পাতা:অরক্ষণীয়া - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.pdf/২৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


O অরক্ষণীয়া দুৰ্গা এখানকার রীতিনীতি কতক জানিতেন, কারণ তিনি এই গ্রামের মেয়ে। কিন্তু জ্ঞানদা আট-দশ বছরের ছেলেগুলোকে পর্যন্ত দিগম্বর দেখিয়া লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া রহিল । মেয়েগুলোরও প্ৰায় ঐ দশা । ইতারবিশেষ যাহা আছে, তাহ নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর । তাহাদের নিজেদের গ্রামটাও শহর নয় বটে, কিন্তু সেখানে রাস্তা-ঘাট আছে, এমন আম, কঁঠাল ও বঁাশঝাড়ে মাথার উপর অন্ধকার করিয়া নাই। এরূপ গোবর ও পাট-পচা গন্ধ চতুর্দিক হইতে আসিয়া শ্বাসপ্ৰশ্বাসের ক্রিয়াকে ভারাক্রান্ত, ব্যাকুল করিয়া দেয় না। তখনও অন্ধকার হয় নাই, একটা শৃগাল উঠানের উপর আসিয়া দাড়াইতেই, বড় ছেলেটা তাড়া করিয়া গেল । চারিদিকে অসংখ্য ঝিঝি পোকা বিকট শব্দ শুরু করিয়া দিল । দেয়ালের গায়ে একটা শুকনা ডালে হঠাৎ অশ্রুতপূর্ব একপ্রকার বিশ্ৰী শব্দ শুনিয়া জ্ঞানদা সভয়ে চুপি চুপি কহিল, ও কি ডাকে মা ? মামী শুনিতে পাইয়া কহিল, ও যে তোক্ষোপ । জ্ঞানদা শিহরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোক্ষোপ কি ? তক্ষক সাপ ? মামী বলিল, হঁয়া মা তাই। ঐ যে কোন রাজাকে কামড়েছিল বলে -গাছে গাছে একেবারে ভয়া । জবাব শুনিয়া জ্ঞানদা মায়ের মুখের প্রতি একবার চাহিল। ইতিপূর্বে কান্নায় তাহার সমস্ত বক্ষ পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এইবার সে জননীর কোলের উপর লুটাইয়া পড়িয়া একেবারে ফু পাইয়া কঁাদিয়া উঠিল ; কহিল, এখান থেকে চল মা-এখানে আমি একদণ্ডও বঁচিব না। মামী আশ্চর্য হইল। বলিল, ভয় কি গো, ওরা যে দেবতা । কখখনো কারুর অপকার করে না। আর সাপ-খোপের কামড়ে কটা লোক মরে বাছা ? বরঞ্চ ভয় যা তা ঐ ম্যালোয়ারীর । একবার ধরলে, আর তাতে বস্তু রেখে ছাড়ে না। এ-বছর দিন-কুড়ি হল তোমার মামাকে ধরেছে- এরই মধ্যে যেন শতজীৰ্ণ করে ফেলেচে, আর দিনকতক পরে কে কার মুখে জল দেবে মা, এগায়ে তার ঠিক থাকবে না ।