প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২০৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৭১৩
অপরিচিতা

ছুটিয়া গিয়াছিল—এখনাে যে তাহাকে কিছুতেই টানিয়া ফিরাইতে পারি না। দেয়ালটকুর আড়ালে রহিয়া গেল গাে। কপালে তার চন্দন আঁকা, গায়ে তার লাল শাড়ি, মুখে তার লজ্জার রক্তিমা, হৃদয়ের ভিতরে কী যে তা কেমন করিয়া বলিব। আমার কল্পলােকের কল্পলতাটি বসন্তের সমস্ত ফুলের ভার আমাকে নিবেদন করিয়া দিবার জন্য নত হইয়া পড়িয়াছিল। হাওয়া আসে, গন্ধ পাই, পাতার শব্দ শুনি—কেবল আর একটিমাত্র পা ফেলার অপেক্ষা—এমন সময়ে সেই এক পদক্ষেপের দূরত্বটুকু এক মুহর্তে অসীম হইয়া উঠিল!

 এতদিন যে প্রতি সন্ধ্যায় আমি বিনুদাদার বাড়িতে গিয়া তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছিলাম! বিনুদার বর্ণনার ভাষা অত্যন্ত সংকীর্ণ বলিয়াই তাঁর প্রত্যেক কথাটি স্ফুলিঙ্গের মতাে আমার মনের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়া দিয়াছিল। বুঝিয়াছিলাম মেয়েটির রূপ বড়াে আশ্চর্য; কিন্তু না দেখিলাম তাহাকে চোখে, না দেখিলাম তার ছবি, সমস্তই অস্পষ্ট হইয়া রহিল। বাহিরে তাে সে ধরা দিলই না, তাহাকে মনেও আনিতে পারিলাম না—এইজন্য মন সেদিনকার সেই বিবাহসভার দেয়ালটার বাহিরে ভূতের মতাে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বেড়াইতে লাগিল।

 হরিশের কাছে শুনিয়াছি, মেয়েটিকে আমার ফোটোগ্রাফ দেখানাে হইয়াছিল। পছন্দ করিয়াছে বই-কি। না করিবার তাে কোনাে কারণ নাই। আমার মন বলে, সে ছবি তার কোনাে-একটি বাক্সের মধ্যে লুকানাে আছে। একলা ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া এক-একদিন নিরালা দুপুরবেলায় সে কি সেটি খুলিয়া দেখে না। যখন ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখে তখন ছবিটির উপরে কি তার মুখের দুই ধার দিয়া এলােচুল আসিয়া পড়ে না। হঠাৎ বাহিরে কারও পায়ের শব্দ পাইলে সে কি তাড়াতাড়ি তার সুগন্ধ আঁচলের মধ্যে ছবিটিকে লুকাইয়া ফেলে না।

 দিন যায়। একটা বৎসর গেল। মামা তাে লজ্জায় বিবাহসম্বন্ধের কথা তুলিতেই পারেন না। মার ইচ্ছা ছিল, আমার অপমানের কথা যখন সমাজের লােকে ভুলিয়া যাইবে তখন বিবাহের চেষ্টা দেখিবেন।

 এ দিকে আমি শুনিলাম সে মেয়ের নাকি ভালাে পাত্র জুটিয়াছিল, কিন্তু সে পণ করিয়াছে বিবাহ করিবে না। শনিয়া আমার মন পুলকের আবেশে ভরিয়া গেল। আমি কল্পনায় দেখিতে লাগিলাম, সে ভালাে করিয়া খায় না; সন্ধ্যা হইয়া আসে, সে চুল বাঁধিতে ভুলিয়া যায়। তার বাপ তার মুখের পানে চান আর ভাবেন, আমার মেয়ে দিনে দিনে এমন হইয়া যাইতেছে কেন। হঠাৎ কোনােদিন তার ঘরে আসিয়া দেখেন, মেয়ের দুই চক্ষু জলে ভরা। জিজ্ঞাসা করেন, ‘মা, তাের কী হইয়াছে বল্ আমাকে।’ মেয়ে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া বলে, ‘কই, কিছুই তাে হয় নি বাবা।’ বাপের এক মেয়ে যে-বড়াে আদরের মেয়ে। যখন অনাবৃষ্টির দিনে ফুলের কুঁড়িটির মতাে মেয়ে একেবারে বিমর্ষ হইয়া পড়িয়াছে তখন বাপের প্রাণে আর সহিল না। তখন অভিমান ভাসাইয়া দিয়া তিনি ছুটিয়া আসিলেন আমাদের দ্বারে। তার পরে? তার পরে মনের মধ্যে সেই যে কালাে রঙের ধারাটা বহিতেছে সে যেন কালাে সাপের মতাে রূপ ধরিয়া ফোঁস করিয়া উঠিল। সে বলিল, বেশ তাে, আর-একবার বিবাহের আসর সাজানাে হােক, আলাে জ্বলুক, দেশ-বিদেশের লােকের নিমন্ত্রণ হােক, তার পরে তুমি বরের টোপর পায়ে দলিয়া দলবল লইয়া সভা ছাড়িয়া