ইংরেজ ডাকাত/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 অষ্টমদিবস যখন আমরা সকলে পাহারায় নিযুক্ত, সেই সময়—রাত্রি আন্দাজ তিনটার সময়, ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান স্ট্রীটের একটী বাড়ীতে গোল উঠিল—“চোর চোর”। বাড়ীর বাহিরেই পুলিস, সদর দরজা বন্ধ। সেইস্থান হইতে পুলিসও বলিতে লাগিল—“ধর ধর”। বাড়ীতে একটী মুসলমানী আয়া ছিল, চোর আসিয়া তাহারই সম্মুখে পড়িল। আয়াও কম সাহসী নহে—সে চোরকে জাপ্টাইয়া ধরিল; কিন্তু চোর তাহার অপেক্ষা অধিক বলবান্ সুতরাং সে আর চোরকে ধরিয়া রাখিতে পারিল না; চোর সে বাড়ীর পশ্চিমদিকের প্রাচীর এক লম্ফে লঙ্ঘন করিয়া, পার্শ্ববর্ত্তী বাড়ীর ভিতর গিয়া পড়িল। দ্বারের নিকট হইতে পুলিস তাহা দেখিতে পাইল। যে বাড়ীতে চোর গমন করিল, সেই বাড়ীর সম্মুখেও পুলিস ছিল। তখন সকলে একত্র “চোর চোর” বলিয়া চীৎকার করিতে করিতে, কেহ বা সেই বাড়ীর ভিতর প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিয়া প্রবেশ করিল, কেহ বা সেই বাড়ীর পার্শ্বস্থিত একটী খালি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল। যে বাড়ীতে চোর আসিয়াছে, সেই বাড়ীতে দুইজন দ্বারবান্ জাগিয়াছিল; বাড়ীর ভিতর পুলিস প্রবেশ করিবার পূর্ব্বেই দ্বারবন‍্দ্বয় চোরের পশ্চাৎ ধাবমান হইয়াছিল। চোর সেই সময়, সেই বাড়ীর ভিতর হইতে লম্ফপ্রদান করিয়া, সেই খালি বাড়ীর প্রাচীরের উপর যেমন উঠিবে, অমনই একজন দ্বারবান্ উহার একখানি পা চাপিয়া ধরিল। চোর অতিশয় বলশালী; সে অপর পদের দ্বারা আঘাত করিয়া ধৃতপদ ছাড়াইয়া লইল, এবং লম্ফ প্রদান করিয়া সেই খালি বাড়ীর ভিতর পতিত হইল। সেই বাড়ীর ভিতর অগ্রেই পুলিস প্রবেশ করিয়াছিল, কিন্তু উহাকে ধরিবার পূর্ব্বেই, সে দ্রুতপদে সিঁড়ি বাহিয়া ছাদের উপর উঠিল। পুলিসও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছাদের উপর গমন করিলে, সে সেই ছাদের উপর হইতে একলম্ফে অন্য আর একটা বাড়ীর ছাদের উপর গিয়া পতিত হইল। পুলিসের সাধ্য নাই যে, সেইরূপ লম্ফ প্রদানে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে পারে। তখন আর কি করা যায়, স্থির করিতে না পারিয়া, সকলে মিলিয়া কেবল “চোর চোর” বলিয়া চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। আর সেই চোরও, লক্ষে লম্ফে দুই তিনটী বাড়ী অতিক্রম-পূর্ব্বক অন্য আর একটী বাড়ীতে গমন করিল। সেই বাড়ী হইতে অন্য বাড়ীতে গমন করিতে, আর কেহই দেখিতে পাইল না। শেষোক্ত বাড়ীটী ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান স্ট্রীটের হোটেল। এই সকল কথা বলিতে যত সময় লাগিল, তাহার সহস্রাংশের একাংশ সময়ের মধ্যে চোর প্রথম বাড়ী হইতে শেষ বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইল।

 সে যাহা হউক, তখন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্ত করিলাম যে, চোর এই কয়েকটী বাড়ীর ভিতর নিশ্চয়ই আছে। অবশেষে স্থির হইল, এই বাড়ী কয়েকটীতে এরূপভাবে পাহারা দিতে হইবে যে, সে আর কোনদিক দিয়া পলায়ন করিতে সমর্থ না হয়; বন্দোবস্তও সেইরূপ হইল। পাহারার বন্দোবস্ত শেষ হইলে, আমাদের প্রথম কার্য্য হইল—সেই হোটেলের ভিতর অনুসন্ধান করা। সেইস্থানের সাহেবমাত্রই চোরের জ্বালায় পূর্ব্বেই জ্বালাতন হইয়াছিলেন। সুতরাং সকলে আসিয়া আমাদিগের সহিত যোগ দিলেন। হোটেলের দ্বারে গমন করিয়া দেখিলাম, সেইস্থানেও দুইজন সাহেব আসিয়া দাঁড়াইয়া আছেন; ইঁহারা সেই হোটেলেই থাকেন। ইঁহারাও আমাদের সাহায্যে প্রবৃত্ত হইলেন। সেই দুইজন সাহেবের মধ্যে একজনের নাম “হিলি”।

 হোটেলের নীচের গৃহ হইতে আমরা অনুসন্ধান আরম্ভ করিলাম। এ অনুসন্ধান, নামে অনুসন্ধান নহে—প্রত্যেক ঘরই দস্তুরমত খানা-তল্লাসি করিতে লাগিলাম। সেই সকল গৃহে যাঁহারা ছিলেন, তাঁহারা সকলেই ভদ্রলোক; বিশেষতঃ পূর্ব্বোক্ত ভয়ানক ভয়ানক চুরির কথা সমস্ত তাঁহারা শুনিয়াছেন। তাঁহাদিগকে বলিবামাত্রই তাঁহারা গৃহের সমস্ত দ্রব্যাদি আমাদিগকে দেখাইয়া দিলেন; কিন্তু কাহারও গৃহে কোন চোরাই দ্রব্য পাওয়া গেল না। নীচের গৃহ ও দ্বিতলের গৃহ অনুসন্ধান করিয়া, পরিশেষে ত্রিতলে উঠিলাম। এইস্থানে আমাদিগের সাহায্যকারী “হিলি” সাহেব অবস্থিতি করেন। জিজ্ঞাসা করায় জানিতে পারিলাম, দশ এগার দিবস হইতে তিনি সেই গৃহে আছেন। গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়াই একজোড়া জুতা দেখিতে পাওয়া গেল; ঠিক্ এইরূপ একজোড়া জুতা এক টী সাহেবের গৃহ হইতে পূর্ব্বে চুরি গিয়াছিল। সেই গৃহের ভিতর এক গাছি ছড়ি ছিল, তাহাতে সুবর্ণ ও রৌপ্যের কাজ করা; এইরূপ একগাছি ছড়িও অন্য আর একজনের গৃহ হইতে চুরি যায়। তখন দুইজন পুলিস-কর্ম্মচারী দুইখানি গাড়ি লইয়া, যাঁহাদের জুতা ও ছড়ি চুরি গিয়াছিল, সেই দুইজন সাহেবের নিকট গমন করিলেন। সেই সাহেবদ্বয় সেই কথা শুনিবামাত্র তখনই আগমন করিলেন। জুতা ও ছড়ি দেখিয়াই তাঁহারা বলিলেন, “ইহাই আমাদিগের গৃহ হইতে চুরি গিয়াছিল।” তখন আর হিলি সাহেব কোথায় যাইবেন?— তখনই তাঁহার হস্ত লৌহ-অলঙ্কারে শোভিত হইল, এবং সেই গোলযোগের সময় কে একজন আসিয়া, তাঁহার গালে সবলে এক চপেটাঘাত করিল। যখন হিলি দেখিল যে, তাহার আর বাঁচিবার উপায় নাই—সে মালসমেত ধরা পড়িয়াছে, তখন সে সমস্ত স্বীকার করিল। এইটী ইংরাজ চোরের মহৎ গুণ। ইংরাজ চোর যে পর্যন্ত মালসমেত ধরা না পড়ে, সে পর্য্যন্ত কাহার সাধ্য—উহার মুখ হইতে কোন কথা বাহির করে। কিন্তু যদি দেখিল, মালসমেত ধরা পড়িয়াছি—বাঁচিবার কোন উপায় নাই, তথ্য সে কোন কথা গোপন করিবে না—সকল কথা স্পষ্ট করিয়। বলিয়া দিবে।

 হিলি যে সকল চুরি করিয়াছিল, তাহা সমস্ত স্বীকার করিল, এবং সেই বাড়ীর নানাস্থান হইতে দ্রব্যাদি বাহির করিয়া দিল। এ পর্যন্ত যত চুরি হইয়াছিল, তাহার সমস্ত দ্রব্যই প্রায় পাওয়া গেল; কেবল বাকি থাকিল—চেনগুলি। চেনের কথা জিজ্ঞাসা করায়, পরিশেষে হিলি তাহাও স্বীকার করিল, এবং একটী বাজ‍্নার বাক্সের (পিয়োনোর) ভিতর হইতে ৩২ ছড়া সোণার চেন বাহির করিয়া দিল।

 হিলির নামে অনেক চুরির নালিস হইল। মাজিষ্ট্রেটের কোর্টেও হিলি কোন কথা অস্বীকার করিল না, মাজিষ্ট্রেট সাহেব উহাকে দায়রায় পাঠাইয়া দিলেন। সেখানেও হিলি সমস্ত দোষ স্বীকার করিয়া লওয়ায়, জজ ও জুরির দয়া হইল। ১৮৮৮ সালের আগষ্ট মাসে হিলি তিন বৎসরের নিমিত্ত কঠিন পরিশ্রমের সহিত কারাগারে প্রেরিত হইল। হিলি ও হরিণ-বাড়ীর জেলে আবদ্ধ রহিল।