প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৪৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


&tb . গল্পগুচ্ছ বোটমী আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসবাদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালীর ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্ৰমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোহারী তো নহেই । শরীরে যেখানটায় ঘা পড়িতে থাকে সে জায়গাটা যত তুচ্ছই হোক সমস্ত দেহটাকে বেদনার জোরে সেই ছাড়াইয়া যায়। যে লোক গালি খাইয়া মানুষ হয় সে আপনার স্বভাবকে যেন ঠেলিয়া একঝোঁকা হইয়া পড়ে— আপনার চারি দিককে ছাড়াইয়া আপনাকেই কেবল তাহার মনে পড়ে—সেটা আরামও নয়, কল্যাণও নয় । আপনাকে ভোলাটাই তো সবসিত । আমাকে তাই ক্ষণে ক্ষণে নিজনের খোঁজ করিতে হয়। মানুষের ঠেলা খাইতে খাইতে মনের চারি দিকে যে টোল খাইয়া যায়, বিশ্বপ্রকৃতির সেবানিপুণ হাতখানির গণে তাহা ভরিয়া উঠে। কলিকাতা হইতে দুরে নিভৃতে আমার একটি অজ্ঞাতবাসের আয়োজন আছে; আমার নিজ-চচার দৌরাত্ম্য হইতে সেইখানে অন্তধান করিয়া থাকি ! সেখানকার লোকেরা এখনো আমার সম্পবন্ধে কোনো-একটা সিদ্ধান্তে আসিয়া পৌছে নাই । তাহারা দেখিয়াছে— আমি ভোগী নই, পল্লীর রজনীকে কলিকাতার কলষে আবিল করি না; আবার যোগীও নই, কারণ দর হইতে আমার যেটুকু পরিচয় পাওয়া যায় তাহার মধ্যে ধনের লক্ষণ আছে; আমি পথিক নহি, পল্লীর রাস্তায় ঘুরি বটে কিন্তু কোথাও পেছিবার দিকে আমার কোনো লক্ষই নাই; আমি যে গহী এমন কথা বলাও শক্ত, কারণ ঘরের লোকের প্রমাণাভাব। এইজন্য পরিচিত জীবশ্রেণীর মধ্যে আমাকে কোনো-একটা প্রচলিত কোঠায় না ফেলিতে পারিয়া গ্রামের লোক আমার সম্বন্ধে চিন্তা করা একরকম ছাড়িয়া দিয়াছে, আমিও নিশ্চিত আছি। অলপদিন হইল খবর পাইয়াছি, এই গ্রামে একজন মানুষ আছে যে আমার সম্বন্ধে কিছ-একটা মনে ভাবিয়াছে, অন্তত বোকা ভাবে নাই। তাহার সঙ্গে প্রথম দেখা হইল, তখন আষাঢ়মাসের বিকালবেলা। কান্না শেষ হইয়া গেলেও চোখের পল্লব ভিজা থাকিলে যেমন ভাবটা হয়, সকালবেলাকার বন্টিঅবসানে সমস্ত লতাপাতা আকাশ ও বাতাসের মধ্যে সেই ভাবটা ছিল। আমাদের পাকুরের উচু পাড়িটার উপর দাঁড়াইয়া আমি একটি নধর-শ্যামল গাভীর ঘাস খাওয়া দেখিতেছিলাম। তাহার চিক্কণ দেহটির উপর রোঁদ পড়িয়াছিল দেখিয়া ভাবিতেছিলাম, আকাশের আলো হইতে সভ্যতা আপনার দেহটাকে পথক করিয়া রাখিবার জন্য যে এত দজির দোকান বানাইয়াছে, ইহার মতো এমন অপব্যয় আর নাই। এমন সময় হঠাৎ দেখি, একটি প্রৌঢ়া সন্ত্রীলোক আমাকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল। তাহার অচিলে কতকগুলি ঠোঙার মধ্যে করবী গন্ধরাজ এবং আরও দুইচার রকমের ফল ছিল। তাহারই মধ্যে একটি আমার হাতে দিয়া ভক্তির সঙ্গে জোড় হাত করিয়া সে বলিল, “আমার ঠাকুরকে দিলাম।”