পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ So জেব । কিসে ? দ। আমার সঙ্গে সাদি হয়েছে। জেব। নেকাল হিয়াসে । জেবউন্নিসা কতকগুলা ফুল ফেলিয়া সবলে দরিয়াকে প্রহার করিল। দরিয়া যোড় হাত করিয়া বলিল, “মোল্লা গোওয়া সব জীবিত আছে । না হয় তাহাদের জিজ্ঞাসা করিয়৷ পাঠান ।” জেবউন্নিসা ভ্রভঙ্গ করিয়া বলিল, “আমার হুকুমে তাহার শূলে যাইবে ।” দরিয়া কঁাপিল । এই ব্যাস্ত্রী-তুল্য মোগলকুমারীরা সব পারে, তা সে জানিত । বলিল, শাহজাদী ! আমি দুঃখী মানুষ, খবর বেচিতে আসিয়াছি—আমার সে সব কথার প্রয়োজন নাই ।” জেব । কি খবর বলু। দরিয়া । দুষ্টট আছে । একটা এই মবারক খ সম্বন্ধে । আজ্ঞা ন পাইলে বলিতে সাহস হয় না । জেব । বল্‌ ৷ দরিয়া । ইনি আজ রাত্রে চোঁকে গণেশ জ্যোতিষীর কাছে আপনার কেসমৎ গণাইতে শিয়াছিলেন । জেব । জ্যোতিষী কি বলিল ? দরিয়া । শাহজাদী বিবাহ কর । তাহা হইলে তোমার তরক্কী হইবে । জেব । মিছা কথা । মনসবদার কখন জ্যোতি ধীর কাছে গেল ? দরিয়া । এখানে আসিবার আগেই । জেব । কে এখানে আসিয়াছিল ? দরিয়া একটু ভয় খাইল । কিন্তু তখনই আবার সাহস করিয়া তল্লীম দিয়া বলিল, “মবারক খ সাহেব ।” জেব । তুই কেমন করিয়া জানিলি ? দরিয়া । আমি আসিতে দেখিয়াছি। জেব । যে এ সকল কথা বলে, আমি তাহাকে শূলে দিই । দরিয়া শিহয়িল। বলিল, “বেগম সাহেবার হুজুরে ভিন্ন এ সকল কথা আমি মুখে আনি না ।” জেব । আনিলে জল্লাদের হাতে তোমার জিব কাটাইয় ফেলিব । তোর দোসরা খবর কি বল । দরিয়া । দোসর খবর রূপনগরের । দরিয়া তখন চঞ্চলকুমারীর তসবীর ভাঙ্গার কাহিনীটা আদ্যোপাস্ত শুনাইল । শুনিয়া জেব-উন্নিসা বলিলেন, “এ খবর আচ্ছা । কিছু বখশিশ পাইবি ।” vදා তখন রঙমহালের খাজনাখানার উপর বখশিশের পরওয়ান হইল । পাইয়া দরিয়া পলাইল । তাতারী প্রতিহারী তাহাকে ধরিল । তরবারিখানা দরিয়ার কাধের উপর রাখিয়া বলিল, “পলাও কোথা সখি ?” দ। কাজ হুইয়াছে—ঘর যাইব । প্রতিহারী । টাকা পাইয়াছ—আমায় কিছু দিবে না ? দ। আমার টাকার বড় দরকার, একটা গীত শুনাইয়। যাই । সারেঙ্গ আন । প্রতিহারীর সারেঙ্গ ছিল—মধ্যে মধ্যে বাজাইত । রঙ মহালে গীতবাদ্যের বড় ধূম । সকল বেগমের এক এক সম্প্রদায় নৰ্ত্তকী ছিল ; যে অপরিণীত গণিকাদিগের ছিল না, তাহারা আপন আপনি সে কাৰ্য্য সম্পন্ন করিত । রঙমহালে রাত্রিতে সুর লাগিয়াই ছিল । দরিয়া তাতারীর সারেঙ্গ লইয়া গান করিতে বসিল । সে অতিশয় মুকণ্ঠ, সঙ্গীতে বড় পটু অতি মধুর গায়িল । জেবাউন্নিসা ভিতর হইতে জিজ্ঞাসা করিল, “কে গায় ?” প্রতিহারী বলিল, “দরিয়া বিবি " হুকুম হইল, “উহাকে পাঠাইয়া দাও।” দরিয়া আবার জেব-উল্লিসার নিকট গিয়া কুর্ণিল করিল । জেব-উল্লিস বলিলেন, “গ । ঐ বীণ আছে।” বীণ লইয়া দরিয়া গায়িল। গায়িল অতি মধুর। শাহজাদী অনেক অপারোনিন্দিত সঙ্গীতবিদ্যাপটু গায়ক-গায়িকার গান শুনিয়াছিলেন, কিন্তু এমন গান কখন গুনেন নাই । দরিয়ার গীত সমাপ্ত হইলে, জেব উন্নিসা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি মবারকের কাছে কখন গায়িয়াছিলে ?” দরিয়া । আমার এই গীত শুনিয়াই তিনি আমাকে বিবাহ করিয়াছিলেন । জেব উন্নিসা একটা ফুলের তোর্রা ফেলিয়৷ , দরিয়াকে এমন জোরে মারিলেন যে, দরিয়ার কর্ণ ভূযায় লাগিয়া কান কাটিয়া রক্ত পড়িল । তখন জেব উল্লিস তাহাকে আরও কিছু অর্থ দিয়া বিদায় করিলেন। বলিলেন, “আর আসিস না ।” দরিয়া তসলীম দিয়া বিদায় হইল । মনে মনে বলিল, “আবার আসিব—আবার জালাইব—আবার মার খাইব—আবার টাকা নিব, তোমার সৰ্ব্বনাশ করিব ” ::