পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/৭৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
রামপাল।

সেনের দেবপাড়া-প্রশস্তিতে উক্ত হইয়াছে, বিজয়সেনের পিতামহ সামন্তসেন “একাঙ্গ (এক প্রকার) সেনা লইয়া, অরিকুলাকীর্ণ-কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারি দুর্বৃত্তগণকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন” (৮ শ্লোক); এবং শেষ বয়সে, গঙ্গাতীরবর্ত্তী পুণ্যাশ্ৰমনিচয়ে বিচরণ করিয়াছিলেন (৯ শ্লোক)। আবার বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেনের [কাটোয়ায় প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে—“চন্দ্রবংশে অনেক রাজপুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন;………তাঁহারা সদাচারপালন-খ্যাতিগর্ব্বে রাঢ়দেশকে অননুভূতপূর্ব্ব প্রভাবে বিভূষিত করিয়াছিলেন (৩ শ্লোক)।” এই রাজপুত্ৰগণের বংশে “শক্রসেনা-সাগরের প্রলয়-তপন সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন (8 শ্লোক)।” এই উভয় বিবরণে আপাতত বিরোধ দেখা যায়। প্রথম লিপি অনুসারে মনে হয়, সামন্তসেন শেষ বয়সে কর্ণাট ত্যাগ করিয়া, তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে, বাঙ্গালায় আসিয়াছিলেন। দ্বিতীয় লিপিতে দেখা যায়, তাঁহার পূর্ব্বপুরুষেরা রাঢ়-নিবাসী ছিলেন। অথচ এই দুইটি লিপি প্রায় একই সময়ে রচিত। এইরূপ তুল্যকালীন লিপিতে এত বিরোধ-কল্পনা অসম্ভব। কিন্তু যদি অনুমান করা যায়, রাঢ়দেশ কর্ণাট-রাজের পদানত ছিল, এবং কর্ণাট-রাজ কর্ত্তৃক রাঢ়-শাসনাৰ্থ নিয়োজিত, [লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর-তাম্রশাসনে কথিত] “কর্ণাটক্ষত্ৰিয়”-বংশজাত রাজপুত্রগণের বংশে সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করিয়া, রাঢ়দেশেই কর্ণাটরাজের শক্রগণের সহিত যুদ্ধে রত ছিলেন, তাহা হইলে এই বিরোধের ভঞ্জন হয়। বিহ্লন-বিবৃত চালুক্য-রাজকুমার বিক্রমাদিত্য কর্ত্তৃক গৌড়াধিপের এবং [হয়ত গৌড়াধিপের সাহায্যার্থ আগত] কামরূপাধিপের পরাজয়-বৃত্তান্ত এই অনুমানের অনুকূল প্রমাণরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। চন্দেল্ল-রাজ কীর্ত্তিবর্ম্মার (রাজত্ব ১০৪৯-১১০০ খৃষ্টাব্দ) আশ্রিত “প্রবোধ-চন্দ্রোদয়”-রচয়িতা কৃষ্ণমিশ্র যাহাকে “গৌড়ং রাষ্ট্রমনুত্তমং নিরুপমা তত্ৰাপি রাঢ়া” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, কুমার বিক্রমাদিত্য গৌড়াধিপকে পরাজিত করিয়া, সেই রাঢ়দেশ গৌড়-রাষ্ট্র হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়াছিলেন। নবজিত রাঢ়-শাসনাৰ্থ কর্ণাট-রাজ যে রাজপুত বা ক্ষত্রিয় সেনা-নায়ককে নিয়োগ করিয়াছিলেন, সামন্তসেন তাঁহারই বংশধর। সামন্তসেন একাদশ শতাব্দের চতুর্থপাদে বিদ্যমান ছিলেন, একথা স্বীকার করিলেই, এই অনুমানকে প্রমাণরূপে গ্রহণের আর আপত্তি থাকে না। সামন্তসেন যে একাদশ শতাব্দের শেষপাদেই প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন, তাহা সেন-রাজগণের কালনির্ণয়-প্রসঙ্গে প্রদর্শিত হইবে।

 মহীপাল, শূরপাল, এবং রামপাল, এই তিন পুত্র বর্ত্তমান রাখিয়া, তৃতীয় বিগ্রহপাল পরলোক গমন করিয়াছিলেন। “রামচরিত”-কাব্যে তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্রের এবং পৌত্রগণের রাজত্বের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে।[১] “রামচরিত”-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দী বরেন্দ্রী-মণ্ডলে “শ্রীপৌণ্ড্রবৰ্দ্ধনপুর-প্রতিবদ্ধ” ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা প্রজাপতি নন্দী

  1. Ramacharita by Sandhyākara Nandi, Edited by Mahāmahopādhyāya Haraprasād Sāstri M. A. (Memoirs of the A. S. B., Vol. III, No. 1).

৪৭