প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৫৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৫৬৯
মাস্টারমশায়


বড়ােলােকের কাছ হইতে সার্টিফিকেট আনিতে পার?” কোনাে বড়ােলােককেই সে জানে না।
 শুনিয়া সাহেব আরও যেন খুশি হইয়া কহিলেন, “আচ্ছা বেশ, পঁচিশ টাকা বেতনে কাজ আরম্ভ করো, কাজ শিখিলে উন্নতি হইবে।” তার পরে সাহেব তাহার বেশভূষার প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “পনেরাে টাকা আগাম দিতেছি, আপিসের উপযুক্ত কাপড় তৈরি করাইয়া লইবে।”
 কাপড় তৈরি হইল, হরলাল আপিসেও বাহির হইতে আরম্ভ করিল। বড়াে সাহেব তাহাকে ভূতের মতাে খাটাইতে লাগিলেন। অন্য কেরানিরা বাড়ি গেলেও হরলালের ছুটি ছিল না। এক-একদিন সাহেবের বাড়ি গিয়াও তাঁহাকে কাজ বুঝাইয়া দিয়া আসিতে হইত।
 এমনি করিয়া কাজ শিখিয়া লইতে হরলালের বিলম্ব হইল না। তাহার সহযােগী কেরানিরা তাহাকে ঠকাইবার অনেক চেষ্টা করিল, তাহার বিরুদ্ধে উপরওয়ালাদের কাছে লাগালাগিও করিল, কিন্তু এই নিঃশব্দ নিরীহ সামান্য হরলালের কোনাে অপকার করিতে পারিল না।
 যখন তাহার চল্লিশ টাকা মাহিনা হইল, তখন হরলাল দেশ হইতে মাকে আনিয়া একটি ছােটোখাটো গলির মধ্যে ছােটোখাটো বাড়িতে বাসা করিল। এত দিন পরে তাহার মার দুঃখ ঘুচিল। মা বলিলেন, “বাবা, এইবার বউ ঘরে আনিব।”
 হরলাল মাতার পায়ের ধুলা লইয়া বলিল, “মা, ওইটে মাপ করিতে হইবে।”
 মাতার আর-একটি অনুরােধ ছিল। তিনি বলিলেন, “তুই যে দিনরাত তাের ছাত্র বেণুগােপালের গল্প করিস, তাহাকে একবার নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়া। তাহাকে আমার দেখিতে ইচ্ছা করে।”
 হরলাল কহিল, “মা, এ বাসায় তাহাকে কোথায় বসাইব। রােসাে. একটা বড়াে বাসা করি, তাহার পরে তাহাকে নিমন্ত্রণ করিব।”


হরলালের বেতনবৃদ্ধির সঙ্গে ছােটো গলি হইতে বড়াে গলি ও ছােটো বাড়ি হইতে বড়াে বাড়িতে তাহার বাস-পরিবর্তন হইল। তবু সে কী জানি কী মনে করিয়া, অধরলালের বাড়ি যাইতে বা বেণুকে নিজের বাসায় ডাকিয়া আনিতে কোনােমতেই মন স্থির করিতে পারিল না।
 হয়তাে কোনােদিনই তাহার সংকোচ ঘুচিত না। এমন সময়ে হঠাৎ খবর পাওয়া গেল, বেণুর মা মারা গিয়াছেন। শুনিয়া মুহূর্ত বিলম্ব না করিয়া সে অধরলালের বাড়ি গিয়া উপস্থিত হইল।
 এই দুই অসমবয়সী বন্ধুতে অনেক দিন পরে আবার একবার মিলন হইল। বেণুর অশৌচের সময় পার হইয়া গেল, তবু এ বাড়িতে হরলালের যাতায়াত চলিতে লাগিল। কিন্তু, ঠিক তেমনটি আর কিছুই নাই। বেণু, এখন বড়াে হইয়া উঠিয়া অঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনী যােগে তাহার নূতন গোঁফের রেখার সাধ্যসাধনা করিতেছে। চাল- চলনে বাবুয়ানা ফুটিয়া উঠিয়াছে। এখন তাহার উপযুক্ত বন্ধুবান্ধবেরও অভাব নাই।