পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১১৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১২ বাটিতেছে। কোথাও বা ভাণ্ডারমধ্যে দাসী, পাচিক এবং ভাণ্ডারের রক্ষাকারিণী এই তিন জনে তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত। ভাণ্ডারকত্রী তর্ক করিতেছেন যে, বে ঘৃত দিয়াছি, তাহাই ন্যায্য খরচ —পাচিক তর্ক করিতেছে যে, হায্য খরচে কুলাইবে কি প্রকারে ? দাসী তর্ক করিতেছে যে, যদি ভাণ্ডারের চাবি খোলা থাকে, তাহা হইলে আমরা কোনরূপে কুলাইয়া দিতে পারি। ভাতের উমেদারীতে অনেকগুলি ছেলে-মেয়ে, কাঙ্গালী, কুকুর বসিয়া আছে। বিড়ালেরা উমেদারী করে না--তাহার অবকাশ মতে “দোষভাবে পরগৃহে প্রবেশ” করত বিনা অনুমতিতেই খাদ্য লইয়া যাইতেছে । কোথাও অনধিকারপ্রবিষ্ট কোন গাভী লাউয়ের খোলা, বে গুনের ও পটলের বোট এবং কলার পাত অমৃতবোধে চক্ষু বুজিয়৷ চৰ্ব্বণ করিতেছে । এই তিন মহল অন্দরমহলের পর পুষ্পোপ্তান । পুষ্পোদ্যানপরে নীলমেঘখণ্ডতুল্য প্রশস্ত দীর্ঘিকা । দীধিক প্রাচীরবেষ্টিত ! ভিতর-বাটীর তিন মহল ও পুষ্পোদ্যানের মধ্যে খিড়কীর পথ । তাহার দুই মুখে দুই দ্বার । সেই দুই খিড়কী । ঐ পথ দিয়া অন্দরের তিন মহলেই প্রবেশ করা যায়। বাটীর বাহিরে আস্তাবল, হাতিশাল, কুকুরের স্বর, গোশালা, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি স্থান ছিল । কুন্দনন্দিনী, বিস্মিতনেত্রে নগেন্দ্রের অপরিমিত ঐশ্বৰ্য্য দেখিতে দেখিতে শিবিকারোহণে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল। সে সূর্যমুখীর নিকট আনীত হইয়া তাহাকে প্রণাম করিল, সূৰ্য্যমুখী আশীৰ্ব্বাদ করিলেন । নগেন্দ্রসঙ্গে স্বপ্নদৃষ্ট পুরুষরূপের সাদৃশ্ব অনুভব করিয়া কুন্দনন্দিনীর মনে মনে এমন সন্দেহ জন্মিয় ছিল যে, তাহার পত্নী অবং তৎপরপৃষ্ট স্ত্রীমূৰ্বির সদৃশরূপা হইবেন ; কিন্তু স্বৰ্য্যমুখীকে দেখিয়া সে সন্দেহ দূর হইল। কুন্দ দেখিল ষে, স্বৰ্য্যমুখী আকাশপটে দৃষ্ট নারীর ন্যায় খামাঙ্গী নহে। স্বৰ্য্যমুখী পূর্ণচন্দ্রতুল্য তপ্তকাঞ্চনবর্ণ । তাহার চক্ষু স্বন্দর বটে, কিন্তু কুন্দ যে প্রকৃতির চক্ষু স্বপ্নে দেখিয়াছিল, এ সে চক্ষু নহে। স্বৰ্য্যমুখীর চক্ষু সুদীর্ঘ, অলকম্পর্শী ক্রযুগসমাশ্রিত, কমনীয় বঙ্কিমপল্লবরেখার মধ্যস্থ, স্থূলকৃষ্ণতারাসনাথ, মগুলাংশের আকারে ঈষৎ স্ফীত, উজ্জল অথচ মন্দগতিবিশিষ্ট। স্বপ্নদৃষ্ট শুামাঙ্গীর চক্ষুর এরূপ অলৌকিক মনোহারিত্ব ছিল না। স্বৰ্য্যমুখীর অবয়বও সেরূপ নহে। স্বপ্নদৃষ্ট খৰ্ব্বাকৃতি, স্বৰ্য্যমুখীর আকার কিঞ্চিৎ দীর্ঘ, বাতান্দোলিত লতার স্তায় সেন্দিৰ্য্যভরে তুলিতেছে। স্বপ্নদৃষ্ট স্ত্রীমূৰ্ত্তি সুন্দরী বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী । 婷 কিন্তু স্বৰ্য্যমুখী তাহার অপেক্ষা শতগুণে সুন্দরী। আর স্বপ্নদৃষ্টার বয়স বিংশতির অধিক বোধ হয় নাই -স্বৰ্য্যমুখীর বয়স প্রায় ষড়বিংশতি। স্বৰ্য্য মুখীর সঙ্গে সেই মূৰ্ত্তির কোন সাদৃপ্ত নাই দেখিয়া কুন্দ স্বচ্ছন্দচিত্ত হুইল । স্বৰ্য্যমুখী কুন্দকে সাদর-সম্ভাষণ করিয়া, তাহার পরিচর্য্যার্থ দাসীদিগকে ডাকিয়া আদেশ করিলেন এবং তন্মধ্যে যে প্রধান, তাহাকে কহিলেন যে, “এই কুন্দের সঙ্গে আমি তারাচরণের বিবাহ দিব । অতএব ইহাকে তুমি আমার ভাইজের মত ষত্ব করিবে ।” দাসী স্বীকৃত হইল। কুন্দকে সে সঙ্গে করিয়া কক্ষান্তরে লইয়া চলিল। কুন্দ এতক্ষণে তাহার প্রতি চাহিয়া দেখিল । দেখিয়া কুন্দের শরীর কণ্টকিত এবং আপাদমস্তক স্বেদাক্ত হইল । যে স্ত্রীমূৰ্ত্তি কুন্দ স্বপ্নে মাতার অঙ্গুলীনির্দেশক্রমে আকাশপটে দেখিয়াছিল, এই দাসীই সেই পদ্মপলাশলোচনা শু্যামাঙ্গী : কুন্দ ভীতিবিহবলা হইয়া, মৃত্যুনিক্ষিপ্ত শ্বাসে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে গা ?” দাসী কহিল, “আমার নাম হীর ” অষ্টম পরিচ্ছেদ পাঠক মহাশয়ের বড় রাগের কারণ এইখানে পাঠক মহাশয় বড় বিরক্ত হইবেন । আখ্যায়িক গ্রন্থের প্রথা আছে যে, বিবাহটা শেষে হয়, আমরা আগেই কুন্দনন্দিনীর বিবাহ দিতে বসিলাম । আর ও চিরকালের প্রথা আছে যে, নায়িকার সঙ্গে যাহার পরিণয় হয়, সে পরম সুন্দর হইবে, সৰ্ব্ব গুণে ভূষিত, বড় বীরপুরুষ হইবে এবং নায়িকার প্রণয়ে ঢল ঢল করিবে । গরীব তারাচরণের ত এ সকল কিছুই নাই,—সৌন্দর্য্যের মধ্যে তামাটে বর্ণ, আর খাদ নাক-বীৰ্য্য কেবল স্কুলের ছেলেমহলে প্রকাশ-আর প্রণয়ের বিষয়টা কুন্দনন্দিনীর সঙ্গে তাহার কতদূর ছিল, বলিতে পারি না । কিন্তু একটা পোষা বানরীর সঙ্গে একটু একটু ছিল । - সে যাহা হউক, কুন্দনন্দিনীকে নগেন্দ্র বাট লইয়া আসিলে, তারাচরণের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইল। তারাচরণ সুন্দরী স্ত্রী ঘরে লইয়া গেলেন । কিন্তু সুন্দরী স্ত্রী লইয়া তিনি এক বিপদে পড়িলেন । পাঠক মহাশয়ের স্মরণ থাকিবে যে, তারাচরণের