প্রধান মেনু খুলুন

হরিলক্ষ্মী/তৃতীয় পরিচ্ছেদ





 বন্যার চাপে মাটীর বাঁধ যখন ভাঙ্গিতে সুরু করে, তখন তাহার অকিঞ্চিৎকর আরম্ভ দেখিয়া মনে করাও যায় না যে, অবিশ্রান্ত জলপ্রবাহ এত অল্পকালমধ্যেই ভাঙনটাকে এমন ভয়াবহ, এমন সুবিশাল করিয়া তুলিবে। ঠিক এমনই হইল হরিলক্ষ্মীর! স্বামীর কাছে বিপিন ও তাহার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথাগুলা যখন তাহার সমাপ্ত হইল, তখন তাহার পরিণাম কল্পনা করিয়া সে নিজেই ভয় পাইল। মিথ্যা বলা তাহার স্বভাবও নহে, বলিতেও তাহার শিক্ষা ও মর্য্যাদায় বাধে, কিন্তু দুর্নিবার জলস্রোতের মত যে সকল বাক্য আপন ঝোঁকেই তাহার মুখ দিয়া ঠেলিয়া বাহির হইয়া আসিল, তাহার অনেকগুলিই যে সত্য নহে, তাহা নিজেই সে চিনিতে পারিল। অথচ তাহার গতিরোধ করাও যে তাহার সাধ্যের বাহিরে, ইহাও অনুভব করিতে লক্ষ্মীর বাকি রহিল না। শুধু একটা ব্যাপার সে ঠিক এতখানি জানিত না, সে তাহার স্বামীর স্বভাব। তাহা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং তেমনই বর্ব্বর। পীড়ন করিবার কোথায় যে সীমা, সে যেন তাহা জানেই না। আজ শিবচরণ আস্ফালন করিল না, সমস্তটা শুনিয়া কহিল, আচ্ছা, মাস-ছয়েক পরে দেখো। বছর ঘুরবে না, সে ঠিক।

 অপমান লাঞ্ছনার জ্বালা হরিলক্ষ্মীর অন্তরে জ্বলিতেই ছিল, বিপিনের স্ত্রী ভালরূপে শাস্তি ভোগ করে, তাহা সে যথার্থই চাহিতেছিল, কিন্তু শিবচরণ বাহিরে চলিয়া গেলে তাহার মুখের এই সামান্য কয়েকটা কথা বার বার মনের মধ্যে আবৃত্তি করিয়া লক্ষ্মী মনের মধ্যে আর স্বস্তি পাইল না। কোথায় যেন কি একটা ভারি খারাপ হইল, এমনই তাহার বোধ হইতে লাগিল।

 দিন-কয়েক পরে কি একটা কথার প্রসঙ্গে হরিলক্ষ্মী হাসিমুখে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, ওঁদের সম্বন্ধে কিছু করছ না কি?

 কাদের সম্বন্ধে?

 বিপিন ঠাকুরপোদের সম্বন্ধে?

 শিবচরণ নিস্পৃহভাবে কহিল, কি-ই বা করব, আর কি-ই বা করতে পারি? আমি সামান্য ব্যক্তি বৈ ত না!

 হরিলক্ষ্মী উদ্বিগ্ন হইয়া কহিল, এ কথার মানে?

 শিবচরণ বলিল, মেজবৌমা ব’লে থাকেন কি না, রাজত্বটা ত আর বট্‌ঠাকুরের নয়—ইংরাজ গভর্মেণ্টের!

 হরিলক্ষ্মী কহিল, বলেছে না কি? কিন্তু, আচ্ছা—

 কি আচ্ছা?

 স্ত্রী একটুখানি সন্দেহ প্রকাশ করিয়া বলিল, কিন্তু মেজবৌ ত ঠিক ও রকম কথা বড় একটা বলে না। ভয়ানক চালাক কি না! অনেকে আবার বাড়িয়েও হয় ত তোমার কাছে ব’লে যায়।

 শিবচরণ কহিল, আশ্চর্য্য নয়। তবে কি না, কথাটা আমি নিজের কানেই শুনেছি।

 হরিলক্ষ্মী বিশ্বাস করিতে পারিল না, কিন্তু তখনকার মত স্বামীর মনোরঞ্জনের নিমিত্ত সহসা কোপ প্রকাশ করিয়া বলিয়া উঠিল, বল কি গো, এত বড় অহঙ্কার! আমাকে না হয় যা খুসী বলেছে, কিন্তু ভাশুর ব’লে তোমার ত একটা সম্মান থাকা দরকার!

 শিবচরণ বলিল, হিঁদুর ঘরে এই ত পাঁচ জনে মনে করে লেখাপড়া-জানা বিদ্বান মেয়েমানুষ কি না! তবে আমাকে অপমান ক’রে পার আছে, কিন্তু তোমাকে অপমান ক’রে কারও রক্ষে নাই। সদরে একটু জরুরি কাজ আছে, আমি চল্‌লাম। বলিয়া শিবচরণ বাহির হইয়া গেল। কথাটা যে রকম করিয়া হরিলক্ষ্মীর পাড়িবার ইচ্ছা ছিল, তাহা হইল না, বরঞ্চ উল্টা হইয়া গেল। স্বামী চলিয়া গেলে ইহাই তাহার পুনঃ পুনঃ মনে হইতে লাগিল।

 সদরে গিয়া শিবচরণ বিপিনকে ডাকাইয়া আনিয়া কহিল, পাঁচ-সাত বছর থেকে তোমাকে ব’লে আসচি, বিপিন, গোয়ালটা তোমার সরাও, শোবার ঘরে আমি আর টিক্‌তে পারি নে, কথাটায় কি তুমি কান দেবে না ঠিক করেছ?

 বিপিন বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিল, কৈ আমি ত একবারও শুনি নি বড়দা?

 শিবচরণ অবলীলাক্রমে কহিল, অন্ততঃ দশবার আমি নিজের মুখেই তোমাকে বলেছি। তোমার স্মরণ না থাক্‌লে ক্ষতি হয় না, কিন্তু এত বড় জমিদারী যাকে শাসন কর্‌তে হয় তার কথা ভুলে গেলে চলে না। সে যাই হোক্‌, তোমার আপনার ত একটা আক্কেল থাকা উচিত যে, পরের যায়গায় নিজের গোয়ালঘর রাখা কতদিন চলে? কালকেই ওটা সরিয়ে ফেল গে। আমার আর সুবিধে হবে না, তোমাকে শেষবারের মত জানিয়ে দিলাম।

 বিপিনের মুখে এমনিই কথা বাহির হয় না, অকস্মাৎ এই পরম বিস্ময়কর প্রস্তাবের সম্মুখে সে একেবারে অভিভূত হইয়া পড়িল। তাহার পিতামহর আমল হইতে যে গোয়ালঘরটাকে সে নিজেদের বলিয়া জানে, তাহা অপরের, এত বড় মিথ্যা উক্তির সে একটা প্রতিবাদ পর্য্যন্ত করিতে পারিল না, নীরবে বাড়ি ফিরিয়া আসিল।

 তাহার স্ত্রী সমস্ত বিবরণ শুনিয়া কহিল, কিন্তু রাজার আদালত খোলা আছে ত!

 বিপিন চুপ করিয়া রহিল। সে যত ভাল মানুষই হোক, এ কথা সে জানিত, ইংরাজ রাজার আদালতগৃহের বৃহৎ দ্বার যত উন্মুক্তই থাক্‌, দরিদ্রের প্রবেশ করিবার পথ এতটুকু খোলা নাই। হইলও তাহাই। পরদিন বড়বাবুর লোক আসিয়া প্রাচীন ও জীর্ণ গো-শালা ভাঙ্গিয়া লম্বা প্রাচীর টানিয়া দিল। বিপিন থানায় গিয়া খবর দিয়া আসিল, কিন্তু আশ্চর্য্য এই যে, শিবচরণের পুরাতন ইটের নূতন প্রাচীর যতক্ষণ না সম্পূর্ণ হইল, ততক্ষণ পর্য্যন্ত একটা রাঙা পাগড়ীও ইহার নিকটে আসিল না। বিপিনের স্ত্রী হাতের চুড়ি বেচিয়া আদালতে নালিশ করিল, কিন্তু তাহাতে শুধু গহনাটাই গেল, আর কিছু হইল না।

 বিপিনের পিসিমা সম্পর্কীয়া এক জন শুভানুধ্যায়িনী এই বিপদে হরিলক্ষ্মীর কাছে গিয়া পড়িতে বিপিনের স্ত্রীকে পরামর্শ দিয়াছিলেন, তাহাতে সে নাকি জবাব দিয়াছিল, বাঘের কাছে হাত যোড় ক’রে দাঁড়িয়ে আর লাভ কি পিসিমা? প্রাণ যা যাবার তা যাবে, কেবল অপমানটাই উপরি পাওনা হবে।

 এই কথা হরিলক্ষ্মীর কানে আসিয়া পৌঁছিলে, সে চুপ করিয়া রহিল, কিন্তু একটা উত্তর দিবার চেষ্টা পর্য্যন্ত করিল না।

 পশ্চিম হইতে ফিরিয়া অবধি শরীর তাহার কোন দিনই সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল না, এই ঘটনার মাস-খানেকের মধ্যে সে আবার জ্বরে পড়িল। কিছুকাল গ্রামেই চিকিৎসা চলিল, কিন্তু ফল যখন হইল না, তখন ডাক্তারের উপদেশমত পুনরায় তাঁহাকে বিদেশ- যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতে হইল।

 নানাবিধ কাজের তাড়ায় এবার শিবচরণ সঙ্গে যাইতে পারিল না, দেশেই রহিল। যাবার সময় সে স্বামীকে একটা কথা বলিবার জন্য মনে মনে ছট্‌ফট্ করিতে লাগিল, কিন্তু মুখ ফুটিয়া কোনমতেই সে এই লোকটির সম্মুখে সে কথা উচ্চারণ করিতে পারিল না। তাহার কেবলই মনে হইতে লাগিল, এ অনুরোধ বৃথা, ইহার অর্থ সে বুঝিবে না।