প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১২০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৬৩০
গল্পগুচ্ছ

হালদারগােষ্ঠী

এই পরিবারটির মধ্যে কোনােরকমের গােল বাধিবার কোনাে সংগত কারণ ছিল না। অবস্থাও সচ্ছল, মানুষগুলিও কেহই মন্দ নহে। কিন্তু তবুও গােল বাধিল।
 কেননা, সংগত কারণেই যদি মানুষের সব-কিছু ঘটিত তবে তাে লােকালয়টা একট অঙ্কের খাতার মতাে হইত, একটু সাবধানে চলিলেই হিসাবে কোথাও কোনাে ভুল ঘটিত না; যদি বা ঘটিত সেটাকে রবার দিয়া মুছিয়া সংশােধন করিলেই চলিয়া যাইত।
 কিন্তু, মানুষের ভাগ্যদেবতার রসবােধ আছে; গণিতশাস্ত্রে তাঁহার পাণ্ডিত্য আছে কি না জানি না, কিন্তু অনুরাগ নাই; মানবজীবনের যােগবিয়ােগের বিশুদ্ধ অঙ্কফলটি উদ্ধার করিতে তিনি মনােযােগ করেন না। এইজন্য তাঁহার ব্যবস্থার মধ্যে একটা পদার্থ তিনি সংযােগ করিয়াছেন, সেটা অসংগতি। যাহা হইতে পারিত সেটাকে সে হঠাৎ আসিয়া লণ্ডভণ্ড করিয়া দেয়। ইহাতেই নাট্যলীলা জমিয়া উঠে, সংসারের দুই কূল ছাপাইয়া হাসিকান্নার তুফান চলিতে থাকে।
 এ ক্ষেত্রেও তাহাই ঘটিল—যেখানে পদ্মবন সেখানে মত্তহস্তী আসিয়া উপস্থিত। পঙ্কের সঙ্গে পঙ্কজের একটা বিপরীত রকমের মাখামাখি হইয়া গেল। তা না হইলে এ গল্পটির সৃষ্টি হইতে পারিত না।
 যে পরিবারের কথা উপস্থিত করিয়াছি তাহার মধ্যে সব চেয়ে যােগ্য মানুষ যে বনােয়ারিলাল, তাহাতে সন্দেহ নাই। সে নিজেও তাহা বিলক্ষণ জানে এবং সেইটেতেই তাহাকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। যােগ্যতা এঞ্জিনের স্টীমের মতাে তাহাকে ভিতর হইতে ঠেলে; সামনে যদি সে রাস্তা পায় তাে ভালােই, যদি না পায় তবে যাহা পায় তাহাকে ধাক্কা মারে।
 তাহার বাপ মনােহরলালের ছিল সাবেককেলে বড়ােমানুষি চাল। যে সমাজ তাঁহার, সেই সমাজের মাথাটিকেই আশ্রয় করিয়া তিনি তাহার শিরােভূষণ হইয়া থাকিবেন, এই তাঁহার ইচ্ছা। সুতরাং সমাজের হাত-পায়ের সঙ্গে তিনি কোনাে সংস্রব রাখেন না। সাধারণ লােকে কাজকর্ম করে, চলে ফেরে; তিনি কাজ না-করিবার ও না-চলিবার বিপুল আয়ােজনটির কেন্দ্রস্থলে ধ্রুব হইয়া বিরাজ করেন।
 প্রায় দেখা যায়, এইপ্রকার লােকেরা বিনা চেষ্টায় আপনার কাছে অন্তত দুটি-একটি শক্ত এবং খাঁটি লােককে যেন চুম্বকের মতাে টানিয়া আনেন। তাহার কারণ আর কিছু নয়, পৃথিবীতে একদল লােক জন্মায় সেবা করাই তাহাদের ধর্ম। তাহারা আপন প্রকৃতির চরিতার্থতার জন্যই এমন অক্ষম মানুষকে চায় যে লােক নিজের ভার যােলাে-আনাই তাহাদের উপর ছাড়িয়া দিতে পারে। এই সহজ সেবকেরা নিজের কাজে কোনাে সুখ পায় না; কিন্তু আর-একজনকে নিশ্চিত করা, তাহাকে সম্পূর্ণ আরামে রাখা, তাহাকে সকলপ্রকার সংকট হইতে বাঁচাইয়া চলা, লােকসমাজে তাহার সম্মানবৃদ্ধি করা, ইহাতেই তাহাদের পরম উৎসাহ। ইহারা যেন একপ্রকারের পুরুষ মা; তাহাও নিজের ছেলের নহে, পরের ছেলের।
 মনােহরলালের যে চাকরটি আছে, রামচরণ, তাহার শরীররক্ষা ও শরীরপাতের