প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২৬৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8 গল্পগুচ্ছ কাটা যায়। তাই তিনি নিজের আহারের খরচ বাঁচিয়ে গোপনে শিল্পের সরঞ্জাম কিনিয়ে আনাতেন। যা-কিছু কাজ করতেন সেও গোপনে দরজা বন্ধ করে। ভংসনার ভয়ে নয়, অরসিকের দটিপাতের সংকোচে। আজ চুনি ছিল তাঁর শিল্প-রচনার একমাত্র দশক ও বিচারকারী। এই কাজে ক্লমে তার সহযোগিতাও ফটে উঠল। তাকে লাগল বিষম নেশা। শিশরে এ অপরাধ ঢাকা পড়ে না, খাতার পাতাগুলো অতিক্রম করে দেয়ালের গায়ে পৰ্যন্ত প্রকাশ হতে থাকে। হাতে মখে জামার হাতায় কলঙ্ক ধরা পড়ে। পয়সা-সাধনার বিরদ্ধে ইন্দ্রদেব শিশর চিত্তকেও প্রলব্ধ করতে ছাড়েন না। খড়োর হাতে অনেক দুঃখ তাকে পেতে হল। এক দিকে শাসন যতই বাড়তে চলল আর-এক দিকে মা তাকে ততই অপরাধে সহায়তা করতে লাগলেন। আপিসের বড়োসাহেব মাঝে মাঝে আপিসের বড়োবাবকে নিয়ে আপন কাজে মফস্বলে যেতেন, সেই সময়ে মায়েতে ছেলেতে মিলে অবাধ আনন্দ। একেবারে ছেলেমানষির একশেষ ! যে-সব জন্তুর মতি হত বিধাতা এখনো তাদের সন্টি করেন নি—বেড়ালের ছাঁচের সঙ্গে কুকুরের ছাঁচ ষেত মিলে, এমন-কি মাছের সঙ্গে পাখির প্রভেদ ধরা কঠিন হত। এই-সমস্ত সটিকায রক্ষা করবার উপায় ছিল না—বড়োবাব ফিরে আসবার পবেই এদের চিহ্ন লোপ করতে হত। এই দুজনের সস্টিলীলায় ব্রহ্মা এবং রন্দ্রই ছিলেন, মাঝখানে বিফর আগমন হল না। শিল্পরচনাবায়র প্রকোপ সত্যবতীদের বংশে প্রবল ছিল। তারই প্রমাণস্বরপে সত্যবতীর চেয়ে বয়সে বড়ো তাঁরই এক, ভাগনে রঙ্গলাল চিত্রবিদ্যায় হঠাৎ নামজাদা হয়ে উঠলেন। অথাৎ, দেশের রসিক লোক তাঁর রচনার অদ্ভূতত্ব নিয়ে খুব অট্টহাস্য জমালে । তারা যেরকম কপেনা করে তার সঙ্গে তাঁর কলপনার মিল হয় না দেখে তাঁর গণপনার সম্বন্ধে তাদের প্রচণ্ড অবজ্ঞা হল। আশ্চর্য এই যে, এই অবজ্ঞার জমিতেই বিরোধ-বিদ্রুপের আবহাওয়ায় তাঁর খ্যাতি বেড়ে উঠতে লাগল; যারা তাঁর যতই নকল করে তারাই উঠে পড়ে লাগল প্রমাণ করতে যে, লোকটা আর্টিস্ট হিসাবে ফকি—এমন-কি, তার টেকনিকে সম্পাট গলদ। এই পরমনিন্দিত চিত্রকর একদিন আপিসের বড়োবাবরে অবতমানে এলেন তাঁর মামির বাড়িতে। বারে ধাক্কা মেরে মেরে ঘরে যখন প্রবেশলাভ করলেন, দেখলেন মেঝেতে পা ফেলবার জো নেই। ব্যাপারখানা ধরা পড়ল। রঙ্গলাল বললেন, "এতদিন পরে দেখা গেল, গণেীর প্রাণের ভিতর থেকে সন্ট মতি তাজা বেরিয়েছে—এর মধ্যে দাগা-বলোনোর তো কোনো লক্ষণ নেই, যে বিধাতা রাপ সৃষ্টি করেন তাঁর বয়সের সঙ্গে ওর বয়সের মিল আছে। সব ছবিগুলো বের করে আমাকে দেখাও।” কোথা থেকে বের করবে। যে গণেী রঙে রঙে ছায়ায় আলোয় আকাশে আকাশে চিত্র অাঁকেন তিনি তাঁর কুহেলিকা-মরীচিকাগুলি যেখানে অকাতরে সরিয়ে ফেলেন, এদের কাঁতিগুলোও সেইখানেই গেছে। রঙ্গলাল মাথার দিব্যি দিয়ে তাঁর মামিকে বললেন, “এবার থেকে তোমরা যা-কিছু রচনা করবে আমি এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যাব।” বড়োবাব এখনো আসেন নি। সকাল থেকে শ্রাবণের ছায়ায় আকাশ ধ্যানমগন, বষ্টি পড়ছে; বেলা ঘড়ির কাঁটার কোন সংকেতের কাছে তার ঠিকানা নেই, তার খোঁজ করতেও মন যায় না। আজ চুনিবাব নোঁকো-ভাসানোর ছবি অকিতে লেগেছেন।