পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/৬২

◄  ৬১
৬৩  ►
৬২

শরৎচন্দ্র বসুকে লিখিত

অক্‌সফোর্ড
৬।৪।২১

 ....বাবার ধারণা আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন সিভিল সার্ভিস চাকুরিয়ার পক্ষে নূতন শাসন ব্যবস্থায় জীবন মোটেই দুর্বিষহ হইবে না। দশ বৎসরের মধ্যে এদেশে স্বায়ত্তশাসন অনিবার্য্য। কিন্তু আমার জীবন নূতন শাসন ব্যবস্থায় সহনীয় হইবে কিনা ইহা আমার প্রশ্ন নহে। পরন্তু আমার ধারণা যে চাকুরিতে বহাল থাকিয়াও আমি দেশের কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারি। আমার প্রধান প্রশ্ন নীতিগত। বর্ত্তমান অবস্থায় কি আমাদের এক বিদেশী আমলাতন্ত্রের বশ্যতা স্বীকার করিয়া এক কাঁড়ি টাকার জন্য আত্মবিক্রয় করা সমীচীন? যাহারা ইতিমধ্যেই চাকুরিতে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে বা চাকুরি গ্রহণ করা ভিন্ন যাহাদের গত্যন্তর নাই তাহাদের কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু আমার অবস্থা অনেক দিক দিয়া সুবিধাজনক থাকিতে আমার কি এত শীঘ্র বশ্যতা স্বীকার করা উচিত? যেদিন আমি চাকুরির প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করিব সেদিন হইতে আমি আর স্বাধীন মানুষ থাকিব না ইহাই আমার বিশ্বাস।

 যদি আমরা উপযুক্ত মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকি তবে দশ বৎসরে কেন তাহার পূর্ব্বেই স্বায়ত্তশাসন আমরা অর্জ্জন করিতে পারি। সেই মূল্য আত্মত্যাগ এবং ক্লেশ স্বীকার। কেবল এই আত্মত্যাগ এবং দুঃখ বরণের ভিত্তিতেই জাতীয় সৌধ প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে। যদি আমরা সকলে নিজের নিজের চাকুরির খুঁটি আঁকড়াইয়া বসিয়া থাকি, নিজের স্বার্থের অন্বেষণেই প্রবৃত্ত থাকি, তবে পঞ্চাশ বৎসরেও আমাদের স্বায়ত্তশাসন মিলিবে না। প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব যদি না হয়, অন্ততঃ প্রত্যেক পরিবারকে আজ দেশমাতার চরণে অর্ঘ্য আনিয়া দিতে হইবে। বাবা আমাকে এই আত্মত্যাগ হইতে রক্ষা করিতে চাহেন। আমাকে আমারই স্বার্থে এই দুঃখকষ্ট হইতে বাচাইবার জন্য তাঁহার ইচ্ছার মধ্যে যে স্নেহ উদ্বেল হইয়া উঠিয়াছে তাহার মূল্য বুঝিব না এমন হৃদয়হীন আমি নহি। তাঁহার স্বভাবতই আশঙ্কা হয় বুঝিবা আমি তরুণ-সুলভ উত্তেজনার ঝোঁকের মাথায় কিছু একটা করিয়া বসিব। কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস এই ত্যাগ কাহাকে না কাহাকেও করিতেই হইবে।

 যদি অন্য কেহ অগ্রসর হইত, তবে আমার পিছপা হইবার, অন্ততঃ আরও খানিকটা ভাবিয়া দেখিবার কারণ বুঝিতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে লক্ষণ মােটেই দেখা যাইতেছে না, অথচ অমূল্য সময় বহিয়া যাইতেছে। সমস্ত আলােড়ন সত্ত্বেও এটকু ঠিক যে এখন পর্য্যন্ত একজন সিভিলিয়ানও চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া আন্দোলনে নামিতে সাহস করে নাই। ভারতবর্ষের সম্মুখে যুদ্ধের আহ্বান আসিয়াছে —অথচ কেহ তাহার সমুচিত জবাব দেয় নাই। আরও অগ্রসর হইয়া বলিতে পারি সমগ্র বৃটিশ ভারতের ইতিহাসে একজনও ভারতীয় স্বেচ্ছায় দেশ সেবার জন্য সিভিল সার্ভিস ত্যাগ করে নাই। দেশের সর্বোচ্চ কর্ম্মচারীদের নিম্নতর শ্রেণীর লােকেদের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সময় আসিয়াছে। সরকারী উচ্চ চাকুরিয়ারা যদি বশ্যতার প্রতিজ্ঞা প্রত্যাহার করেন এমন কি তাহার ইচ্ছাটুকুও প্রকাশ করেন তাহা হইলেই আমলাতন্ত্রের যন্ত্র ধসিয়া পড়ে।

 সুতরাং এই ত্যাগ হইতে নিজেকে রক্ষা করিবার কোনও পথ দেখিতে পাইতেছি না। এই ত্যাগের অর্থ আমি ভালরূপে জানি। দারিদ্র্য, দুঃখ, ক্লেশ, কঠিন পরিশ্রম ত আছেই, আরও নানা ভােগ আছে যাহার কথা স্পষ্টভাবে বলিবার প্রয়ােজন নাই, কিন্তু আপনার পক্ষে বুঝিয়া লওয়া সহজ। কিন্তু এ ত্যাগ করিতেই হইবে, জানিয়া শুনিয়া বুঝিয়া করিতে হইবে। দেশে ফিরিয়া পদত্যাগ করিবার যে পরামর্শ আপনি দিয়াছেন তাহা অতি যুক্তিসঙ্গত হইলেও তাহার বিরুদ্ধে দুই একটি কথা বলিবার আছে। প্রথমতঃ গােলামির প্রতীক স্বরূপ প্রতিজ্ঞাপত্রে সহি করা আমার পক্ষে অতি কঠিন কাজ হইবে। দ্বিতীয়তঃ বর্ত্তমানের জন্য যদি চাকুরিতে প্রবেশ করি তাহা হইলে প্রথা অনুসারে আমি ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারীর পূর্ব্বে দেশে ফিরিতে পারিব না। এখন যদি পদত্যাগ করি তবে জুলাই মাসেই ফিরিতে পারিব। ছয় মাসের মধ্যে বহু পরিবর্ত্তন ঘটিবে। ঠিক মুহূর্ত্তে যথেষ্ট সাড়া না পাওয়ার ফলে আন্দোলন দমিয়া যাইতে পারে, দেরীতে সাড়া মিলিলে তাহা হয়ত ফলপ্রসূ হইবে না। আমার বিশ্বাস আরেকটি এ জাতীয় আন্দোলন আরম্ভ করিতে বহু বৎসর লাগিয়া যাইবে। সুতরাং বর্ত্তমান আন্দোলনের ঢেউকে যতদূর সম্ভব কাজে লাগানাের চেষ্টা করাই সমীচীন। যদি আমাকে পদত্যাগ করিতে হয় তবে তাহা দুদিন পরে অথবা এক বৎসর পরে করিলেও আমার বা অন্য কাহারও ক্ষতিবৃদ্ধি নাই, কিন্তু দেরি করিলে আন্দোলনের পক্ষে হয়ত ক্ষতি হইতে পারে। আমি জানি যে আন্দোলনকে সাহায্য করিবার ক্ষমতা আমার হাতে অল্পই, তবু যদি নিজের কর্ত্তব্য পালনের সন্তোষ লাভ করিতে পারি তাহাও এক বৃহৎ লাভ বলিতে হইবে।••• যদি কোনও কারণে পদত্যাগ সম্বন্ধে মত পরিবর্ত্তন করি তবে বাবার নিকট তৎক্ষণাৎ তার পাঠাইব, তাহাতে তাঁহার আশঙ্কা ঘুচিবে।

(ইংরাজী হইতে অনূদিত)