পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৪৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মৃণালিনী কদাচিৎ শঙ্কিতচিত্তে যবনসমীপে উপস্থিত হইলেন । বখতিয়ার খিলিজি গাত্ৰোখান করিয়া সাদরে র্তাহাকে অভিবাদন করিলেন এবং কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। পশুপতি রাজভৃত্যবর্গের রক্তনদীতে চরণ প্রক্ষালন করিয়া আসিয়াছেন, সহসা কোন উত্তর দিতে পারিলেন না । বখতিয়ার খিলিজি তাহার চিত্তের ভাব বুঝিতে পারিয়া কহিলেন,—“পণ্ডিতবর। রাজসিংহাসনে আরোহণের পথ কুঞ্জমাবৃত নহে । এ পথে চলিতে গেলে, বন্ধুবর্গের অস্থিমুণ্ড সৰ্ব্বদা পদে বিদ্ধ হয় ।” পশুপতি কহিলেন, “সত্য । কিন্তু যাহার। বিরোধী, তাহাদিগেরই বধ আবশুক । ইহার নিৰ্ব্বিরোধী * বখতিয়ার কহিলেন, “আপনি কি শোণিতপ্রবাহ দেখিয়া, নিজ অঙ্গীকার স্মরণে অসুখী হইতেছেন ?” পশুপতি কহিলেন, “ষাহা স্বীকার করিয়াছি, তাহ অবহু করিব । মহাশয়ও যে তদ্রুপ করিবেন, তাহাতে আমার কোন সংশয় নাই ।” বখ। কিছুমাত্র সংশয় নাই । আমাদিগের এক ষাজ্ঞা আছে । প। আজ্ঞা করুন । ব। কুতুব উদ্দীন গোঁড়শাসনভার আপনার প্রতি অর্পণ করিলেন । আজ হইতে আপনি বঙ্গে রাজপ্রতিনিধি হইলেন । কিন্তু যবন-সম্রাটের সঙ্কল্প এই যে, ইসলামধৰ্ম্মাবলম্বী ব্যতীত কেহ তাহার রাজকাৰ্য্যে সংলিপ্ত হইতে পরিবে না। আপনাকে ইসলাম ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিতে হইবে । পশুপতির মুখ শুকাইল । তিনি কহিলেন, "সদ্ধির সময়ে এরূপ কোন কথা হয় নাই ।” ব। যদি না হইয়া থাকে, তবে সেটা ভ্রাস্তিমাত্র। আর এ কথা উত্থাপিত না হইলেও আপনার ন্যায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্বারা অনায়াসেই অনুমিত হইয়। থাকিবে । কেন না, এমন কখনও সম্ভবে না ষে, মুসলমানের ষাঙ্গালী জয় করিয়াই আবার হিন্দুকে রাজ্য দিবে । প। আমি বুদ্ধিমান বলিয়া আপনার নিকট পরিচিত হইতে পারিলাম না । ব। না বুঝিয়া থাকেন, এখন বুঝিলেন ; আপনি যবনধৰ্ম্ম অবলম্বনে স্থিৱসঙ্কল্প হউন । প । ( সদর্পে) অামি স্থিরসঙ্কল্প হুইয়াছি ষে, ষবন-সম্রাটের সাম্রাজ্যের জন্তও সনাতন ধৰ্ম্ম ছাড়িয়া নরকগামী হুইব না । כפי . কেবলমাত্র -(to ব। ইহা আপনার ভ্ৰম । যাহাকে সনাতন ধৰ্ম্ম বলিতেছেন, সে ভূতের পুজা মাত্র । কোরাণউক্ত ধৰ্ম্মই সত্যধৰ্ম্ম । মহম্মদ ভজিয়া ইহুকাল পরকালের মঙ্গলসাধন করুন। পশুপতি যবনের শঠতা বুঝিলেন । তাহার অভিপ্রায় এইমাত্র ষে, কাৰ্য্যসিদ্ধি করিয়া নিবন্ধ সন্ধি ছলফ্রমে ভঙ্গ করিবে । আরও বুঝিলেন, ছলক্রমে না পারিলে বলক্রমে করিবে । অতএব কপটেৱ । সহিত কাপট্য অবলম্বন না করিয়া দৰ্প করিয়া ভাল করেন নাই । তিনি ক্ষণেক চিন্তা করিয়া কহিলেন, “ষে আজ্ঞা, আমি আজ্ঞানুবৰ্ত্তী হইব ।” বখতিয়ারও তাহার মনের ভাব বুঝিলেন । বখতিয়ার যদি পশুপতির অপেক্ষা চতুর ন হইতেন, তবে এত সহজে গৌড়জয় করিতে পারিতেন না । বঙ্গভূমির অদৃষ্টলিপি এই যে, এ ভূমি যুদ্ধে জিত হইবে না ; চাতুৰ্য্যই ইহার জয় । চতুর ক্লাইব সাহেব ইহার দ্বিতীয় পরিচয়স্থান । বখতিয়ার কহিলেন, “ভাল, ভাল। আজ আমাদিগের শুভ দিন । এরূপ কার্য্যে বিলম্বের প্রয়োজন নাই। আমাদিগের পুরোহিত উপস্থিত, এখনই আপনাকে ইসলামধৰ্ম্মে দীক্ষিত করিবেন।” পশুপতি দেখিলেন, সৰ্ব্বনাশ ! বলিলেন, "একবার মাত্র অবকাশ দিউল, পরিবারগণকে লইয়া আসি, সপরিবারে একেবারে দীক্ষিত হইব ।” বখতিয়ার কহিলেন, “আমি তাহাদিগকে আনিতে লোক পাঠাইতেছি । আপনি এই প্রহরীর সঙ্গে গিয়া বিশ্রাম করুন।” প্রহরী আসিয়া পশুপতিকে ধরিল, পশুপতি ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, “সে কি ? আমি কি বন্দী হইলাম ?” বখতিয়ার : কহিলেন, বটে * পশুপতি রাজপুরীমধ্যে নিরুদ্ধ হইলেন । উর্ণনাভের জাল ছিড়িল-সে জালে কেবল স্বয়ং জড়িত হইলেন । আমরা পাঠক মহাশয়ের নিকট পশুপতিকে বুদ্ধিমান বলিয়া পরিচিত করিয়াছি। পাঠক মহাশয় বলিবেন, যে ব্যক্তি শক্রকে এতদুর বিশ্বাস করিল, সহায়হীন হইয় তাহাদিগের অধিকৃত পুরীমধ্যে প্রবেশ করিল, তাহার চতুরতা কোথায় ? কিন্তু । বিশ্বাস না করিয়া কি করেন । এ বিশ্বাস না করিলে যুদ্ধ করিতে হয় । উৰ্ণনাভ জাল পাতে, যুদ্ধ করে না ! - “আপাততঃ তাছাই