প্রধান মেনু খুলুন


Gle চোখের বালি “তবে তুমি কাশী যাইতে চাহিতেছ কেন।” আশা কহিল, “আমি কাশী যাইতে চাই না, আমি কোথাও যাইব না।” মহেন্দ্র তখন তো চাহিয়াছিলে। আশা অত্যন্ত পীড়িত হইয়া কহিল, “তুমি তো জান, কেন চাহিয়াছিলাম।” মহেন্দ্র । আমাকে ছাড়িয়া তোমার মাসির কাছে বোধ হয় বেশ মুখে থাকিতে ? আশা কহিল, “কখনো না । আমি সুখের জন্য যাইতে চাহি নাই ।” মহেন্দ্র কহিল, “আমি সত্য বলিতেছি চুনি, তুমি আর-কাহাকেও বিবাহ করিলে ঢের বেশি মুখী হইতে পারিতে ।” শুনিয়া আশা চকিতের মধ্যে মহেন্দ্রের বক্ষ হইতে সরিয়া গিয়া বালিশে মুখ ঢাকিয়া, কাঠের মতো আড়ষ্ট হইয়া রহিল— মুহূর্তপরেই তাহার কান্না আর চাপ রহিল না । মহেন্দ্র তাহাকে সাস্তুনা দিবার জন্য বক্ষে তুলিয়া লইবার চেষ্টা করিল, আশা বালিশ ছাড়িল না। পতিব্ৰতার এই অভিমানে মহেন্দ্র মুখে গর্বে ধিক্কারে ক্ষুব্ধ হইতে লাগিল । যেসব কথা ভিতরে ভিতরে আভাসে ছিল, সেইগুলো হঠাৎ স্পষ্ট কথায় পরিস্ফুট হইয়। সকলেরই মনে একটা গোলমাল বাধাইয়া দিল । বিনোদিনী মনে মনে ভাবিতে লাগিল, অমন স্পষ্ট অভিযোগের বিরুদ্ধে বিহার কেন কোনো প্রতিবাদ করিল না । যদি সে মিথ্যা প্রতিবাদও করিত, তাহা হইলেও যেন বিনোদিনী একটু খুশি হইত। বেশ হইয়াছে, মহেন্দ্র বিহারীকে যে আঘাত করিয়াছে, তাহা তাহার প্রাপ্যই ছিল । বিহারীর মতো অমন মহৎ লোক কেন আশাকে ভালোবাসিবে। এই আঘাতে বিহারীকে যে দূরে লইয়া গেছে, সে যেন ভালোই হইয়াছে – বিনোদিনী যেন নিশ্চিন্ত হইল । কিন্তু বিহারীর সেই মৃত্যুবাণাহত রক্তহীন পাংশু মুখ বিনোদিনীকে সকল কর্মের মধ্যে যেন অমুসরণ করিয়া ফিরিল । বিনোদিনীর অস্তরে যে সেবাপরায়ণা নারীপ্রকৃতি ছিল, সে সেই আর্ত মুখ দেখিয়া কাদিতে লাগিল। রুগণ শিশুকে যেমন মাতা বুকের কাছে দোলাইয়া বেড়ায়, তেমনি সেই আতুর মূর্তিকে বিনোদিনী আপন হৃদয়ের মধ্যে রাখিয়া দোলাইতে লাগিল ; তাহাকে সুস্থ করিয়া সেই মুখে আবার রক্তের রেখা, প্রাণের প্রবাহ, হাস্তের বিকাশ দেখিবার জন্য বিনোদিনীর একটা অধীর ঔৎস্থক্য জন্মিল । 唱 চোখের বালি > * দুই-তিনদিন সকল কর্মের মধ্যে এইরূপ উন্মনা হইয়া ফিরিয়া বিনোদিনী আর থাকিতে পারিল না। বিনোদিনী একখানি সানার পত্র লিখিল, কহিল— ঠাকুরপো, আমি তোমার লেনিকার সেই গুৰু মুখ দেখিয়া অবধি প্রাণমনে কামনা করিতেছি, তুমি স্থস্থ হও, তুমি যেমন ছিলে তেমনিটি হও— সেই সহজ হাসি আবার কবে দেখিব, সেই উদায় কৰ। আবার কৰে শুনিব । তুমি কেমন আছ, আমাকে একটি ছত্র লিখিয়া জানাও । তোমার বিনোদ-বোঠান বিনোদিনী দরোয়ানের হাত দিয়া বিহারীর ঠিকানায় চিঠি পাঠাইয়া দিল । আশাকে বিহারী ভালোবাসে, এ কথা যে এমন রূঢ় করিয়া এমন গর্হিতভাবে মহেন্দ্র মুখে উচ্চারণ করিতে পারিবে, তাহ বিহারী স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই । কারণ, সে নিজেও এমন কথা স্পষ্ট করিয়া কখনো মনে স্থান দেয় নাই। প্রথমটা জাহত হইল— তার পরে ক্রোধে ঘৃণায় ছটফট করিয়া বলিতে লাগিল, 'অন্যায়! अनष्णङ ! अंभूलक !' কিন্তু কথাটা যখন একবার উচ্চারিত হইয়াছে, তখন তাহাকে আর সম্পূর্ণ মারিয়া ফেলা যায় না। তাহার মধ্যে যেটুকু সত্যের বীজ ছিল, তাহ দেখিতে দেখিতে অঙ্কুরিত হইয়া উঠিতে লাগিল । কস্তা দেখিবার উপলক্ষে সেই যে একদিন স্বর্যান্তকালে বাগানের উচ্ছসিত পুষ্পগন্ধপ্রবাহে লজ্জিত বালিকার হুকুমার মুখখানিকে সে নিতান্তই আপনার মনে করিয়া বিগলিত অম্বুরাগের সহিত একবার চাহিয়া দেখিয়াছিল, তাহাই বার বার মনে পড়িতে লাগিল, এবং বুকের কাছে কী যেন চাপিয়া ধরিতে লাগিল, এবং একটা অত্যন্ত কঠিন বেদনা কণ্ঠের কাছ পর্যন্ত আলোড়িত হইয়া উঠিল। দীর্ঘরাত্রি ছাদের উপর গুইয়া শুইয়া, বাড়ির সম্মুখের পথে দ্রুতপদে পায়চারি করিতে করিতে, যাহা এতদিন অব্যক্ত ছিল তাহা বিহারীর মনে ব্যক্ত হইয়া উঠিল। যাহা সংযত ছিল তাহা উদাম হইল ; নিজের কাছেও যাহার কোনো প্রমাণ ছিল না, মহেঞ্জের বাক্যে তাহা বিরাট প্রোণ পাইয়া বিহারীর অঙ্কর-বাহির ব্যাপ্ত করিয়া দিল । তখন সে নিজেকে অপরাধী বলিয়া বুঝিল । মনে মনে কছিল, ‘আমার তো আর স্বাগ করা শোভা পায় না, মহেঞ্জের কাছে তে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বিদায় BBB DDS BDD BBBB DBD DBBDDDBBS DD BBB BBS चांषि बेिष्ांद्मक- cश् चथ्रiश्च श्रौड्iद्म विद्मः चणिब ।।' চোখের বালি , • "שכ: বিহারী জানিত, আশা কাশী চলিয়া গেছে। একদিন সে সন্ধ্যার সময় ধীরে ধীরে মহেঞ্জের স্বারের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজলক্ষ্মীর দূৱ-সম্পর্কের মামা খুচরণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সাধা, ক’দিন আসিতে পারি নাই— এখানকার সব খবর ভালো ?” সাধুচরণ সকলেৱ কুশল জানাইল। বিহারী জিজ্ঞাসা করিল, “বোঠান কাশীতে কবে গেলেন ।” সাধুচরণ কহিল, “তিনি যান নাই। তাহার কাশী যাওয়া হইবে না।” শুনিয়া, কিছু না মানিয়া অন্তঃপুরে যাইবার জন্ত বিহারীর মন ছুটিল। পূর্বে যেমন সহজে, যেমন আনন্দে, আত্মীয়ের মতো সে পরিচিত সিড়ি বাহিয়া ভিতরে যাইত, সকলের সঙ্গে স্নিগ্ধ কৌতুকের সহিত হাস্তালাপ করিয়া আসিত, কিছুই মনে হইত না, আজ তাহা অবিহিত, তাহা দুর্লভ, জানিয়াই তাহার চিত্ত যেন উন্মত্ত হুইল। আর-একটিবার, কেবল শেষবার, তেমনি করিয়া ভিতরে গিয়া ঘরের ছেলের মতে রাজলক্ষ্মীর সহিত কথা সারিয়া, একবার ঘোমটাৰ্বত আশাকে ‘বোঠান বলিয়া দুটো তুচ্ছ কথা কহিয়া আসা তাহার কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয় হইয়া উঠিল । সাধুচরণ কহিল, “ভাই, অন্ধকারে দাড়াইয়া রহিলে যে, ভিতরে চলো।” শুনিয়া বিহারী দ্রুতবেগে ভিতরের দিকে কয়েক পদ অগ্রসর হইয়াই ফিরিয়া সাধুকে কহিল, “যাই, একটা কাজ আছে।” বলিয়া তাড়াতাড়ি প্রস্থান করিল। সেই রাত্রেই বিহারী পশ্চিমে চলিয়া গেল । জরোয়ান বিনোদিনীর চিঠি লইয়া বিহারীকে না পাইয়া চিঠি ফিরাইয়া লইয়া আসিল । মহেক্স তখন দেউড়ির সম্মুখে ছোটো বাগানটিতে বেড়াইতেছিল । জিজ্ঞাসা করিল, “এ কাহার চিঠি ।” দরোয়ান সমস্ত বলিল। মহেন্দ্র চিঠিখানি নিজে লইল । একবার সে ভাবিল, চিঠিখান লইয়া বিনোদিনীর হাতে দিবে— অপরাধিনী বিনোদিনীয় লজ্জিত মুখ একবার সে দেখিয়া আসিবে, কোনো কথা বলিবে না। এই চিঠির মধ্যে বিনোদিনীর লঙ্কার কারণ যে আছেই, মহেঞ্জের মনে তাহাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। মনে পড়িল, পূর্বে জার-একদিন বিহারীর নামে এমনি একখানা চিঠি গিয়াছিল। চিঠিতে কী লেখা আছে, এ কথা না জানিয়া মহেন্দ্র চোখের বালি @@ কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। সে মনকে বুঝাইল— বিনোদিনী তাহার অভিভাবকতায় আছে, বিনোদিনীর ভালোমন্দর জন্য সে দায়ী । অতএব এরূপ সন্দেহজনক পত্র খুলিয়া দেখাই তাহার কর্তব্য। বিনোদিনীকে বিপথে যাইতে দেওয়া কোনোমতেই হইতে পারে না । মহেন্দ্র ছোটো চিঠিখান খুলিয়া পড়িল । তাহ সরল ভাষায় লেখা, সেইজস্ত অকৃত্রিম উজবেগ তাহার মধ্য হইতে পরিষ্কার প্রকাশ পাইয়াছে। চিঠিখানা পুন:পুন: পাঠ করিয়া এবং অনেক চিন্তা করিয়া মহেন্দ্ৰ ভাবিয়া উঠিতে পারিল না, বিনোদিনীর মনের গতি কোন দিকে । তাহার কেবলই আশঙ্কা হইতে লাগিল, ‘আমি যে তাহাকে ভালোবাসি না বলিয়া অপমান করিয়াছি, সেই অভিমানেই বিনোদিনী অন্য দিকে মন দিবার চেষ্টা করিতেছে । রাগ করিয়া আমার আশা সে একেবারেই ছাড়িয়া দিয়াছে।’ এই কথা মনে করিয়া মহেন্দ্রের ধৈর্যরক্ষা করা একেবারে অসম্ভব হইয়া উঠিল । যে বিনোদিনী তাহার নিকট আত্মসমর্পণ করিতে আসিয়াছিল, সে যে মুহূর্তকালের মৃঢ়তায় সম্পূর্ণ তাহার অধিকারচু্যত হইয়া যাইবে, সেই সম্ভাবনায় মহেন্দ্রকে স্থির থাকিতে দিল না । মহেন্দ্র ভাবিল, “বিনোদিনী আমাকে যদি মনে মনে ভালোবাসে, তাহা বিনোদিনীর পক্ষে মঙ্গলকর— এক জায়গায় সে বদ্ধ হইয়া থাকিবে । আমি নিজের মন জানি, আমি তো তাহার প্রতি কখনোই অন্যায় করিব না । সে আমাকে নিরাপদে ভালোবাসিতে পারে । আমি আশাকে ভালোবাসি, আমার দ্বারা তাহার কোনো ভয় নাই। কিন্তু সে যদি অন্য কোনো দিকে মন দেয়, তবে তাহার কী সর্বনাশ হইতে পারে কে জানে । মহেন্দ্র স্থির করিল, নিজেকে ধরা না দিয়া বিনোদিনীর মন কোনো অবকাশে আর-একবার ফিরাইতেই হইবে । মহেন্দ্র অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতেই দেখিল, বিনোদিনী পথের মধ্যেই যেন কাহার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া প্রতীক্ষা করিতেছে । অমনি মহেন্দ্রের মনে চকিতের মধ্যে বিদ্বেষ জলিয়া উঠিল । কহিল, ওগো, মিথ্যা দাড়াইয়া আছ, দেখা পাইবে না । এই তোমার চিঠি ফিরিয়া আসিয়াছে।” বলিয়া চিঠিখানা ফেলিয়া দিল । বিনোদিনী কহিল, “খোলা যে ?” মহেন্দ্র তাহার জবাব না দিয়াই চলিয়া গেল। বিহারী চিঠি খুলিয়া পড়িয়৷ কোনো উত্তর না দিয়া চিঠি ফেরত পাঠাইয়াছে, মনে করিয়া বিনোদিনীর সর্বাঙ্গের , е е | r চোখের বালি শিরা জব, দব, করিতে লাগিল । যে দরোয়ান চিঠি লইয়া গিয়াছিল, তাহাকে ভাকিয়া পাঠাইল; সে অন্ত কাজে অনুপস্থিত ছিল, তাহাকে পাওয়া গেল না । প্রদীপের মুখ হইতে যেমন জলন্ত তৈলবিন্দু ক্ষরিয়া পড়ে, রুদ্ধ শয়নকক্ষের মধ্যে বিনোদিনীর দীপ্ত নেত্ৰ হইতে তেমনি হৃদয়ের জালা আশ্রজলে গলিয়া পড়িতে লাগিল । নিজের চিঠিখান ছিড়িয়া ছিড়িয়া কুটি-ফুটি করিয়া কিছুতেই তাহার সান হইল না— সেই তুষ্ট-চারি লাইন কালির দাগকে অতীত হইতে, বর্তমান হইতে, একেবারেই মূছিয়া ফেলিবার, একেবারেই ‘না করিয়া দিবার কোনো উপায় নাই কেন । ক্রুদ্ধ মধুকরী যাহাকে সম্মুখে পায় তাহাকেই দংশন করে, ক্ষুদ্ধ বিনোদিনী তেমনি তাহার চারি দিকের সমস্ত সংসারটাকে জালাইবার জন্ত প্রভত হইল। সে যাহা চায় তাহাতেই বাধা ? কোনো-কিছুতেই কি সে কৃতকার্য হইতে পারিবে না। মুখ যদি না পাইল, তবে যাহারা তাহার সকল মুখের অন্তরায়, যাহারা তাহাকে কৃতাৰ্থত হইতে ভ্ৰষ্ট, সমস্ত সম্ভবপর সম্পদ হইতে বঞ্চিত করিয়াছে, তাহাদিগকে পরাস্ত খুলিলুষ্ঠিত করিলেই তাহার ব্যর্থ জীবনের কর্ম সমাধা হইবে । ૨ (? সেদিন নূতন ফাঙ্কনে প্রথমে বলম্ভের হাওয়া দিতেই আশা অনেক দিন পরে সন্ধ্যার আরতে ছাদে মাদুর পাতিয়া বসিয়াছে । একখানি মাসিক-কাগজ লইয়া থওশ প্রকাশিত একটা গল্প খুব মনোযোগ দিয়া সেই অল্প আলোকে পড়িতেছিল। গল্পের নায়ক তখন সংবৎসর পরে পূজার ছুটিতে বাড়ি আসিবার সময় ডাকাতের হাতে পড়িয়াছে, আশার হৃদয় উজবেগে কাপিডেছিল ; এ দিকে হতভাগিনী নায়িকা ঠিক সেই সময়েই বিপদের স্বপ্ন দেখিয়া কাদিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। আশা চোখের জন্ম- আর রাখিতে পারে না । আশা বাংলা গল্পের অত্যন্ত উদার সমালোচক ছিল যাহা পড়িত, তাহাই মনে হইত চমৎকার। বিনোদিনীকে ডাকিয়া বলিত, “ভাই চোখের বালি, মাথা খাও, এ গল্পটি পড়িয়া দেখো। এমন সুন্দর । পড়িয়া আর কাদিয়া বাচি না ।” বিনোদিনী ভালোমন্দ বিচার করিয়া আশার উচ্ছ্বসিত উৎসাহে বড়ো অfঘাত করিত । আজিকার এই গল্পটা আশা মহেন্দ্রকে পড়াইবে ৰলিয়া স্থির করিয়। যখন সজলচক্ষে কাগজখানা বদ্ধ করিল, এমন সময়ে মহেন্দ্র জাসিয়া উপস্থিত ছইল ।