পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/৮৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

গৌড়রাজমালা।

সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার হইতে মহারাজাধিরাজ-জ্যোতিবর্ম্ম-পাদানুধ্যাত-পরমবৈষ্ণব-পরমেশ্বর-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ-শ্রীহরিবর্ম্মদেব” ভূমিদান করিতেছেন। ভট্ট-ভবদেব-বালবলভী-ভুজঙ্গের প্রশস্তিতে উক্ত হইয়াছে,—সাবর্ণমুনির বংশধর শ্রোত্রিয়গণ যে সকল গ্রামে বাস করিতেন, তন্মধ্যে রাঢ় বা রাঢ়দেশের অলঙ্কার সিদ্ধলগ্রাম সর্ব্বাগ্রগণ্য। এই গ্রামের একটি সমুন্নত বংশে (প্রথম) ভবদেব জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি গৌড়নৃপ হইতে হস্তিনীভিট্ট নামক গ্রাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই ভবদেবের পুত্র রথাঙ্গ। রথাঙ্গের পুত্র অত্যঙ্গ। অত্যঙ্গের পুত্র স্ফুরিত-বুধ। স্ফুরিত-বুধের পুত্র আদিদেব। আদিদেব বঙ্গরাজের মহামন্ত্ৰী-মহাপাত্র-সন্ধিবিগ্রহী ছিলেন। আদিদেবের পুত্র গোবর্দ্ধন। গোবর্দ্ধন জনৈক বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণের দুহিতার [সাঙ্গোকার] পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। গোবর্দ্ধন এবং সাঙ্গোকার পুত্র ভবদেব-বালবলভীভুজঙ্গ দীর্ঘকাল হরিবর্ম্মদেবের মন্ত্রী ছিলেন, এবং পরে হরিবর্ম্মদেবের পুত্রেরও মন্ত্রিপদারূঢ় ছিলেন। এই দ্বিতীয় ভবদেব রাঢ়দেশে একটি জলাশয় খনন করাইয়াছিলেন; এবং ভুবনেশ্বরে মন্দির নির্ম্মাণ করাইয়া, সেই মন্দিরে নারায়ণ, অনন্ত এবং নৃসিংহমূর্ত্তি স্থাপিত করিয়াছিলেন।

 এই প্রশস্তি যে কেবল বর্ম্ম-রাজবংশের এবং দ্বাদশ শতাব্দীর রাঢ়-বঙ্গের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশের ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে আলোক দান করে এমন নহে, ইহা বাঙ্গালার ইতিহাসের আরও একটি গুরুতর প্রশ্নের মীমাংসার সহায়তা করে। এই গুরুতর প্রশ্ন,—আদিশূর ঐতিহাসিক ব্যক্তি কি না? আদিশূর নামক যে প্রকৃত একজন রাজা ছিলেন, এ বিষয়ে কেহ কখনও সন্দেহ করেন নাই। আদিশূর কখন কোন্ স্থানে রাজত্ব করিয়া গিয়াছেন, এই কথা লইয়াই বহু দিন বাদানুবাদ চলিতেছে। কিন্তু ভট্ট-ভবদেবের ভুবনেশ্বরের প্রশস্তি পাঠ করিলে, আদিশূরের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সন্দেহ উপস্থিত হয়। “গৌড়রাজমালায়” আদিশূর স্থান পাইতে পারেন কি না, এ স্থলে

    সমসাময়িক। সুলতান মামুদের আক্রমণ-সময়ে যিনি কান্যকুব্জের অধীশ্বর এবং মুসলমান লেখকগণ যাঁহাকে “রায় জয়পাল” বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, তিনি প্ৰতীহার-রাজ রাজ্যপাল, এ কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। কুলগ্রন্থ এই রাজ্যপালের কোন খবর দিতে পারে কিনা জানি না। সুতরাং এই হিসাবে হরিবর্ম্মার সময় নিরূপণের জন্য বসুমহাশয় যে সকল যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা অমূলক। হরিবর্ম্মার আবির্ভাবকাল সম্বন্ধে প্রধান সাক্ষী হরিবর্ম্মার তাম্রশাসনের এবং ভট্টভবদেবের ভুবনেশ্বর-প্রশস্তির অক্ষর। বসু মহাশয় প্রকাশিত উক্ত তাম্রশাসনের অস্পষ্ট প্রতিকৃতির যে কয়টি অক্ষর বুঝা যায়, তাহা বিজয়সেনের দেবপাড়া প্রশস্তির অনুরূপ। দৃষ্টান্তস্থলে আমরা ত, ম, এবং সএর উল্লেখ করিব। ভট্ট-ভবদেবের ভুবনেশ্বর-প্রশস্তি সম্বন্ধে কিল্‌হৰ্ণ লিখিয়াছেন,–“On palæographical grounds I do not hesitate to assign this record, like the preceding one, to about A. D. 1200 (Epigraphia Indica, Vol. VI, p. 205).” কিল্‌হৰ্ণ “preceding one” বলিয়া যে লিপির উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা ত্রিকলিঙ্গপতি প্রথম অনিয়ঙ্কভীমের সময়ের স্বপ্নেশ্বরদেবের প্রশস্তি। প্রথম অনিয়ঙ্কভীম ১১৯২ খৃষ্টাব্দে কলিঙ্গের সিংহাসনে আরোহণ করিয়া, দশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। সুতরাং স্বপ্নেশ্বরদেবের শিলালিপির সময় সম্বন্ধে আর কোন সংশয় হইতে পারে না। ভট্টভবদেবের প্রশস্তির অক্ষর স্বপ্নেশ্বরের লিপির ঠিক অনুরূপ বলিয়া, কিল্‌হৰ্ণ এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন। কিল্‌হৰ্ণ-কথিত ঠিকঠাক ১২০০ খৃষ্টাব্দ ভট্ট-ভবদেবের প্রশস্তির কাল না হইলেও, অক্ষরের হিসাবে, হরিবর্ম্মার তাম্রশাসন এবং ভবদেবের প্রশস্তি দ্বাদশ শতাব্দের পূর্ব্বে ঠেলিয়া লওয়া যায় না।

৫৬