পাতা:বক্সা ক্যাম্প.djvu/৩০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালী। বিষ্ণুর সৃজনীশক্তিকে আমরা বলিয়া থাকি লক্ষ্মী, আর রুদ্রের প্রলয়-শক্তিকে বলি কালী। পূর্ববাঙলাকে আমি বলিতে চাই মহালক্ষ্মীর পাদপীঠ, আর বীরভূমিকে বলিব মহাকালীর পাদভূমি। শক্তির রুদ্রমুখ বীরভূমির মাটিতে আমি দেখিতে পাইলাম, আর আমার পূর্ববাঙলায় দেখিয়াছি শক্তির দক্ষিণ মুখ, কল্যাণময়ী মাতৃশক্তি।

 রুদ্রশক্তি ও মাতৃশক্তি—দুইটী বিপরীত প্রকাশ সত্য, কিন্তু দুই-ই আমার আপন। অর্থাৎ ট্রেণের জানালায় বসিয়া যে-বীরভূমিকে আমার মানসনেত্রে দেখিতে পাইলাম, তাকেও আমি ভালো বাসিয়া ফেলিলাম।

 সন্ধ্যার পরে গাড়ি হাওড়া স্টেশনে ঢুকিল। মালপত্র লরীতে উঠানো হইল, তারপর এক সময়ে আমাদের মোটর বাহির হইয়া আসিল। গাড়ির গতির সঙ্গে রক্তে আমাদের বেগ সঞ্চারিত হইল।

 গঙ্গার উপর দিয়া চলিয়াছি—শরীর ও মনে রোমাঞ্চ লাগিল। আচ্ছা, লোকগুলি অমন নিস্তেজ উৎসাহীনভাবে পথ চলে কেন? নদীর উপর দিয়া চলিয়াছে, এ তারা খেয়াল করে না কেন? মুক্তভাবে যথেচ্ছ চলাফেরার অধিকার যে কত বড় অধিকার, তা কি ইহারা জানে না? জানিলে সে-সৌভাগ্যের এমন অপব্যবহার করে কেমন করিয়া?

 হঠাৎ মনে হইল, যখন মুক্ত ছিলাম, তখন সহজ-প্রাপ্য আলো-বাতাস-জলমাটিকে আমরাও এমন অবহেলা করিয়াছি। সহজ-প্রাপ্য বস্তু বড় সহজে পাইয়াছি বলিয়াই তার অর্থ ও মূল্য বুঝিতে পারি নাই। দীর্ঘ দিন জেলে থাকার ফলে আজ আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি যে, জল-বাতাস-আলো সহজে পাই বলিয়াই আসলে সহজ নয়, তাকে গ্রহণ করিবার জন্য সৌভাগ্য ও সাধনা দুই-ই দরকার।

 ভাসমান পুলের দুই দিকে উত্তরে ও দক্ষিণে প্রসারিত গঙ্গার দিকে তাকাইলাম। ভারতবর্ষের গঙ্গা! হিমালয়ের দুর্গম গিরিভবন হইতে মানস সরোবরের জল লইয়া সাগরে চলিয়াছে। সারা পথটা দুই হাতে উদার

২১