আধুনিক সাহিত্য/সাকার ও নিরাকার

সাকার ও নিরাকার
সাকার ও নিরাকার-তত্ত্ব। শ্রীযতীন্দ্রমােহন সিংহ বি. এ.-প্রণীত

ঈশ্বর সাকার কি নিরাকার এইরূপ তর্ক মধ্যে মধ্যে আমাদের দেশে শুনা যায়। কিন্তু বর্তমান সমালােচ্য গ্রন্থে তর্কটা তত দূর স্কুল নহে। গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয় এই যে, ঈশ্বরকে সাকার ভাবে উপাসনা করিতে হইবে কি নিরাকার ভাবে।

 কেহ কেহ এ প্রশ্নের উত্তর দিয়া থাকেন যে, যে লােক নিরাকারে মন দিতে পারে না তাহার পক্ষে সাকার-উপাসনা শ্রেয়।

 কিন্তু গ্রন্থকার সেরূপ মাঝামাঝি কিছু বলিতে চাহেন না, তিনি বলেন নিরাকার-উপাসনা হইতেই পারে না। হয় সােহহংব্রহ্ম হইয়া যাও, নয় মূর্তিপূজা করে। তিনি কালাপাহাড়ের ঠিক বিপরীতমুখে সংহারকার্য শুরু করিয়াছেন। মূর্তিপূজাকে কেবল যে তিনি রক্ষা করিতে চান তাহা নহে, অমৃর্তপূজাকে তর্কের দ্বারা ধ্বংস করিতে ইচ্ছা করেন।

 কী হইতে পারে এবং কী হইতে পারে না, তর্ক অপেক্ষা ইতিহাসে তাহার প্রমাণ সহজে পাওয়া যায়। জল যে শীতে জমিয়া বরফ হইতে পারে, উষ্ণপ্রধান দেশের রাজাকে তাহা তর্কে বুঝানাে অসাধ্য; কিন্তু যদি তিনি একবার নড়িয়া হিমালয়প্রদেশে ভ্রমণ করিয়া আসেন তবে এ সম্বন্ধে আর কথা থাকে না। লেখকমহাশয় সে রাস্তায় যান নাই, তিনি তর্কারা বলিয়াছেন নিরাকার-উপাসনা হইতেই পারে না।

 মুসলমানেরা মূর্তিপূজা করে না। অথচ মুসলমান-সম্প্রদায়ের মধ্যে ভক্ত কেহ নাই বা কখনাে জন্মেন নাই, এ কথা বিশ্বাস্য নহে। কী করিয়া যে তাহাদের ভক্তিবৃত্তির পরিতৃপ্তি হয় তাহা যতীন্দ্রমােহনবাবু না বুঝিতে পারেন, কিন্তু মূর্তিপূজা করিয়া নহে এ কথা নিশ্চয়।  নানক যে জগতের ভক্তশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজন নহেন তাহা কেহ সাহস করিয়া বলিবেন না; তিনি যে সোহহংব্রহ্মবাদী ছিলেন না, ইহাও নিঃসন্দেহ। তিনি যে প্রচলিত মূর্তি-উপাসনা বিশেষরূপে পরিত্যাগ করিয়া অমূর্ত-উপাসনা প্রচার করিয়াছেন, ইহার একটি বৈ কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। নিশ্চয় তিনি নিরাকার উপাসনায় চরিতার্থতা লাভ করিতেন এবং মূর্তি উপাসনায় তাহার ব্যাঘাত করিয়াছিল।

 ব্রাহ্মদের মধ্যেও নিঃসন্দেহে কেহ-না-কেহ আছেন যিনি প্রবলভক্তির আবেগ-বশতই মূর্তিপূজা পরিহার-পূর্বক সমস্ত জীবন নিরাকার-উপাসনায় যাপন করিয়াছেন। গ্রন্থকারের মতে তিনি ভ্রান্ত হইতে পারেন, কিন্তু তিনি যে ভক্ত তাহা কেবল তর্কে নহে, আচরণে এবং বহুপীড়ন ও ত্যাগ স্বীকারে প্রমাণ করিয়াছেন।

 এককালে ভারতবর্ষে মূর্তিপূজা ছিল না। কিন্তু সেই দূর কাল সম্বন্ধে ঐতিহাসিক প্রমাণ উত্থাপন করা নিস্ফল। আধুনিক কালের যে-কয়টি উদাহরণ দেওয়া গেল তাহা হইতে অন্তত এইটুকু প্রমাণ হয় যে, কোনো কোনো ভক্ত মূর্তিপূজায় বিরক্ত হইয়া তাহা ত্যাগ করিয়াছেন এবং অনেক ভক্ত পৃথিবীর অনেক দেশে অমূর্ত-উপাসনায় ভক্তিবৃত্তির পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছেন। গ্রন্থকার বলেন, ‘মানিলাম তাহারা মূর্তিপূজা করেন না, কিন্তু তাহারা নিরাকার-উপাসনা করেন ইহা হইতেই পারে না।’ কারণ, ‘জাতিবাচক ও গুণবাচক পদার্থের জ্ঞান সাকার।’ এবং ‘জাতিবাচক ও গুণবাচক পদার্থ অবলম্বনে ঈশ্বরের জ্ঞান সাকার।’

 এ কেমন তর্ক? যেমন—যদি আমি বলি ‘ক বাঁকা পথে চলে এবং খ সোজা পথে চলে’ তুমি বলিতে পারো, ‘খও সোজা পথে চলে, কারণ সরল রেখা কাল্পনিক, পৃথিবীতে কোথাও সরল রেখা নাই।’  কথাটা সত্য বটে, কিন্তু তথাপি ইহা তর্কমাত্র। আমাদের ভাষা আমাদের মনকে এক-দম ছাড়াইয়া যাইতে পারে না এবং আমাদের মন সীমাবদ্ধ। সুতরাং আমাদের ভাষা আপেক্ষিক। আমরা যাহাকে তীক্ষ্ণ বলি অনুবীক্ষণ দিয়া দেখিতে গেলে তাহা ভোতা হইয়া পড়ে, আমরা যাহাকে নিটোল গোল বলি তাহাকে সহস্রগুণ বাড়াইয়া দেখিলে তাহার অসমানতা ধরা পড়িয়া যায়। অণুবীক্ষণ দিয়া দেখিতে গেলে নিরাকার উপাসনার মধ্যে যে আকারের আভাস পাওয়া যায় না তাহা বলিতে সাহস করি না।

 তাই যদি হইল, তবে আমরা যাহাকে সাকার-উপাসনা বলি তাহাতেই বা দোষ কী? নিরাকার যখন পূর্ণভাবে মনের অগম্য তখন তাঁহাকে সুগম আকারে পূজা করাই ভালো।

 আকার আমাদের মনের পক্ষে সুগম হইতে পারে, কিন্তু, তাই বলিয়া নিরাকার যে আকারের দ্বারা সুগম হইতে পারেন তাহা নহে—ঠিক তাহার উল্টা। মনে করো, আমি সমুদ্রের ধারণা করিতে ইচ্ছা করি। সমুদ্র ক্রোশ দুই তফাতে আছে। আমি তাহা দেখিতে যাত্রা করিবার সময় পণ্ডিত আসিয়া বলিলেন, ‘সমুদ্র এতই বড়ো যে স্বচক্ষে দেখিয়া তাহার ধারণা হইতে পারে না, কারণ আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ— আমরা সমুদ্রের মধ্যে যতই দূরে যাই, যতই প্রয়াস পাই, সমুদ্রকে ছোটো করিয়া দেখা ছাড়া উপায়ই নাই। অতএব, তোমার অন্দরের মধ্যে একটি ছোটো ভোবা খুড়িয়া তাহাকে সমুদ্র বলিয়া কল্পনা করো।’

 কিন্তু দর্শনশক্তির সাধ্যসীমা-দ্বারা সমুদ্র দেখিয়াও যদি সমুদ্রের ধারণা সম্পূর্ণ না হয় তবে ডোবা হইতে সমুদ্রের ধারণা অসম্ভব বলিলেও হয়। অনন্ত আকাশ আমাদের কাছে মণ্ডলবদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঘরে দ্বার বন্ধ করিয়া আকাশ দেখার সাধ মিটাইতে পারি না। আমি যতদূর পর্যন্ত দেখিতে পাই তাহা না দেখিয়া আমার তৃপ্তি হয় না।

 এই-যে প্রয়াস বস্তুত ইহাই উপাসনা। আমার শেষ পর্যন্ত গিয়াও যখন তাহার শেষ পাই না—আমার মন যখন একাকী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যাত্রা করিয়া বাহির হয়, যখন অগণ্য গ্রহ চন্দ্র তারকা অনন্ত জটিল জ্যোতিররণ্য-মধ্যে সে হারাইয়া যায় এবং প্রভাতকরপ্লাবিত নীলাকাশের মহোচ্চ দেশে বিলীনপ্রায় বিহঙ্গমের মতো উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে গাহিয়া উঠে, ‘তুমি ভুমা, আমি তোমার শেষ পাইলাম না’, তখন তাহাতেই সে কৃতার্থ হয়। সেই অন্ত না পাইয়াই তাহার সুখ। ভূমৈব সুখং, নাল্পে সুখমস্তি।

 টলেমির জগৎতন্ত্র আমাদের ধারণাযোগ্য। পৃথিবীকে মধ্যে রাখিয়া বদ্ধ কঠিন আকাশে জ্যোতিষ্কগণ সংকীর্ণ নিয়মে ঘুরিতেছে, ইহা ঠিক মনুষ্যমনের আয়ত্তগম্য। কিন্তু অধুনা জ্যোতির্বিদ্যার বন্ধনমুক্তি হইয়াছে, সে সীমাবদ্ধ ধারণার বাহিরে অনন্ত রহস্যের মধ্যে গিয়া পড়িয়াছে বলিয়া তাহার গৌরব বাড়িয়াছে। জগৎটা যে পৃথিবীর প্রাঙ্গণমাত্র নহে, পৃথিবী যে বিশ্বজগতে ধূলিকণার অধম, এই সংবাদেই আমাদের কল্পনা প্রসারিত হইয়া যায়।

 আমাদের উপাস্য দেবতাকেও যখন কেবলমাত্র মনুষ্যের গৃহপ্রাঙ্গণের মধ্যে বদ্ধ করিয়া না দেখি, তাহাকে আমাদের ধারণার অতীত বলিয়া জানি, যখন ঋষিদের মুখে শুনি—

যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ
আনন্দং ব্রহ্মণণা বিদ্বান্ ন বিভেতি কুতশ্চন

অর্থাৎ, মনের সহিত বাক্য যাহাকে না পাইয়া ফিরিয়া আসে সেই আনন্দকে, সেই ব্রহ্মকে, যিনি জানেন তিনি কাহা হইতেও ভয় পান না—তখনই আমাদের বদ্ধ হৃদয় মুক্তির আশ্বাস লাভ করিতে থাকে। বাক্য-মন যাহাকে না পাইয়া ফিরিয়া আসে তিনি যে আমাদের পক্ষে শূন্যস্বরূপ তাহা নহে, তিনিই আনন্দ।

 যাঁহাকে আমাদের অপেক্ষা বড়ো বলিয়া জানি তাহাকেই উপাসনা করি। আমাদের সর্বোচ্চ উপাসনা তিনিই আকর্ষণ করেন যিনি এত বড়ো যে কোথাও তাহার শেষ নাই।

 তর্কের মুখে বলা যাইতে পারে, তাহাকে জানিব বড়ো করিয়া, কিন্তু দেখিব ছোটো করিয়া। আপনাকে আপনি খণ্ডন কবিয়া চলা কি সহজ কাজ? বিশেষত ইন্দ্রিয় প্রশ্রয় পাইলে সে মনের অপেক্ষা বড়ো হইয়া উঠে। সেই ইন্দ্রিয়ের সাহায্য যতটুকু না লইলে নয় তদপেক্ষা বেশি কর্তৃত্ব তাহার হাতে স্বেচ্ছাপূর্বক সমর্পণ করিলে মনের জড়ত্ব অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে।

 তাঁহাকে ছোটো করিয়াই বা দেখিব কেন? নতুবা তাহাকে কিছু-একটা বলিয়া মনে হয় না, তিনি মন হইতে ক্রমশ স্খ‌লিত হইয়া পড়েন।

 কিন্তু মহৎ লক্ষ্যের জন্য ফাঁকি দিয়া সারিবার সংক্ষিপ্ত রাস্তা নাই। দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি। সেই দুর্গম পথ এড়াইবার উপায় থাকিলে ভাবনা ছিল না। কষ্ট করিতে হয়, চেষ্টা করিতে হয় বলিয়া বিনা প্রয়াসের পথ অবলম্বন করিলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া যায়। যে লোক ধনী হইতে চায় সে সমস্ত দিন খাটিয়া রাত্রি একটা পর্যন্ত হিসাব মিলাইয়া তবে শুইতে যায়। পায়ের উপর পা দিয়া তাহার অভীষ্টসিদ্ধি হয় না। আর যে ঈশ্বরকে চায়, পথ দুর্গম বলিয়া সে কি খেলা করিয়া তাহাকে পাইবে?

 আসল কথা, ঈশ্বরকে সকলে চায় না, পারমার্থিক দিকে স্বভাবতই অনেকের মন নাই। ধন ঐশ্বর্য সুখ সৌভাগ্য পাপক্ষয় এবং পুণ্যঅর্জনের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া দেবসেবা ও ধর্মকর্ম করাকেই জর্জ এলিয়ট other-worldliness নাম দিয়াছেন। অর্থাৎ সেটা পারলৌকিক বৈষয়িকতা, তাহা আধ্যাত্মিকতা নহে। যাহাদের সেই দিকে লক্ষ্য সাকার নিরাকার তাহাদের পক্ষে উপলক্ষ মাত্র। সুতরাং হাতের কাছে যেটা থাকে, যাহাতে সুবিধা পায়, দশজনে যেটা পরামর্শ দেয়, তাহাই অবলম্বন করিয়া ধর্মচতুর লোক পুণ্যের খাতায় লাভের অঙ্ক জমা করিতে থাকেন। নিরাকারবাদী এবং সাকারবাদী উভয় দলেই তেমন লোক ঢের আছে।

 কিন্তু আধ্যাত্মিকতা যাহাদের প্রকৃতির সহজ ধর্ম, সংসার যাহাদিগকে তৃপ্ত ও বিক্ষিপ্ত করিতে পারে না, যে দিকেই স্থাপন কর কম্পাসের কাটার মতো যাহাদের মন এক অনির্বচনীয় চুম্বক-আকর্ষণে অনন্তের দিকে আপনি ফিরিয়া দাড়ায়, জগদীশ্বরকে বাদ দিলে যাহাদের নিকট আমাদের স্থিতিগতি চিন্তাচেষ্টা ক্রিয়াকর্ম একেবারেই নিরর্থক এবং সমস্ত জগদ্‌ব্যাপার নিরবচ্ছিন্ন বিভীষিকা, যাহারা অন্তরাত্মার মধ্যে পরমাত্মার প্রত্যক্ষ আনন্দ উপভোগ করিয়াই বুঝিতে পারিয়াছেন যে ‘আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে, আনন্দেন জানি জীবন্তি, আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি’—সাধনা তাঁহাদের নিকট দুঃসাধ্য নহে এবং তাহারা আপনাকে এবং আপনার ঈশ্বরকে ভুলাইয়া সংক্ষেপে কার্যোদ্ধার করিতে চাহেন না—কারণ, নিত্যসাধনাতেই তাহাদের সুখ, নিয়ত-প্রয়াসেই তাহাদের প্রকৃতির পরিতৃপ্তি।

 সেইরূপ কোনো স্বভাবভক্ত যখন মূর্তিপূজার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন তখন তিনি আপন অসামান্য প্রতিভাবলে মূর্তিকে অমূর্ত করিয়া দেখিতে পারেন, তাহার প্রত্যক্ষবর্তী কোনো সীমা তাহাকে অসীমের নিকট হইতে কাড়িয়া রাখিতে পারে না; তাহার চক্ষু যাহা দেখে তাহার মন তাহাকে বিদ্যুদ্‌বেগে ছাড়াইয়া চলিয়া যায়, বাহিরের উপলক্ষ তাঁহার নিকট কেবল অভ্যাসক্রমে থাকে মাত্র, তাহাকে দূর করিবার কোনো প্রয়োজন হয় না; বিশ্বসংসারই তাঁহার নিকট রূপক, প্রতিমার তো কথাই নাই—যে লোকের অক্ষরজ্ঞান আছে সে যেমন অক্ষরকে অক্ষররূপে দেখে না, সে যেমন কাগজের উপর যখন ‘গা’ এবং ‘ছ’ দেখে তখন ক্ষুদ্র গ’এ আকার ছ দেখে না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনশ্চক্ষে শাখা-পল্লবিত বৃক্ষ দেখিতে পায়, তেমনি তিনি সম্মুখে স্থাপিত বস্তুকে দেখিয়াও দেখিতে পান না, মুহূর্তমধ্যে অন্তঃকরণে সেই অমূর্ত আনন্দ উপলব্ধি করেন ‘যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ’। কিন্তু এই ইন্দ্রজাল অসামান্য প্রতিভার দ্বারাই সাধ্য। সে প্রতিভা চৈতন্যের ছিল, রামপ্রসাদ সেনের ছিল।

 আবার প্রকৃতিভেদে কোনো কোনো স্বভাবভক্ত লোক প্রচলিত মূর্তিদ্বারা ঈশ্বরের পূজাকে আবমাননা এবং পরমাত্মাবমাননা বলিয়া অভ্যাসবন্ধন ছেদন করিয়া আত্মার মধ্যে এবং বিশ্বের মধ্যে তাঁহার উপাসনা করেন। মহম্মদ এবং নানক তাহার দৃষ্টান্ত।

 কিন্তু আমাদের মধ্যে ভক্তির প্রতিভা খুব অল্প লোকেরই আছে। প্রত্যক্ষ সংসার-অরণ্য আমাদিগকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখে; মাঝে মাঝে তাহারই ডালপালার অবকাশ-পথে অধ্যাত্মরশ্মি দেবদূতের তর্জনীর মতো আমাদের অন্ধকারের একাংশ স্পর্শ করিয়া যায়। এখন, আমরা যদি মাঝে মাঝে সংসারের বনচ্ছায়াতলে কীটানুসন্ধান ছাড়িয়া দিয়া অনন্ত আকাশের মধ্যে মুক্তির আনন্দ ভোগ করিতে চাই তো কী করিব?

 ‘যদি চাই’ এ কথা বলিতে হইল। কারণ, পূর্বেই বলিয়াছি, আমরা সকলে চাই না, ঈশ্বরকে উপলক্ষ করিয়া আর-কিছু চাই। কিন্তু যদি চাই তোত কী করিব?

 তবে, যাহাতে বাধা, যাহাতে অন্ধকার, তাহা সাবধানে এড়াইয়া যে দিকে আলোক আপনাকে প্রকাশ করে সেই পথ দিয়া পাখা মেলিয়া আকাশের দিকে উড়িতে হইবে সে পথ কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের পথ, ধূলির পথ, পৃথিবীর পথ নহে; তাহা পদচিহ্নহীন বায়ুর পথ, আলোকের পথ, আকাশের পথ। আমাদের পক্ষে সেই এক পথ।

 যাঁহারা মুক্তক্ষেত্রে বাস করেন তাহারা মাটিতে বসিয়াও আকাশের আলো পান, কিন্তু যাহারা জটিল প্রবৃত্তিজালে পরিবৃত হইয়া আছে তাহাদিগকে একেবারে পৃথিবীর দিক হইতে উড়িয়া বাহির হইয়া যাইতে হয়।

 তাহা না করিয়া আমরা যদি আমাদেরই প্রবৃত্তি আমাদেরই আকৃতি দিয়া দেবতা গড়ি তবে তাহার মধ্যে মুক্তি কোন্‌খানে। যদি তাহাকে স্নান করাই, খাওয়াই, মশারিতে শোওয়াই, এমন-কি, তাহার জন্য নটী নিযুক্ত করিয়া রাখি, তবে তাহার ফল কী হয়? তবে নিজের প্রবৃত্তিকেই দেবতা করিয়া পূজা করা হয়। আমাদের লোভ, আমাদের হিংসা, আমাদের ক্ষুদ্রতাকে দেবতারূপে অমর করিয়া রাখি। এই কারণেই কালীকে দস্যু আপন দস্যুবৃত্তির সহায় বলিয়া জ্ঞান করে, মিথ্যা-শপথকারী আদালতে জয়লাভের জন্য পশু মানত করে, এমন-কি, যে-সকল অন্যায় অবিচার দুষ্কর্ম মনুষ্যলোকে গর্হিত বলিয়া খ্যাত দেবচরিত্রে তাহাও অনিন্দনীয় বলিয়া স্থান পায়।

 আমাদের দেশের দেবতা কি কেবল মূর্তিতেই বদ্ধ যে রূপক ভাঙিয়া তাহার মধ্যে আমরা ভাবের স্বাধীনতা লাভ করিব? চার হাতকে যেন আমরা চারিদিক্‌বর্তী কর্মশীলতা বলিয়া মনে করিলাম, কিন্তু পুরাণে-উপপুরাণে যাত্রায় কথকতায় তাহার জন্মমৃত্যুবিবাহ-রাগদ্বেষ-সুখদুঃখ-দৈন্যদুর্বলতার বিচিত্র পাঠ ও পাঠান্তর হইতে মনকে মুক্ত করিব কেমন করিয়া? যত প্রকার কৌশলে মানুষের মনকে ভুলাইয়া একেবারে আটে-ঘাটে বাঁধা যায় তাহার কোনোটারই ক্রটি নাই। এবং এতপ্রকার সুদৃঢ় স্থূল শৃঙ্খলে চতুর্দিক হইতে সযত্ন বন্ধনকে গ্রন্থকার যদি তাঁহার নির্গুণ ব্রহ্মলাভের সোপান বলিয়া গণ্য করেন তবে মাছির পক্ষে মাকড়সার জালে পড়াই আকাশে উড়িবার উপায় মনে করা অসংগত হইবে না।

 দেবচরিত্র সম্বন্ধে যে-সকল ভ্রষ্ট আদর্শের কল্পনা আমাদের দেশে শাখাপল্লবিত হইয়া চারি দিকে শিকড় বিস্তার করিয়াছে তাহা কল্পনার বিকার; গ্রন্থকার বোধ করি তাহা হিন্দুসমাজের অধোগতির ফল বলিয়া জ্ঞান করেন এবং সম্ভবত তাহা সংশোধন করিয়া লইতে উপদেশ দেন। সংশোধনের উপায় কী? তিনি এক স্থলে বলিয়াছেন, “সকল শাস্ত্রের মূলে এক বেদ, এক শ্রুতি—এক শ্রুতির দ্বারা সকল শাস্ত্রের বিবোধ ভঞ্জন করিবার বিধি রহিয়াছে।’

 বিধি রহিয়াছে, কিন্তু কেহ কখনো চেষ্টা করিয়াছেন? পৌরাণিক ধর্মের সহিত বৈদিক ধর্মের সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া কোনো পণ্ডিত আজ পর্যন্ত হিন্দুধর্মের একটা অখণ্ড আদর্শ প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন কি? ইহা কি সকলের দ্বারা সাধ্য?

 পৌরাণিক ধর্ম ঐতিহাসিক হিন্দুধর্ম। কালক্রমে হিন্দুর অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। বৈদিক আর্যগণ যে সমাজ, যে রীতি, যে বিশ্বাস, যে মানসিক প্রকৃতি লইয়া ভারতবর্ষে প্রবেশ করিয়াছিলেন, অনার্যদের সংঘর্ষে, মিশ্রণে, বিচিত্র অবস্থান্তরে, স্বভাবের নিয়মে ক্রমশই তাহা রূপান্তরিত হইয়া আসিয়াছে। সেই-সকল নব নব অভিব্যক্তি নব নব পুরাণে আপনাকে আকারবদ্ধ করিয়াছে। বেদ যে অবস্থার শাস্ত্র, পুরাণ সে অবস্থার শাস্ত্র নহে। সুতরাং বেদকেই যদি প্রমাণ বলিয়া মানা যায় তবে পুরাণকে ছাড়িতে হয় এবং পুরাণকে প্রবল বলিয়া মানিলে বেদকে পরিহার করিতে হয়। এমন-কি, গ্রন্থকার নিজে বলিয়াছেন এবং ফলেও দেখা যায়, এক পুরাণকে মানিলে অন্য পুরাণের সহিত বিরোধ বাধিয়া উঠে। বর্তমানে হিন্দুসমাজ বেদকে মুখে মান্য করিয়া কাজের বেলা পুরাণকে অবলম্বন করে। উভয়ের মধ্যে যে কোনোকার অসামঞ্জস্য আছে সে তর্ক উত্থাপিত হয় না।

 হিন্দুধর্মের এই ঐতিহাসিক অভিব্যক্তি আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে। কারণ, পুরাণ কেবল সংস্কৃত ভাষায় বদ্ধ নহে, প্রচলিত ভাষাতেও রচিত হয়। মনসার ভাসান, সত্যপীরের কথা প্রভৃতি তাহার দৃষ্টান্ত। মেয়েদের ব্রতকথাও তাহার উদাহরণ। অন্নদামঙ্গলে যদিও পৌরাণিক শিবদুর্গার লীলা বর্ণিত এবং যদিও তাহার রচয়িতা ভারতচন্দ্র শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, তথাপি তাহার মধ্যে জনসাধারণ-প্রচলিত আধুনিক কল্পনাবিকার সহজেই স্থানলাভ করিয়াছে। কবিকঙ্কণ চণ্ডীতেও তাহাই। হরপার্বতীর কোন্দল, কোঁচ-নারীদের প্রতি শিবের আসক্তি, নিজের গাত্রমল দিয়া দুর্গা-কর্তৃক খেলার পুত্তলি-নির্মাণ ও তাহা হইতে গণেশের জন্ম, এ-সমস্ত কাহিনী আধুনিক, প্রাদেশিক; শ্রুতি ইহার মূল নহে, লোকের কল্পনাই ইহার মূল, দেবতাকে নিজ পরিমাপে নির্মাণচেষ্টাই ইহার প্রধান কারণ। ইহার মধ্যে উচ্চ অঙ্গের আধ্যাত্মিক রূপক বাহির করা সাধারণ লোকের পক্ষে অসাধ্য এবং অসাধারণ লোকের পক্ষেও দুঃসাধ্য।

 সংক্ষেপে আমাদের শেষ বক্তব্য এই যে, যে-সকল ভক্ত মহাপুরুষ চিরপ্রথাগত সাকার উপাসনা ত্যাগ করেন নাই তাহারা অসামান্য প্রতিভাবলে উদ্দীপ্ত ভাবাবেগে দৃষ্টিগোচরকেও দৃষ্টিপথাতীত করিয়া তুলিয়াছেন; বাধা তাহাদের নিকট বাধা নহে, র‍্যণ্ট্‌গেন-আবিষ্কৃত রশ্মির ন্যায় তাঁহাদের মন শতপ্রাচীরবেষ্টিত জড়-আবরণ অনায়াসে ভেদ করিয়া চলিয়া যাইতে পারে। কিন্তু সাধারণ লোকের কাছে বাধা যে বাধা তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহাদের মনের স্বাভাবিক জড়ত্ব জড়কে আশ্রয় করিতে চায়, তাহাকে অতিক্রম করিতে পারে না। ইহা তাহাদিগকে অগ্রসর করে না, বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। ইহা দ্বারা সে ভক্তিমুখ লাভ করিতে পারে, কিন্তু তাহা মুক্তিমুখ নহে।

 সকল সম্প্রদায়েরই অধিকাংশ লোক সমাজের অনুসরণে অভ্যস্ত আচার পালন করেন। ব্রাহ্মদের মধ্যে অনেকে নিয়মিত কতকগুলি শব্দ উচ্চারণ করেন এবং শব্দ শুনিয়া যান, এবং মূর্তি-উপাসকদের অনেকে বাহ্যিক পূজা ও মৌখিক জপ করিয়া কর্তব্য সারিয়া দেন। কিন্তু যাঁহারা কেবল সামাজিক ব্রাহ্ম নহেন, আধ্যাত্মিক ব্রাহ্ম, তাঁহাদের উপাসনাকে গ্রন্থকার যেরূপ উভ্রান্ত মনে করেন তাহা সেরূপ নহে।

 আশ্বিন ১৩০৫