিয়ে পড়। ছেলেটাকে তার পায়ের ওপর নিয়ে ফেলে দিয়ে বল গে, দিদি, এর ত কোন দোষ নেই, একে বাঁচাও—

 কথাগুলি আবৃত্তি করিতেই পিসিমার চোখ জলভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল, অঞ্চলে মুছিয়া ফেলিয়া বলিলেন, কিন্তু সেই যে মাথা গুঁজে মুখ বুজে ব’সে রইল, হা-না একটা জবাব পর্য্যন্ত দিলে না।

 হরিলক্ষ্মী বুঝিল, ইহার সমস্ত অপরাধের ভারই তাহার মাথায় গিয়া পড়িয়াছে। তাহার মুখে সমস্ত অন্ন-ব্যঞ্জন তিতো বিষ হইয়া উঠিল এবং একটা গ্রাসও যেন গলা দিয়া গলিতে চাহিল না। পিসিমা কি একটা কাজে ক্ষণকালের জন্য বাহিরে গিয়াছিলেন, তিনি ফিরিয়া আসিয়া খাবারের অবস্থা দেখিয়া চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। ডাক দিলেন, বিপিনের বৌ! বিপিনের বৌ!

 বিপিনের বৌ দ্বারের বাহিয়ে আসিয়া দাঁড়াইতেই তিনি ঝঙ্কার দিয়া উঠিলেন। তাঁর মুহূর্ত্ত পূর্ব্বের করুণা, চক্ষুর নিমেষে কোথায় উবিয়া গেল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলিয়া উঠিলেন, এমন তাচ্ছীল্য ক’রে কাজ কর্‌লে ত চল্‌বে না বিপিনের বৌ! বৌমা একটা দানা মুখে দিতে পারলে না, এমনই রেঁধেছ!

 ঘরের বাহির হইতে এই তিরস্কারের কোন উত্তর আসিল না, কিন্তু অপরের অপমানের ভারে লজ্জায় ও বেদনায় ঘরের মধ্যে হরিলক্ষ্মীর মাথা হেঁট হইয়া গেল। পিসিমা পুনশ্চ কহিলেন, চাকরী কর্‌তে এসে জিনিস-পত্র নষ্ট ক’রে ফেল্‌লে চল্‌বে না, বাছা, আরও পাঁচ জনে যেমন ক’রে কাজ করে, তোমাকে তেমনই কর্‌তে হবে, তা ব’লে দিচ্চি।

 বিপিনের স্ত্রী এবার আস্তে আস্তে বলিল, প্রাণপণে সেই চেষ্টাই ত করি পিসিমা, আজ হয় ত কি রকম হয়ে গেছে। এই বলিয়া সে নিচে চলিয়া গেলে, লক্ষ্মী উঠিয়া দাঁড়াইবামাত্র পিসিমা হায় হায় করিয়া উঠিলেন। লক্ষ্মী মৃদু কণ্ঠে কহিল, কেন দুঃখ করচ পিসিমা, আমার দেহ ভাল নেই বলেই খেতে পার্‌লাম না—মেজবৌয়ের রান্নার ত্রুটি ছিল না।

 হাত-মুখ ধুইয়া আসিয়া নিজের নির্জ্জন ঘরের মধ্যে হরিলক্ষ্মীর যেন দম বন্ধ হইয়া আসিতে লাগিল। সর্ব্বপ্রকার অপমান সহিয়াও বিপিনের স্ত্রী হয় ত ইহার পরেও এই বাড়িতেই চাক্‌রী করা চলিতে পারে, কিন্তু আজকের পরে গৃহিণীপনার পণ্ডশ্রম করিয়া তাহার নিজের দিন চলিবে কি করিয়া? মেজবৌয়ের একটা সান্ত্বনা তবুও বাকি আছে—তাহা বিনা দোষে দুঃখ সহার সান্ত্বনা, কিন্তু তাহার নিজের জন্য কোথায় কি অবশিষ্ট রহিল!

 রাত্রিতে স্বামীর সহিত কথা কহিবে কি, হরিলক্ষ্মী ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিতেও পারিল না। আজ তাহার মুখের একটা কথায় বিপিনের স্ত্রীর সকল দুঃখ দূর হইতে পারিত, কিন্তু নিরুপায় নারীর প্রতি যে মানুষ এত বড় শোধ লইতে পারে, তাহার পৌরুষে বাঁধে না, তাহার কাছে ভিক্ষা চাহিবার হীনতা স্বীকার করিতে কোনমতেই লক্ষ্মীর প্রবৃত্তি হইল না।

 শিবচরণ ঈষৎ হাসিয়া প্রশ্ন করিল, মেজবৌমার সঙ্গে হ’ল দেখা? বলি কেমন রাঁধচে?

 হরিলক্ষ্মী জবাব দিতে পারিল না, তাহার মনে হইল, এই লোকটিই তাহার স্বামী এবং সারাজীবন ইহারই ঘর করিতে হইবে, মনে করিয়া তাহার মনে হইল, পৃথিবী, দ্বিধা হও!

 পরদিন সকালে উঠিয়াই লক্ষ্মী দাসীকে দিয়া পিসিমাকে বলিয়া পাঠাইল, তাহার জ্বর হইয়াছে, সে কিছুই খাইবে না। পিসিমা ঘরে আসিয়া জেরা করিয়া লক্ষ্মীকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিলেন—তাহার মুখের ভাবে ও কণ্ঠস্বরে তাঁহার কেমন যেন সন্দেহ হইল, লক্ষ্মী কি একটা গোপন করিবার চেষ্টা করিতেছে। কহিলেন, কিন্তু তোমার ত সত্যিই অসুখ করে নি বৌমা?

 লক্ষ্মী মাথা নাড়িয়া জোর করিয়া বলিল, আমার জ্বর হয়েছে, আমি কিচ্ছু খাবো না।

 ডাক্তার আসিলে তাহাকে দ্বারের বাহিরে হইতেই লক্ষ্মী বিদায় করিয়া দিয়া বলিল, আপনি ত জানেন, আপনার ওষুধে আমার কিছুই হয় না—আপনি যান।

 শিবচরণ আসিয়া অনেক কিছু প্রশ্ন করিল, কিন্তু একটা কথারও উত্তর পাইল না।

 আরও দুই-তিন দিন যখন এমনই করিয়া কাটিয়া গেল, তখন বাড়ির সকলেই কেমন যেন অজানা আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল।

 সে দিন বেলা প্রায় তৃতীয় প্রহর, লক্ষ্মী স্নানের ঘর হইতে নিঃশব্দ মৃদু পদে প্রাঙ্গণের এক ধার দিয়া উপরে যাইতেছিল, পিসিমা রান্নাঘরের বারান্দা হইতে দেখিতে পাইয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন, দেখ বৌমা, বিপিনের বৌয়ের কাজ;—অ্যাঁ মেজবৌ, শেষকালে চুরি সুরু করলে?

 হরিলক্ষ্মী কাছে গিয়া দাঁড়াইল। মেজবৌ মেঝের উপর নির্ব্বাক অধোমুখে বসিয়া, একটা পাত্রে অন্ন-ব্যঞ্জন গামছা ঢাকা দেওয়া সম্মুখে রাখা, পিসিমা দেখাইয়া বলিলেন, তুমিই বল বৌমা, এত ভাত-তরকারী একটা মানুষে খেতে পারে? ঘরে লয়ে যাওয়া হচ্চে ছেলের জন্যে; অথচ বার বার ক’রে মানা ক’রে দেওয়া হয়েছে। শিবচরণের কানে গেলে আর রক্ষে থাক্‌বে না—ঘাড় ধ’রে দূর দূর ক’রে তাড়িয়ে দেবে। বৌমা, তুমি মনিব, তুমিই এর বিচার কর। এই বলিয়া পিসিমা যেন একটা কর্ত্তব্য শেষ করিয়া হাঁফ ফেলিয়া বাঁচিলেন।

 তাঁহার চীৎকার শব্দে বাড়ির চাকর, দাসী, লোকজন যে যেখানে ছিল, তামাসা দেখিতে ছুটিয়া আসিয়া দাঁড়াইল, আর তাহারই মধ্যে নিঃশব্দে বসিয়া ও-বাড়ির মেজবৌ ও তাহার কর্ত্রী এ-বাড়ির গৃহিণী।

 এত ছোট, এত তুচ্ছ বস্তু লইয়া এত বড় কদর্য্য কাণ্ড বাধিতে পারে, লক্ষ্মীর তাহা স্বপ্নের অগোচর। অভিযোগের জবাব দিবে কি, অপমানে, অভিমানে, লজ্জায় সে মুখ তুলিতেই পারিল না। লজ্জা অপরের জন্য নয়, সে নিজের জন্যই। চোখ দিয়া তাহার জল পড়িতে লাগিল, তাহার মনে হইল, এত লোকের সম্মুখে সে-ই যেন ধরা পড়িয়া গিয়াছে এবং বিপিনের স্ত্রী-ই তাহার বিচার করিতে বসিয়াছে।

 মিনিট দুই-তিন এমনই ভাবে থাকিয়া সহসা প্রবল চেষ্টায় লক্ষ্মী আপনাকে সামলাইয়া লইয়া কহিল, পিসিমা, তোমরা সবাই একবার এ ঘর থেকে যাও।

 তাহার ইঙ্গিতে সকলে প্রস্থান করিলে লক্ষ্মী ধীরে ধীরে মেজ-বৌয়ের কাছে গিয়া বসিল; হাত দিয়া তাহার মুখ তুলিয়া ধরিয়া দেখিল, তাহারও দুই চোখ বাহিয়া জল পড়িতেছে। কহিল, মেজবৌ, আমি তোমার দিদি, এই বলিয়া নিজের অঞ্চল দিয়া তাহার অশ্রু মুছাইয়া দিল।