পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২১৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ৭২৯ পয়লা নম্বর আমি তামাকটা পৰ্যন্ত খাই নে। আমার এক অভ্ৰভেদী নেশা আছে, তারই আওতায় অন্য-সকল নেশা একেবারে শিকড় পর্যন্ত শুকিয়ে মরে গেছে। সে সামার বই-পড়ার নেশা । আমার জীবনের মন্ত্রটা ছিল এই— যাবজীবেং নাই-বা জীবেং ঋণং কৃত্বা বহিং পঠেৎ । যাদের বেড়াবার শখ বেশি অথচ পথেয়ের অভাব, তারা যেমন করে টাইমটেবল পড়ে, অলপ বয়সে আর্থিক অসদ্ভাবের দিনে আমি তেমনি ক'রে বইয়ের ক্যাটালগ পড়তুম। আমার দাদার এক খড়শবশরে বাংলা বই বেরবা মাত্র নিবিচারে কিনতেন এবং তাঁর প্রধান অহংকার এই যে, সে বইয়ের একখানাও তাঁর আজ পয'ত খোওয়া যায় নি। বোধ হয় বাংলাদেশে এমন সৌভাগ্য আর-কারও ঘটে না । কারণ ধন বল, আয় বল, অন্যমনস্ক ব্যক্তির ছাতা বল, সংসারে যতকিছল সরণশীল পদাৰ্থ আছে বাংলা বই হচ্ছে সকলের চেয়ে সেরা। এর থেকে বোঝা যাবে, দাদার খড়শবশরের বইয়ের আলমারির চাবি দাদার খড়েশাশুড়ির পক্ষেও দলভ ছিল । দীন যথা রাজেন্দ্রসংগমে আমি যখন ছেলেবেলায় দাদার সঙ্গে তাঁর শবশুরবাড়ি যেতুম ঐ রন্ধন্বার আলমারিগুলোর দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছি। তখন আমার চক্ষর জিভে জল এসেছে। এই বললেই যথেস্ট হবে, ছেলেবেলা থেকেই এত অসম্ভব-রকম বেশি পড়েছি যে পাস করতে পারি নি। যতখানি কম পড়া পাস করার পক্ষে অত্যাবশ্যক তার সময় আমার ছিল না। আমি ফেল-করা ছেলে বলে আমার একটা মস্ত সবিধে এই যে, বিশববিদ্যালয়ের ঘড়ায় বিদ্যার তোলা জলে আমার স্নান নয়— স্রোতের জলে অবগাহনই আমার অভ্যাস । আজকাল আমার কাছে অনেক বি. এ. এম. এ. এসে থাকে ; তারা যতই আধুনিক হোক, আজও তারা ভিক্টোরীয় যাগের নজরবন্দী হয়ে বসে আছে। তাদের বিদ্যার জগৎ টলেমির পথিবীর মতো আঠারো-উনিশ শতাব্দীর সঙ্গে একেবারে যেন ইস্কু দিয়ে অাঁটা ; বাংলাদেশের ছাত্রের দল পত্রপৌত্রাদিক্ৰমে তাকেই যেন চিরকাল প্রদক্ষিণ করতে থাকবে। তাদের মানস-রথযাত্রার গাড়িখানা বহন কটে মিল-বেন্থাম পেরিয়ে কালাইল-রাসিকনে এসে কাত হয়ে পড়েছে। মাস্টার-মশায়ের বলির বেড়ার বাইরে তারা সাহস করে হাওয়া খেতে বেরোয় না । কিন্তু, আমরা যে-দেশের সাহিত্যকে খোঁটার মতো করে মনটাকে বেধে রেখে জাওর কাটাচ্ছি সে-দেশে সাহিত্যটা তো প্ৰাণ নয়— সেটা সেখানকার প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে চলছে। সেই প্রাণটা আমার না থাকতে পারে কিন্তু সেই চলাটা আমি অনুসরণ করতে চেষ্টা করেছি। আমি নিজের চেন্টায় ফরাসি জমান ইটালিয়ান শিখে নিলাম; অলপদিন হল রাশিয়ান শিখতে শরে করেছিলাম। আধুনিকতার যে একসপ্রেস গাড়িটা ঘণ্টায় ষাট মাইলের চেয়ে বেগে ছুটে চলেছে, আমি তারই টিকিট কিনেছি। তাই আমি হাক্সলি-ডারায়নে এসেও ঠেকে যাই নি, টেনিসনকেও বিচার করতে ডরাই নে, এমন-কি, ইবসেন-মেটারলিকের নামের নৌকা ধরে আমাদের মাসিক