প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:গল্পগুচ্ছ (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৪

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২৫৫
প্রায়শ্চিত্ত

যে শুনিল সকলেই খুশি হইয়া উঠিল।

 আনন্দে গর্বে বিন্ধ্যবাসিনীর প্রীতিসুধাসিক্ত কোমল হৃদয়টি সর্বত্র উচ্ছ্বসিত হইতে লাগিল। সে মনে মনে কহিল, “বিলাত হইতে যিনিই আসেন একেবারে আস্ত বিলাতি সাহেব হইয়া আসেন, দেখিয়া বাঙালি বলিয়া চিনিবার যো থাকে না। কিন্তু আমার স্বামী একেবারে অবিকৃতভাবে ফিরিয়াছেন, বরঞ্চ তাঁহার হিন্দুধর্মে ভক্তি পূর্বাপেক্ষা আরও অনেক বাড়িয়া উঠিয়াছে।

 যথানির্দিষ্ট দিনে ব্রাহ্মণপণ্ডিতে রাজকুমারবাবুর ঘর ভরিয়া গেল। অর্থব্যয়ের কিছুমাত্র ত্রুটি হয় নাই। আহার এবং বিদায়ের আয়ােজন যথােচিত হইয়াছিল।

 অন্তঃপুরেও সমারােহের সীমা ছিল না। নিমন্ত্রিত পরিজনবর্গের পরিবেশন ও পরিচর্যায় সমস্ত প্রকোষ্ঠ ও প্রাঙ্গণ সংক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। সেই ঘােরতর কোলাহল এবং কর্মরাশির মধ্যে বিন্ধ্যবাসিনী প্রফুল্লমুখে শারদরৌদ্ররঞ্জিত প্রভাত-বায়ুবাহিত লঘু মেঘখণ্ডের মতাে আনন্দে ভাসিয়া বেড়াইতেছিল। আজিকার দিনের সমস্ত বিশ্বব্যাপারের প্রধান নায়ক তাহার স্বামী। আজ যেন সমস্ত বঙ্গভূমি একটিমাত্র রঙ্গভূমি হইয়াছে এবং যবনিকা-উদ্‌ঘাটন-পুর্বক একমাত্র অনাথবন্ধুকে বিস্মিত বিশ্বদর্শকের নিকট প্রদর্শন করাইতেছে। প্রায়শ্চিত্ত যে অপরাধস্বীকার তাহা নহে, এ যেন অনুগ্রহপ্রকাশ। অনাথ বিলাত হইতে ফিরিয়া হিন্দুসমাজে প্রবেশ করিয়া হিন্দুসমাজকে গৌরবান্বিত করিয়া তুলিয়াছেন। এবং সেই গৌরবচ্ছটা সমস্ত দেশ হইতে সহস্র রশ্মিতে বিচ্ছুরিত হইয়া বিন্ধ্যবাসিনীর প্রেমপ্রমুদিত মুখের উপরে অপরূপ মহিমাজ্যোতি বিকীর্ণ করিতেছে। এতদিনকার তুচ্ছ জীবনের সমস্ত দুঃখ এবং ক্ষুদ্র অপমান দূর হইয়া সে আজ তাহার পরিপূর্ণ পিতৃগৃহে সমস্ত আত্মীয়স্বজনের সমক্ষে উন্নতমস্তকে গৌরবের আসনে আরােহণ করিল। স্বামীর মহত্ত্ব আজ অযােগ্য স্ত্রীকে বিশ্বসংসারের নিকট সম্মানাস্পদ করিয়া তুলিল।

 অনুষ্ঠান সমাধা হইয়াছে। অনাথবন্ধু জাতে উঠিয়াছেন। অভ্যাগত আত্মীয় ও ব্রাহ্মণ -গণ তাঁহার সহিত একাসনে বসিয়া তৃপ্তিপূর্বক আহার শেষ করিয়াছেন।

 আত্মীয়েরা জামাতাকে দেখিবার জন্য অন্তঃপুরে ডাকিয়া পাঠাইলেন। জামাতা সুস্থচিত্তে তাম্বুল চর্বণ করিতে করিতে প্রসন্নহাস্যমুখে আলস্যমন্থরগমনে ভূমি-লুণ্ঠ্যমান চাদরে অন্তঃপুরে যাত্রা করিলেন।

 আহারান্তে ব্রাহ্মণগণের দক্ষিণার আয়ােজন হইতেছে এবং ইত্যবসরে তাঁহারা সভাস্থলে বসিয়া তুমল কলহ-সহকারে পাণ্ডিত্য বিস্তার করিতেছেন। কর্তা রাজকুমারবাবু ক্ষণকাল বিশ্রাম উপলক্ষে সেই কোলাহলাকুল পণ্ডিতসভায় বসিয়া স্মৃতির তর্ক শুনিতেছেন, এমন সময় দ্বারবান গৃহস্বামীর হস্তে এক কার্ড্ দিয়া খবর দিল, “এক সাহেবলােগ্‌কা মেম আয়া।”

 রাজকুমারবাব, চমৎকৃত হইয়া উঠিলেন। পরক্ষণেই কার্ডের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, তাহাতে ইংরাজিতে লেখা রহিয়াছে—মিসেস অনাথবন্ধু সরকার। অর্থাৎ, অনাথবন্ধু সরকারের স্ত্রী।

 রাজকুমারবাবু অনেক ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া কিছুতেই এই সামান্য একটি শব্দের অর্থগ্রহ করিতে পারিলেন না। এমন সময়ে বিলাত হইতে সদ্যপ্রত্যাগতা আরক্ত কপােলা আতাম্রকুন্তলা আনীললােচনা দুগ্ধফেনশুভ্রা হরিণলঘুগামিনী ইংরাজমহিলা