পাতা:অরক্ষণীয়া - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.pdf/৬৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অরক্ষণীয়া · VS মা বলিতে লাগিলেন, বেশ করে একটু রোগড়ে রোগড়ে ধূস মা, তাচ্ছিল্য করিসনে, চাটু করে আসিস মা-বলা যায় না ত, কখন তঁরা সব এসে পড়বেন । পুকুর হইতে ফিরিয়া আসিয়া জ্ঞানদা অবাক হইয়া গেল। মরণাপন্ন মা ইতিমধ্যে কখন বিছানা হইতে উঠিয়া কেমন করিয়া কি জানি তেরঙ্গের কাছে গিয়া সেটা খুলিয়াছেন এবং নিজের একখানি ছোপানো কাপড় এবং জামা বাহির করিয়া বসিয়া আছেন। মেয়ে আসিতেই বলিলেন, ভুল হয়ে গেল রে, মাথাটা বেঁধে দিলাম না, গা ধুয়ে এলি-ত হোক, বোস। চট করে বেঁধে দিই। মেন্ধুে কাতর হইয়া বলিল, না মা, তোমার পায়ে পড়ি, তুমি পারবে না মা শোও, আমি আপনি বেঁধে নিচ্চি । দোহাই মা তোমার ! মেয়ের কথা শুনিয়া আজি মা একটুখানি হাসিলেন, ঘাড় নাডিয়া বুলিলেন, হুঃ । পারব না ! জানিস গেনি, এই মেজবৌয়ের হাতে চুল বঁধবার জন্যে পাড়ার মেয়ে বেঁটিয়ে আসত। আমি পারব না। চুল বাঁধতে ? নে, আয়, দেরি করিসনে। বলিয়া জোর করিয়া কাছে বসাইয়া সযত্নে সস্নেহে স্বহস্তে পরিপাটি করিয়া, বোধ করি এই তাহার শেষ সাজ সাজাইয়া দিলেন। পায়ে আলতা, কপালে খয়েরের টিপ, ঠোঁটে রঙটুিকু পর্যন্ত দিতে ভুলিলেন না, মুখখানি নাড়িয়া-চাড়িয়া একটি চুমা খাইয় তাহার হঠাৎ মনে হইল,-কে বলে, মেয়ে আমার দেখতে ভাল নয়। একটু কালো, কিন্তু কার মেয়ের এমন মুখ, এমন চোখ দুটি ! এটা তিনি ধরিতে পারিলেন না যে, কার মেয়ে মাকে এমন ভালবাসে ? কার এমন মা-অন্ত প্ৰাণ ? কোন মেয়ের হৃদয়ের এতবড় ভক্তি ও ভালবাসার দীপ্তি এমন করিয়া তাহার সমস্ত কুরূপ আবৃত করিয়া বাহিরে ফুটিয়া উঠে ? এসকল তিনি টের পাইলেন না বটে, কিন্তু মেয়ের গায়ে একখানি অলঙ্কারও পরাইতে পারেন নাই বলিয়া ইতিপূর্বে যে ক্ষোভ জন্মিয়াছিল, কেমন করিয়া কখন যেন তাহা মুছিয়া গেল।