প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (চতুর্থ খণ্ড).pdf/২৩২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্রন্থপরিচয় NIOළු সেখানে যে-সব ছোটােগল্প লিখেছি তার মধ্যে আছে পদ্মাতারের আভাস। সাজাদপরে যখন আসতুম চোখে পড়ত গ্রাম্য জীবনের চিত্র, পল্লীর বিচিত্র কমোদাম । তারই প্রকাশ পোস্টমাস্টার’ ‘সমাপ্তি ছয়টি প্রভৃতি গল্পে। তাতে লোকালয়ের খণ্ড খণ্ড চলতি দশ্যগুলি কল্পনার স্বারা ভরাট করা হয়েছে। ~~রবীন্দ্রনাথ। মানবসত্য (১৩৩৯) । মানুষের ধর্ম শিলাইদহে পামার ) বোটে ছিলাম আমি একলা, সঙ্গে ছিল এক বড়ো মাঝি, আমার মতো চুপচাপ প্রকৃতির, আর ছিল এক চাকর—ফটিক তার নাম, সেও সফটিকের মতোই নিঃশব্দ। নিজনে নদীর বকে দিন বয়ে যেত নদীর ধারারই মতো সহজে। বোট বাঁধা থাকত পদ্মার চরে। সে দিকে ধন ধন করত দিগন্ত পর্যন্ত পাণ্ডুবণ বালরাশি, জনহীন, তৃণশস্যহীন। মাঝে-মাঝে জল বেধে আছে, সেখানে শীত ঋতুর আমন্ত্ৰিত জলচর পাখির দল। নদীর ওপারে গাছপালার ঘন ছায়ায় গ্রামের জীবনযাত্রা। মেয়েরা জল নিয়ে যায়, ছেলেরা জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটে, চাষীরা গোর মোষ নিয়ে পার হয়ে চলে অন্য তীরের চাষের ক্ষেতে, মহাজনী নৌকা গণের টানে মন্থর গতিতে চলতে থাকে, ডিঙিনৌকা পাটকিলে রঙের পাল উড়িয়ে হল হন করে জল চিরে যায়, জেলে-নৌকা জাল বাচ করতে থাকে, যেন সে কাজ নয়, যেন সে খেলা— এর মধ্যে প্রজাদের প্রাত্যহিক সুখদুঃখ আমার গোচরে এসে পড়ত তাদের নানাপ্রকার নালিশ নিয়ে, আলোচনা নিয়ে। পোস্টমাস্টার গল্প শুনিয়ে যেত গ্রামের সদ্য ঘটনা এবং তার নিজের সংকট সমস্যা নিয়ে, বোস্টমী এসে আশচব* লাগিয়ে যেত তার রহস্যময় জীবনবৃত্তান্ত বণনা করে। বোট ভাসিয়ে চলে যে তুম পক্ষা থেকে পাবনার কোলের ইছামতীতে, ইছামতী থেকে বড়লে, হাড়ো সাগরে, চলন বিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমনা পেরিয়ে সাজাদপরের খাল বেয়ে সাজাদপরে। দুই ধারে কত টিনের-ছাদ-ওয়ালা গঞ্জ, কত মহাজনী নৌকার ভিড়ের কিনারায় হাট, কত ভাঙনধরা তট, কত বধিক গ্রাম। ছেলেদের দলপতি ব্রাহ্মণ বালক, গোচারণের মাঠে রাখাল ছেলের জটলা, বনঝাউ-আচ্ছন্ন পদ্মাতীরের উচু পাড়ির কোটরে কোটরে গাঙশালিকের উপনিবেশ। আমার গল্পগুচ্ছের ফসল ফলেছে আমার গ্রাম-গ্রামান্তরের পথে-ফেরা এই বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভূমিকায়। সেদিন দেখলাম একজন সমালোচক লিখেছেন আমার গলপ অভিজাত সম্প্রদায়ের গল্প, সে তাদের হৃদয় সপশ করে না। গলপগুচ্ছের গলপ বোধ হয় তিনি আমার বলে মানেন না। সেদিন গভীর আনন্দে আমি যে কেবল পল্লীর ছবি এঁকেছি তা নয়, পল্লীসংস্কারের কাজ আরম্ভ করেছি তখন থেকেই—সে সময়ে আজকের দিনের পল্লীদরদী লেখকেরা দরিদ্রনারায়ণ’ শব্দটার সস্টিও করেন নি। সেদিন গল্পও চলেছে, তারই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সত্রে বাঁধা জীবনও চলেছে এই নদীমাতৃক বাংলাদেশের আতিথ্যে। ... সাধনার যুগে প্রধানত শিলাইদহেই কাটিয়েছি। কলকাতা থেকে বলধের ফরমাস আসত, গলপ চাই। জীবনের পথ-চলতি কুড়িয়ে-পাওয়া অভিজ্ঞতার সঞ্চয় সাজিয়ে লিখেছি গল্প। তখন ভাবতাম কলম বাগিয়ে বসলেই গল্প লেখা যায়। [ ২o অক্টোবর ১৯৩৬ ] -রবীন্দ্রনাথের উৰি প্ৰভাতৰি বিৰি