পাতা:গল্পগুচ্ছ (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/১৯৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৪০৯
দৃষ্টিদান

 স্বামী কুণ্ঠিত হইয়া বলিলেন, “চোখে অস্ত্র করা আবশ্যক হইয়াছে।”

 আমি একটু রাগের ভাণ করিয়া কহিলাম, “অস্ত্র করিতে হইবে, সে তাে তুমি জানিতে কিন্তু প্রথম হইতেই সে কথা আমার কাছে গােপন করিয়া গেছ। তুমি কি মনে কর, আমি ভয় করি।”

 স্বামীর লজ্জা দুর হইল; তিনি বলিলেন, “চোখে অস্ত্র করিতে হইবে শুনিলে ভয় না করে পুরুষের মধ্যে এমন বীর কয়জন আছে।”

 আমি ঠাট্টা করিয়া বলিলাম, “পুরুষের বীরত্ব কেবল স্ত্রীর কাছে।”

 স্বামী তৎক্ষণাৎ ম্লানগম্ভীর হইয়া কহিলেন, “সে কথা ঠিক। পুরুষের কেবল অহংকার সার।”

 আমি তাঁহার গাম্ভীর্য উড়াইয়া দিয়া কহিলাম, “অহংকারেও বুঝি তােমরা মেয়েদের সঙ্গে পার? তাহাতেও আমাদের জিত।”

 ইতিমধ্যে দাদা আসিলে আমি দাদাকে বিরলে ডাকিয়া বলিলাম, “দাদা, আপনার সেই ডাক্তারের ব্যবস্থামত চলিয়া এতদিন আমার চোখ বেশ ভালােই হইতেছিল, একদিন ভ্রমক্রমে খাইবার ওষুধটা চক্ষে লেপন করিয়া তাহার পর হইতে চোখ যায়-যায় হইয়া উঠিয়াছে। আমার স্বামী বলিতেছেন, চোখে অস্ত্র করিতে হইবে।”

 দাদা বলিলেন, “আমি ভাবিতেছিলাম, তাের স্বামীর চিকিৎসাই চলিতেছে, তাই আরও আমি রাগ করিয়া এতদিন আসি নাই।"

 আমি বলিলাম, “না, আমি গােপনে সেই ডাক্তারের ব্যবস্থামতই চলিতেছিলাম, স্বামীকে জানাই নাই, পাছে তিনি রাগ করেন।”

 স্ত্রীজন্ম গ্রহণ করিলে এত মিথ্যাও বলিতে হয়! দাদার মনেও কষ্ট দিতে পারি না, স্বামীর যশও ক্ষুণ্ন করা চলে না। মা হইয়া কোলের শিশুকে ভুলাইতে হয়, স্ত্রী হইয়া শিশুর বাপকে ভুলাইতে হয় মেয়েদের এত ছলনার প্রয়ােজন!

 ছলনার ফল হইল এই যে, অন্ধ হইবার পূর্বে আমার দাদা এবং স্বামীর মিলন দেখিতে পাইলাম। দাদা ভাবিলেন, গােপনচিকিৎসা করিতে গিয়া এই দুর্ঘটনা ঘটিল; স্বামী ভাবিলেন, গােড়ায় আমার দাদার পরামর্শ শুনিলেই ভালাে হইত। এই ভাবিয়া দুই অনুতপ্ত হৃদয় ভিতরে ভিতরে ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া পরষ্পরের অত্যন্ত নিকটবর্তী হইল। স্বামী দাদার পরামর্শ লইতে লাগিলেন, দাদাও বিনীতভাবে সকল বিষয়ে আমার স্বামীর মতের প্রতিই নির্ভর প্রকাশ করিলেন।

 অবশেষে উভয়ের পরামর্শক্রমে একদিন একজন ইংরাজ ডাক্তার আসিয়া আমার বাম চোখে অস্ত্রাঘাত করিল। দুর্বল ঢক্ষু সে আঘাত কাটাইয়া উঠিতে পারিল না, তাহার ক্ষীণ দীপ্তিটুকু হঠাৎ নিবিয়া গেল। তাহার পরে বাকি চোখটাও দিনে দিনে অল্পে অল্পে অন্ধকারে আবৃত হইয়া গেল। বাল্যকালে শুভদৃষ্টির দিনে যে চন্দনচর্চিত তরুণমূর্তি আমার সম্মুখে প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল তাহার উপরে চিরকালের মতাে পর্দা পড়িয়া গেল। একদিন স্বামী আমার শয্যাপার্শ্বে আসিয়া কহিলেন, “তােমার কাছে আর মিথ্যা বড়াই করিব না, তােমার চোখদুটি আমিই নষ্ট করিয়াছি।”

 দেখিলাম, তাঁহার কণ্ঠস্বরে অশ্রুজল ভরিয়া আসিয়াছে। আমি দুই হাতে তাঁহার দক্ষিণহস্ত চাপিয়া কহিলাম, “বেশ করিয়াছ, তােমার জিনিস তুমি লইয়াছ। ভাবিয়া