প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/২৮৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


838 গল্পগুচ্ছ পাথর দিয়া কি এমনি করিয়াই ঠকাইতে হয়। . চারার যে-সকল কথায় আদরে ব্যবহারে ভূপতি ভুলিয়াছিল সেগলা মনে আসিয়া তাহাকে মড়, মড়, মড় বলিয়া বেত মারতে লাগিল। অবশেষে তাহার বহন কষ্টের, বহ যত্নের রচনাগুলির কথা যখন মনে উদয় হইল তখন ভূপতি ধরণীকে বিধা হইতে বলিল। অংকুশতাড়িতের মতো চারার কাছে দ্রতপদে গিয়া ভূপতি কহিল, "আমার সেই লেখাগুলো কোথায়।” চার কহিল, “আমার কাছেই আছে।" ভূপতি কহিল, "সেগুলো দাও।” চার তখন ভূপতির জন্য ডিমের কচুরি ভাজিতেছিল; কহিল, "তোমার কি এখনই চাই ।” ভূপতি কহিল, "হাঁ, এখনই চাই।” চার কড়া নামাইয়া রাখিয়া আলমারি হইতে খাতা ও কাগজগুলি বাহির করিয়া আনিল । - ভূপতি অধীরভাবে তাহার হাত হইতে সমস্ত টানিয়া লইয়া খাতাপত্র একেবারে উনানের মধ্যে ফেলিয়া দিল । - চার ব্যস্ত হইয়া সেগলা বাহির করিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “এ কী করলে।” ভূপতি তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া গজন করিয়া বলিল, “থাক।” চার বিস্মিত হইয়া দড়িাইয়া রহিল। সমস্ত লেখা নিঃশেষে পড়িয়া ভস্ম হইয়া গেল । চার বঝিল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। কচুরি ভাজা অসমাপ্ত রাখিয়া ধীরে ধীরে অন্যত্র চলিয়া গেল। চারার সম্মখে খাতা নট করিবার সংকল্প ভূপতির ছিল না। কিন্তু ঠিক সামনেই আগনটা জনলিতেছিল, দেখিয়া কেমন যেন তাহার খন চাপিয়া উঠিল। ভূপতি আত্মসম্বরণ করিতে না পারিয়া প্রবঞ্চিত নিবোধের সমস্ত চেষ্টা বঞ্চনাকারিণীর সম্মুখেই আগনে ফেলিয়া দিল। - সমস্ত ছাই হইয়া গেলে ভূপতির আকস্মিক উন্দামতা যখন শান্ত হইয়া আসিল তখন চার্য আপন অপরাধের বোঝা বহন করিয়া যেরপে গভীর বিষাদে নীরব নতমখে চলিয়া গেল তাহা ভূপতির মনে জাগিয়া উঠিল—সম্মুখে চাহিয়া দেখিল, ভূপতি বিশেষ করিয়া ভালোবাসে বলিয়াই চার বহতে যত্ন করিয়া খাবার তৈরি করিতেছিল। ভূপতি বারান্দার রেলিঙের উপর ভর দিয়া দাঁড়াইল। মনে মনে ভাবিতে লাগিল তাহার জন্য চারর এই যে-সকল অশ্রান্ত চেষ্টা, এই যে-সমস্ত প্রাণপণ বণ্টনা, ইহা । অপেক্ষা সকরণ ব্যাপার জগৎসংসারে আর কী আছে। এই সমস্ত বঞ্চনা এ তো ছলনাকারিণীর হেয় ছলনামাত্র নহে; এই ছলনাগলির জন্য ক্ষতহদয়ের ক্ষতযন্ত্রণা চতুগণে বাড়ইয়া অভাগিনীকে প্রতিদিন প্রতিম হতে হৎপিণ্ড হইতে রক্ত নিপেষণ করিয়া বাহির করিতে হইয়াছে। ভূপতি মনে মনে কহিল, ‘হায় অবলা, হায় দুঃখিনী! দরকার ছিল না, আমার এ-সব কিছুই দরকার ছিল না। এতকাল আমি তো ভালোবাসা না পাইয়াও পাই নাই বলিয়া জানিতেও পারি নাই-আমার তো কেবল প্রফে দেখিয়া কাগজ লিখিয়াই চলিয়া গিয়াছিল; আমার জন্য এত করিবার কোনো দরকার ছিল না।’