৫৭

অপরাহ্নে সুচরিতা পরেশবাবুর কাছে যাইবে বলিয়া প্রস্তুত হইতেছিল, এমন সময় বেহারা আসিয়া খবর দিল একজন বাবু আসিয়াছেন।

 “কে বাবু? বিনয়বাবু?”

 বেহারা কহিল, “না, খুব গৌরবর্ণ, লম্বা একটি বাবু।”

 সুচরিতা চমকিয়া উঠিয়া কহিল, “বাবুকে উপরের ঘরে এনে বসাও।”

 আজ সুচরিতা কী কাপড় পরিয়াছে ও কেমন করিয়া পরিয়াছে এত ক্ষণ তাহা চিন্তাও করে নাই। এখন আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া কাপড়খানা কিছুতেই তাহার পছন্দ হইল না। তখন বদলাইবার সময় ছিল না। কম্পিত হন্তে কাপড়ের আঁচলে, চুলে, একটু-আধটু পারিপাট্য সাধন করিয়া স্পন্দিত হৃৎপিণ্ড লইয়া সুচরিতা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। তাহার টেবিলের উপর গােরার রচনাবলী পড়িয়া ছিল, সে কথা তাহার মনেই ছিল । ঠিক সেই টেবিলের সম্মুখেই চৌকিতে গােরা বসিয়া আছে। বইগুলি নির্লজ্জভাবে ঠিক গােরার চোখের উপরে পড়িয়া আছে- সেগুলি ঢাকা দিবার বা সাইবার কোনাে উপায়মাত্র নাই।

 “মাসিমা আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে অনেক দিন থেকে ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন, তাকে খবর দিই গে।” বলিয়া সুচরিতা ঘরে প্রবেশ করিয়াই চলিয়া গেল- সে একলা গােরার সঙ্গে আলাপ করিবার মতাে জোর পাইল না।

 কিছু ক্ষণ পরে সুচরিতা হরিমােহিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিল। কিছুকাল হইতে হরিমােহিনী বিনয়ের কাছ হইতে গােরার মত বিশ্বাস ও নিষ্ঠা এবং তাহার জীবনের কথা শুনিয়া আসিতেছেন। প্রায় মাঝে মাঝে তাঁহার অনুরােধে সুচরিতা মধ্যাহ্নে তাঁহাকে গােরার লেখা পড়িয়া শুনাইয়াছে। যদিও সে-সব লেখা তিনি যে সমস্তই ঠিক বুঝিতে পারিতেন তাহা নহে এবং তাহাতে তাঁহার নিদ্রাকর্ষণেরই সুবিধা করিয়া দিত, তবু এটুকু মােটামুটি বুঝিতে পারিতেন যে, শাস্ত্র ও লোকাচারের পক্ষ লইয়া গােরা এখনকার কালের আচারহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করিতেছে। আধুনিক ইংরেজি-শেখা ছেলের পক্ষে ইহা অপেক্ষা আশ্চর্য এবং ইহা অপেক্ষা গুণের কথা আর কী হইতে পারে! ব্রাহ্মপরিবারের মধ্যে প্রথম যখন বিনয়কে দেখিয়াছিলেন তখন বিনয়ই তাঁহাকে যথেষ্ট তৃপ্তিদান করিয়াছিল। কিন্তু, ক্রমে সেটুকু অভ্যাস হইয়া যাওয়ার পর নিজের বাড়িতে যখন তিনি বিনয়কে দেখিতে লাগিলেন তখন তাহার আচারের ছিদ্রগুলিই তাঁহাকে বেশি করিয়া বাজিতে লাগিল। বিনয়ের উপর তিনি অনেকটা নির্ভর স্থাপন করিয়াছিলেন বলিয়াই তাহার প্রতি ধিক্‌কার তাঁহার প্রতিদিন বাড়িয়া উঠিতেছে। সেই জন্যই অত্যন্ত উৎসুকচিত্তে তিনি গােরার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।

 গােরার দিকে নেত্রপাত করিয়াই হরিমােহিনী একেবারে আশ্চর্য হইয়া গেলেন। এই তাে ব্রাহ্মণ বটে! যেন একেবারে হােমের আগুন। যেন শুভ্রকায় মহাদেব। তাহার মনে এমন একটি ভক্তির সঞ্চার হইল যে, গােরা যখন তাঁহাকে প্রণাম করিল তখন সে প্রণাম গ্রহণ করিতে হরিমােহিনী কুন্ঠিত হইয়া উঠিলেন।

 হরিমােহিনী কহিলেন, “তােমার কথা অনেক শুনেছি বাবা। তুমিই গৌর? গৌরই বটে। ওই-যে কীর্তনের গান শুনেছি

চাঁদের অমিয়া-সনে চন্দন বাঁটিয়া গো।
কে মাজিল গােরার দেহখানি—

আজ তাই চক্ষে দেখলুম। কোন্ প্রাণে তােমাকে জেলে দিয়েছিল আমি সেই কথাই ভাবি।”

 গােরা হাসিয়া কহিল, “আপনারা যদি ম্যাজিস্ট্রেট হতেন তা হলে জেলখানায় ইঁদুর-বাদুডের বাসা হত।”

 হরিমােহিনী কহিলেন, “না বাবা, পৃথিবীতে চোর-জুয়াচোরের অভাব কী? ম্যাজিস্ট্রেটের কি চোখ ছিল না! তুমি যে যে-সে কেউ নও, তুমি যে ভগবানের লােক, সে তাে মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়। জেলখানা আছে বলেই কি জেলে দিতে হবে!বাপ রে! এ কেমন বিচার!”

 গােরা কহিল, “মানুষের মুখের দিকে তাকালে পাছে ভগবানের রূপ চোখে পড়ে তাই ম্যাজিস্ট্রেট কেবল আইনের বইয়ের দিকে তাকিয়ে কাজ করে। নইলে মানুষকে চাবুক জেল দ্বীপান্তর ফাঁসি দিয়ে কি তাদের চোখে ঘুম থাকত, না মুখে ভাত রুচত?”

 হরিমােহিনী কহিলেন, “যখনই ফুরসত পাই রাধারানীর কাছ থেকে তােমার বই পড়িয়ে শুনি। কবে তােমার নিজের মুখ থেকে ভালো ভালাে সব কথা শুনতে পাব মনে এই প্রত্যাশা করে এতদিন ছিলুম। আমি মূর্খ মেয়েমানুষ আর বড়াে দুঃখিনী, সব কথা বুঝিও নে, আবার সব কথায় মনও দিতে পারি নে। কিন্তু বাবা, তােমার কাছ থেকে কিছু জ্ঞান পাব, এ আমার খুব বিশ্বাস হয়েছে।”

 গােরা বিনয়সহকারে এ কথার কোনাে প্রতিবাদ না করিয়া চুপ করিয়া রহিল।

 হরিমােহিনী কহিলেন, “বাবা, তােমাকে কিছু খেয়ে যেতে হবে। তােমার মতাে ব্রাহ্মণের ছেলেকে আমি অনেক দিন খাওয়াই নি। আজকের যা আছে তাই দিয়ে মিষ্টিমুখ করে যাও, কিন্তু আর-একদিন আমার ঘরে তােমার নিমন্ত্রণ রইল।”

 এই বলিয়া হরিমােহিনী যখন আহারের ব্যবস্থা করিতে গেলেন তখন সুচরিতার বুকের ভিতর তােলপাড় করিতে লাগিল।

 গােরা একেবারে আরম্ভ করিয়া দিল, “বিনয় আজ আপনার এখানে এসেছিল?”

 সুচরিতা কহিল, “হাঁ”

 গােরা কহিল, “তার পরে বিনয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয় নি, কিন্তু আমি জানি কেন সে এসেছিল।”  গােরা একটু থামিল, সুচরিতাও চুপ করিয়া রহিল।

 গােরা কহিল, “আপনারা ব্রাহ্মমতে বিনয়ের বিবাহ দেবার চেষ্টা করছেন। এটা কি ভালাে করছেন?”

 এই খোঁচাটুকু খাইয়া সুচরিতার মন হইতে লজ্জা-সংকোচের জড়তা একেবারে দূর হইয়া গেল। সে গােরার মুখের দিকে চোখ তুলিয়া কহিল, “ব্রাহ্মমতে বিবাহকে ভালাে কাজ বলে মনে করব না, এই কি আপনি আমার কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন?”

 গােরা কহিল, “আপনার কাছে আমি কোনােরকম ছােটো প্রত্যাশা করি নে, এ আপনি নিশ্চয় জানবেন। সম্প্রদায়ের লােকের কাছ থেকে মানুষ যেটুকু প্রত্যাশা করতে পারে আমি আপনার কাছ থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি করি। কোনাে-একটা দলকে সংখ্যায় বড়াে করে ভােলাই যে-সমস্ত কুলির সর্দারের কাজ আপনি সে শ্রেণীর নন, এ আমি খুব জোর করে বলতে পারি। আপনি নিজেও যাতে নিজেকে ঠিকমত বুঝতে পারেন এইটে আমার ইচ্ছা। অন্য পাঁচজনের কথায় ভুলে আপনি নিজেকে ছােটো বলে জানবেন না। আপনি কোনো-একটি দলের লােকমাত্র নন, এ কথাটা আপনাকে নিজের মনের মধ্যে থেকে নিজে স্পষ্ট বুঝতে হবে।”

 সুচরিতা মনের সমস্ত শক্তিকে জাগাইয়া সতর্ক হইয়া শক্ত হইয়া বসিল। কহিল, “আপনিও কি কোনাে দলের লোক নন?”

 গােরা কহিল, “আমি হিন্দু। হিন্দু তাে কোনো দল নয়। হিন্দু একটা জাতি। এ জাতি এত বৃহৎ যে কিসে এই জাতির জাতিত্ব তা কোনাে সংজ্ঞার দ্বারা সীমাবদ্ধ করে বলাই যায় না। সমুদ্র যেমন ঢেউ নয়, হিন্দু তেমনি দল নয়।”

 সুচরিতা কহিল, “হিন্দু যদি দল নয় তবে দলাদলি করে কেন?”

 গােরা কহিল, “মানুষকে মারতে গেলে সে ঠেকাতে যায় কেন? তার প্রাণ আছে বলে। পাথরই সকলরকম আঘাতে চুপ করে পড়ে থাকে।”

 সুচরিতা কহিল, “আমি যাকে ধর্ম বলে জ্ঞান করছি হিন্দু যদি তাকে আঘাত বলে গণ্য করে, তবে সে স্থলে আমাকে আপনি কী করতে বলেন?”

 গােরা কহিল, “তখন আমি আপনাকে বলব যে, যেটাকে আপনি কর্তব্য মনে করছেন সেটা যখন হিন্দুজাতি বলে এতবড়াে একটি বিরাট সত্তার পক্ষে বেদনাকর আঘাত তখন আপনাকে খুব চিন্তা করে দেখতে হবে, আপনার মধ্যে কোনাে ভ্রম কোনাে অন্ধতা আছে কি না, আপনি সব দিক সকল রকম করে চিন্তা করে দেখেছেন কি না। দলের লােকের সংস্কারকে কেবলমাত্র অভ্যাস বা আলস্য -বশত সত্য বলে ধরে নিয়ে এতবড়ো একটা উৎপাত করতে প্রবৃত্ত হওয়া ঠিক নয়। ইদুর যখন জাহাজের খােল কাটতে থাকে তখন ইঁদুরের সুবিধা ও প্রবৃত্তির হিসাব থেকেই সে কাজ করে; দেখে না এতবড়াে একটা আশ্রয়ে ছিদ্র করলে তার যেটুকু সুবিধা তার চেয়ে সকলের কতবড় ক্ষতি। আপনাকেও তেমনি ভেবে দেখতে হবে, আপনি কি কেবল আপনার দলটির কথা ভাবছেন, না সমস্ত মানুষের কথা ভাবছেন। সমস্ত মানুষ বললে কতটা বােঝায় তা জানেন? তার কত রকমের প্রকৃতি, কত রকমের প্রবৃত্তি, কত রকমের প্রয়ােজন? সব মানুষ এক পথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই কারও সামনে পাহাড়, কারও সামনে সমুদ্র, কারও সামনে প্রান্তর। অথচ কারও বসে থাকবার জো নেই, সকলকেই চলতে হবে। আপনি কেবল আপনার দলের শাসনটিকেই সকলের উপর খাটাতে চান? চোখ বুজে মনে করতে চান, মানুষের মধ্যে কোনাে বৈচিত্র্যই নেই, কেবল,ব্রাহ্মসমাজের খাতায় নাম লেখাবার জন্যেই সকলে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে? যে-সকল দস্যজাতি পৃথিবীর সমস্ত জাতিকেই যুদ্ধে জয় করে নিজের একচ্ছত্র রাজত্ব বিস্তার করাকেই পৃথিবীর একমাত্র কল্যাণ বলে কল্পনা করে, অন্যান্য জাতির বিশেষত্ব যে বিশ্বহিতের পক্ষে বহুমূল্য বিধান নিজের বলগর্বে তা যারা স্বীকার করে না এবং পৃথিবীতে কেবল দাসত্ব বিস্তার করে, তাদের সঙ্গে আপনাদের প্রভেদ কোন্‌খানে!”

 সুচরিতা ক্ষণকালের জন্য তর্কযুক্তি সমস্তই ভুলিয়া গেল। গােরার রজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর একটি আশ্চর্য প্রবলতা -দ্বারা তাহার সমস্ত অন্তঃকরণকে আন্দোলিত করিয়া তুলিল। গােরা যে কোনাে-একটা বিষয় লইয়া তর্ক করিতেছে তাহা সুচরিতার মনে রহিল না, তাহার কাছে কেবল এই সত্যটুকুই জাগিতে লাগিল যে গােরা বলিতেছে।

 গােরা কহিল, “আপনাদের সমাজই ভারতের বিশ কোটি লােককে সৃষ্টি করে নি; কোন্ পন্থা এই বিশ কোটি লােকের পক্ষে উপযােগী কোন্ বিশ্বাস কোন্ আচার এদের সকলকে খাদ্য দেবে, শক্তি দেবে, তা বেঁধে দেবার ভার জোর করে নিজের উপর নিয়ে এতবড়াে ভারতবর্ষকে একেবারে একাকার সমতল করে দিতে চান কী ব’লে। এই অসাধ্য-সাধনে যতই বাধা পাচ্ছেন ততই দেশের উপর আপনাদের রাগ হচ্ছে, অশ্রদ্ধা হচ্ছে, ততই যাদের হিত করতে চান তাদের ঘৃণা করে পর করে তুলছেন। অথচ যে ঈশ্বর মানুষকে বিচিত্র করে সৃষ্টি করেছেন এবং বিচিত্রই রাখতে চান, তাঁকেই আপনারা পূজা করেন, এই কথা কল্পনা করেন। যদি সত্যই আপনারা তাকে মানেন তবে তার বিধানকে আপনারা স্পষ্ট করে দেখতে পান না কেন, নিজের বুদ্ধির এবং দলের অহংকারে কেন এর তাৎপর্যটি গ্রহণ করছেন না!”

 সুচরিতা কিছুমাত্র উত্তর দিবার চেষ্টা না করিয়া চুপ করিয়া গােরার কথা। শুনিয়া যাইতেছে দেখিয়া গােরার মনে করুণার সঞ্চার হইল। সে একটুখানি থামিয়া গলা নামাইয়া কহিল, “আমার কথাগুলাে আপনার কাছে হয়তাে কঠোর শােনাচ্ছে কিন্তু আমাকে একটা বিরুদ্ধপক্ষের মানুষ বলে মনে কোনাে বিদ্রোহ রাখবেন না। আমি যদি আপনাকে বিরুদ্ধপক্ষ বলে মনে করতুম তা হলে কোনাে কথাই বলতুম না। আপনার মনে যে একটি স্বাভাবিক উদার শক্তি আছে সেটা দলের মধ্যে সংকুচিত হচ্ছে বলে আমি কষ্ট বােধ করছি।”

 সুচরিতার মুখ আরক্তিম হইল; সে কহিল, “না না, আমার কথা আপনি কিছু ভাববেন না। আপনি বলে যান, আমি বােঝবার চেষ্টা করছি।”

 গােরা কহিল, “আমার আর-কিছুই বলবার নেই— ভারতবর্ষকে আপনি আপনার সহজ বুদ্ধি সহজ হৃদয় দিয়ে দেখুন, একে আপনি ভালােবাসুন। ভারতবর্ষের লােককে যদি আপনি অব্রাহ্ম বলে দেখেন, তা হলে তাদের বিকৃত করে দেখবেন এবং তাদের অবজ্ঞা করবেন; তা হলে তাদের কেবলই ভুল বুঝতে থাকবেন। যেখান থেকে দেখলে তাদের সম্পূর্ণ দেখা যায় সেখান থেকে তাদের দেখাই হবে না। ঈশ্বর এদের মানুষ করে সৃষ্টি করেছেন, এরা নানারকম করে ভাবে, নানারকম করে চলে, এদের বিশ্বাস এদের সংস্কার নানারকম কিন্তু সমন্তেরই ভিত্তিতে একটি মনুষ্যত্ব আছে; সমন্তেরই ভিতরে এমন একটি জিনিস আছে যা আমার জিনিস, যা আমার এই ভারতবর্ষের জিনিস, যার প্রতি ঠিক সত্যদৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তার সমস্ত ক্ষুদ্রতা-অসম্পূর্ণতার আবরণ ভেদ করে একটি আশ্চর্য মহৎসত্তা চোখের উপরে পড়ে; অনেক দিনের অনেক সাধনা তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন দেখা যায়, দেখতে পাই অনেক কালের হােমের অগ্নি ভস্মের মধ্যে এখনাে জ্বলছে এবং সেই অগ্নি একদিন আপনার ক্ষুদ্র দেশকালকে ছাড়িয়ে উঠে পৃথিবীর মাঝখানে তার শিখাকে জাগিয়ে তুলবে তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ থাকে না; এই ভারতবর্ষের মানুষ অনেক দিন থেকে অনেক বড়াে কথা বলেছে, অনেক বড়ো কাজ করেছে, সে-সমস্তই একেবারে মিথ্যা হয়ে গেছে এ কথা কল্পনা করাও সত্যের প্রতি অশ্রদ্ধা, সেই তো নাস্তিকতা।”

 সুচরিতা মুখ নিচু করিয়া শুনিতেছিল। সে মুখ তুলিয়া কহিল, “আপনি আমাকে কী করতে বলেন?”

 গােরা কহিল, “আর কিছু বলি নে— আমি কেবল বলি আপনাকে এই কথাটা বুঝে দেখতে হবে যে, হিন্দুধর্ম মায়ের মতো নানা ভাবের নানা মতের লােককে কোল দেবার চেষ্টা করেছে; অর্থাৎ কেবল হিন্দুধর্মই জগতে মানুষকে মানুষ বলেই স্বীকার করেছে, দলের লােক বলে গণ্য করে নি। হিন্দুধর্ম মূঢ়কেও মানে, জ্ঞানীকেও মানে- এবং কেবলমাত্র জ্ঞানের এক মূর্তিকেই মানে না, জ্ঞানের বহুপ্রকার বিকাশকে মানে। খৃস্টানরা বৈচিত্র্যকে স্বীকার করতে চায় না; তারা বলে, এক পারে খৃস্টানধর্ম আর-এক পারে অনন্ত বিনাশ, এর মাঝখানে কোনাে বিচিত্রতা নেই। আমরা সেই খৃস্টানের কাছ থেকেই পাঠ নিয়েছি, তাই হিন্দুধর্মের বৈচিত্র্যের জন্যে লজ্জা পাই। এই বৈচিত্র্যের ভিতর দিয়েই হিন্দুধর্ম যে এককে দেখবার জন্যে সাধনা করছে সেটা আমরা দেখতে পাই নে। এই খৃস্টানি শিক্ষার পাক মনের চারি দিক থেকে খুলে ফেলে মুক্তিলাভ না করলে আমরা হিন্দুধর্মের সত্যপরিচয় পেয়ে গৌরবের অধিকারী হব না।”

 কেবল গােরার কথা শােনা নহে, সুচরিতা যেন গােরার কথা সম্মুখে দেখিতেছিল, গােরার চোখের মধ্যে দূর-ভবিষ্যৎ-নিবদ্ধ যে-একটি ধ্যানদৃষ্টি ছিল সেই দৃষ্টি এবং বাক্য সুচরিতার কাছে এক হইয়া দেখা দিল। লজ্জা ভুলিয়া, আপনাকে ভুলিয়া, ভাবের উৎসাহে উদ্দীপ্ত গােরার মুখের দিকে সুচরিতা চোখ তুলিয়া চাহিয়া রহিল। এই মুখের মধ্যে সুচরিতা এমন একটি শক্তি দেখিল যে শক্তি পৃথিবীতে বড়াে বড়াে সংকল্পকে যেন যােগবলে সত্য করিয়া তােলে। সুচরিতা তাহার সমাজের অনেক বিদ্বান ও বুদ্ধিমান লােকের কাছে অনেক তত্ত্বালােচনা শুনিয়াছে, কিন্তু গােরার এ তাে আলােচনা নহে, এ যেন সৃষ্টি। ইহা এমন একটা প্রত্যক্ষ ব্যাপার যাহা এককালে সমস্ত শরীর-মনকে অধিকার করিয়া বসে। সুচরিতা আজ বজ্রপাণি ইন্দ্রকে দেখিতেছিল— বাক্য যখন প্রবলমন্দ্রে কর্ণে আঘাত করিয়া তাহার বক্ষঃকপাটকে স্পন্দিত করিতেছিল সেই সঙ্গে বিদ্যুতের তীব্রচ্ছটা তাহার রক্তের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে নৃত্য করিয়া উঠিতেছিল। গােরার মতের সঙ্গে তাহার মতের কোথায় কী পরিমাণ মিল আছে বা মিল নাই, তাহা স্পষ্ট করিয়া দেখিবার শক্তি সুচরিতার রহিল না।

 এমন সময় সতীশ ঘরে প্রবেশ করিল। গােরাকে সে ভয় করিত, তাই তাহাকে এড়াইয়া সে তাহার দিদির পাশ ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল এবং আস্তে আন্তে বলিল, “পানুবাবু এসেছেন।”

 সুচরিতা চমকিয়া উঠিল— তাহাকে কে যেন মারিল। পানুবাবুর আসাটাকে সে কোনােপ্রকারে ঠেলিয়া সরাইয়া, চাপা দিয়া, একেবারে বিলুপ্ত করিয়া দিতে পারিলে বাঁচে এমনি তাহার অবস্থা হইল। সতীশের মৃদু কণ্ঠস্বর গােরা শুনিতে পায় নাই মনে করিয়া সুচরিতা তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল। সে একেবারে সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া হারানবাবুর সম্মুখে উপস্থিত হইয়াই কহিল, “আমাকে মাপ করবেন, আজ আপনার সঙ্গে কথাবার্তার সুবিধা হবে না।”

 হারানবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন সুবিধা হবে না?”

 সুচরিতা এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়া কহিল, “কাল সকালে আপনি যদি বাবার ওখানে আসেন তা হলে আমার সঙ্গে দেখা হবে।”

 হারানবাবু কহিলেন, “আজ বুঝি তােমার ঘরে লােক আছে?”

 এ প্রশ্নও এড়াইয়া সুচরিতা কহিল, “আজ আমার অবসর হবে না, আজ আপনি দয়া করে মাপ করবেন।”

 হারানবাবু কহিলেন, “কিন্তু, রাস্তা থেকে গৌরমােহনবাবুর গলার স্বর শুনলুম যে, তিনি আছেন বুঝি?”

 এ প্রশ্নকে সুচরিতা আর চাপা দিতে পারিল না, মুখ লাল করিয়া বলিল, “হাঁ, আছেন।”

 হারানবাবু কহিলেন, “ভালােই হয়েছে, তার সঙ্গেও আমার কথা ছিল। তােমার হাতে যদি বিশেষ কোনাে কাজ থাকে তা হলে আমি তত ক্ষণ গৌরমােহনবাবুর সঙ্গে আলাপ করব।”

 বলিয়া সুচরিতার কাছ হইতে কোনাে সম্মতির প্রতীক্ষা না করিয়া তিনি সিঁড়ি দিয়া উঠিতে লাগিলেন। সুচরিতা পার্শ্ববর্তী হারানবাবুর প্রতি কোনাে লক্ষ না করিয়া ঘরে প্রবেশ করিয়া গােরাকে কহিল, “মাসি আপনার জন্যে খাবার তৈরি করতে গেছেন, আমি তাকে একবার দেখে আসি।” এই বলিয়া সে দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল এবং হারানবাবু গম্ভীর মুখে একটা চৌকি অধিকার করিয়া বসিলেন।

 হারানবাবু কহিলেন, “কিছু রােগ দেখছি যেন।”

 গােরা কহিল, “আজ্ঞা হাঁ, কিছুদিন রােগা হবার চিকিৎসাই চলছিল।”

 হারানবাবু কণ্ঠস্বর স্নিগ্ধ করিয়া কহিলেন, “তাই তাে, আপনাকে খুব কষ্ট পেতে হয়েছে।”

 গােরা কহিল, “যেরকম আশা করা যায় তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়।”

 হারানবাবু কহিলেন, “বিনয়বাবুর সম্বন্ধে আপনার সঙ্গে কিছু আলােচনা করবার আছে। আপনি বােধ হয় শুনেছেন, আগামী রবিবারে ব্রাহ্মসমাজে দীক্ষা নেবার জন্যে তিনি আয়ােজন করেছেন।”

 গােরা কহিল, “না, আমি শুনি নি।”

 হারানবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার এতে সম্মতি আছে?”

 গােরা কহিল, “বিনয় তাে আমার সম্মতি চায় নি।”

 হারানবাবু কহিলেন, “আপনি কি মনে করেন বিনয়বাবু যথার্থ বিশ্বাসের সঙ্গে এই দীক্ষা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়েছেন?”

 গাের কহিল, “যখন তিনি দীক্ষা নিতে রাজি হয়েছেন তখন আপনার এ প্রশ্ন সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।”

 হারানবাবু কহিলেন, “প্রবৃত্তি যখন প্রবল হয়ে ওঠে তখন আমরা কী বিশ্বাস করি আর কী করি নে তা চিন্তা করে দেখবার অবসর পাই নে। আপনি তো মানবচরিত্র জানেন।”

 গােরা কহিল, “না। মানবচরিত্র নিয়ে আমি অনাবশ্যক আলােচনা করি নে।”

 হারানবাবু কহিলেন, “আপনার সঙ্গে আমার মতের এবং সমাজের মিল নেই, কিন্তু আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি নিশ্চয় জানি, আপনার যা বিশ্বাস, সেটা সত্য হােক আর মিথ্যাই হােক, কোনাে প্রলােভনে তার থেকে আপনাকে টলাতে পারবে না। কিন্তু—”

 গােরা বাধা দিয়া কহিল, “আমার প্রতি আপনার ওই-যে একটুখানি শ্রদ্ধা বাঁচিয়ে রেখেছেন তার এমনি কী মূল্য যে তার থেকে বঞ্চিত হওয়া বিনয়ের পক্ষে ভারী একটা ক্ষতি! সংসারে ভালাে মন্দ বলে জিনিস অবশ্যই আছে, কিন্তু আপনার শ্রদ্ধা ও অশ্রদ্ধার দ্বারা যদি তার মূল্য নিরূপণ করেন তো করুন, তবে কিনা পৃথিবীর লােককে সেটা গ্রহণ করতে বলবেন না।”  হারানবাবু কহিলেন, “আচ্ছা বেশ, ও কথাটার মীমাংসা এখন না হলেও চলবে। কিন্তু আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, বিনয় যে পরেশবাবুর ঘরে বিবাহ করবার চেষ্টা করছেন আপনি কি তাতে বাধা দেবেন না?”

 গােরা লাল হইয়া উঠিয়া কহিল, “হারানবাবু, বিনয়ের সম্বন্ধে এ-সমস্ত আলােচনা কি আমি আপনার সঙ্গে করতে পারি? আপনি সর্বদাই যখন মানবচরিত্র নিয়ে আছেন তখন এটাও আপনার বােঝা উচিত ছিল যে, বিনয় আমার বন্ধু এবং সে আপনার বন্ধু নয়।”

 হারানবাবু কহিলেন, “এই ব্যাপারের সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের যােগ আছে বলেই আমি এ কথা তুলেছি, নইলে—”

 গােরা কহিল, “কিন্তু আমি তাে ব্রাহ্মসমাজের কেউ নই, আমার কাছে আপনার এই দুশ্চিন্তার মূল্য কী আছে।”

 এমন সময় সুচরিতা ঘরে প্রবেশ করিল। হারানবাবু তাহাকে কহিলেন, “সুচরিতা, তােমার সঙ্গে আমার একটু বিশেষ কথা আছে।”

 এটুকু বলিবার যে কোনো আবশ্যক ছিল তাহা নহে। গােরার কাছে সুচরিতার সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করিবার জন্যই হারানবাবু গায়ে পড়িয়া কথাটা বলিলেন। সুচরিতা তাহার কোনাে উত্তরই করিল না; গােরা নিজের আসনে অটল হইয়া বসিয়া রহিল, হারানবাবুকে বিশ্রম্ভালাপের অবকাশ দিবার জন্য সে উঠিবার কোনােপ্রকার লক্ষণ দেখাইল না।

 হারানবাবু কহিলেন, “সুচরিতা, একবার ও ঘরে চলো তো, একটা কথা বলে নিই।”

 সুচরিতা তাহার উত্তর না দিয়া গােরার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার মা ভালো আছেন?”

 গােরা কহিল, “মা ভালো নেই এমন তাে কখনাে দেখি নি।”

 সুচরিতা কহিল, “ভালাে থাকবার শক্তি যে তাঁর পক্ষে কত সহজ তা আমি দেখেছি।”

 গােরা যখন জেলে ছিল তখন আনন্দময়ীকে সুচরিতা দেখিয়াছিল সেই কথা স্মরণ করিল।

 এমন সময় হারানবাবু হঠাৎ টেবিলের উপর হইতে একটা বই তুলিয়া লইলেন, এবং সেটা খুলিয়া প্রথমে লেখকের নাম দেখিয়া লইলেন, তাহার পরে বইখানা যেখানে-সেখানে খুলিয়া চোখ বুলাইতে লাগিলেন।

 সুচরিতা লাল হইয়া উঠিল। বইখানি কী তাহা গােরা জানিত, তাই গােরা মনে মনে একটু হাসিল।

 হারানবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “গৌরমােহনবাবু, আপনার এ বুঝি ছেলেবেলাকার লেখা?”

 গােরা হাসিয়া কহিল, “সে ছেলেবেলা এখনাে চলছে। কোনাে কোনাে প্রাণীর ছেলেবেলা অতি অল্পদিনেই ফুরিয়ে যায়, কারও কারও ছেলেবেলা কিছু দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়।”

 সুচরিতা চৌকি হইতে উঠিয়া কহিল, “গৌরমােহনবাবু, আপনার খাবার এত ক্ষণে তৈরি হয়েছে। আপনি তা হলে ও ঘরে একবার চলুন। মাসি আবার পানুবাবুর কাছে বের হবেন না, তিনি হয়তাে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।”

 এই শেষ কথাটা সুচরিতা হারানবাবুকে বিশেষ করিয়া আঘাত করিবার জন্যই বলিল। সে আজ অনেক সহিয়াছে, কিছু ফিরাইয়া না দিয়া থাকিতে পারিল না।

 গােরা উঠিল। অপরাজিত হারানবাবু কহিলেন, “আমি তবে অপেক্ষা করি?”

 সুচরিতা কহিল, “কেন মিথ্যা অপেক্ষা করবেন, আজ আর সময় হয়ে উঠবে না।”

 কিন্তু হারানবাবু উঠিলেন না। সুচরিতা ও গােরা ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

 গােরাকে এ বাড়িতে দেখিয়া ও তাহার প্রতি সুচরিতার ব্যবহার লক্ষ করিয়া হারানবাবুর মন সশস্ত্র জাগিয়া উঠিল। ব্রাহ্মসমাজ হইতে সুচরিতা কি এমনি করিয়া স্খলিত হইয়া যাইবে! তাহাকে রক্ষা করিবার কেহই নাই! যেমন করিয়া হােক ইহার প্রতিরােধ করিতেই হইবে।

 হারানবাবু একখানা কাগজ টানিয়া লইয়া সুচরিতাকে পত্র লিখিতে বসিলেন। হারানবাবুর কতকগুলি বাঁধা বিশ্বাস ছিল। তাহার মধ্যে এও একটি যে, সত্যের দোহাই দিয়া যখন তিনি ভর্ৎসনা প্রয়ােগ করেন তখন তাঁহার তেজস্বী বাক্য নিষ্ফল হইতে পারে না। শুধু বাক্যই একমাত্র জিনিস নহে, মানুষের মন বলিয়া একটা পদার্থ আছে সে কথা তিনি চিন্তাই করেন না।

 আহারান্তে হরিমােহিনীর সঙ্গে অনেক ক্ষণ আলাপ করিয়া গােরা তাহার লাঠি লইবার জন্য যখন সুচরিতার ঘরে আসিল তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। সুচরিতার ডেস্কের উপরে বাতি জ্বলিতেছে। হারানবাবু চলিয়া গেছেন। সুচরিতার নাম-লেখা একখানি চিঠি টেবিলের উপর শয়ান রহিয়াছে, সেখানি ঘরে প্রবেশ করিলে চোখে পড়ে।

 সেই চিঠি দেখিয়াই গােরার বুকের ভিতরটা অত্যন্ত শক্ত হইয়া উঠিল। চিঠি যে হারানবাবুর লেখা তাহাতে সন্দেহ ছিল না। সুচরিতার প্রতি হারানবাবুর যে একটা বিশেষ অধিকার আছে তাহা গােরা জানিত; সেই অধিকারের যে কোনাে ব্যত্যয় ঘটিয়াছে তাহা সে জানিত না। আজ যখন সতীশ সুচরিতার কানে কানে হারানবাবুর আগমনবার্তা জ্ঞাপন করিল এবং সুচরিতা সচকিত হইয়া দ্রুতপদে নীচে চলিয়া গেল ও অল্পকাল পরেই নিজে তাহাকে সঙ্গে করিয়া উপরে লইয়া আসিল তখন গােরার মনে খুব একটা বেসুর বাজিয়াছিল। তাহার পরে হারানবাবুকে যখন ঘরে একলা ফেলিয়া সুচরিতা গােরাকে খাইতে লইয়া গেল তখন সে ব্যবহারটা কড়া ঠেকিয়াছিল বটে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতার স্থলে এরূপ রূঢ় ব্যবহার চলিতে পারে মনে করিয়া গােরা সেটাকে আত্মীয়তার লক্ষণ বলিয়াই স্থির করিয়াছিল। তাহার পরে টেবিলের উপর এই চিঠিখানা দেখিয়া গােরা খুব একটা ধাক্কা পাইল। চিঠি বড়াে একটা রহস্যময় পদার্থ। বাহিরে কেবল নামটুকু দেখাইয়া সব কথাই সে ভিতরে রাখিয়া দেয় বলিয়া সে মানুষকে নিতান্ত অকারণে নাকাল করিতে পারে।

 গােরা সুচরিতার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “আমি কাল আসব।”

 সুচরিতা আনতনেত্রে কহিল, “আচ্ছ।”

 গােরা বিদায় লইতে উন্মুখ হইয়া হঠাৎ থামিয়া দাঁড়াইয়া বলিয়া উঠিল, “ভারতবর্ষের সৌরমণ্ডলের মধ্যেই তােমার স্থান- তুমি আমার আপন দেশের কোনাে ধূমকেতু এসে তােমাকে যে তার পুচ্ছ দিয়ে ঝেঁটিয়ে নিয়ে শূন্যের মধ্যে চলে যাবে সে কোনােমতেই হতে পারবে না। যেখানে তােমার প্রতিষ্ঠা সেইখানেই তােমাকে দৃঢ় করে প্রতিষ্ঠিত করব, তবে আমি ছাড়ব। সে জায়গায় তােমার সত্য, তােমার ধর্ম, তােমাকে পরিত্যাগ করবে এই কথা এরা তােমাকে বুঝিয়েছে। আমি তােমাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেব, তােমার সত্য, তােমার ধর্ম, কেবল তােমার কিম্বা আর দু-চার জনের মত বা বাক্য নয়; সে চারি দিকের সঙ্গে অসংখ্য প্রাণের সূত্রে জড়িত, তাকে ইচ্ছা করলেই বন থেকে উপড়ে নিয়ে টবের মধ্যে পোঁতা যায় না- যদি তাকে উজ্জ্বল ক’রে সজীব করে রাখতে চাও, যদি তাকে সর্বাঙ্গীণরূপে সার্থক করে তুলতে চাও, তবে তােমার জন্মের বহু পূর্বে যে লােকসমাজের হৃদয়ের মধ্যে তােমার স্থান নির্দিষ্ট হয়ে গেছে সেইখানে তােমাকে আসন নিতেই হবে- কোনােমতেই বলতে পারবে না, আমি ওর পর, ও আমার কেউ নয়। এ কথা যদি বল তবে তােমার সত্য, তােমার ধর্ম, তােমার শক্তি একেবারে ছায়ার মতাে ম্লান হয়ে যাবে। ভগবান তােমাকে যে জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন সে জায়গা যেমনি হােক, তােমার মত যদি সেখান থেকে তােমাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায়, তবে তাতে করে কখনােই তােমার মতের জয় হবে এই কথাটা আমি তােমাকে নিশ্চয় বুঝিয়ে দেব। আমি কাল আসব।”

 এই বলিয়া গােরা চলিয়া গেল। ঘরের ভিতরকার বাতাস যেন অনেকক্ষণ ধরিয়া কাঁপিতে লাগিল। সুচরিতা মূর্তির মতাে নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।