৫৪

গােরার মন তখন ভাবে আবিষ্ট ছিল— সুচরিতাকে সে তখন একটি ব্যক্তিবিশেষ বলিয়া দেখিতেছিল না, তাহাকে একটি ভাব বলিয়া দেখিতেছিল। ভারতের নারীপ্রকৃতি সুচরিতা-মূর্তিতে তাহার সম্মুখে প্রকাশিত হইল। ভারতে গৃহকে পুণ্যে সৌন্দর্যে ও প্রেমে মধুর ও পবিত্র করিবার জন্যই ইহার আবির্ভাব। যে লক্ষ্মী ভারতের শিশুকে মানুষ করেন, রােগীকে সেবা করেন, তাপীকে সান্ত্বনা দেন, তুচ্ছকেও প্রেমের গৌরবে প্রতিষ্ঠাদান করেন- যিনি দুঃখে দুর্গতিতেও আমাদের দীনতমকে ত্যাগ করেন নাই, অবজ্ঞা করেন নাই যিনি আমাদের পূজার্হ হইয়াও আমাদের অযােগ্যতমকেও একমনে পূজা করিয়া আসিয়াছেন, যাঁহার নিপুণ সুন্দর হাতদুইখানি আমাদের কাজে উৎসর্গ করা এবং যাহার চিরসহিষ্ণু ক্ষমাপূর্ণ প্রেম অক্ষয় দানরূপে আমরা ঈশ্বরের কাছ হইতে লাভ করিয়াছি, সেই লক্ষ্মীরই একটি প্রকাশকে গােরা তাহার মাতার পার্শ্বে প্রত্যক্ষ আসীন দেখিয়া গভীর আনন্দে ভরিয়া উঠিল। তাহার মনে হইতে লাগিল, এই লক্ষ্মীর দিকে আমরা তাকাই নাই, ইহাকেই আমরা সকলের পিছনে ঠেলিয়া রাখিয়াছিলাম, আমাদের এমন দুর্গতির লক্ষণ আর-কিছুই নাই। গােরার তখন মনে হইল, দেশ বলিতেই ইনি, সমস্ত ভারতের মর্মস্থানে প্রাণের নিকেতনে শতদল পদ্মের উপর ইনি বসিয়া আছেন, আমরাই ইহার সেবক। দেশের দুর্গতিতে ইহারই অবমাননা- সেই অবমাননায় উদাসীন আছি বলিয়াই আমাদের পৌরুষ আজ লজ্জিত।

 গােরা নিজের মনে নিজে আশ্চর্য হইয়া গেছে। যতদিন ভারতবর্ষের নারী তাহার অনুভবগােচর ছিল না ততদিন ভারতবর্ষকে সে যে কিরূপ অসম্পূর্ণ করিয়া উপলব্ধি করিতেছিল ইতিপূর্বে তাহা সে জানিতই না। গােরার কাছে নারী যখন অত্যন্ত ছায়াময় ছিল তখন দেশ সম্বন্ধে তাহার যে কর্তব্যবােধ ছিল তাহাতে কী একটা অভাব ছিল। যেন শক্তি ছিল কিন্তু তাহাতে প্রাণ ছিল না, যেন পেশী ছিল কিন্তু স্নায়ু ছিল না! গােরা এক মুহূর্তেই বুঝিতে পারিল যে, নারীকে যতই আমরা দূর করিয়া, ক্ষুদ্র করিয়া জানিয়াছি, আমাদের পপৗরুষও ততই শীর্ণ হইয়া মরিয়াছে।

 তাই গােরা যখন সুচরিতাকে কহিল ‘আপনি এসেছেন’, তখন সেটা কেবল একটা প্রচলিত শিষ্টসম্ভাষণরূপে তাহার মুখ হইতে বাহির হয় নাই— তাহার জীবনের একটি নূতনলব্ধ আনন্দ ও বিস্ময় এই অভিবাদনের মধ্যে পূর্ণ হইয়া ছিল।

 কারাবাসের কিছু কিছু চিহ্ন গােরার শরীরে ছিল। পূর্বের চেয়ে সে অনেকটা রােগা হইয়া গেছে। জেলের অন্নে তাহার অশ্রদ্ধা ও অরুচি থাকাতে এই এক-মাস-কাল সে প্রায় উপবাস করিয়া ছিল। তাহার উজ্জ্বল শুভ্র বর্ণও পূর্বের চেয়ে কিছু ম্লান হইয়াছে। তাহার চুল অত্যন্ত ছােটো করিয়া ছাঁটা হওয়াতে মুখের কৃশতা আরও বেশি করিয়া দেখা যাইতেছে।

 গােরার দেহের এই শীর্ণতাই সুচরিতার মনে বিশেষ করিয়া একটি বেদনাপূর্ণ সম্ভ্রম জাগাইয়া দিল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, প্রণাম করিয়া গােরার পায়ের ধুলা গ্রহণ করে। যে উদ্দীপ্ত আগুনের ধোঁওয়া এবং কাঠ আর দেখা যায় না, গােরা সেই বিশুদ্ধ অগ্নিশিখাটির মতো তাহার কাছে প্রকাশ পাইল। একটি করুণামিশ্রিত ভক্তির আবেগে সুচরিতার বুকের ভিতরটা কাঁপিতে লাগিল। তাহার মুখ দিয়া কোনাে কথা বাহির হইল না।

 আনন্দময়ী কহিলেন, “আমার মেয়ে থাকলে যে কী সুখ হত এবার তা বুঝতে পেরেছি গােরা। তুই যে কটা দিন ছিলি নে, সুচরিতা যে আমাকে কত সান্ত্বনা দিয়েছে সে আর আমি কী বলব। আমার সঙ্গে তাে এঁদের পূর্বে পরিচয় ছিল না কিন্তু দুঃখের সময় পৃথিবীর অনেক বড়াে জিনিস, অনেক ভালাে জিনিসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, দুঃখের এই একটি গৌরব এবার বুঝেছি। দুঃখের সান্ত্বনা যে ঈশ্বর কোথায় কত জায়গায় রেখেছেন তা সব সময় জানতে পারি নে বলেই আমরা কষ্ট পাই। মা, তুমি লজ্জা করছ, কিন্তু তুমি আমার দুঃসময়ে আমাকে কত সুখ দিয়েছ সে কথা আমি তােমার সামনে না বলেই বা বাঁচি কী করে।”

 গােরা গভীর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টিতে সুচরিতার লজ্জিত মুখের দিকে একবার চাহিয়া আনন্দময়ীকে কহিল, “মা, তােমার দুঃখের দিনে উনি তােমার দুঃখের ভাগ নিতে এসেছিলেন, আবার আজ তােমার সুখের দিনেও তোমার সুখকে বাড়াবার জন্যে এসেছেন- হৃদয় যাদের বড়ো তাদেরই এইরকম অকারণ সৌহৃদ্য।”

 বিনয় সুচরিতার সংকোচ দেখিয়া কহিল, “দিদি, চোর ধরা পড়ে গেলে চতুর্দিক থেকে শান্তি পায়। আজ তুমি এঁদের সকলের কাছেই ধরা পড়ে গেছ, তারই ফল ভােগ করছ। এখন পালাবে কোথায়! আমি তােমাকে অনেক দিন থেকেই চিনি। কিন্তু কারও কাছে কিছু ফ^^স করি নি, চুপ করে বসে আছি মনে মনে জানি বেশিদিন কিছুই চাপা থাকে না।”

 আমন্দময়ী হাসিয়া কহিলেন, “তুমি চুপ করে আছ বৈকি। তুমি চুপ করে থাকবার ছেলে কিনা। যেদিন থেকে ও তােমাদের জেনেছে সেইদিন থেকে তােমাদের গুণগান করে করে ওর আর আশ কিছুতেই মিটছে না।”

 বিনয় কহিল, “শুনে রাখাে দিদি। আমি যে গুণগ্রাহী এবং আমি যে অকৃতজ্ঞ নই, তার সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির।”

 সুচরিতা কহিল, “ওতে কেবল আপনারই গুণের পরিচয় দিচ্ছেন।”

 বিনয় কহিল, “আমার গুণের পরিচয় কিন্তু আমার কাছে কিছু পাবেন। পেতে চান তাে মার কাছে আসবেন, স্তম্ভিত হয়ে যাবেন, ওঁর মুখে যখন শুনি আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই। মা যদি আমার জীবনচরিত লেখেন তা হলে আমি সকাল-সকাল মরতে রাজি আছি।”

 আনন্দময়ী কহিলেন, “শুনছ একবার ছেলের কথা?”

 গােরা কহিল, “বিনয়, তােমার বাপ-মা সার্থক তােমার নাম রেখেছিলেন।”

 বিনয় কহিল, “আমার কাছে বােধ হয় তাঁরা আর-কোনাে গুণ প্রত্যাশা করেন নি বলেই বিনয় গুণটির জন্যে দোহাই পেড়ে গিয়েছেন, নইলে সংসারে হাস্যাস্পদ হতে হত।”

 এমনি করিয়া প্রথম আলাপের সংকোচ কাটিয়া গেল।

 বিদায় লইবার সময় সুচরিতা বিনয়কে বলিল, “আপনি একবার আমাদের ও দিকে যাবেন না?”

 সুচরিতা বিনয়কে যাইতে বলিল, গােরাকে বলিতে পারিল না। গােরা তাহার ঠিক অর্থটা বুঝিল না, তাহার মনের মধ্যে একটা আঘাত বাজিল। বিনয় যে সহজেই সকলের মাঝখানে আপনার স্থান করিয়া লইতে পারে আর গােরা তাহা পারে না, এজন্য গােরা ইতিপূর্বে কোনােদিন কিছুমাত্র খেদ অনুভব করে নাই- আজ নিজের প্রকৃতির এই অভাবকে অভাব বলিয়া বুঝিল।