প্রধান মেনু খুলুন

গ্রহ-নক্ষত্র/নক্ষত্রদের দূরত্ব


নক্ষত্রদের দূরত্ব

এই ত গেল সংখ্যার কথা; পৃথিবী হইতে নক্ষত্রদের দূরত্বের কথা আরো আশ্চর্য্য! পঞ্চাশ কোটি নক্ষত্রদের মধ্যে কেবল পঞ্চাশটি ছাড়া আর কাহারো দূরত্ব জ্যোতিষীরা স্থিরই করিতে পারেন নাই। এই পঞ্চাশটিই আমাদের কাছের নক্ষত্র, বাকি সকলেই এত দূরে আছে যে সে দূরত্ব স্থির করিতে গিয়া আমাদের যন্ত্র-তন্ত্র সকলি হার মানিয়াছে।

 পঞ্চাশটি নক্ষত্র কাছে আছে শুনিয়া হয় ত ভাবিতেছ, পৃথিবী হইতে সূর্য্য বা নেপ্‌চুন যত দূরে আছে, উহারা বুঝি তাহারি হাজার বা লক্ষ গুণ দূরে আছে। কিন্তু তাহা নয়। যে নক্ষত্রটি সব চেয়ে আমাদের কাছে, তাহারি দূরত্বের কথা শুনিলে তোমরা অবাক্ হইয়া যাইবে।

 একটা জিনিস আর একটা জিনিস হইতে কতদূরে আছে ঠিক্ করিবার জন্য অনেক রকম মাপ-কাঠি আছে,—কেহ ইঞ্চি, ফুট, গজ দিয়া মাপে; কেহ হাত দিয়া মাপে। দূরত্ব বেশি হইলে, ছোট মাপ-কাটিতে কুলায় না। তখন মাইল বা ক্রোশ দিয়া মাপিতে হয়। কিন্তু নক্ষত্রেরা যে রকম দূরে আছে, তাহার হিসাব করিতে গেলে মাইলেও কুলায় না। এই সব দেখিয়া শুনিয়া জ্যোতিষীরা এক মজার মাপ-কাঠি প্রস্তুত করিয়াছেন।

 যেমন রেলের গাড়ী বা বন্দুকের গুলি এক জায়গা হইতে আর এক জায়গায় যাইতে সময় লয়, তেমনি আলো এক জায়গা হইতে আর এক জায়গায় পৌঁছিতে কিছু সময় কাটাইয়া দেয়। তোমরা বোধ হয় কথাটা বুঝিতে পারিলে ন৷। মনে কর, তুমি ঘরের এককোণে একটা আলো জ্বালাইলে, সেই আলোতে হঠাৎ সব ঘরই আলোকিত হইয়া গেল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতেরা বলেন, ঘরের এক কোণে আলো জ্বালাইবা মাত্র সেই আলো আর এক কোণে তখনি পৌঁছায় না। এক জায়গা হইতে আর এক জায়গায় আলো যাইতে একটু সময় লয়। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে, আলো এক সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশী হাজার মাইল বেগে ছুটিয়া চলে; এই বেগ কত ভয়ানক ভাবিয়া দেখ,—আলো এই বেগে চলিয়া এক সেকেণ্ডে পৃথিবীকে আট বার ঘুরিয়া আসিতে পারে। কিন্তু আমাদের ঘরগুলি দশ হাত বিশ হাত না হয় ত্রিশ হাত লম্বা। কাজেই ঘরের এক কোণ হইতে আর কোণে পৌঁছিতে যে, আলো সময় লয় তাহা আমরা বুঝিতেই পারি না।

 সূর্য্য কত দূরে আছে তাহা তোমরা জান; বৈজ্ঞানিকেরা হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশী হাজার মাইল করিয়া। চলিয়া সূর্য্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছিতে প্রায় আট মিনিট সময় লয়। তাহা হইলে বুঝিতে পারিতেছ, যদি এখনি সূর্য্য-লোকে একটা বড় রকমের অগ্নিকাণ্ড হয়, তাহা আমরা এখনি দেখিতে পাই না; আট মিনিটে উহার আলো পৃথিবীতে আসিয়া পড়িলে তবে তাহার খবর জানিতে পারি। পৃথিবী হইতে সূর্য্য যত দূরে আছে, নক্ষত্রেরা তাহারই কোটি কোটি গুণ দূরে রহিয়াছে। তাহা হইলে ভাবিয়া দেখ, তাহাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছিতে কত সময় লয়।

 এই রকমে দেখা গিয়াছে, যে নক্ষত্রটি সব চেয়ে আমাদের কাছে, তাহার আলো পৃথিবীতে পড়িতে তিন বৎসরের বেশি সময় লয়। আর যাহারা খুব দূরের নক্ষত্র, তাহাদের আলো আসিতে দুই শত, পাঁচ শত, এমন কি হাজার দু’হাজার বৎসরও লাগে। কি ভয়ানক দূরত্ব! দূরের নক্ষত্রে আজ যে আলো জ্বলিল, তাহা এক হাজার বা দু’হাজার বৎসর পরে পৃথিবীতে আসিয়া পৌঁছিবে,—ইহা কি আশ্চর্য্যের কথা নয়? এই দূরত্বকে কি কেহ কখনো মাইল বা ক্রোশে হিসাব করিয়া বইতে লিখিতে পারে? লিখিতে গেলে বইয়ের একখানা পাতাই বোধ হয় অঙ্কে অঙ্কে ভরিয়া যায়। এই জন্যই জ্যোতিষীরা নক্ষত্রদের দূরত্ব মাইলে বা ক্রোশে হিসাব না করিয়া, তাহাদের আলো কত বৎসরে পৃথিবীতে আসিয়া পৌঁছায় বইতে কেবল তাহাই লেখেন।

 যে নক্ষত্রটি সব চেয়ে আমাদের কাছে, তাহার আলো পৃথিবীতে আসিতে কত সময় লয় তাহা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। তা ছাড়া যাহাদের দূরত্ব জানা আছে, তাহাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছিতে ত্রিশ, চল্লিশ বৎসর পর্য্যন্ত সময় লয় জানা গিয়াছে। ধ্রুব নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসিতে পথের মাঝে সাড়ে ছয়চল্লিশ বৎসর কাটাইয়া দেয়।