প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


હ૬૭ গল্পগুচ্ছ গুপ্তধন অমাবস্যার নিশীথরাত্রি। মৃত্যুঞ্জয় তাত্রিক মতে তাহাদের বহনকালের গহদেবতা জয়কালীর পজায় বসিয়াছে। পজা সমাধা করিয়া যখন উঠিল, তখন নিকটস্থ আমবাগান হইতে প্রত্যুষের প্রথম কাক ডাকিল। মৃত্যুঞ্জয় পশ্চাতে ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, মন্দিরের বার রন্ধ রহিয়াছে। তখন সে একবার দেবীর চরণতলে মস্তক ঠেকাইয়া তাঁহার আসন সরাইয়া দিল। সেই আসনের নীচে হইতে একটি কাঁঠালকাঠের বাক্স বাহির হইল। পৈতায় চাবি বাঁধা ছিল। সেই চাবি লাগাইয়া মৃত্যুঞ্জয় বাক্সটি খলিল। খলিবামাত্রই চমকিয়া উঠিয়া মাথায় করাঘাত করিল। মৃত্যুঞ্জয়ের অন্দরের বাগান প্রাচীর দিয়া ঘেরা। সেই বাগানের এক প্রান্তে বড়ো বড়ো গাছের ছায়ার অন্ধকারে এই ছোটো মন্দিরটি। মন্দিরে জয়কালীর মতি ছাড়া আর-কিছুই নাই; তাহার প্রবেশদ্বার একটিমাত্র। মৃত্যুঞ্জয় বাক্সটি লইয়া অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করিয়া দেখিল। মৃত্যুঞ্জয় বাক্সটি খলিবার প্বে তাহা বন্ধই ছিল— কেহ তাহা ভাঙে নাই। মৃত্যুঞ্জয় দশবার করিয়া প্রতিমার চারি দিকে ঘুরিয়া হাতড়াইয়া দেখিল—কিছুই পাইল না। পাগলের মতো হইয়া মন্দিরের বার খলিয়া ফেলিল— তখন ভোরের আলো ফুটিতেছে। মন্দিরের চারি দিকে মৃত্যুঞ্জয় ঘুরিয়া ঘরিয়া ব্যথা আশবাসে খ:জিয়া বেড়াইতে লাগিল। সকালবেলাকার আলোক যখন পরিসফটে হইয়া উঠিল, তখন সে বাহিরের চণ্ডীমন্ডপে আসিয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল । সমস্ত রাত্রি অনিদ্রার পর ক্লান্তশরীরে একটা তল্লা আসিয়াছে, এমন সময়ে হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া শুনিল, “জয় হোক বাবা।” সম্মখে প্রাঙ্গণে এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী । মৃত্যুঞ্জয় ভক্তিভরে তাঁহাকে প্রণাম করিল। সন্ন্যাসী তাহার মাথায় হাত দিয়া আশীবাদ করিয়া কহিলেন, “বাবা, তুমি মনের মধ্যে ব্যথা শোক করিতেছ।" শনিয়া মৃত্যুঞ্জয় আশ্চর্য হইয়া উঠিল; কহিল, “আপনি অত্যামী, নহিলে আমার শোক কেমন করিয়া বুঝিলেন । আমি তো কাহাকেও কিছু বলি নাই।” সন্ন্যাসী কহিলেন, “বৎস, আমি বলিতেছি, তোমার যাহা হারাইয়াছে সেজন্য তুমি আনন্দ করো, শোক করিয়ো না।” মৃত্যুঞ্জয় তাঁহার দই পা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “আপনি তবে তো সমস্তই জানিয়াছেন—কেমন করিয়া হারাইয়াছে, কোথায় গেলে ফিরিয়া পাইব, তাহা না বলিলে আমি আপনার চরণ ছাড়িব না।” সন্ন্যাসী কহিলেন, “আমি যদি তোমার অমঙ্গল কামনা করিতাম তবে বলিতাম। কিন্তু, ভগবতী দয়া করিয়া যাহা হরণ করিয়াছেন সেজন্য শোক করিয়ো না।” মৃত্যুঞ্জয় সন্ন্যাসীকে প্রসন্ন করিবার জন্য সমস্ত দিন বিবিধ উপচারে তাঁহার সেবা করিল। পরদিন প্রত্যুষে নিজের গোহাল হইতে লোটা ভরিয়া সফেন দধি দহিয়া লইয়া আসিয়া দেখিল, সন্ন্যাসী নাই।