গ্রহ-নক্ষত্র/সূর্য্যের ছটা-মণ্ডল


সূর্য্যের ছটা-মণ্ডল

সূর্য্যের শেষ আবরণ ছটা-মণ্ডলের কথা এখনো বলা হয় নাই। এখানে পূর্ণ গ্রহণের সময়ে সূর্য্যের ছটা-মণ্ডল তাহার একটা ছবি দিলাম। এই ছবিটা একটি সূর্য্য-গ্রহণের সময়ে তোলা হইয়াছিল। সূর্য্যের আলোকের উৎপাতে পূর্ণ সূর্য্য-গ্রহণ ছাড়া আর কোনো সময়ে ইহা দেখা যায় না, সূর্য্যের আলোক ইহাদিগকে সকল সময়ে ডুবাইয়া রাখে। যেই চাঁদ ধীরে ধীরে আসিয়া সমস্ত সূর্য্যকে ঢাকিয়া কালো করিয়া দেয়, অমনি সূর্য্যের আকাশের এই ছটা-মণ্ডল দেখা যায়।[১]

 ছবি দেখিলে বুঝিবে যে, ইহা ছটার মতই সূর্য্য হইতে বাহির হইয়াছে, এইজন্যই জ্যোতিষীরা সূর্য্যের আকাশের এই অংশকে ছটা-মণ্ডল (Corona) বলেন। কিন্তু ইহার গভীরতা বর্ণ-মণ্ডলের মত দশ হাজার কি বিশ হাজার মাইল নয়। সূর্য্যের বাহিরে লক্ষ লক্ষ মাইল জুড়িয়া ইহার স্থান। ১৮৭৮ সালে একটা গ্রহণে সূর্য্য হইতে এক কোটি মাইল দূরে ছটা-মণ্ডল দেখা গিয়াছিল। মাঝে চাঁদে-ঢাকা কালো সূর্য্য, তার পরে সেই রঙিন্ বর্ণ-মণ্ডল এবং শেষে এই ছটামণ্ডল সূর্য্য গ্রহণের সময়ে একটা দেখিবার জিনিস। যাঁহারা দেখিয়াছেন, তাঁহারা মোহিত হইয়াছেন এবং ইহার বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন। আমরা দেখি নাই, কাজেই ছবি দেখিয়া ও বিবরণ শুনিয়া এখন আমাদিগকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে।

 কি কি জিনিস জ্বলিয়া সূর্য্যের ছটামণ্ডল জন্মিয়াছে, তাহা জানা গিয়াছে। জ্যোতির্ব্বিৎ পণ্ডিতগণ সূর্য্য-গ্রহণের সেই দুই চারি মিনিট সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করিয়া তাহা স্থির করিয়াছেন। আমাদের জানা-শুনা জিনিসের মধ্যে তাঁহারা উহাতে হাইড্রোজেনের বাষ্পই জ্বলিতে দেখিয়াছেন। ইহা ছাড়া আরো যে অনেক বাষ্প জ্বলে, জ্যোতিষীরা তাহা জানিতে পারিয়াছেন। কিন্তু সে-সব বাষ্প আমাদের পৃথিবীতে নাই, কাজেই তাঁহারা তাহাদের নামও বলিতে পারেন নাই। দেখ, আমাদের সূর্য্যটি কি জিনিস!

 এখন বোধ হয়, তোমরা বুঝিতে পারিতেছ, বড় বড় জ্যোতিষীরা

গ্রহ-নক্ষত্র 073.jpg
পূর্ণ সূর্য্য-গ্রহণ।
সূর্য্য ও পৃথিবীর মধ্যে চাঁদ দাঁড়াইয়া সূর্য্যকে কালো করিয়া দিয়াছে।

এত খরচ-পত্র করিয়া এবং এত কষ্ট স্বীকার করিয়া কেন দূর দেশে পূর্ণ সূর্য্য-গ্রহণ দেখিতে আসেন। এমন ঘটনাও ঘটিয়াছে, মাঝ সমুদ্রে বা বরফ-ঢাকা মেরুদেশে না গেলে সূর্য্য-গ্রহণ দেখা যাইবে না। জ্যোতিষীরা জাহাজে করিয়া সেই সব দুর্গম স্থানে গিয়া জাহাজ নোঙর করিয়া সূর্য্য-গ্রহণ দেখিয়াছেন। ১৮৬৮ সালে ভারতবর্ষে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্য্য-গ্রহণ হইয়াছিল। তখন ইউরোপ হইতে ভারতবর্ষে আসার এখনকার মত সুবিধা ছিল না। জ্যোতিষীরা এই অসুবিধা গ্রাহ্য করেন নাই। দলে দলে অনেক জ্যোতিষী ইউরোপ ও আমেরিকা হইতে ভারতবর্ষে আসিয়াছিলেন। সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী-জ্যোতিষী জান্‌সেন্ সাহেব এই দলে ছিলেন। তিনি গ্রহণের সময়ে সূর্য্যের অনেক ছবি উঠাইয়া লইয়াছিলেন। সেগুলি হইতে সূর্য্যের আকাশ-সম্বন্ধে অনেক নূতন খবর আমরা জানিতে পারিয়াছি। কিন্তু এখনো অনেক খবর জানিতে বাকি আছে, তাই পূর্ণ সূর্য্য-গ্রহণ হইলে জ্যোতিষীরা আর ঘরে বসিয়া থাকিতে পারেন না।

 ফরাসী জ্যোতিষী জান্‌সেনের নাম করায় তাঁহার সম্বন্ধে একটা গল্পের কথা মনে পড়িয়া গেল। ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে ফরাসীদের সহিত জর্ম্মান্‌দের একটা ভয়ানক লড়াই হইয়াছিল। দুই পক্ষই বলশালী, অনেক ছোটখাটো যুদ্ধের পর জর্ম্মান্-সৈন্য আসিয়া ফ্রান্সের রাজধানী পারিস্ সহরকে ঘেরিয়া ফেলিল। নগরের চারিদিকেই জর্ম্মান্-সৈন্যের কড়া পাহারা বসিল, একটি লোকও যে নগর হইতে বাহির হইয়া আসিবে, তাহার উপায় রহিল না। বাহিরের লোক যে, সহরের লোকদের নিকটে গিয়া খাবার-দাবার দিয়া আসিবে, তাহারো পথ বন্ধ। তথন জান্‌সেন্ সাহেব দুর্ভাগ্যক্রমে পারিসে ছিলেন, কাজেই তাঁহাকেও অবরুদ্ধ হইয়া থাকিতে হইল।

 যাহা হউক, এই সময়ে একটা বড় রকমের সূর্য্য-গ্রহণ হইবার কথা ছিল। এই গ্রহণটি দেখিয়া সূর্য্যসম্বন্ধে অনেক বিষয় জানিয়া লইবেন বলিয়া জান্‌সেন্ সাহেব বহুদিন ধরিয়া প্রস্তুত হইতেছিলেন। ক্রমে গ্রহণের দিন কাছে আসিতে লাগিল, কিন্তু জর্ম্মান্‌দের পাহারার হাত হইতে মুক্তি পাইয়া তিনি যে, নির্দ্দিষ্ট স্থানে গিয়া সূর্য্য-গ্রহণ দেখিবেন, তাহার আশা রহিল না। জান্‌সেন্ খুব দুঃখিত হইলেন এবং পারিসের বাহিরে যাইবার জন্য খাঁচার পাখীর মত ছট্-ফট্ করিতে লাগিলেন। গ্রহণের পূর্ব্বদিন রাত্রিতে তিনি এমন অধীর হইয়া পড়িলেন যে, একটু সময়েরও জন্য পারিসে থাকিতে তাঁহার ইচ্ছা রহিল না। তিনি স্থির করিলেন, শত্রুদের মাঝ দিয়াই চলিয়া যাইবেন, তাহাদের গোলা-গুলিতে যদি প্রাণত্যাগ হয়, তাহাও ভাল।

 এই সময়ে জান্‌সেন্ সাহেবের হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল যে, তাঁহার একটি ভাঙা ব্যোমযান আছে। সেই অন্ধকার রাত্রিতে তিনি ঐ ব্যোমযানে উঠিলেন এবং পারিসের বাহিরে নিরাপদ স্থানে আসিয়া পৌঁছিলেন। জর্ম্মানেরা যদি জান্‌সেনের এই পলায়নের সংবাদ একটু জানিতে পারিত, তাহা হইলে একটি-মাত্র গোলার আঘাতেই তাঁহার মৃত্যু হইত। জ্ঞানলাভের জন্য জান্‌সেনের মনে যে ব্যাকুলতা আসিয়াছিল, মৃত্যুর আশঙ্কাও তাহাকে দমন করিতে পারে নাই।

 

 

  1. গ্রহণের সময় ছাড়া অপর সময়ে সূর্য্যের বর্ণ-মণ্ডল পরীক্ষা করিবার এক উপায় আজকালকার জ্যোতিষীরা বাহির করিয়াছেন, কিন্তু ছটামণ্ডলকে পূর্ণ সূর্য্য-গ্রহণ ছাড়া আর কখনই চক্ষে দেখা যায় না।