পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/১৯০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যুগলাঙ্গুরীয় a ५ হিরন্ময়ীর হৃদয়ে রক্ত একটু খর বহিল। তাহার দারিদ্র্যদশা মনে পড়িল, পূৰ্ব্বসম্বন্ধও মনে পড়িল । দারিদ্র্যের জালা বড় জালা। তাহার পরিবর্তে এই জতুল ধনরাশি হিরন্ময়ীর হইতে পারিত, ইহা ভাবিয়া যাহার থর রক্ত না বহে, এমন স্ত্রীলোক অতি অল্প আছে। হিরন্ময়ী ক্ষণেক কাল অন্যমনে থাকিয়৷ পরে অন্য প্রসঙ্গ তুলিলেন । শেষ শয়নকালে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমলে, সেই শ্রেষ্টিপুত্রের বিবাহ হইয়াছে ?” অমল কহিল, “না, বিবাহ হয় নাই ।” হিরন্ময়ীর ইন্দ্রিয় সকল অবশ হুইল। সে রাত্রিতে আর কোন কথা হইল না। ’ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ পরে এক দিন অমলা হাসিমুখে হিরন্ময়ীর নিকট আসিয়া মধুর ভৎসনা করিয়া কহিল, “হ্যা গা বাছা, তোমার কি এমনই ধৰ্ম্ম ?” হিরন্ময়ী কহিলেন, “কি করিয়াছি ?” অম। আমার কাছে এত দিন তা বলিতে নাই ? হি। কি বলি নাই ? অম । পুরন্দর শ্রেষ্ঠীর সঙ্গে আত্মীয়তা । হিরণারী ঈষল্লজ্জিত হইলেন, বলিলেন, “তিনি বাল্যকালে আমার প্রতিবাসী ছিলেন, তার বলিব কি ?” আম । এনেছি ? এই বলিয়া আমলা একটি কোঁটা বাহির করিল ; কৌটা খুলিয় তাহার মধ্য হইতে অপূৰ্ব্বদর্শন, মহাপ্রভাযুক্ত মহামূল্য হীরার হার বাহির করিয়৷ হিরণ্ডায়ীকে দেখাইল । শ্রেষ্ঠিকন্ত হীরা চিনিত— বিক্ষিত হইয়া কহিলেন, “এ যে মহামূল্য—এ কোথায় পাইলে ?” অম। ইহা তোমাকে পুরন্দর পাঠাইয়া দিয়াছে। তুমি আমার গৃহে থাক শুনিয়া আমাকে ডাকিয়া পাঠাইয়া ইহা তোমাকে দিতে বলিয়াছে । হিরণ্ডায়ী ভাবিয়া দেখিলেন, এই হার গ্রহণ করিলে চিরকালজন্ত দারিদ্র্যমোচন হয় । ধনদাসের আদরের কস্তা আর অন্নবস্ত্রের কষ্ট সহ করিতে পারিতেছিল না। অতএব হিরন্ময়ী ক্ষণেক বিমনা হইয়া পরে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “অমলা, তুমি বণিককে কহিও যে, আমি ইহা গ্রহণ করিব না - 을 8 তোমার এত শুধু প্রতিবাসী ? দেখ দেখি, কি অমলা বিস্মিত হইল। বলিল, “সে কি ? তুমি কি পাগল, না আমার কথা বিশ্বাস করিতেছ না?” . হি। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করিতেছি— ; আর পাগলও নই। আমি উহা গ্রহণ করিব না। আমলা অনেক তিরস্কার করিতে লাগিল । হিরন্ময়ী . কিছুতেই গ্রহণ করিলেন না। তখন অমল হার লইয়া . মদনদেবের নিকটে গেল। রাজাকে প্রণাম করিয়া ; হার উপহার দিল । বলিল, “এ হার আপনাকে । গ্রহণ করিতে হইবে । এ হার আপনারই যোগ্য ।” রাজা হার লইয়া আমলাকে ষথেষ্ট অর্থ দিলেন । হিরন্ময়ী ইহার কিছুই জানিল না । ইহার কিছুদিন পরে পুরন্দরের এক জন পরি" চারিকা হিরন্ময়ীয় নিকটে আসিল । সে কহিল, “আমার প্রভু বলিয়া পাঠাইলেন যে, আপনি যে পর্ণ কুটীরে বাস করেন, ইহা তাহার সহ্য হয় না, আপনি র্তাহার বাল্যকালের সখী, আপনার গৃহ তাহার গৃহ একই ; তিনি এমন বলেন না যে, আপনি তাহার গৃহে গিয়া বাস করুন, আপনার পিতৃগৃহ তিনি ধনদাসের মহাজনের নিকট ক্রয় করিয়াছেন । তাহা আপনাকে দান করিতেছেন ; আপনি গিয়া সেইখানে বাস করুন, ইহাই তাহার ভিক্ষণ " হিরণায়ী দারিদ্র্য জন্ত যত দুঃখ ভোগ করিতে ছিলেন, তন্মধ্যে পিতৃভবন হইতে নিৰ্ব্বাসনই তাহার সৰ্ব্বাপেক্ষা গুরুতর বোধ হইত। যেখানে বাল্যক্রীড়া করিয়াছিলেন, যেখানে পিতামাতার সহ বাস করি । তেন, যেখানে তাহাদিগের মৃত্যু দেখিয়াছেন, সেখানে । ষে আর বাস করিতে পান না, এ কষ্ট গুরুতর বোধ হইত। সেই ভবনের কথায় তাহার চক্ষে জল আসিল । তিনি পরিচারিকাকে আশীৰ্ব্বাদ করিয়া কহিলেন, “এ দান আমার গ্রহণ করা উচিত নহে— কিন্তু আমি এ লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না । তোমার প্রভুর সর্বপ্রকার মঙ্গল হউক।” পরিচারিক প্রণাম করিয়া বিদায় হুইল ; আমল উপস্থিত ছিল । হিরন্ময়ী তাহাকে বলিলেন, “অমল, “ তথায় আমার এক বাস করা হইতে পারে না । তুমি তথায় বাস করিবে চল ।” ** অমলা স্বীকৃত হইল। ভয়ে গিয়া ধনদাসের গৃহে বাস করিতে লাগিলেন। তথাপি আমলাকে সৰ্ব্বদা পুরন্দরের গৃহে যাইতে হিরন্ময়ী এক দিন নিষেধ করিলেন : অমলা আর যাইত না । পিতৃগৃহে গমনাবধি হিরন্ময়ী একটা বিষয়ে বড় । বিস্মিত হইলেন। এক দিন অমল কহিল, “তুমি