পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/৮

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

উপক্রমণিকা।

হইয়া রহিয়াছে! জনশ্রুতির দোহাই দিয়া, [এক শ্রেণীর গ্রন্থে] দেশের অবস্থা-সম্বন্ধে যে সকল আলোচনার সূত্রপাত হইতেছে, তাহাতে ঐতিহাসিক বিচার-প্রণালী মর্য্যাদা লাভ করিতেছেনা। এই সকল কারণে, গৌড়রাজমালার লেখক মহাশয় ভিত্তিহীন জনশ্রুতির উপর নির্ভর করিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই বলিয়া, বাঙ্গালীর জনশ্রুতি-মূলক ইতিহাসের প্রধান পাত্র [আদিশূর] ঐতিহাসিক ব্যক্তিরূপে মর্য্যাদা লাভ করিতে পারেন নাই। এখনও তাম্রশাসনে বা শিলালিপিতে বা সমকালবর্ত্তী গ্রন্থে আদিশূরের অসন্দিগ্ধ পরিচয় প্রকাশিত হয় নাই। সমসাময়িক গ্রন্থে বা লিপিতে উল্লিখিত ঐতিহাসিক পাত্রগণের প্রকৃত বিবরণ সঙ্কলনেও কিরূপ সতর্ক দৃষ্টিতে বিচার-কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতে হইবে, সুযোগ্য লেখক মহাশয় “গৌড়াধিপ শশাঙ্কের” প্রসঙ্গে তাহার যথেষ্ট পরিচয় প্রদান করিয়াছেন।

 পক্ষান্তরে, “গৌড়রাজমালায়” দেখিতে পাওয়া যাইবে,—পাল-নরপালগণের অভ্যুদয়-লাভের অব্যবহিত পূর্ব্বে, সমগ্র দেশ বহুসংখ্যক খণ্ড-রাজ্যে বিভক্ত ছিল; সমগ্র দেশের উপর কাহারও কোন রূপ আধিপত্য বিদ্যমান ছিল না; বাহুবল প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল; সবলের কবলে দুর্ব্বলদল নিপীড়িত হইতেছিল; দেশ একেবারে ‘অরাজক’ হইয়া পড়িয়াছিল! সংস্কৃত-সাহিত্যে এরূপ অবস্থার নাম “মাৎস্য ন্যায়”। তাহাকে বিদূরিত করিবার অভিপ্রায়ে, প্রজাপুঞ্জ গোপালদেবকে রাজা নির্ব্বাচিত করিয়াছিল। তিনিই পাল-নরপালবংশের প্রথম ভূপাল,—ইতিহাসে “প্রথম গোপালদেব” নামে উল্লিখিত।

 এ দেশের প্রজাপুঞ্জ, অরাজকতা দূর করিবার জন্য, এক বার এক জনকে রাজা নির্ব্বাচিত করিয়া, প্রজাশক্তির বিধিদত্ত অমোঘ বলের পরিচয় প্রদান করিয়াছিল,—ইহা বাঙ্গালীর ইতিহাসের সর্ব্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পৃথিবীর কোন্ কোন্ দেশে, কোন্ কোন্ সময়ে, প্রজাশক্তির এরূপ উন্মেষ লক্ষিত হইয়াছে, তাহার আলোচনার সময়ে, বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি স্মরণ করিবার যোগ্য।

 বাঙ্গালী ইহার কথা একেবারে বিস্মৃত হইয়া গিয়াছে! লামা তারানাথের [তিব্বতীয় ভাষা-নিবদ্ধ] গ্রন্থে এতদ্বিষয়ক জনশ্রুতির উল্লেখ থাকিলেও, এবং বঙ্গদেশে এই জনশ্রুতির আভাস লৌকিক উপকথায় গ্রথিত রহিলেও, তাহাকে কেহ ঐতিহাসিক ঘটনা বলিয়া গ্রহণ করেন নাই। কিন্তু গোপালদেবের পুত্র ধর্ম্মপালদেবের [মালদহের অন্তর্গত খালিমপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে ইহা স্পষ্টাক্ষরে উল্লিখিত থাকায়, এই উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইতিহাসের মর্য্যাদা লাভ করিয়াছে। এই রূপে, [প্রজাশক্তির সাহায্যে] যে সাম্রাজ্য সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহা সমগ্র উত্তরাপথে [আর্য্যাবর্ত্তে] প্রভুত্ব লাভ করিয়াছিল। তাহার কথা এখনও বঙ্গসাহিত্যে যথাযোগ্য ভাবে আলোচিত হয় নাই। এই গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কথাই “গৌড়রাজমালার” প্রধান কথা। গৌড়-বিবরণের অন্যান্য ভাগে [শিল্পকলায়, বিবরণমালায়, লেখমালায়, গ্রন্থমালায়, জাতিতত্ত্বে, শ্রীমূর্ত্তিতত্ত্বে, এবং উপাসক-সম্প্রদায়ে] যাহা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে, তাহারও

৷৹