পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৫১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8& স্থ । দুই কথাই সত্য। আমি তার মুখে সুখী—কিন্তু আমায় যে তিনি পায়ে ঠেলিলেন, আমায় পায়ে ঠেলিয়াছেন বলিয়াই তার এত আহলাদ — স্বৰ্যমুখী আর বলিতে পারিলেন না, কণ্ঠ রুদ্ধ হইল–চক্ষু ভাসিয়া গেল, কিন্তু স্বৰ্য্যমুখীর অসমাপ্ত কথার মৰ্ম্ম কমলমণি সম্পূর্ণ বুঝিয়াছিলেন। বলিলেন, “তোমায় পায়ে ঠেলেছেন বলে তোমার অন্তৰ্দ্দাহ হতেছে। তবে কেন বল, “আমি কে ? তোমার অন্তঃকরণের আধখানা আজও ‘আমি'তে ভরা ; নহিলে আত্মবিসর্জন করিয়াও অনুতাপ করিবে কেন ?” স্থ । অনুতাপ করি না । ভালই করিয়াছি, ইহাতে আমার কোন সংশয় নাই । কিন্তু মরণের ত যন্ত্রণা আছেই। আমার মরণই ভাল বলিয়া আপনার হাতে আপনি মরিলাম। কিন্তু তাই বলিয়া মরণের সময় কি তোমার কাছে কঁদিব না ? স্বৰ্য্যমুখী কাদিলেন । কমল তাহার মাথা আপন হৃদয়ে আনিয়া হাত দিয়া ধরিয়া রাখিলেন । কথায় সকল কথা ব্যক্ত হইতেছিল না—কিন্তু অন্তরে অস্তরে কথোপকথন হইতেছিল । অন্তরে অস্তরে কমলমণি বুঝিতেছিলেন যে স্থৰ্যমুখী কত দুঃখী । অন্তরে অন্তরে স্বৰ্য্যমুখী বুঝিয়াছিলেন যে, কমলমণি র্তাহার দুঃখ বুঝিতেছেন। উভয়ে রোদন সম্বরণ করিয়া চক্ষু মুছিলেন। স্বৰ্য্যমুখী তখন আপনার কথা ত্যাগ করিয়া অন্যান্য কথা পাড়িলেন । সতীশচন্দ্রকে আনাইয়া আদর করিলেন, এবং তাহার সঙ্গে কথোপকথন করিলেন। কমলের সঙ্গে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সতীশ শ্রীশচন্দ্রের কথা কহিলেন। সতীশচন্দ্রের বিদ্যাশিক্ষা, বিবাহ ইত্যাদি fৰষয়ে অনেক মুখের কথার আলোচনা হইল । এইরূপ গভীর রাত্র পর্ষ্যস্ত উভয়ে কথোপকথন করিয়া সূৰ্য্যমুখী কমলকে স্নেহভরে আলিঙ্গন করিলেন, এবং সতীশচন্দ্রকে ক্রোড়ে লইয়া মুখচুম্বন করিলেন। উভয়কে বিদায় দিবারকালে স্বৰ্য্যমুখীর চক্ষের জল জাবার অসংবরণীয় হইল। রোদন করিতে করিতে ভিনিসতীশকে আশীৰ্ব্বাদ করিলেন, “বাব৷ আশীৰ্ব্বাদ ی۔ g ইতেছে—কি ? বল না?” করি, যেন তোমার মামার মত অক্ষয় গুণে গুণবান "ও, ইহার বাড়া আশীৰ্ব্বাদ আর আমি জানি না।”

- সুৰ্য্যমুখী স্বাভাবিক মৃদুস্বরে কথা কহিয়াছিলেন,

&ষ্ঠথাপি তাহার কণ্ঠস্বরের ভঙ্গীতে কমলমণি চমকিয়৷ উঠিলেন। বলিলেন, “বউ ! তোমার মনে কি স্থ । কিছু না । বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী কম। আমার কাছে লুকাইও না। স্থ। তোমার কাছে লুকাইবার আমার কোন কথাই নাই । কমল তখন স্বচ্ছন্দচিত্তে শয়নমন্দিরে গেলেন । কিন্তু স্বৰ্য্যমুখীর একটি লুকাইবার কথা ছিল। তাহ কমল প্রাতে জানিতে পারিলেন। প্রাতে স্বৰ্য্যমুখীর সন্ধানে তাহার শয্যাগৃহে গিয়া দেখিলেন, স্বৰ্য্যমুখী তথায় নাই, কিন্তু অভূক্ত শয্যার উপরে একখানি পত্র পড়িয়া আছে। পত্র দেখিয়াই কমলমণির মাথা ঘুরিয়া গেল—পত্র পড়িতে হইল না—না পড়িয়াই সকল বুঝিলেন । বুঝিলেন, স্বৰ্য্যমুখী পলায়ন করিয়াছেন । পত্র খুলিয়া পড়িতে ইচ্ছা হইল না—তাহ করতলে বিমৰ্দ্ধিত করিলেন । কপালে করাঘাত করিয়া শষ্যায় বসিয়া পড়িলেন । বলিলেন, “আমি পাগল !—নচেৎ কা’ল ঘরে যাইবার সময় বুঝিয়াও বুঝিলাম না কেন ?" সতীশ নিকটে দাড়াইয়া ছিল । মা’র কপালে করাঘাত ও রোদন দেখিয়া সেও কাদিতে লাগিল । অষ্টাবিংশ পরিচ্ছেদ আশীৰ্ব্বাদ-পত্র শোকের প্রথম বেগ সংবরণ হইলে, কমলমণি পত্র খুলিয়া পড়িলেন। পত্ৰখানির শিরোনামায় তাহারই নাম। পত্র এইরূপ : “ষে দিন স্বামীর মুখে শুনিলাম যে, অামাতে আর তার কিছুমাত্র মুখ নাই, তিনি কুন্দনন্দিনীর জন্য উন্মাদগ্ৰস্ত হইবেন, অথবা প্রাণত্যাগ করিবেন, সেই দিনই মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম, যদি কুনানন্দিনীকে আবার কখনও পাই, তবে তাহার হাতে স্বামীকে সমর্পণ করিয়া তাহাকে স্বর্থী করিব । কুননন্দিনীকে স্বামী দান করিয়া আপনি গৃহত্যাগ করিয়া যাইব ; কেন না, আমার স্বামী কুন্দনন্দিনীর হইলেন, ইহা চক্ষে দেখিতে পারিব না। এখন কুন্দনন্দিনীকে পুনৰ্ব্বার পাইয়া তাহাকে স্বামী দান করিলাম। আপনিও গৃহত্যাগ করিয়া চলিলাম। “কালি বিবাহ হুইবার পরেই আমি রাত্রে গৃহত্যাগ করিয়৷ যাইতাম ; কিন্তু স্বামীর ষে মুখের কামনায় আপনার প্রাণ আপনিই বধ করিলাম, সে মুখ ছুই এক দিন চক্ষে দেখিয়া যাইবার সাধ ছিল । আর তোমাকে অার একবার দেখিয়া যাইব সাধ ছিল ।