পাতা:প্রবাসী (দ্বাত্রিংশ ভাগ, প্রথম খণ্ড).djvu/৪৮৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

নরদেবতা শ্ৰীমুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাচীন জাপানী সমাজে বিপদ-আপদে পরস্পরের সাহায্য করা মানুষের প্রধান কৰ্ত্তব্য ছিল । অগ্নিকাণ্ড ঘটিলে ত কথাই নাই, প্রত্যেক ময়নারী অবিলম্বে সব কাজ ফেলিয়। আগুন নিবাইতে ছুটত। এ কৰ্ত্তব্য হইতে বালকবালিকারও রেহাই ছিল না। শহরে ভিন্ন ব্যবস্থা থাকিলেও পল্লীগ্রামে ইহাই ছিল বিধি। দে-বিধি অমান্ত করিতে কহ সাহস করিত না । ] হামাগুচির বয়স হইয়াছে । দীর্ঘকাল গ্রামের মোড়লি করিয়া বর্তমানে তাহার প্রভাব-প্রতিপত্তির আর সীমা নাই। লোকে তাহাকে ‘ওজিসান' বা ঠাকুর্দা বলিয়৷ gাকে—সে সকলেরই শ্রদ্ধা ও প্রীতির পাত্র । ধনসম্পত্তিও |ার সকলের চেয়ে বেশি। ছোটখাট চাষীদের পরামর্শ দিয়া, অভাবের সময় টাকা ধার দিয়া, ভাল দরে ক্ষেতের ধান বিক্রীর ব্যবস্থা করিয়া, বিবাদ-বিসম্বাদে মধ্যস্থত। করিয়া, বিপদে সহায় হইয়া সে এই শ্রদ্ধা ও প্রীতি অর্জন করিয়াছে । উপসাগরের উপরে ছোট মালভূমি । তাহারই এক প্রাস্তে হামাগুচির মস্ত গোলাবাড়ি । মালভূমির উপর প্রধানত ধানের চাষ ; তার তিন দিকে ঘনবনে ঢাক গিরিচুড়ার দেওয়াল। যে দিকটি খোলা সেই দিকের জমি বিশাল সবুজ এক গহ্বর রচনা করিয়া জলের ধার পর্য্যন্ত নামিয়া গিয়াছে—দেখিলে মনে হয় কে যেন ভিতরটা কুরিয়া লইয়াছে। এই ঢালুর সমস্তটা–দৈর্ঘ্যে প্রায় আধক্রোশ—এমন থাকে থাকে উঠিয়াছে যে সমুদ্রের উপর হইতে প্রকাও সবুজ সিড়ির মত দেখায়। তার মাঝখানে একটা সরু সাদা আঁকাবাকা রেখা—এক ফালি পার্বত্য পথ। উপসাগরের বঁাকের মাথায় আসল গ্রাম—- নব্বইটি চালাঘর ও একটি শিন্তে মন্দির। হামাগুচির বাড়ি যাইবার সরুপথের দুইধারে কিছুদূর পর্যন্ত ঢালু বাহিয়া অন্যান্য থানুকয় কুটার কষ্টেশ্বটে উঠিয়াছে। শরৎকালে একদিন অপরাহ্লে নীচেকার গ্রামে উৎসবের আয়োজন হইতেছিল। বাড়ির বারানায় দাড়াইয়া নতমুখে হামাগুচি তাহাই দেখিতেছে। এবার ফসল ফলিয়াছে প্রচুর । ধানকাটা শেষ হইয়াছে— তদুপলক্ষে শিন্তে মন্দির-প্রাঙ্গণে চাষীদের এই নৃত্যোৎসবের আয়োজন। বুড়া দেখিতেছে—নির্জন পথে চালাঘরের মাথায় উৎসবের কেতন, পথের ধারে পোতা সারবনি বাশের গায়ে কাগজের লন্ঠনের মালা, স্থসজ্জিত মন্দির আর শিশুদের পোষাকে উজ্জ্বল রঙের বাহার । বুড়ার সঙ্গে কেহ নাই, আছে কেবল এক বালক নাতি, তার বয়স দশ বৎসর। পরিবারের অন্যান্য সকলে ইতিপূর্বেই গ্রামে নামিয়া গেছে । সেও তাহদের সঙ্গেই যাইত, শরীরটা কাহিল বোধ করায় যায় নাই । সারাদিন গুমট করিয়া ছিল। এখন একটু বাতাস উঠিলেও শূন্যে একটা গুরুভার উত্তাপ—জাপানী চাষীরা জানে কোনো কোনো ঋতুতে উহা ভূকম্পনের পূর্বলক্ষণ। এবং হইলও তাই—দেখিতে দেখিতে ভূমিতল দুলিয়া উঠিল। কম্পনের বেগ এমন নয় যে কেহ ভয় পাইবে, কিন্তু শত শত ভূকম্পনের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও হামাগুচির কাছে উহা যেন কেমন কেমন ঠেকিল—একটা বিলম্বিত মন্থর নাচুনে গতি। হয় ত উহা বহুদূরের একটা বিরাট ভূকম্পের জের মাত্র। বাড়িটা মটমট করিয়া উঠিল, কয়েকবার ধীরে ধীরে দুলিল, তারপর সব স্থির। কাপন থামিলে হামাগুচির তীক্ষ্ণদৃষ্টি শঙ্কিতভাবে গ্রামের পানে ফিরিল। এমন প্রায়ই হয় যে, কোনো ব্যক্তি একটি বিশেষ স্থান বা পদার্থের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়া আছে ; হঠাৎ তার মনোযোগ অপসারিত হইল অপর কিছুর অনুভূতির দ্বার, যাহা যে, সজ্ঞানে দেখেই নাই—অজানার একটা অনির্দিষ্ট অনুভূতি, যাহা প্রত্যক্ষ দৃষ্টির ক্ষেত্রের বাহিরে অচেতন দৃষ্টির অস্পষ্ট সীমান্তে বিরাজিত। এইরূপ একটা অহঙ্কৃতির দ্বার হামুগুচি