পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৪৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


á文 সেই দিন রাত্রিকালে মছাবন হইতে বিংশতি সহস্ৰ যবন আসিয়া নবদ্বীপ প্লাবিত করিল। নবদ্বীপজয় সম্পন্ন হইল। যে স্থর্য সেই দিন অস্ত গিয়াছে, আর তাহার উদয় হইল না । আর কি উদয় হইবে না? উদয় অস্ত উভয়ই ত স্বাভাবিক নিয়ম । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ পিঞ্জর ভাঙ্গিল যভক্ষণ পশুপতি গৃহে ছিলেন, ততক্ষণ তিনি মনোরমাকে নয়নে নয়নে রাখিয়াছিলেন । যখন তিনি যবনদর্শনে গেলেন, তখন তিনি গৃহের সকল দ্বার রুদ্ধ করিয়া শান্তশীলকে গৃহরক্ষায় রাখিয় গেলেন। পশুপতি ষাইবামাত্র মনোরম পলায়নের উদ্যোগ করিতে লাগিল। গৃহের কক্ষে কক্ষে অনুসন্ধান করিতে লাগিল। পলায়নের উপযুক্ত কোন পথ মুক্ত দেখিল না । অতি উদ্ধে কতকগুলি গবাক্ষ ছিল, কিন্তু তাহা ঘুরারোহ ; ভাঁহার মধ্য দিয়া মনুষ্যশরীর নির্গত হইবার সম্ভাবনা ছিল না, আর তাহা ভূমি হইতে এত উচ্চ ষে, তথা হইতে লম্ফ দিয়া ভূমিতে পড়িলে অস্থি চুৰ্ণ হইবার সম্ভাবনা। মনোরমা উন্মদিনী, সেই গবাক্ষপথেই নিজাস্ত হুইবার মানস করিল। অতএর পশুপতি যাইবার ক্ষণকাল পরেই মনোরম পশুপতির শষ্যাৰ্থহে পালঙ্কের উপর আরোহণ করিল। পালঙ্ক হইতে গবাক্ষারোহণ সুলভ হইল । পলঙ্ক হইতে গবাক্ষ অবলম্বন করিয়া মনোরম। গবাক্ষরঞ্জ দিয়া প্রথমে দুই হস্ত, পশ্চাৎ মস্তক, পরে বক্ষ পর্য্যন্ত বাহির করিয়া দিল । গবাক্ষনিকটে উদ্যানস্থ একুটি আম্রবৃক্ষের ক্ষুদ্র শাখা দেখিল ; মনোরম তাহা ধারণ করিল এবং তখন পশ্চাদ্ভাগ গবাক্ষ হইতে বহিস্কৃত করিয়া, শাখবলম্বনে ঝুলিতে লাগিল । কোমল শাখা তাহার ভরে নমিত হইল ; তখন ভূমি তাহার চরণ হইতে অনতিদূরবর্তী হইল । মনোরম শাখা ত্যাগ করিয়া অবলীলাক্রমে ভূতলে পড়িল এবং তিলমাত্র অপেক্ষা না করিয়া জনাৰ্দ্দনের গৃহাভিমুখে চলিল ।

সপ্তম পরিচ্ছেদ যবন-বিপ্লব সেই নিশীথে নবদ্বীপ নগর বিজয়োম্মত্ত যবনসেনায় নিপীড়নে, বাতাসস্তাড়িত তরঙ্গোৎক্ষেপী বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী সাগর সদৃশ চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজপথ ভূরে ভূরি অশ্বারোহিগণে, ভূরি ভূরি পদাতিদলে, ভূরি ভুরি খড়গী, ধানুকী, শূলিসমূহসমারোহে আচ্ছন্ন হইয়। গেল । সেনাবলহীন রাজধানীর নাগরিকের ভীত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল ; দ্বার রুদ্ধ করিয়া সভয়ে ইষ্টনাম জপ করিতে লাগিল । যবনেরা রাজপথে যে দুই এক জন হতভাগ্য আশ্রয়হীন ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হইল, তাহাদিগকে শূলবিদ্ধ করিয়া রুদ্ধদ্বার ভবন সকল আক্রমণ করিতে লাগিল ; কোথাও বা দ্বার ভগ্ন করিয়া, কোথাও বা প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিয়া, কোথাও বা শঠতাপূৰ্ব্বক ভীত গৃহস্থকে জীবনশা দিয়া গৃহপ্রবেশ করিতে লাগিল । গৃহ প্রবেশ করিয়া, গৃহস্থের সর্বস্বাপহরণ, পশ্চাৎ স্ত্রী, পুরুষ, বুদ্ধ, বনিতা, বালক সকলেরই শিরশেছদ, ইহাই নিয়ম পূৰ্ব্বক করিতে লাগিল । কেবল যুবতীর পক্ষে স্বতন্ত্র নিয়ম । শোণিতে গৃহস্থের গৃহ সকল প্লাবিত হইতে লাগিল । শোণিতে রাজপথ পঙ্কিল হইল । শোণিতে যবনসেন রক্তচিত্রময় হইল । অপহৃত দ্রব্যঞ্জাতের ভারে অশ্বের পৃষ্ঠ এবং মনুম্বোর স্কন্ধ পীড়িত হইতে লাগিল। শূলাগ্রে বিদ্ধ হইয়া ব্রাহ্মণের মুণ্ড সকল ভীষণ ভাব ব্যক্ত করিতে লাগিল । ব্রাহ্মণের যজ্ঞে+ পবীত অশ্বের গলদেশে তুলিতে লাগিল । সিংহাসনস্থ শালগ্রামশিলা সকল স্বন-পদাঘাতে গড়াইতে লাগিল । ভয়ানক শব্দে নৈশাকাশ পরিপূর্ণ হইতে লাগিল। অশ্বের পদধ্বনি, সৈনিকের কোলাহল, হস্তীর বৃংহিত, যবনের জয়শব্দ, তদুপরি পীড়িতের আর্তনাদ, মাতার রোদন, শিশুর রোদন, বৃদ্ধের করুণাকাজক্ষা, যুবতীর কণ্ঠবিদার । ষে বীরপুরুষকে মাধবাচাৰ্য্য এত যত্নে যবনদমনার্থ নবদ্বীপে লইয়া আসিয়াছিলেন, এ সময়ে তিনি কোথা ? এই ভয়ানক যবনপ্রলয়কালে হেমচন্দ্র রণোন্মখ নহেন । একাকী রণোন্মুখ হইয়া কি করিবেন ? হেমচন্দ্র এখন আপন শয়ন-মন্দিরে শষ্যোপরি শয়ন করিয়াছিলেন । নগরাক্রমণের কোলাহুল র্তাহার কর্ণে প্রবেশ করিল । তিনি দিগ্বিজয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিসের শব্দ ?” দিগ্বিজয় কহিল, "ঘবনসেন নগর আক্রমণ করিয়াছে ” হেমচন্দ্র চমৎকৃত হইলেন । তিনি এ পর্য্যস্ত বখতিয়ার কর্তৃক রাজপুরাধিকার এবং রাজার