প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৫৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বোস্টমী e&& লইয়া তাহার খবরদারি করিতে আমার ভালো লাগিত না । সেজন্য পারতপক্ষে তাহাকে লইয়া যাইতে চাহিতাম না। সেদিন শ্রাবণ মাস। থাকে থাকে ঘন কালো মেঘে দুই-প্রহর বেলাটাকে একেবারে আগাগোড়া মাড়ি দিয়া রাখিয়াছে। নানে যাইবার সময় খোকা কান্না জড়িয়া দিল। নিস্তারিণী আমাদের হোসেলের কাজ করিত, তাহাকে বলিয়া গেলাম, “বাছা, ছেলেকে দেখিয়ো, আমি ঘাটে একটা ডুব দিয়া আসি গে।” ঘাটে ঠিক সেই সময়টিতে আর-কেহ ছিল না। সঙ্গিনীদের আসিবার অপেক্ষায় আমি সাঁতার দিতে লাগিলাম। দিঘিটা প্রাচীন কালের; কোন রানী কবে খনন করাইয়াছিলেন তাই ইহার নাম রানীসাগর। সাঁতার দিয়া এই দিঘি এপার-ওপার করা মেয়েদের মধ্যে কেবল আমিই পারিতাম। বর্ষায় তখন কলে কলে জল। দিঘি যখন প্রায় অধোকটা পার হইয়া গেছি এমন সময় পিছন হইতে ডাক শুনিতে পাইলাম, “মা!” ফিরিয়া দেখি, খোকা ঘাটের সিড়িতে নামিতে নামিতে আমাকে ডাকিতেছে। চীৎকার করিয়া বলিলাম, “আর আসিস নে, আমি যাচ্ছি।” নিষেধ শনিয়া হাসিতে হাসিতে সে আরও নামিতে লাগিল। ভয়ে আমার হাতে পায়ে যেন খিল ধরিয়া আসিল, পার হইতে আর পারিই না। চোখ বাজিলাম। পাছে কী দেখিতে হয়। এমন সময় পিছল ঘাটে সেই দিঘির জলে খোকার হাসি চিরদিনের মতো থামিয়া গেল। পার হইয়া আসিয়া সেই মায়ের কোলের কাঙাল ছেলেকে জলের তলা হইতে তুলিয়া কোলে লইলাম, কিন্তু আর সে মা বলিয়া ডাকিল না। আমার গোপালকে আমি এতদিন কাঁদাইয়াছি, সেই-সমস্ত অনাদর আজ আমার উপর ফিরিয়া আসিয়া আমাকে মারিতে লাগিল। বাঁচিয়া থাকিতে তাহাকে বরাবর ষে ফেলিয়া চলিয়া গেছি, আজ তাই সে দিনরাত আমার মনকে অাঁকড়িয়া ধরিয়া রহিল। আমার স্বামীর বকে যে কতটা বাজিল সে কেবল তাঁর অন্তষামাই জানেন। আমাকে যদি গালি দিতেন তো ভালো হইত; কিন্তু তিনি তো কেবল সহিতেই জানেন, কহিতে জানেন না। এমনি করিয়া আমি যখন একরকম পাগল হইয়া আছি, এমন সময় গরষ্ঠাকুর দেশে ফিরিয়া আসিলেন । যখন ছেলেবয়সে আমার স্বামী তাঁহার সঙ্গে একত্রে খেলাধুলা করিয়াছেন তখন সে এক ভাব ছিল। এখন আবার দীর্ঘকাল বিচ্ছেদের পর যখন তাঁর ছেলেবয়সের বন্ধ বিদ্যালাভ করিয়া ফিরিয়া আসিলেন তখন তাঁহার পরে আমার স্বামীর ভক্তি একেবারে পরিপণ হইয়া উঠিল। কে বলিবে খেলার সাথি, ইহার সামনে তিনি যেন একেবারে কথা কহিতে পারিতেন না। আমার স্বামী আমাকে সাত্বনা করিবার জন্য তাঁহার গরকে অনুরোধ করিলেন। গর আমাকে শাস্ত্র শনাইতে লাগিলেন। শাস্ত্রের কথায় আমার বিশেষ ফল হইয়াছিল বলিয়া মনে তো হয় না। আমার কাছে সে-সব কথার যা-কিছ মল্যে সে তাঁহারই মখের কথা বলিয়া। মানুষের কণ্ঠ দিয়াই ভগবান তাঁহার অমত মানুষকে পান করাইয়া থাকেন; অমন সাধাপাত্র তো তাঁর হাতে আর নাই। আবার, ঐ মানুষের কণ্ঠ দিয়াই তো সন্ধা তিনিও পান করেন। - -